বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্মানিত আলোচক

অধ্যাপক ডা. ফারুক পাঠান

অধ্যাপক, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগ। পরিচালক, বারডেম একাডেমি।

অধ্যাপক ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব এন্ডোক্রাইনোলজি, বিএসএমএমইউ। প্রেসিডেন্ট, আসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট’ বাংলাদেশ (ACED’B)

অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ

বিভাগীয় প্রধান, ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

অধ্যাপক ডা. মীর মোশারফ হোসেন

বিভাগীয় প্রধান, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ

অধ্যাপক ডা. সমীর কুমার তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, রংপুর মেডিকেল কলেজ

ডা. আহসানুল হক আমিন

সহযোগী অধ্যাপক, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগ, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

ডা. মো. ফিরোজ আমিন

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল

ডা. ফারহানা আক্তার

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

ডা. মো. শাহ্‌ এমরান

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ

সঞ্চালক

ডা. নাদিয়া ইসলাম

আলোচনা

ডা. নাদিয়া ইসলাম

১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। ধারণা করা হয় বিশ্বে প্রতি ১১ জনের মধ্যে ১ জন ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে ডায়াবেটিসের বিস্তার রোধ, সচেতনতা ও সেবার সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে আলোকপাত করতে আমাদের আজকের আয়োজন। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসকে উপলক্ষ করে আমরা আলোচনা করতে চাই, সবার জন্য ডায়াবেটিস চিকিৎসা এবং সেবা নিশ্চিতকরণের গুরুত্ব সম্পর্কে।

default-image

অধ্যাপক ডা. ফারুক পাঠান

সারা বিশ্বের মোট ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে বাস করেন। ডায়াবেটিস রোগীর ধরন অনুযায়ী প্রায় ৯৫ ভাগ রোগী টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। মজার ব্যাপার হলো, টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তাঁরা ডাক্তারের কাছে আসেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পাঁচ-ছয় বছর পরে। কারণ, তাঁরা জানেই না এতদিন তাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা। সাধারণত আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ৭৩ বছর হলে ডায়াবেটিস রোগীর আয়ুষ্কাল ৬৩ বছর। শুধু ডায়াবেটিস থাকার কারণেই জীবন থেকে তাঁদের ১০ বছর ‘নেই’ হয়ে যায়। এই ১০ বছর তাঁরা পরিবার, সমাজ ও দেশকে দিতে পারতেন।

আমি বলতে চাই, যেহেতু ৫০ ভাগ মানুষ জানেন না তাঁদের ডায়াবেটিস আছে কি না, কিন্তু ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাঁদের উচিত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। আপনি কীভাবে বুঝবেন আপনার ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না? খুবই সহজ। যদি আপনার পরিবারে কারও ডায়াবেটিস থাকে বা আপনার শরীরে অতিরিক্ত ওজন বা আপনার বয়স ৩৫ বছরের বেশি হয় এবং আপনি যদি কায়িক পরিশ্রম না করেন, তাহলে আপনার উচিত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা। আপনারা আমাদের কাছে এসে স্ক্যানিং করান, চিকিৎসার আওতায় আসুন। যাঁদের এ রকম ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাঁরা আর দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। তাহলে আমরা নিজেদের আয়ু বাড়াতে পারব এবং দেশকেও কিছু দিতে পারব। সুতরাং, আমাদের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী আর দেরি নয়, যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কাছের চিকিৎসকের কাছে যাই, তাঁদের আমাদের ডায়াবেটিসের আশঙ্কার কথা জানাই। কোনো ঝুঁকি থাকলে দ্রুত স্ক্যান করাই এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলি।

default-image

অধ্যাপক ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন

করোনা মহামারিতে বিশ্ব যখন লন্ডভন্ড হয়ে আছে, এর মধ্যে ডায়াবেটিসের মতো আরেক অদৃশ্য মহামারি নিয়ে আমরা এবার বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালন করছি। ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগকে আরও জটিল করে ফেলেছে করোনা। করোনার জন্য ডায়াবেটিসের হার ও জটিলতা অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেড়ে গেছে। এ কারণে সচেতনতা এখন অনেক জরুরি হয়ে পড়েছে।

১৯৯১ সাল থেকে আইডিএফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এদিন ইনসুলিনের আবিষ্কারক স্যার বেন্টিংয়ের জন্মদিন। ইনসুলিন আবিষ্কারের ১০০ বছর পরও উচ্চমূল্যের জন্য এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধ থেকে কোটি কোটি মানুষ এখনো বঞ্চিত। জাতিসংঘসহ বিশ্ব বিবেককে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস জাতিসংঘস্বীকৃত। ডায়াবেটিসের ব্যাপকতা, জটিলতা, উচ্চ মৃত্যুহার ও চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এই স্বীকৃতির পেছনে অন্যতম কারণ। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস অনেক জটিলতা ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এর অবস্থান এখন চতুর্থ। আইডিএফের হিসাবে প্রতি ৫ সেকেন্ডে একজন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতি ১০ সেকেন্ডে ১ জন মারা যাচ্ছে আর প্রতি ৩০ সেকেন্ডে ১ জনের পা কাটতে হচ্ছে।

ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। এখন পর্যন্ত এই রোগ নিরাময় করা সম্ভব হয়নি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীদের জাতীয়ভাবে কোনো পরিসংখ্যান এখনো লিপিবদ্ধ হয়নি। ভারতে জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে এর হার হচ্ছে ১১ দশমিক ৯। বাংলাদেশে শনাক্ত করা রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮৪ লাখ। বাকি প্রায় ৮৪ লাখ রোগী এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রায় ১ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছে। তাদের শনাক্ত করে সঠিক স্বাস্থ্যবিধির উপদেশের মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ লোকের ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম—এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের ডায়াবেটিসের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের উচ্চমাত্রা ও ব্যাপকতা আমাদের ডায়াবেটিসকে জটিলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। করোনাকালে উদ্বেগজনকভাবে ডায়াবেটিস বাড়ার কারণ শরীরের ওজন অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়া ও কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়া। ডায়াবেটিস রোগীর সুগার, রক্তচাপ ও রক্তের চর্বির নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে খুব কমই থাকে। খোদ আমেরিকায় এ হার ২৬। বাংলাদেশের অবস্থা আরও শোচনীয়—৪ শতাংশের নিচে। এ কারণে ডায়াবেটিস রোগীরা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকে বেশি মারা যায়। ডায়াবেটিস রোগীর অন্ধ হওয়া, কিডনি নষ্ট হওয়ার মাত্রা অনেক বেশি। আমাদের দেশে সিসিইউ, আইসিইউ, ডায়ালাইসিস এবং করোনায় আক্রান্ত রোগীর প্রায় অর্ধেক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

এ অবস্থার উন্নতির জন্য সচেতনতা, সামগ্রিক সম্পৃক্ততা ও জাতীয় মাস্টারপ্ল্যান ও অ্যাকশন প্ল্যান প্রয়োজন। আমাদের সবার এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সেবার দ্বার সহজ ও সহজলভ্য করতে হবে। সেবার সব উপকরণ ক্রয়-সক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের ইউনিয়ন সাবসেন্টার থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে অবকাঠামো ও সুযোগ অনুসারে ডায়াবেটিস চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সরকার উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এটি খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমাদের জেলা হাসপাতালে ডিইএম সেন্টারের মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও হরমোনের রোগীর সেবা বাড়ানো সম্ভব। আমাদের এন্ডোক্রাইন ডিপ্লোমা করা ডাক্তারদের ডিইএম সেন্টারে কনসালট্যান্ট করে এ সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এমডি করা প্রায় ১০০ ডাক্তার বিভিন্ন হাসপাতালে সেবা দিচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডিপার্টমেন্ট খুলে ও দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ডায়াবেটিস সেবার দ্বার ও মান উন্নত করা যেতে পারে। তাহলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০৩০ সালের লক্ষ্যে যাওয়া সম্ভব আমাদের পক্ষে। এনসিডির কারণে মৃত্যুহার অনেক কমে যাবে। জাতিসংঘের এসডিজির দিকে আমরা এগোতে পারব। এবারের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের স্লোগান সার্থক হবে। তাই সবার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরা বলতে চাই, ডায়াবেটিসের সেবার সময় এখন, নয়তো কখন।

default-image

অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ

বাংলাদেশে ১৩ হাজার কমিনিউটি ক্লিনিকে ডায়াবেটিস মাপার যন্ত্র আছে এবং প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। ইচ্ছা থাকলেই কেউ সেখানে গিয়ে তাঁর সুগার মাপতে পারেন এবং বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন। সারা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষই জানেন না তাঁদের ডায়াবেটিস হয়ে আছে। এটা কিন্তু আমাদের অজান্তে ক্ষতি করেই যাচ্ছে। সুতরাং, এই প্রথম আমাদের সরকার একটি প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। সেটি হচ্ছে অজানা ডায়াবেটিস রোগীদের খুঁজে বের করা। এটা অনেক বড় একটি ব্যাপার। সেক্ষেত্রে দেশ এগিয়েও যাচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে একটি সেল রয়েছে। এটিকে বলা হয় ‘নন কমিউনিক্যাবল ডিজিজ সেল’। এটা খুব দক্ষ একটি সেল, যেটা বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে কাজ করছে। বাংলাদেশে প্রায় ৮৪ লাখ ডায়াবেটিস রোগী আছেন। আমাদের দেশে সরকারি–বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডায়াবেটিস সমিতি কোর্স ও ট্রেনিং পরিচালনা করছে। আমরা পাঁচ বছরের ডিগ্রি দিচ্ছি। এই ডিগ্রি নিয়ে সারা বাংলাদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ছড়িয়ে পড়ছেন এবং সেবা নিশ্চিত করছেন। আমাদের প্রায় ৪২১টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার রয়েছে। সেখানেও ডায়াবেটিস মাপার সুবিধা রয়েছে। সুতরাং আগের চেয়ে কিন্তু সচেতনতা বেড়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের পার্টনার হচ্ছে মিডিয়া ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। তাদের বদৌলতে বেশির ভাগ মানুষ জানেন ডায়াবেটিস কী এবং ডায়াবেটিসের চিকিৎসা কীভাবে করাতে হয়। ২০১১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ জানতেন তাঁদের ডায়াবেটিস আছে। ২০১৮ সালে কিন্তু সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ শতাংশে। সুতরাং পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে আমরা দেখতে পাই, মানুষ সচেতন হচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শতাধিক মানুষকে নিয়ে গান–বাজনা করে মানুষকে সচেতন করে তুলছে। ২–৩ বছর আগের ডেটা অনুযায়ী ডায়াবেটিসে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। শুধু এই মৃত্যু ঠেকাতে হলে সচেতন হতে হবে। প্রতিবছর ১৪ নভেম্বর আমরা একত্র হয়ে মানুষকে সচেতন করে তুলি। এই সচেতনতার মাধ্যমে ডায়াবেটিসের মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।

default-image

ডা. মো. ফিরোজ আমিন

আসলে রোগীরা যখন শোনেন ডায়াবেটিস থেকে তাঁর চোখে, কিডনিতে ও হার্টে সমস্যা হতে পারে; তখন এ কথা শুনে তাঁদের মনে ভয় চলে আসে। একটা স্টাডিতে দেখা গেছে, ২০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী বিষণ্ণতায় ভোগেন। রোগীকে যখন বলা হয়, আপনাকে সারা জীবন ওষুধ খেতে হবে, মিষ্টি খেতে পারবেন না, নিয়মিত হাঁটাচলা করতে হবে বা ওষুধের খরচ অনেক বেশি। এসব শুনে রোগী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যান। আমরা সবাইকে বলে দিচ্ছি, আপনারা বাসায় একটা গ্লুকোমিটার রাখবেন। সেটা দিয়ে সপ্তাহে একবার হলেও চেক করবেন। খরচের কথা চিন্তা করে তাঁরা আসলে হতাশার ভেতরে পড়ে যান। হতাশা থেকে দেখা যায়, কোনো কোনো রোগী হাঁটা বন্ধ করে দেন, অতিরিক্ত খাবার খান; আবার কেউ ওষুধ খাওয়াই ছেড়ে দেন। তাঁদের এই কার্যকলাপে আমাদের মূল উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হয়। আমাদের চিকিৎসকের একটা বিশাল ভূমিকা আছে এখানে। রোগীদের হতাশা থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর রোগীদের দিতে হবে। এতে রোগীরা মাঝেমধ্যে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বললে তাঁদের হতাশা কাটবে।

এ ছাড়া পরিবারের একটা বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অল্প বয়সে ডায়াবেটিস ধরা পড়লে রোগীকে ভালো খাবার দেওয়া হয় না বা সবাই মিলে হয়তো ঘুরতে যাচ্ছেন; কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীকে নিয়ে যাচ্ছেন না। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে পারলে রোগীদের ডায়াবেটিসের ভয় কমানো সম্ভব হবে। তাঁরা হতাশায় দিন কাটাবেন না। আরেকটি কথা হলো, রোগীর পক্ষে চিকিৎসার খরচ মেটানো সম্ভব না হলে আমরা অনেক ক্ষেত্রে ফ্রি সার্ভিস দিয়ে থাকি। ছয়–সাত লাখ টাকা বিল হলেও অনেকক্ষেত্রে বারডেম হাসপাতাল সেটি ফ্রি পর্যন্ত করে দেয়। এ রকম সাপোর্ট বিভিন্ন হাসপাতালে আছে। সুতরাং এ রকম সাপোর্ট আমরা আরও বিভিন্ন হাসপাতালে চালু করতে পারলে অবশ্যই আমরা এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাব।

default-image

অধ্যাপক ডা. মীর মোশারফ হোসেন

টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৯৫ শতাংশ। ডায়াবেটিসের সঙ্গে প্রেসার এবং রক্তে চর্বি জমা খুব ঘনিষ্ঠ। শুধু গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিসের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। এর সঙ্গে প্রেসার ও লিপিড নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কোনো ডায়াবেটিস রোগীর বয়স ৪০ বছর হলে, তাঁর লিপিড লেভেল যা–ই থাকুক না কেন, তাঁকে ওষুধ দিতে হবে। আর যদি বয়স ৪০ বছরের কম হয় এবং এলডিএল কোলেস্টেরল ১০০–এর বেশি হয়, তাহলে তাঁকে ওষুধ দিতে হবে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ মারা যান হৃদ্‌রোগের কারণে। এ ছাড়া স্ট্রোকেও মারা যান অনেকে। সুতরাং গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রেসার ও লিপিড নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, স্থূলতা কমাতে হবে ও ধূমপান ছাড়তে হবে। ১০০ বছর আগের আবিষ্কৃত ইনসুলিন ডায়াবেটিস চিকিৎসা তথা চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটা মাইলফলক। সেই সময়ের ইনসুলিন–ব্যবস্থা এখন আরও যোজন যোজন উন্নতি করেছে। বর্তমানে ডায়াবেটিসের উন্নত ওষুধগুলোর মধ্যে আছে মেটফরমিন (Metformin), সালফোনাইল ইউরিয়া, ডিপিপি ফোর ইনহিবিটর এবং এসজিএলটি২ ইনহিবিটর (SGLT2 inhibitor)। সহজলভ্যতাকে যদি দুভাবে ভাগ করি অর্থাৎ প্রাপ্যতা এবং রোগীর কেনার সক্ষমতা। প্রাপ্যতা কিন্তু বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলছে। বিশ্বের যেকোনো দেশের ওষুধ আবিষ্কৃত হওয়ার পর বাংলাদেশে আসতে কিন্তু সময় লাগে না। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, দোকানে তো সব ওষুধই পাওয়া যায়। কিন্তু রোগীর সেই ওষুধ কেনার সক্ষমতা আছে কি না, সেটাও যাচাই করে দেখতে হবে। বেসিক যে ওষুধ দরকার, সেগুলো কিন্তু আমরা দিতে পারছি। মিটফোর্ড হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ডায়াবেটিসের রোগী আসেন। এই করোনার সময়ও প্রায় ২৭ হাজার রোগী এসেছেন। বাংলাদেশের সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চেষ্টায় আমরা ওষুধ ও ইনসুলিন বিনা মূল্যে দিচ্ছি। মাসে প্রায় এক হাজার রোগী আমাদের কাছ থেকে ফ্রি ইনসুলিন পাচ্ছেন। চিকিৎসা প্রাপ্যতা সম্পূর্ণ না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি এবং সফল হচ্ছি।

default-image

ডা. আহসানুল হক আমিন

চাইল্ডহুড ওবেসিটি হার ৩-৪ গুণ বেড়ে গেছে গত কয়েক দশকে। কেন বেড়ে গেল, সেটা জানার জন্য বোধ হয় বিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই। আমাদের চারদিকে একটু তাকালে এগুলো বুঝতে পারব। অল্প বয়সে ওজনের আধিক্য হওয়া ভালো নয়। স্থূলতা, ওজন আধিক্য একটা মইয়ের মতো কাজ করে। এই সিঁড়ি বেয়েই আমাদের শরীরের নানা রকম জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যে অবশ্যই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ। চারদিকে ফ্যাটি লিভার নামে একটা মেডিকেল কন্ডিশন খুব বেশি বেড়ে গেছে। এটাও স্থূলতার সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িত। এটা বাচ্চাদের বা বাড়ন্ত বয়সে অর্থাৎ যে সময় লেখাপড়ার দিকে মনোযোগ বেশি থাকবে, সে সময় তারা অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। তাদের বন্ধুমহলে বা স্কুলেও খুব একটা পজিটিভ কমেন্ট তারা পায় না। সুতারং এটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং মনে রাখতে হবে, একবার স্থূলতা তৈরি হয়ে গেলে ওজন আধিক্য একবার বাসা বাঁধলে সেটাকে কমানো খুব কঠিন। চিকিৎসাশাস্ত্রে এখনো ওজন কমানোর সে রকম কার্যকর কোনো ওষুধ নেই। সুতারং প্রাথমিকভাবে আমাদের চেষ্টা করতে হবে ওজন যেন না বাড়ে। আমরা তাহলে স্থূলতা কমাতে কী করতে পারি? স্থূলতা কমাতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের নজর দিতে হবে।

পারিবারিক পর্যায়ে আমি কোনো অভিভাবককে যদি বলি, আপনার সন্তানের ওজন বেড়ে যাচ্ছে। আজ তাঁর কোচিং বন্ধ করে তাকে একটু খেলতে দিন। একটু হাঁটতে নিয়ে যান। আমি কোনো সময় তাঁদের থেকে ভালো কোনো সাড়া পাই না। পারিবার এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যে মা–বাবা ভাবেন আমাদের খেলাধুলা করা উচিত নয়। সারা দিন শুধু পড়ালেখা করতে হবে। কোচিং করতে হবে, নিয়মিত ক্লাস করতে হবে। মানে এগুলোই এখন মুখ্য বিষয় হয়ে গেছে। খেলাধুলা ছাড়াই ছেলেমেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে এবং এ ধরনের স্থূলতায় ভুগছে। আশির দশকের পর থেকে যতগুলো স্কুল তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে কটা স্কুলে খেলার মাঠ আছে? ধরলাম আমাদের জনবহুল দেশে সেটা করতে পারি না। কিন্তু এটা তো করতে পারি যে দু–তিনটি স্কুল মিলে খেলার একটা জায়গা বা মাঠ তৈরি করতে পারি। সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে খেলাধুলা করতে হবে। কিন্তু আমরা এটা করছি না। রাষ্ট্রকে এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে। মিডিয়ারও এ ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। আশির দশকে বা তার কিছুটা পরে ডায়রিয়ার কনসেপটা কী চমৎকারভাবে আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মিডিয়া আমাদের একটা শক্তিশালী মাধ্যম। সবাই আমরা একসঙ্গে এগিয়ে এলে ডায়াবেটিসের মতো ব্যাপক মহামারির হয়তো আমরা অনেকটা কমিয়ে আনতে পারব।

default-image

অধ্যাপক ডা. সমীর কুমার তালুকদার

সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিস অন্যান্য রোগের চেয়ে বেশি বিস্তার করে। আমরা যারা ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করি, তারা প্রতিনিয়ত রোগীদের ডায়াবেটিসের ব্যাপারে সচেতন করি। কেন ডায়াবেটিস হয় বা ডায়াবেটিস হলে এর চিকিৎসা কী, সে ব্যাপারে আমরা সাধারণ মানুষকে সচেতন করি। আমরা বলি, বাসায় বসে গ্লুকোমিটার বা গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করুন। আমরা প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা টার্গেট দিই। ১৭ বছরের কোনো বাচ্চার জন্য আমরা যে টার্গেট দিই, একজন গর্ভবতী মায়ের ক্ষেত্রে সেই টার্গেট দিই না। বয়সের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের গ্লুকোজের মাত্রা কেমন হবে, সেটা জানিয়ে দিই। ডায়াবেটিসের চিকিৎসার একটা বড় অংশ প্রত্যেক রোগীকে তাঁর চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। একজন রোগী সপ্তায় অন্তত একটি দিন গ্লুকোমিটার দিয়ে পরীক্ষা করে তিনি যেন তাঁর টার্গেটের কাছাকাছি থাকতে পারেন, সেই চেষ্টা আমরা করি। গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, সেটা টেস্ট করার জন্য অনেকেই একটা নির্দিষ্ট সময় পরে আমাদের কাছে এসে টেস্ট করেন। আমরা চাই, আপনারা এই টেস্ট বাসায় বা আমাদের কাছে এসে হলেও টেস্ট করুন। যাঁদের খাওয়ার কোনো টাইম–টেবিল থাকে না, তাঁদের গ্লুকোজের মাত্রা ঘন ঘন টেস্ট করতে হয়। লিভার বা কিডনির সমস্যা থাকলে তাঁদের ক্ষেত্রে খুব তাড়াতাড়ি সুগার লেভেল কমে যায়।

এই কোভিডের সময় দেখা গেছে অনেক রোগী কোভিড আক্রান্ত হয়ে এসেছেন। কোভিড থেকে মুক্তি পেলেও তাঁদের ডায়াবেটিস আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি না। সুতারং আমি বলব, হোম ব্লাড গ্লুকোজ মনিটরিং সিস্টেম প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগীর বাসায় থাকা উচিত এবং এটাকে চিকিৎসার একটা অংশ হিসেবে মেনে নিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা যখন রোগীকে এ বিষয়ে আলোকপাত করি, তখন সব সময় সফল হতে পারি না। অনেকে অনেক মতামত দেন। গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করার জন্য আঙুলে একটু ফুটো করতে হয়। এটাকে অনেক রোগী পেইনফুল বা যন্ত্রণাদায়ক মনে করেন। আবার ডায়াবেটিস ধরা পড়লে তখন রোগী হতাশায় ভোগেন। ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে চাইলে সচেতন হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

default-image

ডা. ফারহানা আক্তার

একটা প্যানডামিক মোকাবিলার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে কিছু নির্দেশনা ছিল। এর মধ্যে ছিল মাস্ক, সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার করা। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মেইনটেন এবং সরকার ঘোষিত বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন বিধিনিষেধ। ডায়াবেটিস আসলে একটি ক্রনিক ডিজিজ এবং ক্রনিক ডিজিজের কারণে ক্রনিক অনগোয়িং একটা সাপোর্ট দরকার। এটা কিন্তু কোভিড চলাকালে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোভিড চলাকালে ডায়াবেটিসের মাত্রা কেমন ছিল? ডায়াবেটিস আসলে টাইপ–১ ও টাইপ–২ নামে আছে। টাইপ–১ ডায়াবেটিসের বেশ কিছু স্টাডিতে চমৎকৃত হওয়ার মতো কিছু বিষয় পাওয়া গেছে। টাইপ–১ ডায়াবেটিস বিধিনিষেধের মধ্যে আগের তুলনায় ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। যেহেতু বাচ্চারা সব সময় বাসায় ছিল এবং মা–বাবার কেয়ার পেয়েছে, সে কারণে হয়তো নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু আমাদের বেশির ভাগ রোগী টাইপ–২–এ আক্রান্ত। শতকরা ৯৫ ভাগ রোগীই টাইপ–২ দ্বারা আক্রান্ত। এঁদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোভিড চলাকালে তাঁদের ডায়াবেটিস মোটেও নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এর কারণ হতে পারে, রোগীরা বাসায় বন্দী ছিলেন। তাঁরা নিয়মিত খাবারের চার্ট মানেননি। আবার বিধিনিষেধের কারণে রোগীরা বাইরে হাঁটতে পারেননি এবং বাসায় বেশি ঘুমিয়েছেন।

এ ছাড়া কঠোর বিধিনিষেধের সময় অনেক ফার্মেসিতে ওষুধ ছিল না ঠিকমতো। তখন ইনসুলিন বা অন্যান্য ওষুধের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তো, এ রকম অনেক কারণ মিলিয়ে আসলে টাইপ–২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আবার রোগীরাও কিন্তু ফিজিওথেরাপির কাছে যেতে পারেননি। তো, এই নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে কিন্তু অনেক সমস্যা হতে পারে। যেমন, কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, লিভারের ক্ষতি হতে পারে, হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, চোখের ক্ষতি হতে পারে, স্ট্রোক হতে পারে। আমি চাই না বিধিনিষেধ আবার ফিরে আসুক। কারণ, ডায়াবেটিসের ইনফেকশন রেট এখন অনেক কমে এসেছে। কিন্তু যদি আবার বিধিনিষেধ আসে, তাহলে রোগীদের বলব, আপনারা ফলোআপ করতে না পারলেও টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সেবা নিন অন্তত এবং আমরা কিন্তু এখানকার সবাই কোভিডের শুরুর প্রথম থেকে টেলিমেডিসিন সেবা একদম ফ্রি দিয়ে এসেছি।

আমরা এখনো রোগীদের উদ্বুদ্ধ করতে চাই যে এই টেলিমেডিসিন সেবা যাতে তাঁরা আমাদের থেকে নেন। ডায়াবেটিস এডুকেশন আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই কাজটা আপনারা মিডিয়াগুলো করতে পারেন। স্যালাইনের কথা আগের বক্তা বললেন মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। সেই সঙ্গে আমি যুক্ত করি, এইচআইভিও কিন্তু মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে জানানো হয়েছে এবং মানুষ সচেতন হয়েছে। কাজেই ডায়াবেটিসের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে মিডিয়াই আমাদের সবচেয়ে ভালো সাহায্য করতে পারবে। মিডিয়া আমাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।

default-image

ডা. শাহ এমরান

আমাদের ম্যান পাওয়ার ক্রিয়েশন খুব বেশি দরকার। বিভাগীয় শহরগুলোতে ম্যান পাওয়ার ক্রিয়েশন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে জেলা শহরে এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট নিয়োগ একেবারে জরুরি হয়ে পড়েছে। এই কাজটা করতে পারলে মানুষ যথাযথ চিকিৎসা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। এখন সেবাগ্রহীতার তুলনায় সেবা যথেষ্ট কি না, এটা একটি জটিল প্রশ্ন। মানুষ কতটুকু সেবা চায় আর কতটুকু পায়, এটা নির্ভর করে কী পরিমাণ সেবাদাতা আছেন এবং কী পরিমাণ সেবাগ্রহীতা আছেন সেটার ওপর। আমি সিলেট বিভাগে বসবাস করি। এখানে প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। এখন এই দুই কোটি মানুষের মধ্যে যদি ৮-১০ জন ডায়াবেটিসের চিকিৎসক ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে চিকিৎসা দেওয়া তো সম্ভব হবে না। সুতরারং আমাদের ডায়াবেটিসের চিকিৎসক বাড়াতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। সারা দেশের মানুষ যাতে চিকিৎসা পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার সেটা খুব ভালোভাবে চেষ্টা করছে। আমি যখন প্রথম দিকে ডায়াবেটিস রোগী দেখতাম, তাঁরা ইনসুলিন নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাতেন না। এখন অবশ্য তাঁদের একটু বোঝাতে পেরেছি। এর গুরুত্বটা মানুষ বুঝতে শিখেছে। সুতরাং আগে যেখানে ডায়াবেটিস রোগী দেখার জন্য তেমন কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। এখন সেখানে কিন্তু চিকিৎসার জন্য আলাদা বিভাগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকের সংখ্যাও বেড়েছে। মানুষের সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে এখানে থেমে থাকলে চলবে না। মানুষকে আরও সচেতন করে তুলতে হবে। এই কাজটা আমাদের চেয়ে মিডিয়া অনেক সুন্দরভাবে করতে পারবে।

অধ্যাপক ডা. মীর মোশারফ হোসেন

আমরা আজকের আলোচনা থেকে ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা বুঝলাম। সচেতনতার বিকল্প কিছু নেই। আমাদের সবার ডায়াবেটিসের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং এ বছরসহ আগামী তিন বছরের ডায়াবেটিসের যে প্রতিপাদ্য—সবার জন্য ডায়াবেটিস চিকিৎসা এবং সেবা নিশ্চিতকরণ, এখন নয় তো কখন? আমরা এখন থেকেই যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাব। ধন্যবাদ সবাইকে।

ডা. আহসানুল হক আমিন

একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ডায়াবেটিস মহামারি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের একত্র হয়ে এই মহামারি প্রতিরোধ করতে হবে। শুধু চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যাঁরা জড়িয়ে আছেন, শুধু তাঁরা এলেই চলবে না, সেই সঙ্গে সরকার, মিডিয়া, সমাজসেবক সবাই মিলে এই রোগ প্রতিরোধ করতে হবে।

ডা. মো. ফিরোজ আমিন

ডায়াবেটিস চিকিৎসার জটিলতা থেকে আমরা মুক্তি পাব, যদি সবাইকে আমরা সচেতন করতে পারি। সচেতনতা বলতে বুঝি, রোগীকে বলতে হবে, আপনার সুগার কন্ট্রোলে রাখুন। ব্লাড প্রেশার ও লিপিড নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ছয় মাসে না পারলেও বছরে একবার চোখ দেখাতে হবে। ছয় মাসে একবার হার্ট ও কিডনি ভালো আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করতে হবে। এই কাজগুলো করলে রোগীকেও আমরা হতাশা বা চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে পারব।

ডা. ফারহানা আক্তার

সবার জন্য ডায়াবেটিস চিকিৎসা ও সেবা নিশ্চিতকরণ, এখন নয় তো কখন? এখন সবার জন্য সেবা নিশ্চিত করতে চাইলে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দিতে হবে এবং এটা করতে হলে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ডিজিটাল ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিভাগ আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলতে হবে। আমাদের লোকবলের অনেক সংকট আছে। সেগুলোর সমাধান করতে হবে।

ডা. শাহ এমরান

১৭ কোটি মানুষের দেশের ১৫০ জন এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট দিয়ে চিকিৎসা করা যাবে না। সুতরাং এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট বাড়াতে হবে এবং এন্ড্রোক্রাইনোলজি বিভাগ খুলতে হবে। প্রতিটি জেলায় জেলায় এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট থাকতে হবে। এমনকি সম্ভব হলে উপজেলা লেভেলেও এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট রাখতে হবে।

ফারুক পাঠান

আমরা রোগীদের দাওয়াত দিচ্ছি। আপনারা ডায়াবেটিসের সেবা নিতে আসুন, শিগগিরই আসুন। এখন শুধু দাওয়াত দিলেই তো চলবে না। আমাদেরও সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেবা প্রদানের জন্য যে অবকাঠামো দরকার, সেটা কারও একার পক্ষে করা সম্ভব হবে না। আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা জেনে খুশি হবেন যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘরে ঘরে ডায়াবেটিসের সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। পলিটেকনিককে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই আমরা সবকিছু রেডি করেছি। এ ছাড়া সরকার আরও একটি ঘোষণা দিয়েছে। সেটা হলো, দেশের সরকারি হাসপাতালে এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের বলেছে। এ ছাড়া আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট রাখা হবে।

প্রাইভেট সেক্টরেও আমরা প্রায় ২০-২২ হাজার ডাক্তারকে ট্রেনিং করিয়েছি। যাঁরা গ্রামেগঞ্জে আছেন, তাঁদেরও ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে, যাতে গ্রামের মানুষেরা ডায়াবেটিসের প্রাথমিক চিকিৎসা পেতে পারে। আমরা আশা করি, সরকার যদি ডায়াবেটিসের ওষুধে ট্যাক্স ফ্রি করে দেয়, তাহলে এর দাম আরও কমবে এবং রোগীদের হয়তো কেনার সামর্থ্য হবে। এ ছাড়া সরকার মুজিব শতবর্ষে টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ইনসুলিন ফ্রি করেছে, এটাও কিন্তু একটা বিরাট ব্যাপার। শুধু টাইপ–১ নয়, আমরা চাই টাইপ–২ রোগীরাও যেন এই সুবিধা পায়। অথবা সম্পূর্ণ ফ্রি না হলেও যদি ডায়াবেটিসের ওষুধ ও সিরিঞ্জ ট্যাক্স ফ্রি করে দেয়, তাহলে এটা মানুষের সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে।

ডা. নাদিয়া ইসলাম

আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য সম্মানিত আলোচকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন