ইসলামে যেমন জালেমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনি মজলুম বা অত্যাচারিত ব্যক্তিকে তার অধিকার আদায়ে আল্লাহর কাছে আরজি পেশ করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
তবে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে বদদোয়া বা অভিশাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়ত কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা অনুসরণ করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
দোয়া মজলুমের অধিকার
সাধারণভাবে কারো মন্দ চর্চা করা বা মন্দ বলা ইসলামে পছন্দনীয় নয়। তবে মজলুমের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “মন্দ কথার প্রচার আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে তার কথা ভিন্ন।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৮)
ইমাম কুরতুবির মতে, এই আয়াতের সারমর্ম হলো—মজলুম ব্যক্তি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বিচার চাইতে পারে এবং প্রয়োজনবোধে তার অশুভ পরিণতির জন্য দোয়া করতে পারে। (ইমাম কুরতুবি, আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, ৬/১১, দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো: ১৯৬৪)
তবে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে বদদোয়া বা অভিশাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়ত কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা অনুসরণ করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
বদদোয়ার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন
অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দোয়া করা জায়েজ হলেও তাতে অসংলগ্ন বা মাত্রাতিরিক্ত কিছু চাওয়া অনুচিত। যেমন নিজের পক্ষ থেকে আজাব বা ভূমিধসের মতো নির্দিষ্ট শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া ঠিক নয়; বরং আল্লাহর কাছে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রার্থনা করাই হলো প্রকৃত মুমিনের কাজ।
শাইখ ইবনে উসাইমিনের মতে, কোনো শাসক বা নেতার বিরুদ্ধে বদদোয়া করার চেয়ে তার হেদায়েতের জন্য দোয়া করা উত্তম। কারণ শাসকের সংশোধন পুরো উম্মতের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে, আর তার পতন বা ক্ষতি অনেক সময় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। (ইবনে উসাইমিন, মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, ১/১৯১৮৮)
নবীজি ও সাহাবিদের আমল
বিপদ ও জুলুমের চূড়ান্ত পর্যায়ে মহানবী (সা.) এবং সাহাবিরা কখনো কখনো নাম ধরে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছেন।
১. খন্দকের যুদ্ধের সময় আহজাব বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নবীজি (সা.) দোয়া করেছিলেন, “আল্লাহ তাদের ঘর ও কবরসমূহকে আগুন দিয়ে পূর্ণ করে দিন, যেমন তারা আমাদের মধ্যবর্তী সালাত থেকে বিরত রেখেছে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬২৭)
২. ওহুদ যুদ্ধের পর মুশরিকদের নাম ধরে ধরে তিনি বদদোয়া করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০৬৯)
৩. সাহাবি সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর বিরুদ্ধে এক ব্যক্তি মিথ্যা অভিযোগ তুললে তিনি আল্লাহর কাছে তার উপযুক্ত বিচার চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি চরম লাঞ্ছিত ও অন্ধ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫৫)
তবে কোনো অবস্থাতেই নিজের ব্যক্তিগত ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না, কারণ আল্লাহ–তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।
বদদোয়া কখন জায়েজ
ইমাম নববীর (রহ.) মতে, ধর্মীয় বিধি-বিধান লঙ্ঘনকারী বা স্পষ্ট অত্যাচারীর বিরুদ্ধে বদদোয়া করার বিষয়টি কিতাব, সুন্নাহ এবং পূর্বসূরি আলেমদের আমল দ্বারা প্রমাণিত। কোনো ব্যক্তি যদি দম্ভের বশে সুন্নাহকে অবজ্ঞা করে, তবে তার বিরুদ্ধে দোয়া করা যায়।
যেমন—এক ব্যক্তি বাম হাতে খাবার খাচ্ছিল এবং অহংকারবশত ডান হাতে খেতে অস্বীকার করায় রাসুল (সা.) তাকে বদদোয়া করেছিলেন, যার ফলে সে আর কখনোই তার হাত মুখের কাছে তুলতে পারেনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০২১)
সারকথা
জুলুমের বিরুদ্ধে দোয়া করা মজলুমের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে মুমিনের শ্রেষ্ঠত্ব হলো ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতায়। যদি অত্যাচারী পক্ষ থেকে সংশোধনের আশা থাকে, তবে তার হেদায়েতের দোয়া করাই শ্রেয়।
আর যদি জুলুম সীমা ছাড়িয়ে যায়, তবে আল্লাহর ওপর বিচার ছেড়ে দিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করা জায়েজ।
তবে কোনো অবস্থাতেই নিজের ব্যক্তিগত ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না, কারণ আল্লাহ–তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।