‘আল্লাহর মাস’ মহররম: কিছু করণীয় ও বর্জনীয়

ছবি: ফ্রিপিক

আমাদের সামনে আবারও এসেছে একটি নতুন হিজরি বছর। নতুন বছরের শুরুই হচ্ছে এমন একটি মাস দিয়ে, যাকে রাসুল (সা.) ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। তাই মহররম শুধু বছরের প্রথম মাস নয়; এটি সম্মান, বরকত, তাওবা ও নেক আমলের এক বিশেষ মৌসুম।

মহররম কী ও এর গুরুত্ব

মহররম শব্দের অর্থ হলো—নিষিদ্ধ, পবিত্র, সম্মানিত বা যার মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক। হিজরি বারোটি মাসের মধ্যে চারটি মাস আল্লাহ তাআলার কাছে বিশেষ সম্মানিত, মহররম তার অন্যতম। এজন্য একে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ও বলা হয়।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।” (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)

পবিত্র কোরআনে এই মাসকে আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই সময়ে নিজেদের ও অন্যদের ওপর জুলুম করতে নিষেধ করেছেন। জাহেলি যুগেও এই মাসে যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাতকে নিষিদ্ধ (হারাম) মনে করা হতো।

আরও পড়ুন

মহররম মাসের তাৎপর্য

মহররম মাসের তাৎপর্য বহুমাত্রিক। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জন্য স্মৃতিবিজড়িত। রাসুল (সা.) বলেছেন, “রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)

মহররম মাসের পুরোটাই সম্মানিত। অতএব এই মাসে যে যত বেশি নফল রোজা রাখতে পারেন এবং ইবাদতে মগ্ন হতে পারেন, তিনি তত বেশি সফল হতে পারবেন।

আশুরা রোজা

মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমে আশুরা’ তথা মহররমের দশ তারিখ। ইসলামপূর্ব আরব সমাজ এবং আহলে কিতাবদের মাঝেও এই দিনের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তখন রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মানুষ আশুরার দিনে রোজা রাখত এবং কাবায় গিলাফ জড়াত।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “আমার জানা মতে, নবীজি আশুরার রোজার তুলনায় অন্য কোনো দিনের রোজার ফজিলত লাভের জন্য এত বেশি উদগ্রীব থাকতেন না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩২)

তিনি বলেছেন, “আশুরার রোজা বিগত এক বছরের পাপের কাফফারা হয়ে যায়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

আরও পড়ুন

সাহাবিরা এই দিনে শিশুদেরও রোজা রাখতে অভ্যস্ত করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৬)।

মহররম মাসের বর্জনীয়

আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা এই দিনগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম করো না।” নিজেদের ওপর সবচেয়ে বড় জুলুম হলো আল্লাহর অবাধ্যতা বা পাপ করা। পাপ বর্জন করা নিজেই একটি বড় ইবাদত।

বর্তমানে আশুরার দিনকে কেন্দ্র করে সমাজে বেশ কিছু বিদআত ও কুসংস্কার প্রচলিত আছে; যা সওয়াবের নিয়তে করা হলেও ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই। যেমন—বিশেষ নিয়মে গোসল করা, সুরমা লাগানো, মেহেদি লাগানো, খিচুড়ি রান্না করে উৎসব করা ইত্যাদি।

এ ছাড়া আশুরার দিনে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে বুক চাপড়ানো, চিৎকার-চেঁচামেচি করে বিলাপ করা এবং ‘তাজিয়া মিছিল’ বের করা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। ইসলামে এভাবে নিয়মতান্ত্রিক শোক প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই।

এই প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এসব অনুষ্ঠানাদি উদ্যাপন প্রসঙ্গে নবীজি থেকে বিশুদ্ধ কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি এবং সাহাবিদের থেকেও কিছু প্রমাণিত নয়। চার ইমামসহ নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমও এসব কাজকে সমর্থন করেননি।” (ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৫/৩০৮, দারুল ওফা, মানসুরা, মিসর, ২০০৫)

  • ইসমত আরা : শিক্ষক ও প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন