বিয়ে মানবজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী একটি সিদ্ধান্ত। একটি সঠিক সিদ্ধান্ত যেমন জীবনকে বেহেশতি শান্তিতে ভরিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি ভুল নির্বাচন পুরো জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।
বর্তমান সমাজে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্য, অর্থসম্পদ বা সামাজিক প্রতিপত্তিকেই মূল মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ইসলামে একটি টেকসই ও প্রশান্তিময় দাম্পত্য জীবনের জন্য মহানবী (সা.) সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বাস্তবমুখী কিছু মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
১. ধর্মীয় মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার
পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নবীজির সবচেয়ে বড় এবং প্রথম শর্ত হলো তার ধার্মিকতা। রূপ, সম্পদ বা বংশমর্যাদা মানুষের সাময়িক অহংকারের বস্তু হতে পারে, কিন্তু এগুলো কখনোই দাম্পত্য জীবনে স্থায়ী শান্তি দিতে পারে না।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘চারটি বিষয় দেখে কোনো নারীকে বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার ধার্মিকতা। সুতরাং তুমি ধার্মিক নারীকে লাভ করে বিজয়ী হও, (অন্যথায়) তোমার হাত ধুলোমলিন হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৯০)
অর্থাৎ, অন্যান্য গুণাবলি থাকলেও ধার্মিকতা না থাকলে সেই বিয়েতে বরকত থাকে না। কারণ, একজন আল্লাহভীরু মানুষ কখনো তার স্বামী বা স্ত্রীর ওপর জুলুম করতে পারেন না।
২. উত্তম চরিত্র
পাশাপাশি সুন্দর চরিত্রের ওপর নবীজি (সা.) অত্যন্ত জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে পাত্রের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় মাপকাঠি।
অনেকেই বাহ্যিকভাবে অনেক ইবাদত বন্দেগি করতে পারেন, কিন্তু তাঁর মেজাজ যদি রুক্ষ হয় বা চরিত্র যদি সন্দেহজনক হয়, তবে তার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন সুখের হয় না।
তাই পাত্রের চরিত্র ও মেজাজ যাচাই করা অভিভাবকদের জন্য জরুরি।
হানাফি ফিকহে এই ‘কুফু’ বা সমতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে স্থায়িত্ব, মানসিক মিলন এবং আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ধর্ম, বংশ, পেশা ও সামাজিক অবস্থানের সমতা থাকা জরুরি।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কাছে এমন কোনো পাত্রের (বিয়ের) প্রস্তাব আসে, যার ধার্মিকতা ও চরিত্রের ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তার সঙ্গে (তোমাদের মেয়েদের) বিয়ে দাও। যদি তোমরা তা না করো, তবে পৃথিবীতে বড় ধরনের ফিতনা ও ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪)
৩. পারস্পরিক সমতা
দাম্পত্য জীবন সুখের হওয়ার জন্য পাত্র ও পাত্রীর সামাজিক, শিক্ষাগত ও মানসিক সমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। ইসলামি আইন বা ফিকহের পরিভাষায় একে ‘কুফু’ বলা হয়।
যদি একজন অত্যন্ত শিক্ষিত ও রুচিশীল মেয়ের সঙ্গে একেবারে অশিক্ষিত ও ভিন্ন রুচির ছেলের বিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেখানে বোঝাপড়ার মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়।
হানাফি ফিকহে এই ‘কুফু’ বা সমতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে স্থায়িত্ব, মানসিক মিলন এবং আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ধর্ম, বংশ, পেশা ও সামাজিক অবস্থানের সমতা থাকা জরুরি।
সমতা না থাকলে বৈবাহিক জীবনে দ্রুত ফাটল ধরতে পারে এবং তা উভয় পরিবারের জন্যই লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৩/৮৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
বাহ্যিক রূপ বা সাময়িক সম্পদের মোহ একসময় কেটে যায়। কিন্তু একজন মানুষের ভেতরের দ্বীনদারি, সুন্দর চরিত্র এবং পারস্পরিক মানসিক মিল বা সমতা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে সেই দাম্পত্য সম্পর্ক দুনিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে আখেরাত পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
এহসান সিরাজ: আলেম ও লেখক