default-image

‘হ্যাালো’—গাড়ির স্টিয়ারিঙে ডান হাত, বাম হাতে পাশের আসন থেকে মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে দুহাত ছেড়ে দিয়ে ডান হাতে সবুজ তিরটা ঘষতে থাকি, একসময় কাজ হয়, ফোনটা কানে ধরি, বলি, ‘হ্যালো।’
‘আনিস ভাই, আমার গল্পটা?’
‘কে?’
‘আনিস ভাই, আমি আলীম আজিজ। আপনার কাছ থেকে আমি একটা গল্প চেয়েছিলাম না আমার পত্রিকার জন্য?’
‘আলীম আজিজ? তুমি না মারা গেছ?’
গাড়ির স্টিয়ারিঙে দুহাত। ঘাড়টা বাঁ দিকে কাত করে ফোনটা ধরে আমি বলি। আলীম আজিজ হাসে, ‘আনিস ভাই, রসিকতা করবেন না তো। কবে লেখা দেবেন বলেন।’
‘কবে দেব। তুমি বেঁচে থাকলে বলতাম কাল বা পরশু। যে বেঁচে নেই তাকে আমি লেখা দিই না।’
একটা গাড়ি বাম দিক দিয়ে এসে মাথাটা আমার গাড়ির সামনে ঢুকিয়ে দিয়ে চাপ দিচ্ছে। তাকে একটা গালি দেওয়া দরকার। কী করি। স্টিয়ারিং ডানে ঘুরিয়ে স্কেলেটরে চাপ দিয়ে সামনে গিয়ে আবার বামে এসে ওর লেনটা ব্লক করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে যাই—যাহ্ বেটা এখন। খুব তাড়া! বসে থাক।
ফোনটা রাখতে হবে। না হলে বলবে, কানে ফোন নিয়া গাড়ি চালান, না! দেন ৫০০ টাকা জরিমানা।
‘এই আলীম। গাড়ি চালাচ্ছি। পরে ফোন কোরো।’
আলীম আজিজ আমার কাছে প্রেমের গল্প চায়। প্রেম জিনিসটা আমার কাছে এখন হাস্যকর ব্যাপার বলে মনে হয়! জীবনে প্রেম নাই, বানিয়ে বানিয়ে কত আর গল্প লেখা যায়?
আলীম আজিজ ছাড়বার পাত্র নয়।
সন্ধ্যার সময় বাসায় এসে হাজির। সঙ্গে অনুবাদক রফিক-উম-মুনির চৌধুরী। বলে, ‘এসে গেলাম।’ আসার সময় আবার স্টার কাবাব থেকে টিকিয়া কাবাব আর নানরুটি কিনে এনেছে। বাসায় কেউ ছিল না আমি ছাড়া। নিজেই প্লেট সাজিয়ে দিলাম টেবিলে। কাবাব জিনিসটা আবার আমার খুব পছন্দ।
‘আনিস ভাই, আজকা রাতে লিখে ফেলেন।’
‘তুমি কাবাব আনছ। তোমাকে তো গল্প দিতেই হবে। কিন্তু রফিক-উম-মুনীর ভাই, আপনি বলেন, যে মারা গেছে, তাকে কি গল্প দেওয়া উচিত?’
রফিক ভাই হাসেন। বলেন, দেন।
আমি বলি, ‘আলীম আজিজের মৃত্যুর খবরটা পাই খুব অসময়ে। তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল জিম্বাবুয়েকে হোয়াইট করে ফেলেছে। আমি সে সময় স্টেডিয়ামে। গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে আছি। পুরস্কার দেওয়া দেখব। এই সময় ফোন এল, শুনেছেন। আলীম আজিজ তো মারা গেছে। শুনে খুব মন খারাপ হলো। মারা গেছে বলে নয়, অ্যাওয়ার্ড সিরিমোনিটা মাটি হলো বলে। ম্যান অব দি সিরিজ তো সাকিব আল হাসানই হবে, নাকি মুশফিকুর রহিম—এই নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলাম। ফোন করেছে তৈমুর রেজা, আলীম ভাই মারা গেছে। কোনো কার েনই। বুকে ব্যথা উঠেছে। হসপিটালে নেওয়ার পরে ডাক্তার বলে, আগেই এক্সপায়ার করেছে। এই হলো খবর।’
রফিক ভাই বলেন, দেন দেন। কোনো অসুবিধা নাই। কেউ মারা গেলে তার গল্প পাওয়ার অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
‘আচ্ছা দেব। কী ধরনের গল্প চাও আলীম?’
‘প্রেমের গল্প দেন।’
‘রফিক ভাই, কী বলে আলীম শোনেন। জীবনে কোথাও প্রেম নাই। বানিয়ে বানিয়ে প্রেমের গল্প লেখা যায় বলেন!’
রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী খুবই সজ্জন প্রকৃতির লোক। বলে, ‘আনিস ভাই, আপনি তো বানিয়ে লিখবেন। ফিকশন। গল্প। বানিয়ে লেখার জন্য তো আপনার জীবনে প্রেম দরকার হবে না। প্রেমের জন্য হাহাকার থাকলেও চলবে।’
‘আরে সেইটাই তো সমস্যা। প্রেমও নাই। প্রেমের জন্য হাহাকারও নাই। পুরা ভেজিটেবলস হয়ে গেছি। দাঁড়ান, নানরুটিটা একটু মাইক্রোওভেনে গরম করে দিই। তাহলে হয়তো মজা লাগবে।’
‘ভাবি কই গেছে?’ জিগ্যেস করেন রফিক।
‘এই তো। অফিসের কাজ। আজকে দেরি হবে।’ গরম নানরুটি টেবিলে রেখে বলি আমি।
‘আচ্ছা। আপনার প্রেমের জন্য হাহাকার লাগে না কেন?’ একটা কাবাবের টুকরা নানরুটিতে প্যঁাচাতে প্যঁাচাতে বলেন রফিক।
‘এইটা আপনি কী প্রশ্ন করলেন রফিক ভাই! কেন হাহাকার লাগে না, তার উত্তর কি জানা আছে?’
আলীম আজিজ খিলখিল করে হাসে। বলে, ‘আমার জানা আছে আনিস ভাই।’
‘তোমার জানা আছে আলীম?’ আলীম পরে আছে একটা টিশার্ট, ছাই রঙের, কালো রঙের ঢোলা ট্রাউজার। তার চুল ছোট করে ছাঁটা। দাড়ি-গোঁফ নাই। নাতি-উচ্চ শরীর। পেটানো। মুখমণ্ডল চতুষ্কোণ। সে খিলখিল করে হাসে। তার দাঁত পরিপাটি। হাসলে সুন্দর দেখায়। চোখ কুচকে যায়।
সে বলে, ‘আছে’।
‘বলো তাহলে? কী কারণ?’
‘কারণ আপনি আসলে মারা গেছেন আনিস ভাই!’
‘আমি হাসি। আমি মারা গেছি? তুমি শিয়োর?’
‘হ্যাঁ। আপনি মারা গেছেন। আপনি মারা গেছেন পেট্রলবোমায়।’
রফিক ভাই বলেন, ‘পেট্রলবোমায় না হয়ে অবশ্য পুলিশের গুলিতেও আপনি মারা যেতে পারেন। ব্যাপারটা নিয়ে কন্ট্রোভার্সি আছে।’
‘কী হলো ব্যাপারটা বলো তো?’
‘আপনার গাড়ি জ্যামে আটকা পড়েছিল। পাশে ছিল একটা নীল রঙের বাস। সেই বাসে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। তো, ওই বাসের এক যাত্রী, যার সারা গায়ে আগুন, জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে আপনার গাড়ির ছাদে। তখন আপনার গাড়িতে আগুন লেগে যায়। আর ওই দিকে ডিউটিরত পুলিশ গুলিও করে। ফলে দেশের অর্ধেক লোক বিশ্বাস করে, আপনি মারা গেছেন পুলিশের গুলিতে। অর্ধেক লোক বিশ্বাস করে, আপনার মৃত্যু হয়েছে পেট্রলবোমায়। এখন আপনি বলেন, আপনি কীভাবে মারা গেছেন?’
আমি হাসি, নাও নাও কাবাব খাও।
রফিক-উম-মুনীর ওয়াক করে ওঠেন। আমি বলি, ‘বেসিনে যান।’
আলীম বলে, ‘আপনার শরীরটা পুরোটাই পুড়ে গেছল আনিস ভাই। আপনি কি ব্যথা পেয়েছিলেন।’
আমি বলি, ‘না, আমার তখন বোধ ছিল না।’
রফিক-উম-মুনীর বমি করে পুরো মেঝে ভাসিয়ে দিচ্ছেন।
আমি বলি, ‘রফিক ভাই, এই কাবাবের সঙ্গে ওই পোড়া বডির কোনো সম্পর্ক নাই। আপনি বমি করবেন না। বাসায় কাজের লোক নাই। পরিষ্কার করবে কে?’
রফিক বেসিনে গিয়ে মাথায় পানি ছিটান। আমি তাকে তোয়ালে এগিয়ে দিই।
তিনি বলেন, ‘আপনি কি ওই গল্পটা জানেন?’
‘কোন গল্পটা?’
আমরা ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসি। রফিক-উম-মুনীর বলেন, ‘প্রথমে আমাদের আসতে হবে জীবনানন্দ দাশের কবিতায়। সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়।’
আমি বলি, ‘গেলাম’।
তারপর আসতে হবে আবুল হাসানের কবিতায়। ঘুরে ঘুরে নাচিতেছে পণ্ডিতের মতো প্রাণে’—তিনি বলেন।
‘আচ্ছা এলাম।’
‘এই কবিতাটার বিষয় হলো, একটা মোরগকে জবাই করা হয়েছে। এখন মোরগটা ব্যথায় নাচছে। ঘুরে ঘুরে নাচছে। তড়পাচ্ছে। কবন্ধ মোরগ।’
‘বুঝলেন।’
আলীম আজিজ সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে।
আমি বলি, ‘জি বুঝলাম। গলাকাটা মোরগ তড়পাচ্ছে। এটা আমাদের কাছে নৃত্য বলে মনে হচ্ছে।’
‘এইবার আসেন এই গল্পটায়’, রফিক-উম-মুনীর বলেন, ‘একটা সার্কাসের দল। তাদের একজন নৃত্যশিল্পী আছে। ধরা যাক, তার নাম আম্রপালি । বয়স ১৯। তার সরু কোমর। তার ভরাট বুক। তার দুই চোখে আগুন। তার দুই হাতে বিদ্যুৎরেখা। তার পায়ে হরিণীর ছন্দ। তার হাসি বল্লমের মতো বিদ্ধ করে।’
‘তারপর?’ আমি বলি।
‘তাকে নাচতে হবে। আগুনের রিঙের ভেতর দিয়ে সে ধাবমান হয়। নাচে। একদিন তার ঘাগড়ায় আগুন লেগে যায়। সে নাচে। সে ঘোরে। সে ঘুরছে। আগুন ঘুরছে। জনতা তালি দিচ্ছে।’
‘তারপর?’
‘তারপর সে নৃত্যপরা অগ্নিকুণ্ড। আগুন নাচছে। জনতা আরও জোরে তালি দিচ্ছে। সে তড়পাচ্ছে ওই মোরগের মতো, যার গলা কাটা। জনতা আরও জোরে তালি দিচ্ছে।
তার সেই নাচ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি তারিফ পাওয়া নাচ। দি মোস্ট এপ্রিশিয়েটেড পিস অব ডান্স ইন দি ওয়ার্ল্ড। কী বুঝলেন?’
‘হুঁ।’
‘আপনার শরীরে যখন আগুন লাগল, নাকি গুলি, আপনার কী মনে হয়েছিল, আনিস ভাই?’ আলীম বলল।
‘দেখো, আমি শুধু একটা জিনিসই চেয়েছিলাম, যেন আমি মারা যাই। এমন না যে দগ্ধ শরীরে বেঁচে থাকার যন্ত্রণার কথা আমি ভেবেছিলাম। সে খুব যন্ত্রণার আমি জানি। কিন্তু তারও চেয়ে বড় যন্ত্রণা কী জানো, আমি জানি, এইভাবে বেঁচে থাকব যত দিন, তত দিন কোনো উপশম হবে না। আমার নিজের কথা বলছি না । নিজের শরীরের কষ্ট সহ্য করা যায়! আমি বলছি দেশের কথা। আমি যত দিন পোড়া শরীর নিয়ে বাঁচব, তত দিনে কি দেশটার এই দহনকালের অবসান হবে? দেশটা যে পুড়ে যাচ্ছে, দেশটার ভবিষ্যৎ যে পুড়ে যাচ্ছে, এই দেখাটা মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক আলীম।’
রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘আপনি মরে গিয়ে ভালো করেছেন আনিস ভাই।’
ফোন আসে। নির্লিপ্ত নয়ন ফোন করেছে। আনিস ভাই, ‘গল্পটা দিলেন না?’
আমি তাকে বলি, ‘নয়ন, আজকের তারিখটা খেয়াল করেছ? পনোরো শূন্য দুই দুই শূন্য পনেরো। ভালো না তারিখটা?’
‘আনিস ভাই, আমার গল্পটা দেন?’
‘আরে আলীম আজিজ এসেছে। রফিক-উম-মুনীর ভাই এসেছেন। আলীমও তো গল্প চায়। তুমি এর মধ্যে ঢুকো না।’
‘কেন আনিস ভাই।’
‘কারণ আলীম মারা গেছে। আমি মারা গেছি।’
নয়ন বলে, ‘রফিক-উম-মুনীর ভাই তো মারা যান নাই। তিনি ওখানে কী করেন?’
আমি বলি, ‘নয়ন, তুমি তো মিয়া ভালো প্যাঁচ লাগাইলা। রফিক-উম-মুনীর ভাই, আপনিও কি মারা গেছেন?’
রফিক ভাই বলেন, ‘আসলে আমরা একটা গল্পের প্যাঁচের মধ্যে পড়েছি। গোলকধাঁধা। আপনি তো জানেন মার্কেজের আত্মজীবনীর মধ্যেও প্রসঙ্গটা আছে। একটা ট্রেনে কলা বহন করা হতো। কলা শ্রমিকেরা বিদ্রোহ করল। গুলি হলো। তারপর ট্রেন ভরে কলার বদলে নিয়ে যাওয়া হলো মানুষের লাশ।’
‘হুঁ। মূর্খ হলেও এই কাহিনি আমি পড়েছি।’
এখন বাংলাদেশটা একটা জ্বলন্ত ট্রেন। তাতে ১৬ কোটি মানুষ। ট্রেনটা জ্বলন্ত আর চলন্ত। এই গল্পে কে বেঁচে আছে, কে মারা গেছে, এই প্রশ্ন অবান্তর। এখানে জীবিতেরা ঈর্ষা করছে মৃতদের। আর মৃতরা দেখছে, জীবিতরা মৃতর চেয়েও মৃত। এই গল্পে কোনো গল্পের যুক্তি লাগে না। ধরা যাক, আপনি মারা যাননি। তাতে কী হলো? আপনার ভূমিকা মৃত মানুষের চেয়েও নগণ্য। ধরা যাক, আমি মারা গেছি। তাতে কী এসে যায়। আমার মৃত্যু কোথাও কোনো চাদরে সামান্য ভাঁজ ফেলবে না।

আলীমকে ফোন করি আমি, ‘আলীম আলীম। আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। তুমি আমার কাছে গল্প চাচ্ছ। আমি বলছি, আলীম তুমি তো মারা গেছ।’
আলীম বলে, ‘আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি আনিস ভাই, মারা যাওয়ার পরেও আমি আপনার কাছে গল্প চাচ্ছি, কারণ আপনিও মারা গেছেন। স্বপ্নে রফিক-উম মুনীর চৌধুরীও আছেন। আপনার বাসায় আমরা যাই কাবাব নিয়ে...’

এই সময় র্নিলিপ্ত নয়ন আমার টেবিলে আসে। আমাদের সংবাদপত্র অফিসে। বলে, ‘গল্প লাগবে না আনিস ভাই। রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী একটা গল্প দিয়ে গেছেন।’
‘দেখি।’
আমি সেই গল্পটা পড়ি।
‘হ্যালো’—গাড়ির স্টিয়ারিঙে ডান হাত, বাম হাতে পাশের আসন থেকে মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে দুহাত ছেড়ে দিয়ে ডান হাতে মোবাইলের সবুজ তিরটা ঘষতে থাকেন আনিসুল হক, একসময় কাজ হয়, ফোনটা কানে ধরে তিনি বলেন, ‘হ্যালো।’
‘আনিস ভাই, আমার গল্পটা?’
‘কে?’
‘আনিস ভাই, আমি আলীম আজিজ। আপনার কাছ থেকে আমি একটা গল্প চেয়েছিলাম না আমার পত্রিকার জন্য?’
‘আলীম আজিজ? তুমি না মারা গেছ?’

বিজ্ঞাপন
অমর একুশে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন