কোনো হাকিকত মানুষের সঙ্গে ভাষার উসিলায় কথা বলে না; মানুষই পাঠ করে হাকিকতকে। কায়েনাত মানুষের সামনে উন্মুক্ত থাকে, কিন্তু তার অর্থ উন্মুক্ত থাকে না।
আকাশ সবার মাথার ওপর সমানভাবে বিস্তৃত, কিন্তু কেউ সেখানে কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞানের বস্তু দেখে, কেউ দেখে সৌন্দর্যের বিস্তার, কেউ দেখে সৃষ্টিকর্তার কুদরতের আয়াত।
অর্থাৎ বাস্তবতার মধ্যে যত–না ফারাক, তার চেয়ে অনেক বেশি পার্থক্য মানুষের তরজমায়।
অতএব জ্ঞানের একটি মৌলিক সওয়াল হলো—মানুষ কীভাবে মর্ম উপলব্ধি করে? আর কোন মর্ম সত্যের অধিক নিকটবর্তী? এই প্রশ্ন থেকেই ফিতরাতভিত্তিক ব্যাখ্যাতত্ত্বের সূচনা।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা মনে করে, ব্যাখ্যা কখনোই নিছক ভাষাতাত্ত্বিক কাণ্ড নয়। ব্যাখ্যা একটি অস্তিত্বগত আমল। মানুষ যেমন, তার ব্যাখ্যাও তেমন। যে হৃদয় লোভ দ্বারা আচ্ছন্ন, সে কায়েনাতেও লোভের পাঠ্য দেখে। যে সভ্যতা আধিপত্যে বিশ্বাস করে, সে প্রকৃতিকেও বিজিত ভূখণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করে। যে অন্তর আমানতের চেতনা ধারণ করে, সে একই প্রকৃতিকে খিলাফতের দায়িত্ব হিসেবে উপলব্ধি করে। ফলে ব্যাখ্যা কেবল পাঠ্যের নয়; পাঠকেরও পরিচয় বহন করে।
এ কারণেই ফিতরাতি ব্যাখ্যাতত্ত্বে ব্যাখ্যার প্রথম শর্ত পাঠকের ফিতরাতকে জাগ্রত করা। কারণ, বিকৃত হৃদয় শুদ্ধ বাক্য থেকেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, আবার পরিশুদ্ধ হৃদয় সীমিত ভাষা থেকেও সত্যের হেদায়াত লাভ করতে পারে। অতএব ব্যাখ্যার পূর্বশর্ত তাযকিয়াহ।
এখানে নৈতিক শুদ্ধি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রয়োজনও বটে।
একটি আয়াতকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রকৃতিকে এনকার করা যেমন ভুল, তেমনি প্রকৃতির কোনো পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওহির উদ্দেশ্যকে এনকার করাও সমান গলতি
ফিতরাতি ব্যাখ্যাতত্ত্ব একই নিয়মকে ওহি, কায়েনাত এবং ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। কারণ, এই তিনটিই আল্লাহর সুন্নাহর ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ।
কোরআন বর্ণনামূলক আয়াত; কায়েনাত সৃষ্টিগত আয়াত; ইতিহাস মানবিক আয়াত। এদের উৎস এক হওয়ায় এদের মধ্যে মৌলিক বিরোধ থাকার কথা নয়। যদি কোথাও সংঘাত প্রতীয়মান হয়, তবে তা হাকিকতের নয়; ব্যাখ্যার।
ফলে একটি আয়াতকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রকৃতিকে এনকার করা যেমন ভুল, তেমনি প্রকৃতির কোনো পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওহির উদ্দেশ্যকে এনকার করাও সমান গলতি।
একটি সত্যকে অন্য সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো ব্যাখ্যার কাজ নয়। তাদের গভীরতর সামঞ্জস্য আবিষ্কার করা ব্যাখ্যার জিম্মাদারি।
এই ব্যাখ্যাতত্ত্বে অর্থকে স্থির ও মৃত কিছু মনে করা হয় না। আবার অর্থকে সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীনও মনে করা হয় না। কোনো পাঠ্যের অর্থের একটি সীমানা থাকে, কিন্তু সেই সীমানার ভেতরে বহুস্তরীয় তাৎপর্য মজুত থাকে।
কোরআনের একটি আয়াত একই সঙ্গে আকিদা, নৈতিকতা, সমাজ, সভ্যতা এবং প্রকৃতি সম্পর্কে ইঙ্গিত বহন করতে পারে। একটি নদী একই সঙ্গে ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সম্পদ, সাংস্কৃতিক ধারক এবং পরিবেশনৈতিক আমানত হতে পারে। অতএব একটি মাত্র অর্থ নির্ধারণ করা ব্যাখ্যার কাজ নয়। অর্থের স্তরগুলোকে তাদের যথার্থ সম্পর্কের মধ্যে উন্মোচন করা ব্যাখ্যার দায়।
ফিতরাতি ব্যাখ্যাতত্ত্ব আক্ষরিকতা ও সীমাহীন প্রতীকবাদের মধ্যবর্তী একটি পথ গ্রহণ করে। কারণ, আক্ষরিকতা অনেক সময় ভাষার গভীরতা হারায়, আর সীমাহীন প্রতীকবাদ পাঠ্যের হাকিকত হারিয়ে ফেলে। ফলে প্রতিটি ব্যাখ্যাকে তার ভাষা, প্রসঙ্গ, উদ্দেশ্য, নৈতিক ফলাফল এবং সমগ্র তাওহিদি বিশ্বদৃষ্টির মধ্যে বিচার করতে হয়।
ওহি অপরিবর্তনীয়, কিন্তু মানুষের ফাহম ক্রমবিকাশমান। কায়েনাতের নেজাম স্থিতিশীল, কিন্তু মানুষের আবিষ্কার সম্প্রসারিত হয়। ইতিহাস সম্পন্ন, কিন্তু ইতিহাসের পাঠ পরিবর্তনমুখী।
কোনো ব্যাখ্যা ভাষাগতভাবে সম্ভব হলেও যদি ইনসাফ, মিজান ও আমানতের বিরুদ্ধে যায়, তবে ব্যাখ্যাটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। আবার কোনো ব্যাখ্যা আধুনিক রুচির সঙ্গে মানানসই হয়েও যদি পাঠ্যের প্রকৃত দালালতকে অস্বীকার করে, তাহলেও ব্যাখ্যাটি গ্রহণযোগ্য নয়।
অর্থাৎ ব্যাখ্যার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সে স্বাধীনতা নেজামবিহীন নয়।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা কখনো খতম হয় না; কারণ, বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও সমাপ্ত হয় না। নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন জ্ঞান এবং নতুন সভ্যতাগত পরিস্থিতি পুরোনো পাঠকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। তবে এই নবায়ন যেন উৎসের পরিবর্তনে পরিণত না হয়, নবায়ন হবে উৎসের স্বকীয়তায় উপলব্ধির গভীরতা।
ওহি অপরিবর্তনীয়, কিন্তু মানুষের ফাহম ক্রমবিকাশমান। কায়েনাতের নেজাম স্থিতিশীল, কিন্তু মানুষের আবিষ্কার সম্প্রসারিত হয়। ইতিহাস সম্পন্ন, কিন্তু ইতিহাসের পাঠ পরিবর্তনমুখী।
অতএব ব্যাখ্যা মানে সত্যের দিকে মানুষের যাত্রাকে আরও পরিণত করা,সত্যকে বদলানো নয়।
এ জন্য ফিতরাতভিত্তিক ব্যাখ্যাতত্ত্বের লক্ষ্য মতের আধিক্য সৃষ্টি করার চেয়ে বরং হিকমাহর বিকাশ ঘটানো। ব্যাখ্যা তখনই সফল, যখন তা মানুষকে বাস্তবতার ওপর কর্তৃত্বের বদলে বাস্তবতার সঙ্গে আমানতদার সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায়। কারণ, শেষ পর্যন্ত ব্যাখ্যা কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা নয়। এ হচ্ছে হাকিকতের সামনে মানুষের আদব শেখার শিল্প।
মুসা আল হাফিজ : লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান