default-image

এই লেখার মূল প্রস্তাব দুটি: এক. প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ড বাংলা একটি নয়; কমপক্ষে দুটি। আরও বেশি হতে পারে, কম নয়। তার মধ্যে একটি ঢাকার। স্পষ্ট করে বললে, ঢাকার প্রমিত বাংলা কলকাতার প্রমিত বাংলা থেকে আলাদা। কথাটা ইশারা-ইঙ্গিতে অনেকে বলেন; কিন্তু কার্যত ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পবিত্র সরকারের প্রযোজনায় বাংলা একাডেমি থেকে সম্প্রতি অতি প্রশংসনীয় যে ব্যাকরণ বেরিয়েছে, তাতে এই ভিন্নতাকে বিশেষ আমলে আনা হয়নি। দুই. বাংলাদেশে প্রমিত বা মান বাংলা নিয়ে ধারণাগত এবং ব্যবহারিক সংকট প্রবল। এই সংকটের অন্যতম কারণ ঢাকার প্রমিত বাংলার আলাদা রূপ সম্পর্কে সংশয়ে ভোগা।
ঢাকার প্রমিত বাংলার সংকট টের পাওয়া যায় গত প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতায়। টেলিভিশন নাটকে ‘অপ্রমিত’ বাংলার প্রবল হাজিরা এবং এ ধরনের নাটকের নজিরবিহীন জনপ্রিয়তায় ঢাকার সুধী সমাজ বেশ অসহায় বোধ করেছিল। অনেকেই ভুলভাবে ব্যাপারটাকে এক বা একাধিক ব্যক্তির প্রযোজনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আদতে এটা ছিল প্রমিত ভাষার আরোপিত বিধির মজবুত নিয়ন্ত্রণে থাকা বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সামষ্টিক অস্বস্তির প্রকাশ। তা না হলে উৎপাদক ও ভোক্তা দুই স্তরেই ‘অপ্রমিত’ বাংলা একসঙ্গে এতটা গ্রাহ্য হতো না। এটা ঠিক, প্রচারমাধ্যমে ভাষা ব্যবহারে বিশেষ মনোযোগ বাঞ্ছনীয়। বাংলা-ইংরেজি মেশানো খিচুড়ি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় এ মনোযোগ দেখা যায় না। কিন্তু এ অবস্থার অবসানের জন্য আমাদের যে যেতে হয়েছে আদালত পর্যন্ত, ভাষার ইতিহাস-স্বভাব-কর্মপ্রণালির দিক থেকে তা বাস্তবসম্মত হয়নি। আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রমিত ভাষা কোনো ভাষাগোষ্ঠীর ভদ্রলোক সমাজের আধিপত্যের ময়দান। আর কাজটা তাঁরা শ্রেণি-সম্মতিতেই করে থাকেন। আরোপণমূলক জবরদস্তির মাধ্যমে নয়।
প্রমিত ভাষা নিজেই একটা সমস্যাগ্রস্ত ধারণা। রুশ তাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন একে বর্ণনা করেছেন একরৈখিক ভাষা (ইউনিটারি ল্যাঙ্গুয়েজ) হিসেবে। একটা নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অসংখ্য ভাষারূপ ব্যবহার করে। ভাষার আঞ্চলিক বিভিন্নতা থাকে, থাকে শ্রেণি-পেশা-বয়স-লিঙ্গভিত্তিক ভিন্নতা। ফলে বৈচিত্র্য ভাষার স্বাভাবিক অবস্থা। জীবিত ভাষার প্রাণশক্তি থাকে ভাষার বৈচিত্র্যে, নিত্য পরিবর্তনশীলতা আর গ্রহিষ্ণুতায়। এই বহুমাত্রিকতা থেকে আলগা করে নিয়ে নির্দিষ্ট বিধির একমাত্রিকতায় যখন প্রমিত বা মানরূপ নির্ধারিত হয়, তখন তা কৃত্রিমভাবেই করা হয়। কেন করা হয়? একেবারেই ব্যবহারিক প্রয়োজনে। প্রমিত ভাষার সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। আদর্শ একভাষী রাষ্ট্রেও মানুষজন এত বিচিত্র ভাষাভঙ্গি ব্যবহার করে যে তা সুষ্ঠু সামষ্টিক যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। অফিসের নথি, আদালতের বয়ান বা পাঠ্যপুস্তকের ভাষারীতি ওই বিচিত্র ভাষাভঙ্গিতে সম্ভব নয়। তাই দরকার হয় প্রমিত বা মান ভাষা।
মান ভাষা তাহলে কোনো পবিত্র ব্যাপার নয়, এমনকি ‘ভালো’ ভাষাও নয়। নিতান্তই ব্যবহারিক বর্গ। কাজের জিনিস। এর সঙ্গে শুদ্ধতার ব্যাপারটা যুক্ত বটে; কিন্তু চিরন্তন অর্থেও নয়, আদর্শ অর্থেও নয়—একেবারেই ব্যবহারিক অর্থে। কোনো কোনো দিক থেকে প্রমিত ভাষা বরং ‘খারাপ’ ভাষা। অন্তত সৃষ্টিশীলতা আর জীবিতের প্রাণস্পন্দন প্রকাশের দিক থেকে।
দুনিয়ার প্রধান ভাষাগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কেন্দ্রের—মূলত রাজধানীর, প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর ভাষাই গৃহীত হয়েছে প্রমিত ভাষা রূপে। ভদ্র জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাই খানিকটা সাফসুতরো করে নিয়ে, খানিকটা পরিমিত বা প্রমিত করে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবহারিক মান ভাষা। বাংলার ক্ষেত্রে ঘটেছে একেবারেই উল্টো ঘটনা। প্রচলিত বাংলা অশুদ্ধ—এই ধারণা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উপনিবেশিত কলকাতায়; হ্যালহেড, কেরি প্রমুখের প্রযোজনায়। কলকাতার উপনিবেশিত ভদ্রলোকসমাজ এই ধারণা পুরোপুরি মেনে নিয়েছিল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত আর কলকাতার নতুন গদ্য-লিখিয়েদের রচনায় এই ধারণা বাস্তবায়িত হয়েছিল। ভাষাটা মুখ থেকে কলমে না গিয়ে কলম থেকে মুখে আসছিল। শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা প্রমথ চৌধুরীর ভাষাবিষয়ক রচনায় আমরা এই উল্টাযাত্রার প্রতিবাদ দেখতে পাই।
দেবেশ রায় ঠিকই বলেছেন, কলকাতার মান বাংলাটা যে শেষ পর্যন্ত ওই অচলায়তনে বসে থাকেনি, অনেকটাই নেমে এসেছে মুখের ভাষার সমতলে, তার প্রধান কারণ সাহিত্যিকদের ভাষা ব্যবহার। কৃত্রিম ভাষায় সাহিত্যের চলে না। নিত্য ব্যবহৃত মুখের ভাষার সঙ্গে তাকে প্রতিনিয়ত আপসরফা করতে হয়। বলে রাখা ভালো, লেখ্য প্রমিত বাংলা ভাষাটা যে মূলত সাহিত্যিকদের তৈরি, এটা বাংলা ভাষার প্রধান দুর্বলতাও বটে। দশ কাজে ব্যবহার করলে ভাষার যে প্রসারতা আসে, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর উচ্চশিক্ষায় ব্যবহৃত হলে ভাষার যে গভীরতা আসে, প্রত্যেকের মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত হলে ভাষার যে আভিজাত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তা থেকে বাংলা ভাষা অনেকটাই বঞ্চিত। ফলে বাংলায় দর্শন-বিজ্ঞান বিশেষ চর্চিত হয়নি। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ আর অভিধান নিয়ে আজও হতাশার শেষ নেই।
তবু কলকাতায় শত বছরের কথায়-লেখায় কাজ-চলতি একটা প্রমিত বাংলা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। উপনিবেশিত মনস্তত্ত্বের দুর্মতিগুলো সেখানে এখনো প্রবল। ভাষার শুদ্ধতার দিকটা এখনো প্রধানত সংস্কৃতের সঙ্গে মিলিয়েই দেখা হয়। অভিধান-ব্যাকরণে প্রাধান্য পায় লেখার বাংলা। এই সবগুলো ‘কুসংস্কার’ই ঢাকা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। তার ওপর ঢাকার প্রমিত বাংলা আরেক ধরনের ব্যভিচারের শিকার হয়েছে—কলকাতায় ‘জমে ওঠা’ ভাষাটিকে আমূল চালানো হয়েছে ঢাকায়। ঢাকা একটি স্বাধীন দেশের রাজধানী। রবীন্দ্রনাথ প্রচারিত মান ভাষার ‘রাজধানীতত্ত্ব’ অনুযায়ী ঢাকার মান ভাষায় প্রাধান্য পাওয়ার কথা বাংলাদেশের উচ্চারণভঙ্গি আর শব্দরীতি। এর মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কলকাতার মান বাংলা কোনো সংজ্ঞাতেই ‘একমাত্র বাংলা ভাষা’ বলে গণ্য হতে পারে না। ইংল্যান্ডীয় আর আইরিশ ইংরেজির ফারাক ইংরেজি ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেনি। লন্ডন আর ওয়াশিংটনের ইংরেজির পার্থক্যের কারণে ইংরেজির জাত যায়নি। পূর্ব বাংলার ভাষা চিরকালই পশ্চিম বাংলা থেকে আলাদা। শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকার ক্রিয়াপদের ভিন্নতা খেয়াল করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সমগ্র ভাষা আলোচনায় বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর আলোচনা ‘কলিকাতা বিভাগে’র মুখের ভাষা অবলম্বনে করা হয়েছে। ঢাকার মান ভাষা বিধিবদ্ধকরণের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারগুলো একেবারেই আমলে আনা হয়নি। যেমন মোটেই বিবেচনা করা হয়নি পূর্ব বাংলার সমৃদ্ধ উপভাষা বৈচিত্র্যকে।
ঢাকার মান বাংলার এই সংকট নিত্য দেখা যায় ব্যাকরণে-অভিধানে। প্রমিত ভাষা যেহেতু ভদ্রসমাজের উচ্চারিত ভাষা, সেহেতু উচ্চারণ অভিধান এই বিবেচনায় নির্ভরযোগ্য কষ্টিপাথর হিসেবে গণ্য হতে পারে। ঢাকার উচ্চারণ অভিধানগুলো আনুশাসনিক, বর্ণনামূলক নয়। অর্থাৎ কীভাবে উচ্চারণ করতে হবে তা শেখানো হয়েছে, কিন্তু ঢাকার ভদ্রলোকসমাজের উচ্চারণ গুরুত্ব পায়নি। প্রাধান্য পেয়েছে উনিশ শতকীয় সংস্কৃতঘেঁষা উচ্চারণ। অনুসৃত হয়েছে কলকাতার উচ্চারণভঙ্গি। ঢাকায় আবৃত্তি বা বাক্শিল্প বা শুদ্ধ উচ্চারণ হিসেবে যে বস্তু প্রতিষ্ঠিত আছে, তা উচ্চারণ অভিধানের বিশ্বস্ত অনুসরণ মাত্র। ব্যবহারিক-মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। পারিবারিক ঐতিহ্য বা ব্যক্তিগত সক্ষমতার দরুন কেউ কেউ ‘বিশুদ্ধ’ উচ্চারণ রপ্ত করতেই পারেন। কিন্তু সব শিক্ষিত সমাজের জন্য ব্যাপারটাকে অবশ্যমান্য করে সমাজে যদি অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি থাকে, তাহলে তার ফল ভালো হতে পারে না। বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত পূর্বাঞ্চলের মানুষের পক্ষে কলকাত্তাই উচ্চারণ রপ্ত করা ভাষাতাত্ত্বিকভাবেই অসম্ভব। প্রমিত উচ্চারণের জবরদস্তি একদিকে বহু মানুষের অকারণ হীনম্মন্যতার কারণ হয়েছে; অন্যদিকে অকারণ সতর্কতা বহু মানুষের বাক্স্ফূর্তি ও প্রাণবন্ততা নষ্ট করছে।
উচ্চারণের মতো শব্দ ব্যবহারেও সংকীর্ণতার মাত্রা প্রবল। মানুষের জবানে বহু ব্যবহৃত ‘সাথে’ শব্দটি আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ভাষায় গৃহীত হয়নি। রবীন্দ্রনাথের জোরালো ওকালতি সত্ত্বেও ‘ইতিমধ্যে’ শব্দটি চালু হয়নি। এ রকম শব্দের সংখ্যা রীতিমতো প্রচুর। চলতি শব্দের প্রতি অকারণ বিদ্বেষ ঢাকার প্রমিত ভাষার এক গোড়ার গলদ। রবীন্দ্রনাথের দেড়শতম জন্মবার্ষিকীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘সার্ধশততম’ শব্দটি। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জেনেছি, বাংলার স্নাতকদের বড় অংশই শব্দটির ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। কিন্তু অতি প্রচলিত ‘দেড়শ’ শব্দটি কোথাও ব্যবহৃত হতে দেখিনি। ‘চালু শব্দ ভালো নয়’—এই কুসংস্কার ঢাকার শিক্ষিত সমাজের খারাপ গদ্য লেখার অন্যতম প্রধান কারণ।
ভাষিক শুদ্ধতার বোধ আর মান বাংলার জনবিচ্ছিন্নতা উপনিবেশিত ভাষাবোধের উত্তরাধিকার। শুদ্ধতার বোধ যদি বাংলা ভাষার অভ্যন্তর রীতি পদ্ধতি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হতো, তাহলে এতটা সমস্যা হতো না। উপনিবেশ আমলের বিশেষ কার্যকারণে বাংলা ভাষার শুদ্ধতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় সংস্কৃত ভাষার বিধি। পবিত্রতার ধারণাটি সম্ভবত সেখান থেকেই এসেছে। সংস্কৃত দুনিয়ার সবচেয়ে বিধিবদ্ধ ভাষা। এ ভাষাবিধির দর্শন যদি বাংলার ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হতো, যেমনটা চেয়েছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, বাংলার জন্য ভালোই হতো। তা না হয়ে আরোপিত হয়েছে সংস্কৃতবিধি। আজ পর্যন্ত বাংলা উচ্চারণ, বানান বা ‘ভালো’ শব্দের ধারণা সংস্কৃত বিধিতেই নির্ণীত হয়। শুদ্ধতার ধারণার আরেকটা দিক হলো ভাষামিশ্রণ। আরবি-ফারসি শব্দ বাংলার জাত নষ্ট করছে—এ আবিষ্কার উপনিবেশক ভাষা পরিকল্পকদের। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন (১৯২৬), কলকাতার হিন্দু ভদ্রলোকদের মুখের ভাষায় এ ধরনের শব্দের সংখ্যা শতকরা আট ভাগ। মুসলমান ভদ্রলোকদের জবানে, তাঁর মতে, সংখ্যাটা স্বভাবতই আরেকটু বেশি। দুনিয়ার তাবৎ ভাষাবিজ্ঞান এ ধরনের চালু শব্দকে ভাষার আবশ্যিক অঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করে। উপনিবেশিত ভাষাদর্শনে বাংলার ক্ষেত্রে ভিন্ন রীতি গৃহীত হয়েছিল। তার অনুসরণে বাংলাদেশেও আরবি-ফারসিজাত চালু শব্দকে প্রমিতের পঙ্িক্ততে বসানোর অনীহা প্রবল। কথাটা ইংরেজির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলায় চালু বিকল্প থাকলে ইংরেজি বা বিদেশি শব্দের ব্যবহার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যেসব বিদেশি নামশব্দ লোকমুখে নিত্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর জন্য সংস্কৃত বিকল্প তৈরি করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। যদি খুঁজতেই হয়, তাহলে খোঁজা উচিত চালু ভাষায়। দেবেশ রায় উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, চালু বাংলায় সুন্দর শব্দ থাকা সত্ত্বেও বহু ইংরেজি শব্দের প্রতিশব্দ বানানো হয়েছে সংস্কৃত থেকে। অথচ অচলিত সংস্কৃত আমদানির চেয়ে লোকমুখে চালু ইংরেজি শব্দ ব্যবহারই সুবিধাজনক। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার চর্চায় এটাই প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ।
ঢাকায় প্রমিত বা মান ভাষাকে দেখা হয় নিত্যদিনের ভাষা থেকে দূরবর্তী এক বর্গ হিসেবে। দেখা হয় স্থায়ী ভাষা হিসেবে। অনেকেই দেখিয়েছেন, এ ব্যাপারে ঢাকার রক্ষণশীলতা কলকাতার তুলনায় ঢের বেশি। মুশকিল হলো, যেমনটা বাখতিন বলেছেন, প্রমিত ভাষা ব্যবহৃত হয় চারপাশের ভাষাবৈচিত্র্যের মধ্যেই। একদিকে সে নিজেও পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে চারপাশের ভাষাবৈচিত্র্যও তাকে প্রভাবিত করে। প্রমিত ভাষাকে তাই হতে হয় সুস্থিত, কিন্তু নমনীয়। বিধিবদ্ধ, কিন্তু গ্রহিষ্ণু। ব্যবহারকারীদের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে যথাসম্ভব হালনাগাদ করতে হয়। তা না হলে তার হেজিমনি ক্ষুণ্ন²হয়। বাংলাদেশে তা-ই হয়েছে। ঢাকায় মান বাংলার ব্যবহারজনিত বিশৃঙ্খলার দায় ব্যবহারকারীদের যতটা, খোদ মান ভাষার ধারণার দায় তার চেয়ে মোটেই কম নয়। শুধু ভাষাপ্রেমের দোহাই বা নিয়ন্ত্রণের হুমকি এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন
অমর একুশে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন