শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে করণীয়

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী

রাশেদ খান মেনন

সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

নাছিমা বেগম, এনডিসি

চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

আরমা দত্ত

সংসদ সদস্য; সভাপতি, শিশু অধিকারবিষয়ক সংসদীয় ককাস

কাজী ফারুক আহমেদ

চেয়ারম্যান, আইএইচডি

তাজুল ইসলাম

উপদেষ্টা, অ্যাডভোকেসি ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং, ব্লাস্ট ও অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ

হেলাল উদ্দিন আহমেদ

চিকিৎসক, সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

মোহাম্মদ আমিরুল হক

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

তাওহিদা জাহান

চেয়ারপারসন, কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আবদুল্লাহ আল মামুন

সেক্টর ডিরেক্টর, সেভ দ্য চিলড্রেন

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

কীভাবে শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরাময় করতে পারি, তা নিয়ে আলোচনা করছি। আজকের আলোচনা থেকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ আসবে। মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি করে বলা হয়েছে, শিক্ষক কোনো ছাত্রকে বেত্রাঘাত, শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দিতে পারবেন না।

তারপরও এই ঘটনা বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে হলেও ঘটে। কিন্তু তার প্রতিকার খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই দিক থেকে আমরা দেখব, শিশু নির্যাতন রোধে আইনে কোথাও কোনো ঘাটতি আছে কি না বা কিছু যুক্ত করার এবং সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার কোনো ব্যাপার আছে কি না কিংবা আইনে শাস্তি সুনির্দিষ্ট আছে কি না। শিক্ষক, অভিভাবকসহ সবাই সচেতন হলে শিশুদের মধ্যে থাকা সুপ্ত প্রতিভা আরও বিকশিত হবে। তাদের প্রতি নির্যাতন কেন হচ্ছে এবং এসব বন্ধ করার জন্য করণীয় কী, সেসব আজকের আলোচনায় আসবে।

বিজ্ঞাপন

তাজুল ইসলাম

default-image

শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে ব্লাস্ট যে আইনগত সুরক্ষার পথ খুঁজছিল, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসে ১৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা পত্রিকায় আসে। মাঠপর্যায়ে আমরা এই ঘটনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করি। সেখানে দেখা যায়, এই ঘটনাগুলোর তদন্ত এবং প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসব ঘটনায় অঙ্গহানিসহ কিছু শিশুর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

সে পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের জুলাই মাসে ব্লাস্ট এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র জনস্বার্থে হাইকোর্টে মামলা করে। সেই মামলায় রুল হয়। রুল পেন্ডিং থাকা অবস্থায় আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ আগস্ট এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২২ সেপ্টেম্বর তাদের মন্ত্রণালয় থেকে শিশুর প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ করার জন্য দুটি পরিপত্র জারি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ করার জন্য একটা পরিপত্র জারি করে।

২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি উচ্চ আদালত রায় দেন। উচ্চ আদালতের রায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিশুকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার নামে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি ওই মামলার রায়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। মামলার রায়ের পরে ব্লাস্ট থেকে অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করি। সেগুলোর মধ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়; সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; আইন কমিশন; জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন জায়গায় রায়ের মূল বিষয়গুলো স্মারকলিপি আকারে প্রদান করি।

এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অ্যাডভোকেসি করি। আমরা ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে এ বিষয়ে সচেতন করতে মতবিনিময়, কর্মশালা এবং প্রশিক্ষণের আয়োজন করি। বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দায়ের করি। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনাগুলো মাঠপর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেগুলো তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ২০১২-১৩ সাল থেকে।

এর সঙ্গে পরবর্তীকালে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনের এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। বিশেষ করে সেভ দ্য চিলড্রেন আমাদের এই উদ্যোগকে আরও বেগবান করে। শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনগুলো নিয়ে আমরা একটা গবেষণা করি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে পরামর্শ করে একটা খসড়া আইনগত সংশোধনী প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিই। পরে ২০১৯ সালের প্রথম দিকে খসড়া আইনগত সংশোধনী প্রণয়ন করি। এটা আরও সুন্দর করার জন্য জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে সবার মতামত নিই। এ খসড়া নিয়ে আলাদাভাবে বিচারক ও আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়।

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি থেকে সুরক্ষার জন্য আইনগত সুরক্ষার কেন প্রয়োজন? বিদ্যমান শিশু আইনে ১১টি অধ্যায় আছে। এসব অধ্যায়ের বেশির ভাগই হচ্ছে শিশুদের অপরাধসংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ শিশু অপরাধীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শুধু নবম অধ্যায় অপরাধের শিকার হওয়া ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষী হিসেবে থাকা শিশুদের জন্য প্রযোজ্য। শিশুদের সুরক্ষার জন্য যা পর্যাপ্ত নয়।

এসব কারণে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির জন্য একটা আইনগত সুরক্ষার ও বিদ্যমান শিশু আইনে সংশোধন আনা দরকার। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিদ্যমান শিশু আইনের একটা সংশোধনী খসড়া প্রণয়ন করেছি। সেখানে শিশুকে শারীরিক, মানসিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়াকে অপরাধ বলা হয়েছে। যেসব শিশু এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হবে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণের বিধান রেখে এ সংশোধনী প্রস্তাবনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

হেলাল উদ্দিন আহমেদ

default-image

শিশুদের মানসিক নির্যাতনের বিষয়টি আমাদের সবার কাছে পরিষ্কার নয়। কোন বিষয়টি শিশুর জন্য মানসিক নির্যাতন হতে পারে বা কোনটিকে মানসিক নির্যাতনের আওতাভুক্ত করব, সেটি আমরা অনেক সময় বুঝি না। ২০১৩ সালে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্যাল ম্যানুয়াল অন মেন্টাল ডিসঅর্ডারের পঞ্চম সংস্করণে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মৌখিক বা আকার-ইঙ্গিতে শিশুকে যদি কেউ মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায় অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমনটা মনে হয়, তাহলে সেটা তার প্রতি একধরনের মানসিক নির্যাতন।

শিশুদের ভীতি প্রদর্শন করা, আটকে রাখা, তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা, তাকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়া, তার আবেগের চাহিদার প্রতি নজর না দেওয়া, তাকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করা—এগুলো শিশুর জন্য মানসিক নির্যাতন হতে পারে। শিশুদের আবেগের প্রক্রিয়াকে অনেক সময় বাধাগ্রস্ত করা হয়। ছেলেশিশু কাঁদলে তাদের থামিয়ে দেওয়া হয়। তার আবেগকে অবদমিত করে দেওয়া হয়। মেয়েশিশু হাসলে তাদের বলা হয়, ‘মেয়েদের এত জোরে হাসতে হয় না। আস্তে আস্তে হাসতে হয়।’ এটা একধরনের মানসিক নির্যাতন।

করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে এবং অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। অভিভাবকদের মধ্যে অনলাইন ক্লাস নিয়ে একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। দুদিন আগে রংপুরে কিছু কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করেছেন। কোচিং সেন্টার চালাচ্ছে—এটা একটা বিষয়। কিন্তু কোন তাড়নায় অভিভাবকেরা সন্তানদের সেখানে দিলেন, তা নিয়েও ভাবতে হবে। এটি শিশুদের প্রতি একধরনের মানসিক নির্যাতন। এগুলো শিশুর ধারণার জগতের পরিবর্তন ঘটায়। শিশুর নৈতিক উন্নতিতে বাধা দেয় এবং আবেগের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

এ নৈতিকতা, আবেগ ও ধারণার বিকাশে বাধাগ্রস্ত হওয়ার অর্থই হলো, তার পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার হয়। সেটির কারণে তার আচরণের পরিবর্তন ঘটতে পারে। কোনগুলো মানসিক নির্যাতন, সেটি বুঝতে পারা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

মোহাম্মদ আমিরুল হক

default-image

আজকের আলোচনার বিষয় ‘শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে করণীয়’। আমি সব সময় ‘শাস্তি’ শব্দ নিয়ে আপত্তি করে এসেছি। আমি এটাকে কোনোভাবেই শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করতে চাই না। রাষ্ট্রীয় বিধিব্যবস্থার বাইরে কেউ কখনো শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে না। তাই এটাকে শাস্তি না বলে নির্যাতন বলা উচিত। শিশুদের শাস্তি বা নির্যাতন নিরসনের জন্য শিশু আইনের একটি সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সংশোধনীর খসড়া তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। সেখানে এই শারীরিক ও মানসিক শাস্তিকে একটি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছি। এটাকে অপরাধ হিসেবে বলতে গিয়ে দেখেছি, অনেক আইনজীবীর মধ্যে শাস্তি কী করে একটি অপরাধ হয়, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। এ বিষয়ে আমরা এক যুগের মতো কাজ করে যাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে সব থেকে বড় অর্জন হলো উচ্চ আদালত একটা রায় দিয়েছেন। সেখানে শিশুদের শারীরিক শাস্তি বলে যে নির্যাতন করা হয়, তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ওই মামলা চলাকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন পরিপত্রের মাধ্যমে অন্তত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে একে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রায় একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতা ও প্রতিরোধ সুরক্ষা আইন, ২০১০ এ পরিবারের অভ্যন্তরে শিশুদের প্রতি যে ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, এ জন্য শাস্তির বিধান পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই আইনের বাস্তবায়ন একেবারে স্বল্প পর্যায়ে রয়ে গেছে। বাস্তবায়নের ব্যর্থতা কেন? আমাদের আর্থিক ও সংস্কৃতিগত কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নির্যাতন নিরসনে পরিবারের অভ্যন্তরে যে রকম প্যারেন্টিং থাকা প্রয়োজন, সেটি নেই। যে ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক দরকার, তা–ও আমাদের নেই। এ সমস্যা শুধু আইন প্রণয়ন করে সমাধান করা যাবে না। তবে আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করে তা যুগোপযোগী করা দরকার। যেন আইনেও অন্তত কিছু প্রতিকারের সুযোগ থাকে।

আবদুল্লাহ আল মামুন

default-image

আমরা এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে আর কোনো শিশু কোনো রকম নির্যাতনের শিকার হবে না। এটা একক কোনো স্বপ্ন নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৬তম অভীষ্টের ২ নম্বর লক্ষ্যে সব রাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুদের সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন মুক্ত একটা পরিবেশ দেব। শিশুদের কাছে এটা আমাদের বৈশ্বিক অঙ্গীকার। শিশুকে লালনপালনে শাস্তি একটা উপসর্গ হিসেবে চলে এসেছে। সারা বিশ্বের তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, শারীরিক ও মানসিক শাস্তি শিশুর মানসিক বিকাশে অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটা এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বাংলাদেশ নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগের সূচকে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সময়ে শিশুদের সুরক্ষার সূচকগুলোতেও আমাদের নজর দেওয়া উচিত। সেই দিক থেকে আজকের আলোচনা খুবই প্রাসঙ্গিক। এ ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চারটা বিষয় আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে একধরনের সুরক্ষা দরকার। অর্থাৎ ঘরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা শিশু যেখানে গমন করে, সেখানে শিশুদের প্রতি সব রকমের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সেটা আইনত নিষিদ্ধ এবং কঠোর অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। দ্বিতীয়টি হচ্ছে পজিটিভ প্যারেন্টিং মেথড। যেটা সেভ দ্য চিলড্রেনসহ আমরা আরও ছড়িয়ে দিতে চাইছি। পজিটিভ প্যারেন্টিং মেথডকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, একটা সামাজিক পরিবর্তন দরকার। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ জন্য সরকার থেকে পরিপত্রও জারি করা হয়েছে।

কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে এটা এখনো খুব বেশি সমাদৃত হয়নি। এখনো অনেক অভিভাবক মনে করেন, স্কুলে একটু শাস্তি না দিলে মানুষ হবে কী করে। একবিংশ শতাব্দীতে এই প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্য একটা ব্যাপক গণসচেতনতা দরকার। সেখানে গণমাধ্যম, বেসরকারি সংগঠন ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেটাকে আরও জোরদার করার সুযোগ রয়েছে। সর্বশেষ হলো, যে শিশু কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য, আইনি সেবা ও সুরক্ষা দেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে তাকে নিরাপদ স্থানে রাখা দরকার।

এই চারটি বিষয় মাথায় রেখে সামনের দিনগুলোতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। তাহলেই ২০৩০ সালের মধ্যে শিশু নির্যাতনমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

আরমা দত্ত

default-image

আমাদের আইন আছে। সেগুলো সংশোধিতও হচ্ছে। আইনের কোনো ঘাটতি নেই। এই আইনগুলো সহজ করে মানুষের কাছে পৌঁছানো হলো বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা নিজেরাও আইনগুলো পুরোপুরি জানি না। তাহলে অভিভাবকেরা কীভাবে পুরোপুরি জানবেন। পাশ্চাত্য দেশে শিশুরা তাদের অধিকার ও আইনগুলো জানে। প্রয়োজন হলে এসব শিশু বিশেষ নম্বরে কল দেয়।

প্রথমে আমরা হাসতাম, পরে দেখলাম, শিশুদের কাছে পৌঁছে গেছে যে এ আইন তাদের সুরক্ষা দেয়। এখানে পুরো সমাজের মনস্তাত্ত্বিক জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের দেশে এখনো শিশুদের প্রতি নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো শিশুদের প্রতি নির্যাতন করা হয়, বিশেষ করে মাদ্রাসায় শিশুদের প্রতি খুব বেশি পরিমাণে নির্যাতনের কথা শোনা যায়।

সিলেটের ওই ঘটনায় আমাদের গা শিউরে ওঠে। সেখানে একটা শিশুকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। অনেকে সে ছবি তুলে ভাইরাল করে। যে মারছে, তার থেকে বড় অপরাধী হলো যারা ছবি তুলছে, হাসছে এবং সেটা ভাইরাল করছে। সে জন্য আমাদের বুঝতে হবে, কোথায় কাজ করতে হবে।

আমি স্কুলে একদিন অঙ্ক পারিনি। শিক্ষক আমাকে কান ধরে হাঁটু গেড়ে দাঁড়াতে বলেন। তখন আমি প্রতিবাদ করি। তিনি ছাত্রদের ভীষণ মারতেন। পরে শিক্ষক ও অভিভাবকেরা চিহ্নিত করেন যে শিশুরা ভয়ে কিছু বলত না। সে জন্য শিশুদের তার সুরক্ষার অধিকার সম্পর্কে জানাতে হবে। নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশু পরবর্তী সময়ে আক্রমণাত্মক হয়। এই আইনগুলো সব শিশু ও অভিভাবকদের কীভাবে জানাব?

ডায়রিয়ার প্রকোপের সময় লবণ-গুড়-পানি গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রচারিত হলো যে এখন বাংলাদেশে ডায়রিয়া নেই।

এটা করা যদিও ততটা সহজ নয়, তবু করতে হবে। বাড়িতে ও কারখানায় শিশুশ্রমের বিষয়টি সংশোধনী আইনে দেখা দরকার। কারণ, নির্যাতনটা ওখানেই বেশি হয়। এগুলো তদারক করতে হবে। যঁারা শিশুশ্রমিক কাজে নেন, তঁাদের শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তাওহিদা জাহান

default-image

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা শিশুর বিকাশ থেকে পিছিয়ে থাকে। সেটি শারীরিক, মানসিক ও ভাষিক যোগাযোগের বিকাশসহ সব ক্ষেত্রেই হতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যেকোনো আইনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

শিশুর জীবনের প্রথম চার বছর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শিশুর মস্তিষ্ক নমনীয় থাকে এবং দ্রুত বিকশিত হয়। তাই শৈশবকালে শিশুর ভালো অভিজ্ঞতা না হয়ে খারাপ অভিজ্ঞতার শিকার হলে সেটি মস্তিষ্কের বিকাশে খারাপ প্রভাব ফেলে। সুতরাং স্বাভাবিক শিশুসহ বিশেষ শিশুদের প্রতি অবহেলা, নির্যাতন ও কটু ভাষার ব্যবহার শিশুর বুদ্ধিবৃত্তি, আচরণ ও আবেগের জটিলতা সৃষ্টি করে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মানসিক বয়সের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা মানসিক বয়সে স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় পিছিয়ে থাকে। তাই কোনো আইন প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক শিশুর চেয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর বয়সসীমা বাড়াতে হবে। আমরা মূল্যায়নের মাধ্যমে বিশেষ শিশুদের মানসিক বয়স বের করি। আইনের ক্ষেত্রে এ মানসিক বয়সের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। ভাষার মাধ্যমে যেন শিশুর প্রতি কোনো নির্যাতন না হয়, তা খেয়াল রাখতে হবে।

শিশুর প্রতি শুধু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হচ্ছে, তা নয়; বরং ভাষা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের মাধ্যম হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং শিশুর ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহারে সব ধরনের নেতিবাচক শব্দ পরিত্যাগ করতে হবে। শিশুকে শাসন করতে হবে ইতিবাচক ভাষায়। যেমন শিশুকে কোনো কাজে ‘এটি করবে না’ না বলে তার প্রিয় কোনো কাজ নির্দেশ করে বলতে পারি, ‘তুমি বরং এটা করলে ভালো হয়’। আমরা নেতিবাচকভাবে শাসন না করে তার মনোযোগকে ইতিবাচক কাজের দিকে সরিয়ে নিতে পারি। অন্যের সামনে শিশুকে অপমান, বকা ও শাসন করা যাবে না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।

করোনার কারণে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা এখন ঘরে আছে। তারা স্কুলে যেতে পারছে না। তাদের বিশেষ থেরাপিগুলো নিতে পারছে না। এসব কারণে তারা মানসিক চাপের মধ্যে আছে। এ মানসিক চাপের কারণ হলো, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা একটা রুটিন অনুসরণ করে। সেই রুটিনের ব্যত্যয় ঘটলে তারা মেনে নিতে পারে না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর এ মানসিক চাপ মোকাবিলার জন্য তাকে ধীরে ধীরে ইতিবাচকভাবে বোঝাতে হবে।

নাছিমা বেগম

default-image

আমাদের শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুকে বেত্রাঘাত, কান মলে দেওয়া একধরনের নির্যাতন। কিন্তু ইদানীং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরা শিশুদের যৌন নির্যাতন করছেন। শিশুরা এ ধরনের বিকৃত মানসিকতার শিকার হচ্ছে। অনেক শিশু নিজেরা এ ধরনের অত্যাচারের শিকার হওয়ায় পরবর্তী জীবনে এ রকম অত্যাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আলোচনায় পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের বিষয়টি এসেছে। পজিটিভ প্যারেন্টিং খুব প্রয়োজন। আমরা পারিবারিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতি দেখছি। একসময় পরিবার থেকে শিখেছি, সদা সত্য কথা বলব, মিথ্যা বলব না, মিথ্যা বলা মহাপাপ। এই জায়গা থেকে আমরা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছি। শিশুরা ভালো কিছু শিখলে তার প্রভাব বড় হলেও থেকে যায়। শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে হবে।

শিশুদের কথা আমরা শুনি না। আমরা তখন ‘আমার কথা শোনো’ নামে একটা অনুষ্ঠান চালু করেছিলাম। সেখানে শর্ত ছিল, শিশুরা বলবে আর বড়রা শুনবে। তখন দেখলাম, শিশুরা অনেক ভালো পরামর্শ দেয়। শিশুদের অনেক ভালো চিন্তা–চেতনা আছে। আমরা মনে করি, ওরা কী বোঝে। এটা ভুল ধারণা। এই কথাগুলো সঠিক নয়। এখন শিশু–কিশোর গ্যাং তৈরি হয়ে যাচ্ছে, শিশুরা বিপথে চলে যাচ্ছে এবং ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়ে যাচ্ছে। এসব জায়গায় গুড প্যারেন্টিং প্রয়োজন। মা–বাবা যেন এসব বিষয়ে সজাগ থাকেন।

একদিকে শিশুকে যেমন শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া যাবে না, পাশাপাশি তার মানসিক বিকাশ যেন ভালোভাবে ঘটে, সে জন্য গুড প্যারেন্টিং গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের আমরা যেন সঠিক শিক্ষা দিই। শিশুশ্রমের বিষয়টি দেখা উচিত। কারণ, এটা শিশুর মানসিক বিকাশের সঙ্গে জড়িত। এ ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। সবাই মিলে কাজ করলে এবং শিশুদের এ বিষয়ে সচেতন করলে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।

প্রতিটি উপজেলায় মানবাধিকার সুরক্ষা ক্লাব করার একটা লক্ষ্য আমাদের আছে। সেখানে নবম-দশম শ্রেণির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এ ক্লাবের সদস্য করব। সে জায়গায় শিশুর উন্নয়নের জন্য এসব শিক্ষা দিতে চাই। শিশুর শৈশব থেকে পূর্ণকালীন বিকাশ হোক। আমাদের আগামী প্রজন্ম সুস্থ ও সুন্দরভাবে মানবাধিকার চর্চা নিয়ে বেড়ে ওঠুক।

কাজী ফারুক আহমেদ

default-image

জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০-এ শিক্ষার স্তরনির্বিশেষে কয়েকটি পদক্ষেপের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। শিক্ষার কোনো স্তরেই শিক্ষার্থীরা যেন শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের মুখোমুখি না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। শুধু এটা বলেই ক্ষান্ত থাকিনি।

এর জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আচরণবিধির কথাও বলেছিলাম, কিন্তু সেটা হয়নি। ছেলেমেয়েরা স্কুলে হোক, বাড়িতে হোক—কিছু ভুল করতে পারে। প্রচলিত নিয়মের কিছু বরখেলাপ তাদের হতে পারে। তাদের নিয়মানুবর্তী করতে আমরা কিছু বিকল্প ভাবতে পারি। মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রকম বিকল্পের কথা বলেছেন।

সেই সঙ্গে আমাদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। অভিভাবকেরও বদলাতে হবে। অভিভাবক যদি মনে করেন, শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সবকিছু ঠিক করে দেবেন, তাহলে হবে না। শিক্ষকদের সংগঠনেরও কিছু করার আছে। আমি শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত। শিক্ষক নিয়োগপত্রে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া যাবে না, এ কথা উল্লেখ থাকা দরকার।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালেও এটা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। শিক্ষক সংগঠনগুলোর পেশাগত উন্নয়নের সঙ্গে কীভাবে শিক্ষার্থীদের কোনো রকম নিপীড়ন না করে আনন্দের মধ্য দিয়ে অনুকূল পরিবেশে শেখাতে হবে। কোনো শিক্ষক অথবা শিক্ষা ব্যবস্থাপক অন্যায় করলে তঁার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বাক্স স্থাপনের কথা বলা হলেও সেটা প্রকাশ্য স্থানে অনেক জায়গায় নেই। শুধু আইন থাকলে হবে না,

আইনের প্রয়োগ যেন হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা নিয়ে একটা উদ্বুদ্ধকরণ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কীভাবে এ সমস্যাগুলো সমাধান হচ্ছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারি।

তাজুল ইসলাম

আমরা গত তিন বছরে ব্লাস্ট ও সেভ দ্য চিলড্রেনের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে একটা খসড়া দাঁড় করিয়েছি। এ আইনকে পরবর্তী ধাপে নেওয়ার জন্য আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি।

রাশেদ খান মেনন

default-image

আজকের অালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাজুল ইসলাম বলেছেন, আইনটি তঁারা বহু স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধনী নিয়ে এসেছেন। নিশ্চয়ই এটা সংসদে বিবেচিত হবে। শিশুদের প্রতি আইনের সংবেদনশীল ও সহানুভূতিশীল ধারা প্রয়োগের ব্যাপারটি আজকালকার সমাজে খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থিত হচ্ছে।

এখন যখন কোনো ঘটনা ঘটছে, তখন সে আইন সংশোধনের জন্য কিছু দাবি উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের কারণে এর শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বিধান করার দাবি উঠেছে। সরকার সেটা মেনেও নিয়েছে। আইন করে আইনের সুরক্ষা দিয়েও লাভ হয় না। যদি না সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমি বিষয়টা গ্রহণ না করি। ধরুন, আমরা তো বেড়েই উঠেছি এ ধরনের শাসনব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। সেটা পরিবার ও স্কুল উভয় ক্ষেত্রে।

স্কুলে তো শাস্তির নানা ধরন ছিল। আঙুলের মধ্যে পেনসিল ঢুকিয়ে মোচড় দেওয়া থেকে শুরু করে হাঁটু গেড়ে দাঁড়ানো। এখন তো সময়, সমাজ সবটাই পাল্টেছে। আমরা যদি সেই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জায়গায় না পাল্টাই, তাহলে আইনের সংশোধন কোনো কাজে লাগবে না। কতগুলো নতুন উপসর্গ আমরা সমাজে দেখছি। যেমন গ্যাং বাহিনী। কিশোর ধর্ষণকারীর দেখা মিলছে। আগে যেভাবে মেয়েশিশু সমাজে নিরাপদ থাকত, এখন নিরাপদ নয়। এমনকি তার বয়সীদের দ্বারাও সে নির্যাতিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে সমাজের মধ্যে একধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সুতরাং দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন আনার ব্যাপারে গণমাধ্যম, বিভিন্ন সাংগঠনিক উদ্যোগগুলো খুব জরুরি। আলোচনায় শিশুর শারীরিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার কথা এসেছে। মানুষের মধ্যে এ অপরাধবোধ আসার জন্য সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে জায়গা থেকে আপনারা আইনের যে সংশোধনী এনেছেন সেখানে এ বিষয়গুলো যুক্ত করে প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিতে পারলে এ আইন কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। আমাদের শিশু আইন সংশোধন যেন শুধু আইনের ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি যে একটা সামাজিক অপরাধ, এই বোধ জাগ্রত করা জরুরি। বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখব।

ফিরোজ চৌধুরী

আলোচনায় দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য এসেছে। আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে। তাদের সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে আশা করি। আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

সুপারিশ

  • শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদানকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে শিশু আইন, ২০১৩ –এর ৭০ ধারা সংশোধন করা প্রয়োজন

  • বিভিন্ন পর্যায়ে শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে আরও সচেতন করতে মতবিনিময়, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ জরুরি।

  • শিশুদের ভয় দেখানো, আটকে রাখা এবং তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। তার আবেগের মূল্য দিতে হবে। তাকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়া এবং অবজ্ঞা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

  • আইনকে যুগোপযোগী করতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি কঠোর অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত।

  • বাড়িতে ও কারখানায় শিশু নির্যাতন বেশি হয়। এটা তদারক করা দরকার।

  • শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া যাবে না; পাশাপাশি তার মানসিক বিকাশ যেন ভালোভাবে ঘটে, সে জন্য গুড প্যারেন্টিং গুরুত্বপূর্ণ।

  • শিশুর শারীরিক নির্যাতন যে অপরাধ, মানুষের মধ্যে এ বোধ আসার জন্য সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন