বিজ্ঞাপন

প্রবাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে বন্ধু মিলনের সঙ্গে আগে কথা হতো ভাইবারে। এখন Zoom, StreamYard, GoogleMeet ইত্যাকার বিবিধ নব নব পদ্ধতিতে কথা হয়। করোনা আমাকে অন্তর্জালে পারঙ্গম করে তুলেছে। কেউ কেউ এই অন্তর্জাল আলাপের কাব্যিক নাম দিয়েছেন ‘মেঘ মিলন’। আমার বন্ধু মিলনের সঙ্গে তেমন মেঘ মিলন প্রায়ই ঘটে এখন। মিলনের সঙ্গে আমার কথা বলতে হয়; কারণ, যেকোনো নতুন লেখা লিখতে মিলনের পরামর্শ আমার জন্য জরুরি। মিলন লেখে না মোটেও, কিন্তু পড়ে অবিরাম। যেকোনো একটা লেখা, সাহিত্যের মানচিত্রে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে নিমেষে বলে দিতে পারে। আমার সব লেখার অনিবার্য পাঠক সে। সে আমার সাহিত্যযাত্রার সবগুলো বাঁক জানে। জুমের ক্যামেরায় মিলনকে ভালো দেখা যায়। ফলে আলাপ জমে ভালো। ওর চুলে কোথায় নতুন করে পাক ধরেছে, সেটাও দেখতে পাই আমি। মিলনকে বলি, একটা নতুন গল্প লেখার চেষ্টা করছি।

মিলন কিছু একটা বলে।

আমি বলি, তোর মাইক্রোফোনটা মিউট আছে। আনমিউট কর।

জুমের এই এক ক্যাচাল। মিউট করো, আনমিউট করো। এনি ওয়ে বলছিলাম, লেখা শুরু করেছিস?

আমি জানাই যে শুরু করেছি।এখনো শেষ করিনি।

মিলন বলে, শোনা দেখি শুরুটা।

আমি মিলনকে আমার নতুন লেখা গল্পের শুরুটা পড়ে শোনাই:

‘আমি শকুন দেখেছি। স্রোতে ভেসে যাওয়া মৃতদেহের ওপর দাঁড়ানো একটা আত্মতৃপ্ত, অহংকারী ধরনের শকুন। আমার চোখের নিচে ফুটে আছে সে শকুনটির ছবি। আমার পোষা একটা মোরগ কোলে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি ফেলে পালিয়ে উঠেছিলাম একটা স্কুলঘরে। একটা চৌকিতে শুয়ে ছিলাম আমরা। আমরা মানে বাবা, মা, বোন আর আমি। চৌকির পায়ার সঙ্গে মোরগটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিলাম। বেচারা মোরগ দৌড়ে ছুটে যেতে গিয়ে আটকে যেত দড়িতে, তারপর এক পা উঁচু করে কোনো দৌড়বিদের ভাস্কর্যের মতো স্থির দাঁড়িয়ে থাকত। দূরে তখন কামানের গোলার আওয়াজ হতো। হারিকেনের আলোতে আমি ওই মোরগের ভীতচকিত চোখ দেখেছিলাম। মোরগের সেই চোখও আমার চোখের নিচে ফুটে আছে। তবে সেই সব শকুন বা মোরগ নিয়ে আমি কোনো গল্প লিখিনি।’

মিলন আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, মনে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প?

আমি বলি, হ্যাঁ।

খেপে যায় মিলন—এ নিশ্চয়ই পঞ্চাশ বছর পূর্তির চক্কর। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, সিনেমার তো সুনামি দেখা দিচ্ছে এখন। এই স্রোতের ভেতর তুই একটা গল্প না লিখলেই-বা কী?

আমি তার কথা মানি। তবে বলি, আসলে এ ব্যাপারে আমার নিজের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার বিষয় আছে। প্রণোদনাটা বাইরের না ভেতরের। আমি বহুদিন আগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা গল্প লিখেছিলাম। গল্পটার নাম ‘অগল্প’। সেখানে একটা প্রতিশ্রুতি ছিল। আমি সেই প্রতিশ্রুতির কাছে ফিরে যেতে চাই। আমি মিলনকে জিজ্ঞাসা করি, গল্পটার কথা তার মনে আছে কি না।

মিলন বলে, অফকোর্স মনে আছে। ওটা তোর দ্বিতীয় ছাপা গল্প, কিন্তু প্রথম লেখা গল্প। গল্পটা তো তুই এইটিজে লিখেছিলি। যখন আমাকে পড়তে দিলি, তখন দেশে মিলিটারি গভর্নমেন্ট। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চর্চার চিকন বা মোটা কোনো রকম ব্যবসা হবার সম্ভাবনাই তখন নাই; বরং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখায় বিপদ ছিল। তোকে উৎসাহ দিয়েছিলাম লিখতে। তুই লিখলি। সেটা তো তোর একটা মাইলস্টোন গল্প হয়ে আছে। তখন কেউ লিখত না, তাই তোকে উৎসাহ দিয়েছিলাম। এখন তো সবাই লেখে, লিখতে চায়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখলে বাতাসাও মেলে। তোর লেখার দরকার কী?

আমি বলি, আমার সেই গল্পটা মনে আছে তোর?

মিলন বলে, তোর সব লেখা আমার ম্যাপিং করা আছে। গল্পটা শুরু করেছিলি হেরাক্লিটাস আর তার শিষ্যের কথোপকথন দিয়ে। শিষ্য জিজ্ঞাসা করছে, ‘মহাশয়, আপনি কার পক্ষে, যুদ্ধের না শান্তির?’ হেরাক্লিটাস বলছে, ‘বৎস, আমি শান্তির পক্ষে; কারণ, শান্তির সময় পুত্র পিতার কবর খনন করে আর যুদ্ধের সময় পিতা পুত্রের।’

আমি বলি, একজাক্টলি। কারণ, এই সংলাপটার একটা রেলেভেন্স ছিল গল্পটাতে।

মিলন বলে, হ্যাঁ, গল্পটাতে একজন গল্পকারের কথা ছিল, যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা গল্প লিখতে চাচ্ছে। একটা করে গল্প লিখছে আর সেটা বাতিল করছে। তোর ওই গল্পে ব্রেখটের নাটকের একটা প্রভাব ছিল। গল্পের আদি, মধ্য, অন্তের ধারাকে ভেঙে দিয়েছিলি তুই।

default-image

আমি আর মিলন আমার সেই প্রথম গল্পটা নিয়ে কথা বলি। অগল্প নামের গল্পের সেই গল্পকার প্রথম যে গল্পটি লেখে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এক মর্মান্তিক ঘটনার কথা আছে। ঘটনায় হেরাক্লিটাসের কথামতো এক বাবা তার ছেলের কবর খোঁড়ে। কিন্তু গল্প লিখে শেষ করার পর গল্পকারের সেই গল্পটা আর ভালো লাগে না। তার মনে হয় গল্পটা খুব ক্লিশে। গল্পটাকে সে বাতিল করে দ্বিতীয় আরেকটি গল্প লেখে। দ্বিতীয় গল্পটি বেশ নিরীক্ষাধর্মী। এক মুক্তিযোদ্ধার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। লেখা শেষে এ গল্পটিও তার আর পছন্দ হয় না। গল্পটাকে মনে হয় একটা বুদ্ধিতাত্ত্বিক ব্যায়াম। যেন কনটেন্টের চেয়ে ফর্মই বড়। এ গল্পটিকেও বাতিল করে সে। এরপর একে একে গল্প লেখার আর বাতিল করার এক গোলকধাঁধায় পড়ে যায় সেই লেখক। কোনো গল্পের ভেতর দিয়েই সে মুক্তিযুদ্ধকে পুরোপুরি ধরতে পারে না। অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নেয়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্পটা সে আপাতত লিখবে না। অপেক্ষা করবে। সে লেখক প্রতিশ্রুতি দেয় যেকোনো একদিন গল্পটি শেষ করবে। ফলে আমার অগল্প নামের গল্পটা ঠিক মুক্তিযুদ্ধের কোনো গল্প নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের গল্প লিখতে না পারার গল্প। সে কারণেই এর নাম অগল্প। আমি মিলনকে বলি যে আমি আমার সেই পুরোনো গল্পে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কাছে ফিরতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের এই পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে আমি আমার অসমাপ্ত গল্পটিকে সমাপ্ত করতে চাই।

মিলন বলে, আইডিয়াটা খারাপ না। কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে নতুন কী লিখবি তুই? খেয়াল করে দেখ, এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে একটা যুদ্ধ হচ্ছে। যুদ্ধের ধরন, কারণ হয়তো ভিন্ন; কিন্তু ভেতরের নির্যাসটা একই। মূল কথাটা একই। সত্যি বলতে যুদ্ধে কেউ জেতে না, সবাই হারে। হিউম্যানিটি হারে। হোমারের ইলিয়াড পড়, ওটাই মূলকথা।

জুমে মিলনের কথা শুনতে শুনতে একসময় হঠাৎ মনে হলো, আমি কিসের যেন একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমার বিলাতের এই ছোট শহরে রাস্তায় গাড়ির মৃদু শব্দ ছাড়া বাড়তি, আচমকা কোনো শব্দ তো জন্ম নেয় না। আমি বুঝতে পারি, শব্দটা মিলনের প্রান্ত থেকেই আসছে।

মিলনকে বলি, তোর ওখানে কি কোনো শব্দ হচ্ছে?

মিলন বলে, কিসের শব্দ?

আমি বলি, কেমন যেন হাতুড়ি পেটানোর শব্দ। হাতুড়ি দিয়ে কেউ যেন কিছু একটা ভাঙছে।

মিলন বলে, না তো। আমার আশপাশে কোনো কনস্ট্রাকশনের কাজ তো হচ্ছে না। আর এখন তো গভীর রাত। সব ঘুমে। আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না। বাদ দে। তোর গল্পের প্রসঙ্গে আয়। অগল্পের বাতিল গল্পটা শেষ করার তোর আইডিয়াটা ভালো। কিন্তু যে গল্পটা শোনালি, বুঝতে পাচ্ছি, তুই যুদ্ধের ওই সময়টাকে ধরতে চাচ্ছিস। কামানের শব্দে একটা মোরগের ভয় আর একজন কিশোরের ভয়কে একে অন্যের পাশে রেখে যুদ্ধের বিপরীতে একটা আদিম সারল্যকে দাঁড় করাতে চাচ্ছিস। কিন্তু আমার মনে হয়, পিরিয়ড পিস লিখে বিশেষ কাজ হবে না, তুই বরং কনটেম্পরারি সময়ে চলে আয়।

আমরা হাতুড়ি পেটানোর প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সমসাময়িক নানা বিষয়ে এলোমেলো কথা বলি। আমরা পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যানের লৌকিক, অলৌকিক নানা মাত্রা নিয়ে কথা বলি, একজন চিকিৎসক যিনি মহামারির ভুয়া সনদ দিয়ে বাণিজ্য করেছেন, তার মনস্তত্ত্ব বুঝতে ক্রিমিনোলজির নানা তত্ত্ব ঘাঁটি। আমরা সেই অভিনব ঘটনাটি নিয়ে আলাপ করি, যেখানে দেশের কারাগারের একজন কয়েদি পাহারাদার, জেলার সবার সামনে একটা মই বানিয়ে কারাগারের দেয়াল টপকে চলে যায় বাইরে। আমরা বলি যে চার্লি চ্যাপলিন এ বিষয়টি নিয়ে একটা ডার্ক হিউমারের চলচ্চিত্র বানিয়ে তুলতে পারতেন। এরপর আমরা মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে ফিরি। কনটেম্পরারি সময়ে ঠিক কোথায় হাত রাখলে মুক্তিযুদ্ধকে ছোঁয়া যাবে, আমরা তা নিয়ে কথা বলি।

মিলন বলে, বড় জায়গা থেকে চোখ সরিয়ে ফ্যাল, বরং ছোট জায়গায় তাকা। তোকে খুব সাম্প্রতিক দুটো ঘটনা বলি। একটা এই সপ্তাহে, অন্যটা গত সপ্তাহে ঘটল আমার সাথে। শুনে দেখ, এর ভেতর থেকে গল্পের কোনো সুতা টেনে আনতে পারিস কি না। এই সপ্তাহের গল্পটা একজন চাবিওয়ালাকে নিয়ে আর গত সপ্তাহের গল্পটা একটা কেরোসিনের টিনের বাক্স নিয়ে।

চাবিওয়ালার গল্প : তার আলমারির চাবির একটা ডুপ্লিকেট বানাতে মিরপুর গোলচত্বরে যায় মিলন। ফুটপাতে বসা এক চাবিওয়ালাকে পায় সে। সেই চাবিওয়ালা তার খুঁটিনাটি যন্ত্রপাতি দিয়ে মিলনের চাবি বানাতে থাকে। এ সময় একজন লোক একটা কাগজে একটা চাবির ছাপ চাবি নির্মাতাকে দেখায় এবং সেই মতো একটা চাবি বানিয়ে দিতে বলে। কিন্তু চাবিওয়ালা চাবিটা বানায় না। লোকটিকে বলে, আসল চাবিটা আনলেই কেবল সে নকল চাবি বানিয়ে দেবে। সেই লোক চাবির জন্য দ্বিগুণ টাকা দিতে চায়। কিন্তু তরুণ চাবিওয়ালা তবু চাবি বানায় না। লোকটা চলে গেলে মিলন চাবিওয়ালার কাছে জানতে চায়, কেন সে চাবিটা বানাল না। চাবিওয়ালা তখন র‍্যাঁদা দিয়ে চাবি ঘষতে ঘষতে তার বাবাকে স্মরণ করে। বলে, তার বাবা বস্তুত তার চাবিগুরু। তিনিও এই পেশাতেই ছিলেন। পা-বিহীন পঙ্গু ছিলেন তিনি। অন্য পেশায় টেকা দুরূহ ছিল তার; বরং ফুটপাতে চট বিছিয়ে নিপুণ হাতে চাবি বানাতেই দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তার বাবা তাকে বলেছেন কখনো চাবির ছাপ থেকে চাবি না বানাতে। চাবির ছাপের ভেতর গোপন অপরাধের ইঙ্গিত আছে। কেবল মূল চাবি থেকে চাবি বানানোই নীতি ছিল তার। গুরু হিসেবে তিনি তার ছেলেকে বলেছিলেন, চাবি বানানো একটা পবিত্র কাজ, ঝুঁকির কাজ। ফলে খুব সতর্কতার সঙ্গে চাবি বানানো জরুরি। কোনো অপরাধের আভাস যেখানে আছে, সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে উপদেশ দিয়েছেন ছেলেকে। তারপর সে প্রবীণ চাবিওয়ালা যিনি এখন মৃত, বলেছেন, ‘দুই নম্বরি একটা দেশ বানাইতে তো যুদ্ধে পা হারাই নাই।’ সামান্য সাধ্য তার, তবু তাই দিয়ে নিজের লোকসানের বিনিময়ে একটা নিখাদ দেশের স্বপ্ন সে সাজিয়ে রেখেছে ফুটপাতের ওপর চট বিছানো তার ছোট্ট সাম্রাজ্যতে। মিলন আমাকে বলে, দেশে এলে মিরপুর গোলচত্বরের পাশের ফুটপাতে গিয়ে খোঁজ করলেই আমি ছেলেটাকে পাব। মিলনের ধারণা, সেখানে গিয়ে আমি যদি সেই ছেলেটার চাবি বানানো র‍্যাঁদাটায় হাত রাখি, তাহলে হয়তো আমি মুক্তিযুদ্ধকে স্পর্শ করতে পারব।

মরচে পড়া কেরোসিনের টিনের গল্প: মিলনের মামি তার স্টোররুমের একেবারে ভেতর থেকে একটা মরচে পড়া কেরোসিনের টিন বের করে মিলনকে দেখালেন। একসময় এমন চৌকো কেরোসিন তেলের টিন পাওয়া যেত দেশে। মামির বাবা যুদ্ধে যাওয়ার সময় এই এক টিন কেরোসিন তেল কিনে রেখে গিয়েছিলেন বাড়িতে। মামি তখন কিশোরী। মামির বাবা তাকে এবং তার মাকে বলেছিলেন, যেদিন গ্রামে মিলিটারিরা ঢুকবে, সেদিন তারা দুজনেই যেন গায়ে কেরোসিন ঢেলে নিজেদের পুড়িয়ে ফেলে তৎক্ষণাৎ। কিশোরী মামি খুব ভালো জানতেন একজন নারীর কাছে গ্রামে মিলিটারি ঢোকার মানে কী ছিল তখন। একটা অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটা তার বুকের ভেতর টিক টিক করেছে যুদ্ধের পুরো নয়টি মাস। সারা জীবন বাড়ি বদলের সময় নানা জিনিস ফেলেছেন মামি কিন্তু তার বাবার দেওয়া সেই কেরোসিনের টিনটি স্টোররুমের কোনায় সযত্নে রেখে দিয়েছেন দশকের পর দশক। ওই টিনের বাক্সটার দিকে তাকালে প্রতিবার তার বুকের ভেতরের পুরোনো সেই ঘড়ির কাঁটার শব্দ শুনতে পান তিনি। সেই শব্দ চরাচরে আর কেউ কোথাও শুনতে পায় না। মিলন বলে, দেশে গেলে সে আমাকে ওর মামির কাছে নিয়ে যাবে। আমি সেই মরচে পড়া কেরোসিন টিনের গায়ে হাত রাখলে হয়তো মুক্তিযুদ্ধকে স্পর্শ করতে পারব।

আমি মিলনের কথা শুনতে শুনতে আবার আমার ল্যাপটপে জুমের ওপ্রান্ত থেকে হাতুড়ি দিয়ে কিছু ভাঙার শব্দ শুনি। মিলনকে বলি, আমি কিন্তু আবার হাতুড়ির শব্দ শুনছি। তুই শুনতে পাচ্ছিস?

মিলন বলে, দাঁড়া। একটু থাম। ভালো করে খেয়াল করে শুনি।

তারপর মিলন কিছুক্ষণ কান পেতে চারদিকটা শোনে এবং বলে, হ্যাঁ, তাইতো। ঠিকই বলেছিস। আমিও তো একটা হাতুড়ি পেটানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু শব্দটা আসছে কোথা থেকে? আশ্চর্য।

আমরা দুজন একসঙ্গে আবার খানিকক্ষণ শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করি। কিন্তু খুঁজে পাই না। ব্যর্থ হয়ে আমরা আবার কথায় ফিরি।

আমি বলি, যে ঘটনা দুটো বললি, দুটোকেই বিস্তার করার অনেক সুযোগ আছে। অপশনটা চিন্তা করা শুরু করব।

মিলন বলে, চিন্তা কর, ভালোমতো চিন্তা কর। দেখতে চাইলে দেখবি, বর্তমানের নানা অকিঞ্চিৎকর গলি, ঘুপচিতে এইভাবে ইতিহাস চুপচাপ পড়ে আছে। আর যদি অতীতেই যেতে চাস, তাহলে ইতিহাসবিদ যা দেখে না, লেখক হিসেবে সেদিকেই তোর নজর দেওয়া উচিত। একটা উদাহরণ দিই। মনে কর, ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা। কত আড়ম্বর, কত কথা বক্তৃতাটা নিয়ে, ওই বিশাল মাঠ, মঞ্চ, লক্ষ লক্ষ মানুষ, এর ঐতিহাসিক মূল্য। কিন্তু তুই নজর দিতে পারিস এই বক্তৃতা দিতে যাবার আগে ৩২ নম্বর বাসায় কাটানো শেখ মুজিবের কয়েকটা মুহূর্তের দিকে।

default-image

বিভিন্ন জনের স্মৃতিচারণা থেকে সেই সময়টুকুর যে ছবি মিলন পেয়েছে, সেটা আমাকে বর্ণনা করে সে। সকাল থেকে দলের নানা নেতা–কর্মী একে একে তখন ৩২ নম্বরের বাসায় আসছেন। সবাই জানতে চাচ্ছেন, কী বলবেন আজকে মুজিব। তিনি নানাজনের মত নিচ্ছেন। নিজে বিশেষ কিছু বলছেন না। ঠিক কী বলবেন, সেটাও স্পষ্ট করে বলছেন না কাউকে। একপর্যায়ে দুপুরের খাবার খেলেন তিনি। স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা বললেন, ‘তুমি একটু বিশ্রাম নাও।’ মুজিব তাঁর বিছানায় গিয়ে শুলেন। চোখ বুজে চিত হয়ে শুয়েছেন তিনি ৩২ নম্বরের দোতলার তাঁর ঘরটাতে। মেয়ে শেখ হাসিনা বালিশের পাশে বসে তাঁর ব্যাকব্রাশ চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কেটে দিচ্ছেন। চোখ বুজে আজ রেসকোর্স ময়দানে কী বলবেন, সেটা নিশ্চয় মনে মনে বোঝাপড়া করে নিচ্ছেন তখন তিনি। ফজিলাতুন্নেছা একটা মোড়া নিয়ে মাথার পাশে গিয়ে বসলেন। মুজিব চোখ বুজে আছেন। ফজিলাতুন্নেছা বললেন, ‘তোমার মনে যা আছে, তুমি তা–ই বইল। শুধু মনে রাইখো, তোমার সামনে কয়েক লাখ মানুষ আর তোমার পিছে পাকিস্তানি মিলিটারি।’ ইতিহাসের সেই ক্রান্তিকালের একটা চারণ ব্যাখ্যা দিলেন এই নারী। আর ঘণ্টাখানেক পর বিশ্বের বুকে একটা নতুন দেশ জন্ম নেবার শেষ মন্ত্রটি উচ্চারণ করবেন মুজিব। একই সঙ্গে আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষার দ্বৈত মন্ত্রের সেই সূত্রটি কি তিনি পেয়ে গেলেন বিছানার পাশে মোড়ায় বসা তাঁর স্ত্রীর কাছে? ইতিহাসের পাতায় এই আটপৌরে দৃশ্যটির গুরুত্ব নেই, কিন্তু সাহিত্যের পাতায় তার গুরুত্ব থাকুক, মিলন বলে আমাকে। তারপর তো শেখ মুজিব মঞ্চে দাঁড়িয়ে তর্জনী উঁচিয়ে শুরু করলেন, ‘আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন।’

সেদিনের সেই বিশাল জনসমুদ্রে যে মানুষগুলো জড়ো হয়েছিল, তাদের চোখের নিচে যে দেশটার কল্পনা ফুটে উঠেছিল, সেটা টের পাওয়া যায় কিন্তু আজকের মানুষের চোখের নিচে যে কল্পনার দেশটা ফুটে আছে, সেটাকে কি চিনতে পারিস তুই?—আমি জানতে চাই মিলনের কাছে।

মিলন বলে, চেনা কঠিন। কারণ, কল্পনায় ভবিষ্যতের দেশের ছবিটা তো এখন একেকজনের কাছে একেক রকম। বাচ্চাদের দিকে তাকালেই বুঝবি। বাচ্চারা একেক স্কুলের গেট থেকে চোখে একেক রকমের স্বপ্ন নিয়ে বের হয়। একদল যেমন দেশের স্বপ্ন দেখে, অন্য দল সে দেশের স্বপ্ন দেখে না। আমি তো তাদের চোখের নিচে অন্তত তিন রকম দেশের ভবিষ্যৎ কল্পনা দেখি। রকমগুলো বুঝতে পারছিস তো।

আমি বলি, তা বুঝতে পারছি। কিন্তু ওই ভবিষ্যতের সঙ্গে অতীতের তো কোনো যোগ নাই।

মিলন বলে, তা তো নাই। মানুষ তো স্মৃতিভ্রষ্ট এখন, তোর দাদির মতো সব ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত।

আমার তখন দাদির কথা মনে পড়ে আবার। মনে পড়ে অতীতভ্রষ্ট মানুষ কেমন পরিচয়হীন, করুণ, কৌতুককর হয়ে উঠতে পারে।

এ সময় আমরা দুজনেই আবার জুমের এপ্রান্ত আর ওপ্রান্তে হাতুড়ি পেটানোর শব্দ শুনতে পাই। এবার মনে হয় শব্দটা আরও বেড়েছে। ঠক ঠক ঠক ঠক করে হাতুড়ি দিয়ে কারা যেন কী ভাঙছে।

মিলন বলে ওঠে, এইবার আমি বুঝতে পারছি, হাতুড়ির শব্দটা কোন জায়গা থেকে আসছে। সত্যি বলতে আমি দেখতেও পাচ্ছি।

আমি বলি, কোন জায়গা থেকে শব্দ আসছে? তুই দেখতেও পাচ্ছিস?

মিলন বলে, হ্যাঁ, কিছু মানুষ রাতের অন্ধকারে হাতুড়ি দিয়ে একজনের নাক ভাঙছে, আঙুল ভাঙছে। তারই শব্দ হচ্ছে।

আমি বলি, কার নাক, কার আঙুল ভাঙছে?

মিলন বলে, যার নাক, যার আঙুল পাথরে বাঁধাই করা।

কিছুক্ষণ পর হাতুড়ির শব্দ আরও বেড়ে যায়। শব্দ চারদিক থেকে আসতে থাকে। মেঘ মিলনের সুবাদে মিলনের বাতাসে ভেসে থাকা শব্দ হাজার মাইল পেরিয়ে আমার কানে এসে পৌঁছায়। শব্দ এত বেড়ে যায় যে আমরা পরস্পরের কথা আর ভালোমতো শুনতে পাই না।

আমি চিৎকার করে বলি, মিলন শুনতে পাচ্ছিস? শব্দ তো বেড়ে যাচ্ছে।

মিলন বলে, হ্যাঁ, বাড়বে তো, আরও বাড়বে। দিকে দিকে কোরাসে ভাঙা হবে এমনি আরও যত বাঁধাই করা নাক। শব্দ বাড়তেই থাকবে।

আমি তেপান্তরের এপার থেকে ল্যাপটপের স্পিকারে হাতুড়ি পেটাবার শব্দ শুনি। ঠক ঠক ঠক ঠক।

হাতুড়ির শব্দ ছাপিয়ে গলা উঁচু করে মিলন বলে, একদলের কল্পনার দেশে কোনো পাথরের নাক নাই, আর আরেক দলের কল্পনার দেশে চত্বরে চত্বরে পাথরের নাক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে গুণীজন। কার কল্পনা বাস্তবায়িত হবে, তার মীমাংসা না দেখে তুই তোর অসমাপ্ত গল্পটা শেষ করবি কী করে?

মিলনের কথা সত্য বটে। টের পাই যে অগল্পের পরের গল্পটা আমি এখনই লিখে উঠতে পারব না। লিখবার জন্য আমাকে আরও খানিকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। অসমাপ্ত গল্পটা শেষ করবার জন্য আমি তাই আমার নিজের কাছ থেকেই আরও কিছুটা সময় চেয়ে নিই।

ঈদ আনন্দ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন