default-image

বসন্তের সময় এলে আমি কেমন গল্পহীন হয়ে পড়ি, ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায়। মাথায় কোনো গল্প আসে না তখন। শহরের পথে পথে হেঁটে বেড়াই। রাস্তার মানুষগুলো কেমন একঘেয়ে আর পড়ে ফেলা মনে হতে থাকে, কোনো রহস্য খেলা করে না তাদের মধ্যে। তরুণীদের মুখে ঢলে ঢলে পড়ে রং! তাদের পোশাকে এসে বসে প্রজাপতি, সব কেমন পুরোনো কিচ্ছার মতো। ওই সব রেণু মাখানো কাজ-কারবার অলস ভঙ্গিতে দেখা ছাড়া কীই-বা করার থাকে। তেমনি একদিন চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে এসব ছড়ানো-ছিটানো খলখল হাসির মধ্যে বোকার মতো হাসতে থাকা লোকটিকে বরং নতুন মনে হলো। মুখভর্তি হাসি, অথচ কত অনুজ্জ্বল সেই মুখ! চৌহাট্টায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি আফতাব আলী, তাকে আমার কাছে নিজের মতোই বেহুদা পথচারী বলে মনে হলো। আমি তার কাঁধ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকলে লোকটি প্রমাণ করে যে সে আমার মতো গল্পহীন না।
আমি তখন আফতাব আলীর গল্পে ডুবে যাই। ভাবি, এমন গল্প নিয়ে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর ধরে শহীদ মিনার পাহারা দিচ্ছে লোকটি! কিন্তু সে যখন সময়কালের হিসাব বলে, সব সময় দুই বছর জোড়া লাগিয়ে দেয়। খালি সংগ্রামের সময় বাদে। সে জানায় পঁচিশ বছর আগে গোলাপগঞ্জের ভাদেশ্বর থেকে সিলেট শহরে যখন আসে, তখন এই শহীদ মিনারটি ছিল না। এমন তথ্য দিয়ে সে হনহন করে হাঁটা শুরু করে দিল! আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে ঝুলছে হাসি; আর তা বেশ রহস্যময়। তার হাঁটার মাঝখানে যতটা দ্রুততার ভঙ্গি তৈরি হলো, ততটা দ্রুত সে দূরত্ব তৈরি করতে পারেনি। কারণ, হাঁটার সময় তার বাঁ কাঁধ খানিকটা ঝুঁকে পড়ছিল, আর সেই সূত্র ধরে দেখা যায় যে আফতাব আলীর ডান পা থেকে বাঁ পায়ের উচ্চতা খানিকটা কম। সে শহীদ মিনারের সামনের রাস্তার আইল্যান্ডে গিয়ে বসে পড়ে, আমিও তার পাশে চলে যাই। সে যেন জানতই আমি তার পাশে গিয়ে বসব। তাই কথা বলে যেতে থাকে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
—মাইনষা এমনেতে ফুল দিত মদনমোহন কলেজো, আর ওই যে হাওয়া পাড়াত, সেইখানি ত্রিমুখীত ছোট্ট একটা শহীদ মিনার আছিল, গিয়া সকলই ফুল দিয়া আয়ত। আমি তহন রিকশা চালাইতাম।
আবার কিছুটা থেমে যায়, আমাকে গল্পগুলো গিলে নেওয়ার অবকাশ দিতেই যেন এই যতিচিহ্ন। আমি আবার তার দিকেই তাকাই, তার বসার ভঙ্গিমায় পরনের লুঙ্গি খানিকটা উঁচু হয়ে পা বেরিয়ে থাকলে, আমি তার শুকনো বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের ঝুলে থাকা কালো থোক মাংসের ঝুলি দেখি। বাঁ কাঁধের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে চলা আফতাব আলীর রিকশায় প্যাডেল মারার কসরত আমি দেখিনি।
সে জানায়, এমনকি রিকশায় সওয়ার হয়ে চেপে বসে থাকা কেউ কখনো দেখার চেষ্টা করেনি। খালি খানিকটা ধীরে ধীরে চালানোর দায়ে দ্বিতীয়বার তাকে কেউ ভাড়া করতে চাইত না। লুঙ্গি পরে রিকশা চালাতে চালাতে অনেক সময় তার হাঁটুর নিচের ফোলা মাংসের ওপর ঢিবি হয়ে থাকা বিষফোড়ার মতো গুলির দাগটা বেরিয়ে পড়ত, শীর্ণ পায়ের ওপর বোঝার মতো। কারও তা দেখার দরকার ছিল না। তারা কেবল রিকশার পাটাতনটা ভালো করে দেখে পা ফেলত, যাতে হোঁচট খেতে না হয়। কিন্তু তাকে দেখে নাকি আঁতকে উঠেছিল ইকামত চৌধুরী। করেরপাড়ে রিকশা সাইড করে দাঁড়িয়েছে মাত্র। কোথা থেকে চৌধুরী এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, ইতা তুমি কী করতা বাই? তুমি রিকশা চালাইতানি?
সহযোদ্ধা ইকামত চৌধুরীকে দেখে আবেগাপ্লুত সে, নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিল, আর কিতা করতাম বাই, কিতা কইরা ভাত খাইতাম!
তার পর থেকে সে চৌধুরী সাহেবের সঙ্গেই ছিল। তারা সারা শহর ঘুরে বেড়াত। আমি তখন জিন্দাবাজার থেকে ফিরতি রিকশাচালক আর সওয়ারির দিকে তাকিয়ে কী যেন খুঁজতে থাকি, সে কি ইকামত চৌধুরীকে? এসব বলতে বলতে আফতাব আলী যেন আমার উপস্থিতিও ভুলে যায়। সে বলেই চলে নিজের মতো। আমি গোগ্রাসে গিলতে থাকি সে কথা।

২.
সে জানায়, চৌধুরী সাবের মোতোন মানুষ হয় না। সে ট্যাকাপয়সার দিকে চাইছে না কুনুদিন; খালি আফসোস করছে, এই সিলেট শহরে একখান বড় শহীদ মিনার নাই। তহন এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আছিল না। চৌধুরী সাব আস্তা দিনত আমার লইয়া ঘুইরা বেড়ায়ছে, আর খালি তালাশ করছে।
এই অবস্থায় আমি আফতাব আলীকে যেন নিজের উপস্থিতি জানান দিতেই বলে উঠি, কী তালাশ করছে?
—কি-বা আর, একখণ্ড জমিন। তারপর আফতাব আলী পেছনের দিকে তাকিয়ে বলে, এই জাগাত তহন জলা-জংলাত আর প্যাক-কাদার ডোবা আছিল। চৌধুরী সাব একদিন ওই যে ওইখানতাত, সে সামনের কলেজের গেট দেখিয়ে বলে, উগোত তহন আছিল না, ওইখানত খাড়াইয়া কইছে, এইখানেই হইব শহীদ মিনার। জায়গা দখল করন লাগবি। এই শুরু হইয়া গেল দেন-দরবার।
সে জানায়, তখন এরশাদের আমল। তারা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা জড়ো হচ্ছিল। তার এই মুক্তিযোদ্ধাদের একত্র হওয়ার বিষয়টি বলার মধ্যে বন্ধনের এক শক্তির উচ্ছ্বাস ফুটে থাকে। দারুণ ভরসার সে সম্মিলন। সে বলে, শীতের রাত, টিলা থেকে ট্রাকভর্তি মাটি আনা হলো। তখন বাধা এল। শোনা গেল, পুলিশ ফোর্স আসতেছে, চৌধুরী সাব তার একনলা আর দুইনলা দুইখান বন্দুক লোড কইরা আনল। তারপর ডিসি সাহেবকে ফোন দিল—ডিসি সাব, তোর পুলিশ পাঠাইছস না, আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কইলাম রেডি আছি, যুদ্ধ হইয়া যাইব কইলাম।
কথাগুলো বলার সময় আফতাব আলীর চোখে-মুখে জেগে ওঠে পাহাড়! সে বলে, তখন ছিয়াশি কি সাতাশি সাল হইব। কালের দিন শুরু হইয়া গেছে, সামনি ১৬ ডিসেম্বর। রাইতে ট্রাকের মাটি ফালাইয়া আমরা চার পাউন্ডের হেমার দিয়া গুতাইয়া গুতাইয়া জায়গা রেডি করছি।
আমি আবার চকিতে তার বাঁ পায়ের দিকে তাকাই, সরু আর গুলির আঘাতে ঢিবি নিয়ে রয়েছে যে পা।
আফতাব আলী বলে, ইট-সিমেন্টের ব্যবস্থাও পরে হইব, অহন টাইম নাইকা।
তহন কত্ত তাড়াতাড়ি মিনারটা বানাইমু, তা নিয়া ব্যস্ত আছিলাম। শ্যাষে নাট্যদলের লোকেরা মিইলা পিচবোর্ড দিয়া শহীদ মিনার বানানো হইল, মানুষ আইসা ভিড় কইরা ফুল দিছে। এরপর সে চৌরাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রঙিন ফুল পরা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, মানুষের সে কী ঢল। হেরপর না চান্দা তুইলা এমুন পাকা হইল।
আমি আবাক হয়ে ভাবলাম, আমি কি না ভাবছি, ওই সব রঙিন প্রজাপতির ভিড় দেখে আফতাব আলী বোকার মতো হাসছে! তার প্রাণের হাসিটাকে ছুঁয়ে দেখার জন্য আরও একবার মুখের পানে চাই, দেখি অবিকল বিজয়ীর হাসি। সে বলে, এই একুশের দিনটা তার বুকটা ভইরা যায়, কত্ত মানুষ এইহানে আসে। এরপর আফতাব আলীর কণ্ঠের মধ্যে একটা গর্বের স্বর ফুটে ওঠে। বলে, সেই থিকা আমি এইহানের পাহারাদার, যত্তদিন জীবন আছে পাহারা দিয়া যামু।
সেদিন সেই স্মৃতির মিনাররক্ষীর তৃপ্তিময় হাসিটুকু নিয়ে ফিরে আসি।

৩.
কদিন বাদেই সন্ধ্যায় আবার আমি ছুটে যাই শ্রী-হট্টের চৌহাট্টায়। শহরময়, এমনকি দেশময় মানুষ তখন জানতে পেরেছে, কে বা কারা যেন ভেঙে দিয়েছে চৌহাট্টার মিনার। ছুটে যায় অনেকেই, আমিও। তবে শহীদ মিনারের খোঁজে নয়, আমি খুঁজতে থাকি আফতাব আলীকে।
তাঁর চোখের ভাষা পড়তে পারেনি কেউ। যদিও তাঁর চোখ তখন লাল হয়ে উঠেছিল, আর তা পলাশের চেতনাযুক্ত কি না, বোঝা যায়নি। সে ভাষা বুঝি না আমরা। কবির ভাষায়, আমারই চেতনার রং-জাতীয় কথাটথা যে লেখা থাকে, তা কি সবাই ঠিকমতো বোঝে নাকি? কিন্তু বসন্ত তছনছ করা এই দিনে আফতাব আলীর চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরতে থাকলে তাকে ছেড়ে যেতে পারি না আমরা। বোবা কান্নার সামনে বসে থাকি চুপচাপ। কতক্ষণ আর এভাবে বসে থাকা যায়। একজন না একজন কথা বলেই ওঠে, যে বলে সে আজকের কথা বলে না, বলে গত কয়েক দিনের কথা। কয়েক দিন ভরে কত মানুষ সামনের এই রাস্তায় বসে ছিল। ফুল দিয়ে রাস্তায় কত কী এঁকেছে, মোম জ্বালিয়েছে আর রক্ত গরম করা গানে এলাকাটার চেহারাটাই পাল্টে দিয়েছিল। তখন সে পথে যেতে মানুষ পায়ের জুতাজোড়া হাতে তুলে নিয়েছিল ভালোবেসে।
তখন তো কারও না কারও মনেই পড়ে, আরও কথা। কেউ একজন বলে, ক্যা কাইল আস্তা দিন ভইরা মানুষে কত্ত ফুল দিছে না।
মানুষ তখন নানা রকম ভালোবাসার গল্পে গল্পে ধ্বংসকে ঢেকে দিতে থাকে। আমার মনে পড়ে, আফতাব আলীও এর আগের দিন বলেছিল, এই শহীদ মিনারের মূল থিইকা আমরা আছি, আমরার কোনো নাম নাই, আমরার গরিব, বকলম, আমরার নাম থাকত না।
কিন্তু সেই আফতাব আলী জীবনভর এই মিনারের পাহারায় থাকবে বলে ঠিক করেছে! আমার মনে হয় মানুষ শহীদ মিনারে শোক নয়, ভালোবাসার কথা বলতেই পছন্দ করে। আর সে কথাই মানুষের চেতনা, যাকে আমরা সব সময় চিনতে পারিনি। কিংবা কী জানি, আফতাব আলীর গল্পগুলো শুনে গল্পহীন আমার মন ক্রমশ বসন্তাক্রান্ত হয়। যেন এত দিন চেনা বলে জেনে আসা অনেক রং ভাঁজ খুলে দেখা হয়নি।

৪.
রাতে সবাই চলে গেলে একা হয়ে যাওয়া আফতাব আলীর পাশে বসে থাকি আমি। এখন সেদিনের সেই বিকেল নেই, অন্ধকার করে রাত নেমেছে। প্রায় ছাব্বিশটা বছর ধরে সে আগলে রেখেছিল এই মিনার। তার ভগ্নস্তূপ আর দলিত ফুলের দিকে তাকিয়ে সে আনমনে বলে ওঠে, আমারে কেউ যুদ্ধে আনছে না, আমি যুদ্ধের মধ্যে ঢুইকা পড়ছিলাম। আমি আফতাব আলী, বাড়ি গোলাপগঞ্জের ভাদেশ্বর। বাইশ বছর বয়সের সময় আমি এই সিলেটত কামের খোঁজে আইছিলাম।
সে যেন নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলে। ফিরে যায় তার বাইশ বছর বয়সে। আলী বলতে থাকে, রাতের আঁধার কেটে কেটে স্মৃতির আগল ভেঙে সেই কথাগুলো চৌরাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।
সেদিন আছিল বিষুদবার। রাত তখন কত হবে?

রাত প্রায় চারটা বাজে। আমজাদ আলীর ঘড়িঘরের সামনের লোহার ব্রিজ, ওই কিন ব্রিজের লেবার সে। অন্য মিস্ত্রিদের সঙ্গে আফতাব ব্রিজের লোহার পাত বদলাতে ব্যস্ত। সে জানায়, আতকা পাঞ্জাবি পুলিশের হাঁকডাক শুরু, সার্কিট হাউস থেকে মুখের সামনে চোঙা মাইক ধরে তারা বলতাছিল, তোমরা সব ভ্যাগ যাও...নইলে গুল্লি হোগিয়া...।
তারা সবাই দৌড়ে সুরমা মার্কেটের দালানে এসে জড়ো হয়। তখনো দোতলার কাজ শেষ হয়নি, তারা বিশ-পঁচিশজন লেবার দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যায়। তখন ক্ষণিকের জন্য শুনতে পায় ঢাকাগামী উল্কা ট্রেনের হুইসেল। আর মুহূর্তে সেই শব্দকে ঢেকে দেয় গুলির আওয়াজ, দ্রুমদারাম।
আমি তখন আফতাবের সঙ্গে একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ভোররাতে ফিরে যাই, লোহার ব্রিজের ধারে, বন্দরে সুরমা টাওয়ারে নির্মাণাধীন ভবনে। চারপাশে গুলির শব্দ, মাইকে ভেসে আসে ঘোষণা—কারফিউ...কারফিউ...।
প্রতিদিন লোহার ব্রিজের লোহার পাত বদলাতে বদলাতে আফতাব আলী দেখতে পেত সুরমার নিচ থেকে সূর্য জেগে উঠছে, আলী আমজাদের ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ শুনে তারা ঢুকে যেত খুপরি দোকানে, চা দিয়ে পাউরুটি ডুবিয়ে খেতে। আজ কাজ ফেলে নির্মাণাধীন ভবনের সিঁড়িঘরে অন্য সব শ্রমিকের মতো চোখে-মুখে আতঙ্ক নিয়ে বসে। কেবল শুনতে পায় নয়া সড়ক, আখালিয়, খাদিম নানা দিকের গুলির আওয়াজ। আফতাবের মনে হতে থাকে, সুরমাতে কি আজ সূর্য ওঠেনি? উল্কা এক্সপ্রেস কি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যেতে পেরেছে? কিছুই জানে না সে, কেবল মানুষের আর্তচিৎকারের প্রতিধ্বনি আর ঠুসঠাস গুলির আওয়াজ। তাদের জড়ো করে রেখে দেয় সিঁড়িঘরে।
দুপুর ১২টার দিকে এক ঘণ্টার কারফিউ তুলে নেওয়ার ঘোষণা হলে সে সহকর্মীদের সঙ্গে পথে বেরিয়ে পড়ে। ওই পাড়ে সাফিনা হোটেল পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে কদমতলী পর্যন্ত। সে জানায়, ট্রেনস্টেশন থিকা সোজা রাস্তা তখনো হয় নাই, দুই দিকের দুইটা রাস্তা। গাঙের পাড়, গভীর গাতা আর প্যাক-কাদার পথঘাট আছিল।
তাদের পথ ভাগ হয়ে যায়। কতক্ষণ আরও হেঁটেছিল সে? হঠাত পেছন থেকে কে যেন বলে ওঠে, ওই পোয়া, ওদিক যাইস না, এদিক আয়।
চমকে ওঠে, এ কী, সবাই অস্ত্র নিয়ে আড়ালে প্রস্তুত। পুলিশের বাঙালি সব হাবিলদারের একটা ছোট্ট দল, এক হাতে অস্ত্রধরা হাবিলদার ধমকে ওঠে, হালারপুত শুইয়া পড়, গুল্লি লাগব।
আফতাব শুয়ে পড়তেই তার ওপর দিয়ে একটা গুলি ছুটে যায়। যুদ্ধ কী, জানার আগেই সে তখন যুদ্ধের ময়দানে।
হাবিলদার বতু মিয়ার এক হাত নেই, একমাত্র সচল ডান হাতে সে প্রতিপক্ষের গুলির জবাব দিতে থাকে। আফতাব আলী দ্যাখে, সদ্যমৃত সহকর্মীর লাশ আড়াআড়ি শুইয়ে দিয়ে তার ওপর অস্ত্র রেখে জওয়ানরা গুল্লি করে চলেছে, সে দৃশ্য আলীর বুকে কোনো কম্পন তুলেছিল কি না, তা আজ আর তার মনে নেই। বতু মিয়া পেছনের পা দিয়ে আফতাবের পাছায় লথি মেরে বলে, হারামজাদা গুল্লি ভর...গুল্লি কর।
আফতাব বোকার মতো তাকিয়ে বলে, আমি তো গুল্লি ভরবার পারি না, ছুড়বার জানি না।
বতু মিয়া যেন একলব্যের বংশধর, সে এক হাতে আলীকে দেখিয়ে দেয় লোড করা আর ট্রিগার টেপা। আফতাব শুধু শিখে নিয়েছিল বুকের হাড়ে নয়, মাংসের সঙ্গে বাঁট ঠেকিয়ে ট্রিগার টানতে হয়। আর তাতেই গর্জে ওঠে তার রাইফেল। বলতে বলতেই সে ফিরে আসে আজকের এই রাতে, বসন্ত তছনছ করা সময়ে, অন্ধকারের মধ্যে সে আমাকে একঝলক দেখে নেয়, তারপর নিজের খোঁড়া পায়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে থাকে। তার সেই দৃষ্টি দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে, আফতাব আলীর অমসৃণ, চিরায়ত মুখের ভেতর খোদাই করা চোখ দুটো যেন বুনো নেকড়ের! সেখান থেকে আগুন ঠিকরে বের হয়।
সে বিয়াল্লিশ বছর আগের ওস্তাদ বতু মিয়ার নামে শপথ নিয়ে বলে, আমারে কেউ যুদ্ধে নিয়ে যায় নাইকা, আমি নিজেই যুদ্ধের মধ্যে ঢুইকা গেছি। অস্ত্র চালানো এক্ষণও ভুইলা যাইনাইকা।
অন্ধকারের মধ্যেও আমি তাকিয়ে দেখতে পাই আফতাব লোকটা বোকা না, লোকটা পাহাড়ের মতো শক্ত।

বিজ্ঞাপন
অমর একুশে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন