অংশগ্রহণকারী

মো. তাজুল ইসলাম, এমপি

মাননীয় মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়

মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী

সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ

মো. খায়রুল ইসলাম

অতিরিক্ত সচিব, পানি সরবরাহ অনুবিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ

নুমেরি জামান

যুগ্ম সচিব, উন্নয়ন অধিশাখা, স্থানীয় সরকার বিভাগ

মো. কামাল হোসেন

যুগ্ম সচিব, পলিসি সাপোর্ট অধিশাখা বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ (প্রবন্ধ উপস্থাপন)

মো. সাইফুর রহমান

প্রধান প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)

মো. জসীম উদ্দিন

সভাপতি, এফবিসিসিআই

জাইদ জুর্জি

প্রতিনিধি, ইউনিসেফ বাংলাদেশ

হাসিন জাহান

কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড, বাংলাদেশ

শামীমা আক্তার

পরিচালক, করপোরেট অ্যাফেয়ার্স পার্টনারশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশনস, ইউনিলিভার

আবদুল্লাহ আল সাকিব

ডিরেক্টর অব রিসার্চ, কনসিলিয়ারি

আব্দুল্লাহ-আল-জুনায়েদ

হেড অব অপারেশনস, সাইন স্যানিটারি ওয়্যার অ্যান্ড ফিটিংস, আরএফএল প্লাস্টিক লিমিটেড

সঞ্চালনা

রোকসানা আঞ্জুমান নিকল

মিডিয়া প্রফেশনাল

সুপারিশ

■ সাশ্রয়ী মূল্যে হাত ধোয়ার পণ্য ও পরিষেবা নিশ্চিত করা

■ হাত ধোয়াকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ

■ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়া নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক পানি ও সাবানের ব্যবস্থা রাখা

■ সবার জন্য স্বাস্থ্যবিধি রোডম্যাপ ও কর্মকৌশল বাস্তবায়নে যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন, পদক্ষেপ গ্রহণ

মনিটরিং ও পর্যালোচনা

■ হাত ধোয়ার চর্চা বাড়াতে আচরণগত পরিবর্তন কার্যক্রম চলমান রাখা

■ সবার জন্য হাত ধোয়া নিশ্চিত করতে অবকাঠামো ও সচেতনতামূলক কাজে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ রাখা

■ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোয় পানি ও সাবানসহ সার্বক্ষণিক হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা

■ প্রত্যন্ত এলাকায় সুলভ মূল্যে হাত ধোয়ার সামগ্রীর প্রাপ্তি নিশ্চিত করা

■ হাত ধোয়াকে প্রাত্যহিক জীবনাচার ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পরিণত করা

আলোচনা

মো. তাজুল ইসলাম

হাত ধোয়ার চর্চা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সারা বিশ্বে এ বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। হাত পরিষ্কার রাখা না হলে অনেক রকম রোগজীবাণু থেকে আমাদের মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। হাত ধোয়ার চর্চার সফলতার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে সচেতনতা তৈরি। এ জন্য প্রয়োজন আমাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষ যুদ্ধ-অশান্তির পরিবর্তে শান্তিতে বসবাস করতে চায়। এ জন্য জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতিসংঘ সারা বিশ্বের মানুষের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। এর মধ্যে হাত ধোয়ার চর্চাসংক্রান্ত বিষয়টিও স্থান পেয়েছে। এর আগে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে সারা পৃথিবী প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ এর অভীষ্টগুলো সফলভাবে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপরে এসেছে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা ৬–এ হাইজিন, পানি ও স্যানিটেশনের বিষয়টি বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সরকারি–বেসরকারি খাতে অংশীদারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কাজে জনপ্রতিনিধিদের সংযুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। যেকোনো পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখলে ব্যক্তিগত স্বার্থের পাশাপাশি রাষ্ট্রের স্বার্থও রক্ষা হয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। সবাইকে বোঝাতে হবে, এটি বাস্তবায়নে সবার অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। একজন রিকশাচালক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একজন কৃষকও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমাদের দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। এখন সে হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী এবং কার্যকর পরিকল্পনার কারণেই এ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সবার কাজ সবাইকে করার সুযোগ করে দিয়েছেন। একসঙ্গে কাজ করলে অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব।

মো. কামাল হোসেন

করোনা মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অনুধাবন করেছি, কম খরচে টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপাদান হচ্ছে আমাদের হাত পরিষ্কার রাখা, হাত ধোয়া। বিশ্বব্যাপী সবাই এটি চর্চা করেছে। এ ধারণা থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ বৈশ্বিক আহ্বান করেছে, হাত ধোয়াকে যেন অভ্যাসে পরিণত করা যায়। বিশ্বব্যাপী ৩০০ কোটি মানুষ হাত ধোয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এ সংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ।

আমাদের সর্বজনীনভাবে হাতের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য স্কুল, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রসহ পাবলিক ও পারিবারিক টয়লেটে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, আইন, পলিসি আছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আরও কাজ করতে হবে। এ ছাড়া প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে হাত ধোয়ার সামগ্রীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের আচরণগত অভ্যাস পরিবর্তনও জরুরি। হাত ধোয়াকে আমাদের অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ। আয়তনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯৪তম দেশ হলেও জনসংখ্যায় অষ্টম। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২৬৫ জন লোক বাস করে। গত এক দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে।

এসডিজি ৬–এর আওতায় ৬ দশমিক ২ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাত ধোয়ার বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোসহ বাসাবাড়িতে হাত ধোয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার গুরুত্ব বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে। যেমন জীবন রক্ষা হবে, চিকিৎসা বাবদ অর্থ সাশ্রয় হবে, সংক্রামক রোগ থেকে বাঁচা যাবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় হাত ধোয়া ও স্বাস্থ্যসচেতনতার কথা প্রায়ই বলছেন। আমাদের বর্তমান পলিসিগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করতে হবে। জাতীয় বাজেটের একটা অংশ হাত ধোয়াসংক্রান্ত বিষয়ে বরাদ্দ করতে হবে। রোডম্যাপ বাস্তবায়নে পরিকল্পনা, পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করতে হবে।

মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী

এটি সত্য যে যাদের জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, তারা একে কীভাবে দেখে, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন পলিসি করা হয়, যা সম্পর্কে জনগোষ্ঠীর সংশয় থাকে, তাহলে এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন। হাত ধোয়া সম্পর্কে যে কৌশল তৈরি করা হয়েছে, তা অনেক দিন ধরে বিভিন্নভাবে পরিমার্জন করা হয়েছে। কৌশলগত অংশীদার এবং স্টেকহোল্ডারদের মতামত আমরা নিয়েছি। এটি যে ভালো একটি কৌশল হয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে। যাঁরা এটি বাস্তবায়ন করবেন, তাঁদের সহায়তা আমাদের প্রয়োজন।

করোনাকালীন হাত ধোয়ার সাধারণ অভ্যাসকে কার্যকর পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে অনেকটা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। অনেক সময় ছোট ছোট কৌশল অবলম্বন করে বড় লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। উদাহরণস্বরূপ, ধুলার মতো বড় সমস্যার সমাধান হয়েছিল জুতা আবিষ্কারের মাধ্যমে। আমাদের স্বাস্থ্যগত অনেক সমস্যা আছে। এসব সমস্যা সমাধানে অনেক মডেল রয়েছে, সুপারিশ রয়েছে।

পদ্ধতিগতভাবে হাত ধোয়া শুরুর পর করোনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আরও অনেক রোগ, যা নিয়মিত হতো; তা থেকে অনেকাংশে আমরা নিষ্কৃতি পেয়েছি। গত বছরের তুলনায় এ বছর সাবানের বিক্রি ও ব্যবহার অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি তরল সাবানের ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে লিকুইড ও সাবান বিক্রি হয়েছে। এর মানে জনসাধারণ এসব ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছে। এ ধারা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। একে সংস্কৃতিতে পরিণত করতে পারলে আমরা সুফল পাব ও বড় লক্ষ্য অর্জনে সফল হব। কারণ, সংস্কৃতি সমাজের সবার। এতে কাউকে বাদ দেওয়া হয় না। সবাই এতে অংশগ্রহণ করে। সংস্কৃতিতে পরিণত করার সুবিধা হচ্ছে, এটি দ্রুত পরিবর্তিত হয় না। ফলে হাত ধোয়া সংস্কৃতির অংশ হলে আমাদের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

করোনা মহামারির আগেও আমি বাইরের দেশে, বিশেষ করে দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হাত ধোয়ার অভ্যাস দেখতে পেয়েছি। তখনো এসব দেশের মার্কেটে প্রবেশ করতে গেলে স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হয়েছে। করোনাভাইরাস কী, সে সময় তারা জানত না। এ বিষয়গুলো তাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। এর সুফল তারা পেয়েছে করোনা মহামারির সময়।

সারা পৃথিবী যখন করোনা মহামারিতে টালমাটাল, তখন তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এ জন্য আমি হাত ধোয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেব। এখানে খুব বেশি ব্যয় না হলেও প্রাপ্তি অনেক বড়।

মো. জসীম উদ্দিন

করোনা মহামারিতে সারা বিশ্বে ৭৬ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশেও ২০ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। বিশ্বব্যাপী এক বিলিয়নের মতো মানুষ নিয়মিত হাত ধোয়ার কারণে করোনা মহামারি থেকে বেঁচে গেছেন।

হাত ধোয়াকে একটি সামাজিক আন্দোলনে হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। আর আমাদের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি এ কাজে সরকারি–বেসরকারি খাতসহ সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা জরুরি।

আমরা অনেক সময় নিজেদের অজান্তেই হাত না ধুয়ে খাবার গ্রহণ করি। ডায়রিয়া হওয়ার বড় একটি কারণ হচ্ছে হাত না ধুয়ে খাওয়া। করোনার সময় হাত ধোয়াকে আমরা অভ্যাসে পরিণত করেছিলাম। এখন আবার আমরা আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছি। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ব্যবসায়ী কমিউনিটি তাদের সিএসআর থেকে এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। তারা মার্কেট ও দোকানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। এ জন্য কিছু ক্যাম্পেইনও করা যেতে পারে। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এ রকম ছোট বিষয়গুলো জরুরি। ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশে পরিণত হব। সে জন্য আমাদের মানসিকতার দিক থেকেও উন্নত হতে হবে।

সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমেও আমরা অনেক কাজ করতে পারি। আমি ব্যবসায়ীদের সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও ইউনিসেফের উদ্যোগের সঙ্গে শরিক হতে উদাত্ত আহ্বান জানাই। আমাদের পক্ষে যেটুকু ভূমিকা রাখা সম্ভব, আমরা যেন তা রাখি। আমরা সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ায় অবদান রাখব।

মো. খায়রুল ইসলাম

গত এক দশকে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে বাংলাদেশ ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৬ অর্জনে, বিশেষত উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের হার প্রায় শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সাফল্য প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। স্বাধীনতা অর্জনের সময় এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা ছিল নানান সমস্যায় জর্জরিত।

এখন দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষের নিরাপদ পানি সরবরাহের সুবিধায় আওতায় এসেছে। খোলা জায়গায় মানুষ এখন আর মলত্যাগ করছে না।

হাতের অপরিচ্ছন্নতার মাধ্যম ছড়িয়ে পড়া রোগ প্রতিরোধে হাত ধোয়া একটি কার্যকর উপায়। দেশের ৯৯ শতাংশ বিদ্যালয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে যথেষ্ট পানি ও সাবানের ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ৪৮ শতাংশ স্কুলে। স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলো আরও পিছিয়ে আছে। এদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। সবার জন্য হাত ধোয়া রোডম্যাপের লক্ষ্য হলো সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়গুলোকে তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা দেওয়া।

সাশ্রয়ী মূল্যে হাত ধোয়ার পণ্যসামগ্রী ও পরিষেবা নিশ্চিত করতে সবার একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। রোডম্যাপটি হ্যান্ড হাইজিনবিষয়ক কার্যক্রম সমন্বয় ও সংশ্লিষ্ট কাজের বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য ওয়াশ সেক্টরের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই। এরই ধারাবাহিকতায় হাত ধোয়ার বিষয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

জাইদ জুর্জি

মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে কম খরচ, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ হচ্ছে হাত ধোয়া। এর মধ্যে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি অন্তর্ভুক্ত। এর একটি অন্যটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। পানি ছাড়া হাত ধোয়া সম্ভব নয়। আবার সাবান ছাড়া হাত ধুলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয় না। হাত ধোয়ার জন্য বেসিনেরও প্রয়োজন। বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষের হাত ধোয়ার প্রাথমিক সুবিধা নেই। এটি বড় একটি সমস্যা। অামাদের পানি সরবরাহের জন্য টেকসই ব্যবস্থা করতে হবে। হাত ধোয়ার চর্চা বাড়াতে আচরণগত পরিবর্তন জরুরি। কারণ, কেউই হাত ধুতে বাধ্য নয়। এ জন্য এটি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। আচরণগত পরিবর্তন এ জন্যই জরুরি যে মানুষ তার পরিবারের সদস্য ও পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শিখে থাকে। এ জন্য প্রয়োজন কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা, যার মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে হাত ধোয়ার গুরুত্ব বোঝানো যাবে।

হাত ধোয়ার বিষয়টি কয়েকটি কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এর মাধ্যমে রোগ ছড়ানো প্রতিরোধ করা যায়। শিক্ষা খাতেও এর প্রভাব পড়ে। সুস্থ থাকায় ছেলেমেয়েরা স্কুলে কম অনুপস্থিত থাকে। তারা পড়াশোনার পেছনে বেশি সময় ব্যয় করতে পারে। ফলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়। রোগ কম ছড়ানোর কারণে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের বোঝা অনেকটাই কমে আসে। এতে পরিবারের সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়ে, যা পুরো পরিবারের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই হাত ধোয়াসংক্রান্ত বৈশ্বিক রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এটি তিনটি পর্যায়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মহামারির প্রতিক্রিয়া, হাত ধোয়াসংক্রান্ত অবকাঠামোর পুনর্নির্মাণ ও সমাজে হাত ধোয়ার চর্চা প্রতিষ্ঠা করা। হাত ধোয়ার বিষয়টি একটি সামাজিক আচরণ। মানুষকে এ সামাজিক আচরণের বিষয়ে সচেতন করতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে মানুষ নেতাদের অনুসরণ করে। রাজনৈতিক নেতারাও এ ক্ষেত্রে বেশ ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি হাত ধোয়ার বিষয়টিকে জাতীয় অ্যাজেন্ডায় গুরুত্ব দিতে হবে।

হাত ধোয়া কার্যক্রমসংক্রান্ত রোডম্যাপটি বাস্তবায়নে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। প্রথমত হচ্ছে সরকার। এ কাজে সরকারের নেতৃত্ব প্রয়োজন। সরকারের পক্ষে জনপ্রতিনিধিরা মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের বোঝাবেন এবং সমস্যাগুলো তুলে ধরবেন। দ্বিতীয় হচ্ছে, বেসরকারি খাত। এ খাতে ইউনিসেফ সব সময় দৃষ্টিপাত করেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে। বেসরকারি খাত বেশ সক্রিয়। তারা সমস্যার সমাধান করতে এবং ফলাফল আনতে সক্ষম। তারা মানুষের কাছে খুব সহজে পৌঁছাতে পারে। দেশের প্রতিটি ঘরে হাত ধোয়ার বার্তা পৌঁছাতে হবে। এটি করা বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু বেসরকারি খাতের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

আমরা বেসরকারি খাতকে সংযুক্ত করার কথা বলেছি। বেসরকারি খাত তাদের লভ্যাংশ নেবে, এটা তাদের লক্ষ্য। এটা তাদের অধিকার, এতে কোনো সমস্যা নেই। এর মাধ্যমে তারা চাকরির সুযোগ তৈরি করে থাকে। অনেকে পণ্যের দাম কমানোর কথা বলছেন। কর কমানো ছাড়া এটি সম্ভব নয়। কারণ, পণ্যের কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এ কাজে অবশ্যই সরকারের ভূমিকা প্রয়োজন।

মো. সাইফুর রহমান

আমরা ১৫ অক্টোবর বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালন করেছি। বাংলাদেশে হাত ধোয়ার চর্চা এখন অনেক ভালো। ২০১৯ সালের জরিপে ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রে হাত ধোয়ার স্টেশনে পানি ও সাবানের নিশ্চয়তা ছিল। করোনা মহামারির পর এটি এখন ৯০ শতাংশের ওপরে। এ জন্য কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আমাদের কাছে বড়। প্রথমটি হচ্ছে এটি ধরে রাখা, টেকসই করা। করোনা মহামারিতে আমরা হাত ধোয়ার অনেক স্টেশন প্রতিষ্ঠা করেছি। পাবলিক টয়লেটগুলোতে আমরা আলাদাভাবে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করেছি। সেখানে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক স্থাপন করা হয়েছে। আরও ১৫ হাজার বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম চলমান। আমরা আশা করছি, ২০২৫ সালের মধ্যে শতভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক ওয়াশ ব্লক স্থাপন নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি হাত ধোয়ার স্টেশন তৈরির জন্য পিইডিপি-৪–এ একটি সংস্থানও সৃষ্টি করা হয়েছে।

হাত ধোয়ার অভ্যাস আমাদের ধরে রাখতে হবে। হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে হাত ধোয়া সঠিকভাবে হতে হবে। সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছি। সাবানসহ হাত ধোয়াসংক্রান্ত পণ্যের দাম বিগত দুই বছরে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, যতটা সম্ভব এসব পণ্যের সাশ্রয়ী মূল্য নির্ধারণ করা। তাহলে সবার পক্ষে এসব পণ্য কিনে হাত ধোয়ার সঠিক চর্চা করা সম্ভব।

পাশাপাশি আমরা সবাই মিলে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ২০৩০ সালের আগেই হাত ধোয়ার চর্চার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করব।

আবদুল্লাহ আল সাকিব

আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি। আমরা বিগত কয়েক বছরে হাত ধোয়াসংক্রান্ত পণ্য ও ওয়াশ বেসিন, ট্যাপ প্রভৃতি মার্কেটে কী কী পরিবর্তন এসেছে, এর কারণ কী ছিল, তা জানার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি চাহিদার বিষয়টি, অর্থাৎ ভোক্তার বিষয়টিও বিবেচনা করেছি।

এখানে ভোক্তা বলতে গ্রামীণ অঞ্চল, বিশেষ করে হাওর, চর, লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষজনকে বোঝানো হয়েছে। এর বাইরে আছে পাবলিক প্লেসগুলো, যেখানে অনেক মানুষ হাত ধোয়; যেমন হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড, মসজিদ, মন্দির, চার্চ। এসব জায়গায় যেসব ভোক্তা আছেন, তাঁদের আচরণ কী ধরনের, তাঁরা কী কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তাঁদের প্রয়োজন কী—এ বিষয়গুলো আমরা জানতে চেয়েছি।

বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবনীমূলক আইডিয়া নিয়ে কিছু সংগঠন কাজ করছে। সে বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা–ও বিবেচনায় এনেছি।

বিগত কয়েক বছরে সাবান, তরল সাবান ও সৌন্দর্যবর্ধক এবং অ্যান্টিসেপটিক সাবানের বাজার অনেক বড় হয়েছে। ২০১৯ সালে অ্যান্টিসেপটিক সাবানের মার্কেট শেয়ার ছিল ৩৪ শতাংশ, যা ২০২১ সালে দাঁড়িয়েছে ৪১ শতাংশে। বিক্রি মূলত বেশি হয়েছে ১০০ বা ৭৫ গ্রামের ছোট বার সাবানের প্যাকেটের। লিকুইড সাবানের ক্ষেত্রে ১৭০ মিলিগ্রামের প্যাকেট বিক্রিও অনেক বেশি হয়েছে।

হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পাবলিক প্লেসে বার সাবান বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা দেখেছি, গত কয়েক বছরে গ্রামাঞ্চলে শহরের তুলনায় বার সাবান ব্যবহারের হার বেশি ছিল। তরল সাবানের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ২০১৯-২০–এ শহরে তরল সাবানের বিক্রি বাড়লেও ২০২০-২১–এ তা সে হারে বাড়েনি। করোনার কারণে এ পরিবর্তন হয়েছে। করোনার পরে সাবানের ব্যবহার কিছুটা কমলেও মানুষের মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। অনেক বাড়িতে আমরা দেখেছি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা আছে। এটি ইতিবাচক একটি দিক। এটি আমাদের ধরে রাখতে হবে।

নুমেরি জামান

‘হ্যান্ড হাইজিন ফর অল-রোডম্যাপ’ একটি বড় বিষয়। এর আগে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ জরুরি। ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের কোন লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে, তা সুনির্দিষ্ট করা আছে। ধরে নেওয়া হয়, নগরের তুলনায় গ্রামের মানুষজন পিছিয়ে। কিন্তু আমরা দেখেছি, করোনাকালে গ্রাম পর্যায়ে সাবানের ব্যবহার শহরের তুলনায় বেশি ছিল। অর্থাৎ মানুষের কাছে যথাযথভাবে তথ্য পৌঁছাতে পারলে তার আচরণগত, অভ্যাসগত পরিবর্তন সম্ভব। এর সঙ্গে রোডম্যাপের বিষয়টি জড়িত।

বিশ্বে প্রতিবছর হাতের স্বাস্থ্যবিধি–সংক্রান্ত অসুখে বিশ্বে ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। একসময় বহুসংখ্যক মানুষ ডায়রিয়ায় মারা যেত। টেলিভিশনে ঘরোয়া উপকরণ (গুড়, লবণ) দিয়ে হাতে তৈরি খাওয়ার স্যালাইনের বিজ্ঞাপনের ফলে সবার আচরণের পরিবর্তন হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় মানুষ এখন অর্থ খরচ করে স্যালাইনের প্যাকেট কিনছে। প্রয়োজন সঠিকভাবে তুলে ধরলে মানুষ ব্যয় করতে প্রস্তুত। এ–সংক্রান্ত পণ্য লাভ সীমিত রেখে গ্রাম পর্যায়ে সহজলভ্য করা যেতে পারে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। রোডম্যাপ এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে। সবার করণীয় সেখানেই সুনির্দিষ্ট থাকবে। শহরে সুপারশপে স্যানিটেশনসামগ্রী বিক্রিতে হয়তো দুটো কিনলে একটি ফ্রি অফার থাকে। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে এ সুবিধা কতটুকু আছে, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। এটি করা খুব জরুরি। কোনো পণ্যের সঙ্গে হয়তো স্যানিটেশনসামগ্রীর মিনি প্যাক ফ্রি দেওয়া যেতে পারে। এতে এসব পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ততা তৈরি হবে, যা পরে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আব্দুল্লাহ-আল-জুনায়েদ

বেসরকারি খাত যখন কোনো পণ্য তৈরি করে, তখন চেষ্টা করা হয় কত কম খরচে এটি করা যায়। কোনো পণ্য তৈরির পর যখন এর সামাজিক প্রভাব থাকে, তখন একে প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত বিতরণ করার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা বেসরকারি খাত করে থাকে। এখন বেসরকারি খাতকে সবকিছু ব্যবস্থা করার পরও যদি কম মূল্যে বিক্রি করতে হয়, তাহলে কিছু সহায়তার প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, এ সহায়তা কীভাবে দেওয়া যায়? প্রথমত, যখন এসব পণ্যের কাঁচামাল আমদানি করা হয়, তাতে কর ছাড় দেওয়া যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, প্লাস্টিক দিয়ে তো অনেক কিছুই বানানো যায়। সরকার কি সব ক্ষেত্রেই ভর্তুকি দেবে? আমি বলব, না। সরকার কেবল তাতেই ভর্তুকি দেবে, যাতে তার অগ্রাধিকার রয়েছে। সরকার এসব পণ্যের তথ্য নিয়ে যেটুকু কাঁচামালের প্রয়োজন, তাতে ভর্তুকি দিতে পারে। এতে কম খরচে ভোক্তার হাতে এসব পণ্য পৌঁছানো যাবে।

স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করার সময় আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাইক্রোফাইন্যান্সের কাজ দেখতে পেয়েছি। কিন্তু হাত ধোয়াসংক্রান্ত বিষয়ে কেউ তেমনভাবে কাজ করছে না। মাইক্রোফাইন্যান্স কাজে লাগিয়ে মানুষকে এ কাজে অভ্যস্ত করা সম্ভব। যেমন কেউ যদি হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করতে চায়, তাকে তা করতে ঋণ দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে সে মাসে মাসে সেই ঋণ পরিশোধ করবে। এর কিন্তু বড় একটি প্রভাব আছে।

এ মুহূর্তে আমাদের বিদ্যুৎ-বিভ্রাট, ডলারের উচ্চ মূল্য, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। এই বৈশ্বিক সংকটের কারণে অনেক চেষ্টা করা সত্ত্বেও দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। করোনা মহামারিসহ গত তিন বছরে (হাত ধোয়াসংক্রান্ত) পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এ সময়ে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে কেবল ৩ শতাংশ।

ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হিসাব করে দামের একটি মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বেশি দাম ধরা সম্ভব নয়। ফলে এখন আমাদের সিএসআর ফান্ড থেকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

একটি কোম্পানি সিএসআরে একটি নির্দিষ্ট অংশ যুক্ত করতে পারে। পুরো ব্যবসা সিএসআরের মাধ্যমে চলতে থাকলে কোম্পানি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, ক্ষুদ্র ঋণদাতা, স্থানীয় এনজিওসহ সবাই সমন্বিতভাবে চেষ্টা করলে ভালো ফল সম্ভব।

শামীমা আক্তার

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাস্তবায়নের দায়িত্ব সবার। আজকের রোডম্যাপ কোন কোন জায়গায় আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো আছে, তা সম্পর্কে করপোরেট খাতকে একটা ধারণা দেবে। যে পণ্য আমরা তৈরি করছি, তা দিয়ে যদি সমাজের কোনো সমস্যার সমাধান করা যায়, আমরা এটি নিশ্চিতভাবে করব। আলোচনায় এসেছে, আমাদের ব্যবসায় লাভের একটা প্রবণতা থাকে। তবে আমাদের চাওয়া থাকে, লাভের পাশাপাশি যেন সামাজিক উন্নয়ন হয়।

ইউনিলিভার বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বিগত ১৫ বছরে হাত ধোয়ার বার্তা নিয়ে ১১ কোটি শিশুর কাছে পৌঁছেছে। এটি আমরা করেছি, কারণ শিশুদের অভ্যাস করালে পরিবারের ওপরও প্রভাব পড়ে। আমরা তাদের যে পণ্য নমুনা হিসেবে দিই, সে বাড়িতে পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে একটি বার্তাও নিয়ে যায়। আলোচনায় লিকুইড হ্যান্ডওয়াশের ক্ষেত্রে ছোট স্যাশে প্যাক করার সুপারিশ এসেছে।

আমরা ইউনিলিভারের পক্ষ থেকে ৫ টাকার একটি স্যাশে তৈরি করেছি। এটি দিয়ে ১০ বার হাত ধোয়া যায়। এটি বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। আমরা এটি স্কুলে শিশুদের হাত ধোয়া শেখানোর সময় তাদের দিই। করোনা পরিস্থিতির কারণে আমরা গত দুই বছর স্কুলে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারিনি। ২০২২ সালে হ্যান্ডওয়াশ ও সাবানের বাজারের আকার ৫ থেকে ৬ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে লিকুইডের বাজার। করোনার সময় আমাদের হাত ধোয়ার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছে, তা এখন আর তেমনভাবে নেই। এ জন্য ইউনিলিভার আবার স্কুলে ফেরত যাচ্ছে। এ বছর আমরা একটি কর্মসূচির আওতায় আড়াই লাখ শিশুকে হাত ধোয়া শেখাব। এর সঙ্গে খরচের বিষয়টি জড়িত।

আমরা কোন কোন জায়গায় সমস্যা, তা জানতে চাই। সরকারের রোডম্যাপ সম্পর্কে জানলে আমরাও তা অনুসরণ করতে পারি। আমরা বাংলাদেশেরই অংশ। ইউনিলিভার এখানে ৬০ বছর ধরে কাজ করছে। সমাজে এনজিওর একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে। তারা সুযোগ করে দিলে আমরা আমাদের নিজস্ব পদ্ধতি নিয়ে সেখানে যেতে পারি। সরকারের কাছে আমাদের সবিনয় অনুরোধ থাকবে, হাত ধোয়াসংক্রান্ত বিষয়টিকে আন্দোলন হিসেবে তৈরি করা।

হাসিন জাহান

আজ থেকে দুই যুগ আগে হাত ধোয়ার বিষয়টি আলোচনায় এলে ধরে নেওয়া হতো, এ দায়িত্ব আসলে এনজিওর। এনজিওকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে হাত ধোয়ার কথা বলবেন। কিন্তু আশার কথা হলো, আজ আমরা বুঝতে পারছি, এটি কেবল এনজিও নয়, সবার বিষয়।

আমরা যারা এনজিওতে কাজ করি, তাদের ধারণা হচ্ছে, আমরা গরিব মানুষের জন্য কাজ করি। ফলে একটু কম টাকায় বা বিনা মূল্যে দেওয়ার বিষয়টি আসে। বিনা মূল্যে কারও অভ্যাসের পরিবর্তন করা যায় না। এখন যিনি রিকশা চালান বা ভিক্ষুক, তাঁরও একটা মুঠোফোন আছে। তিনি যদি একটি মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে কেন সাবান দিয়ে হাত ধোবেন না? আমাদের এ ধরনের ধারণা বদলাতে হবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সিএসআর ও ব্যবসা এক নয়। যাঁরা ব্যবসা করছেন তাঁরা যেন অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মানুষের কথা বিবেচনা করে পণ্য তৈরি করেন। যাতে তারা তাদের সামর্থ্যের মধ্যে এসব পণ্য কিনতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ সাবান ও জীবাণুনাশক সাবানের মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই। এরা একইভাবে কাজ করে।

আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, সরকারের আরও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এ জন্য সরকার অপেক্ষাকৃত সস্তা দেশি সাবানের ক্ষেত্রে কর মওকুফ করতে পারে। কিছুদিন আগে সরকার স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে কর মওকুফ করেছে। বেসরকারি খাত এসডিজিতে যে অবদান রেখেছে, সেটা সরকার যথাযথ মূল্যায়ন করলে তাদের বিনিয়োগ আরও বাড়বে। তা না হলে এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়। মানুষের হাতের নাগালের মধে্য হাত ধোয়ার অবকাঠামসহ পানি ও সাবানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেই মানু্ুষ হাত ধোবে।