default-image

শিল্প-বিপ্লবের পর ইউরোপে যে নতুন সমাজ ও সংস্কৃতি গঠিত হলো, তা আগেকার গ্রামীণ সমাজের সংস্কৃতি থেকে বহুলাংশে আলাদা। নবসৃষ্ট শহুরে মধ্যবিত্ত এবং নাগরিক শিল্প-শ্রমিকের সংস্কৃতিতেও এল আঙ্গিক ও বিষয়গত নানা পরিবর্তন। এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একটা সুস্পষ্ট রূপ নিতে শুরু করে এবং এই সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে মূলধারার সংস্কৃতি। সাধারণ শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্ত নতুন এই সংস্কৃতিকে নিজেদের আত্মস্থ করতে প্রয়াসী হন। কিন্তু তাঁদের মনে একটা প্রশ্ন তীক্ষ্ণমুখ হয়ে ওঠে। প্রশ্নটি হলো, আগে তাঁদের যে সংস্কৃতি ছিল, তার সঙ্গে বিচ্ছেদ ও সম্পর্কহীনতার ফলে তাঁরা কি শিকড়বিচ্যুত হয়ে গেলেন না? তা ছাড়া প্রাচীন সংস্কৃতির প্রতি একধরনের মমত্ববোধ এবং প্রাক্তনের স্মৃতিও তাঁদের মনকে কিছু পরিমাণে পীড়িত করল। এই বোধ থেকেই শিল্প-বিপ্লব–পূর্ববর্তী গ্রামীণ সংস্কৃতির অনুসন্ধান এবং তা নিয়ে কাজ করার জন্য ঐতিহ্যপ্রেমী কিছু শিক্ষিত মানুষ এগিয়ে এলেন। এর ফলেই যে নতুন সামাজিক বিদ্যাটির উদ্ভব ঘটল, তারই নাম ফোকলোর। অর্থাৎ সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটি সংস্কৃতির যে অংশ টিকে যায়, তার সঙ্গে নবসৃষ্ট সমাজের সৃজ্যমান সংস্কৃতির ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণই ফোকালোরবিদ্যা বা ফোকলোর বিজ্ঞানের অন্বিষ্ট।
শিল্প-বিপ্লব-পূর্ব কৃষিসমাজের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি ছিল। এই সংস্কৃতিকে বলা হতো লোকসংস্কৃতি। এই সমাজ ছিল সংহত সমাজ। এই সমাজের মানুষের বিশ্ববোধ, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস ও নানা করণক্রিয়া, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ধরন, উৎসব—সবকিছু মিলিয়েই ছিল একটি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিকেই তখন বলা হতো লোকসংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে জীবন এবং শিল্প ছিল একাত্ম। এই সময়ের শিল্পে নান্দনিক বোধের সঙ্গে উপযোগিতা এবং সামাজিক পরিবেশজাত নানা উপাদান-উপকরণ মিলে যাপিত জীবনের একটি কাঠামো নির্মিত হয়েছিল। শিল্প-বিপ্লবের পর এই কাঠামোতে ভাঙন ধরতে থাকে। গ্রামীণ জীবনেও আসে পরিবর্তন এবং নগরজীবনে তো নতুন শিল্পসমাজের এক নবীন সংস্কৃতিরই আবির্ভাব ঘটতে শুরু করে। এই যে গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং নতুন একটি সংস্কৃতির উদ্ভব—এই দুইয়ের সম্পর্কসূত্র নির্মাণ এবং এদের মধ্যে বিরোধ ও সমন্বয়ের বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়নই ফোকলোরবিদের কাজ। অতএব যেকোনো চিন্তাশীল মানুষই বুঝতে পারবেন বিষয়টি জটিল, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিজ্ঞানসম্মত অনুসন্ধানজাত এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে পরিশ্রমসাধ্য ও অকুস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা। তাই এই বিষয়টিকে তুচ্ছ ভাবার বা প্রান্তিকবিদ্যা হিসেবে আখ্যাত করার কোনো সুযোগ নেই। একটি গুরুতর সামাজিকবিদ্যা হিসেবেই এটি পাশ্চাত্যবিশ্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আমাদের এশীয় অঞ্চলেও ধীরে ধীরে এই বিদ্যা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন এবং উচ্চতর প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ লাভের সূচনা হচ্ছে। এর প্রয়োজন ছিল দেশের সামগ্রিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যিক বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য ফোকলোরের জ্ঞান বিশেষ জরুরি। এই বিষয়টি উপলব্ধি করেই উন্নত বিশ্ব বিশেষ করে জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক—এসব দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোরের উচ্চতর কোর্স চালু করা হয়েছে।
উন্নত বিশ্বের ফোকলোরচর্চায় এখন আগের মতো গ্রামীণ কৃষিসমাজের বিষয়-আশয়ই শুধু অধ্যয়ন করা হয় না, নাগরিক সমাজে বিকাশমান চিত্রেরও অনুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত ফোকলোরচর্চায় গ্রামীণ ঐতিহ্য এবং তার নানা বিষয় নিয়ে রোমান্টিক আলোচনা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণই প্রাধান্য পেয়েছিল। ঐতিহ্যের অহংকার এবং গ্রামজীবনের কল্পিত সৌন্দর্যকেও বড় করে দেখানোর চেষ্টা সেখানে ছিল। এখন পদ্ধতিগত পরিবর্ধন ঘটে গেছে। এখন বাস্তব দৃষ্টিতে সূক্ষ্মভাবে নতুন সামাজিক পরিবর্তনের অনুষঙ্গে যে নতুন কৌতুক, দেয়াললিখন, দেয়াল চিত্রণকলা, ফেসবুকের কোনো কোনো বিষয় এবং অন্তর্জালের নানা কথনও নতুন ফোকলোরের বিষয় হয়েছে। জার্মানির বিখ্যাত তাত্ত্বিক হারমান বউজিঙ্গার এ বিষয়ে খুবই উল্লেখযোগ্য একটি গ্রন্থ লিখেছেন। গ্রন্থটির নাম কালচার ইন এ ওয়ার্ল্ড অব টেকনোলজি। আমাদের সাধারণ লোক এমনকি শিক্ষিত লোকদেরও ধারণা, ফোকলোর নিতান্তই একটি গালগল্পের এবং কুসংস্কার ও অতিকথনের বিষয়। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এ ধরনের ধারণা একেবারেই অবাস্তব। সমাজ, সমাজ পরিবর্তন এবং নতুন বিশ্ববীক্ষা সম্পর্কে ধারণার অভাবেই তাঁদের এ ধরনের মতামত প্রকাশ করতে দেখা যায়।
এটা ঠিক যে, কুসংস্কারও ফোকলোরচর্চার একটি বিষয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই বটে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কোনো আধুনিক ফোকলোরবিদ কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন। বরং প্রকৃত ঘটনা হলো, একটি সমাজে কেন একটি বিশেষ ধরনের কুসংস্কার চালু হয়েছে, তার বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখানোই ফোকলোরবিদ্যাব্রতীর আসল কাজ। এখানেই তার সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং সমাজ মানসের গভীরতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আবশ্যিক। যিনি এ ধরনের বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত ফোকলোরবিদ। গ্রামীণ খেলাধুলা বলুন বা লোকশিল্প বলুন বা লোকগল্প বা লোকপুরাণই বলুন—সবকিছুই ফোকলোরের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো আমাদের ইতিহাসের অংশ, ঐতিহ্যেরও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এর গভীরতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ঐতিহাসিকেরা করেন না, নৃতাত্ত্বিকেরা করেন এবং ফোকলোরবিদেরাও করেন। এ জন্যই বহির্বিশ্বে ফোকলোরকে এত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়।
আমাদের অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিও মনে করেন, প্রযুক্তির এই জগতে ফোকলোরের কোনো গুরুত্ব নেই। কিন্তু এই বক্তব্য মোটেই যথার্থ নয়। বরং ফোকলোর আগে যেমন গ্রামীণ সমাজের মধ্যেই প্রধানত সীমাবদ্ধ ছিল, এখন আর তা নেই। বিশ্বব্যাপী এর নব–উত্থান ঘটেছে এবং সেই উত্থানে প্রযুক্তির ভূমিকাও সামান্য নয়। তাহলে কথা এই দাঁড়ায়, প্রযুক্তিগত বিশ্বে ফোকলোর তুচ্ছ নয়, প্রান্তিক নয়, সামান্য নয় বরং বিশেষভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সমাজকে বুঝতে হলে, নগরায়ণের চারিত্র্যগুলো উপলব্ধি করতে হলে এবং একালের মানুষের মনোভাব জানতে হলে ফোকলোরের জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্যই জার্মানির তুবেনগিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক ও প্রগাঢ় ফোকলোর পণ্ডিত হারমান বউজিঙ্গার তাঁর উপর্যুক্ত বইয়ে ফোকলোরের নতুন যে তথ্যটি দিয়েছেন, তাতে নানা উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, ফোকলোর নিঃশেষিত হয়নি, লুপ্ত তো হওয়ার প্রশ্নই নেই বরং প্রযুক্তির যুগে এর বহুল বিস্তার ঘটেছে। নাগরিক ফোকলোর প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, নগরের ঘিঞ্চিগলি, ঠাসাঠাসি করা মানুষ, দূষিত জলবায়ু, নানা গোষ্ঠীর মানুষ, তাদের বিচিত্র ভাষা এবং নিজ অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা নানা লোকগল্প, কাহিনি, ধাঁধা, প্রবাদ, গান শহর অঞ্চলেই ফোকলোরের নতুন আবাসনস্থল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আগে যেমন গ্রামে ছিল খোলা মাঠ, পরিষ্কার আকাশ, ঐতিহ্যগত কৃষি খামার, তার বিপরীতে নতুন সামাজিক এই ব্যবস্থাই আধুনিক ফোকলোরচর্চার উপাদান। সেই সঙ্গে অন্তর্জাল, কম্পিউটার, অনলাইনে নানা বিষয়, কমিকস পত্রিকা, নানা রকম কৌতুক প্রভৃতি ফোকলোরের নতুন উপাদান হিসেবে উদ্ভূত হয়েছে। এখনকার ফোকলোরবিদেরা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এসব উপাদানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছেন। সেই সঙ্গে গ্রামীণ এবং নাগরিক ফোকলোরের বিষয়গত বৈশিষ্ট্য এবং চারিত্র্য-লক্ষণ নিয়েও আলোচনা করবেন। এভাবেই আমাদের এখনকার সমাজের গভীরতল পর্যন্ত ফোকলোরচর্চার মধ্য দিয়ে জানা সম্ভব হবে। অতএব ফোকলোরচর্চা শুধু আধুনিকই নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক একটি মানবিকচর্চার বিষয়ও বটে।
আমাদের দেশের নাগরিক ফোকলোরের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যায়। আগে গ্রামীণ মেলা হতো, এখনো হয়। কিন্তু আগের গ্রামের মেলার সঙ্গে এখনকার গ্রামীণ মেলার অনেক পার্থক্য ঘটে গেছে। সেই বিষয়টি বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। একজন ফোকলোরবিদ সেই কাজ করবেন। অন্যদিকে, পয়লা বৈশাখে আগে গ্রামে যে ধরনের মেলা হতো, এখন নগরের বৈশাখী মেলা তার চেয়ে আঙ্গিকে, বৈশিষ্ট্যে এবং বিষয়ে বিপুল পরিবর্তনকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। এখন রমনার বটমূলে যে বৈশাখী মেলা হয়, তা শুধু বাঙালির ঐতিহ্যের নবনির্মাণই শুধু নয়, বরং বাঙালি জাতির আত্মপ্রকাশের এক নতুন ধারা। এই মেলার আনন্দ মিছিল শুধু এক বিশাল উৎসবই নয়, এর মুখোশ, তৈরি করা হাতিঘোড়ার অবয়বের ব্যবহার, সামাজিক পরিস্থিতিরও বিশ্লেষণ বটে। এতে কৌতুক আছে, সমাজ-সমালোচনা আছে এবং রাজনীতির তির্যক ব্যাখ্যাও আছে। চারুকলা অনুষদের দেয়ালে ছাত্রছাত্রীদের যে দেয়ালচিত্রণ দেখা যায়, তা শুধু একটি নান্দনিক উপস্থাপনা নয়, সমাজকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার এক নতুন মাধ্যমও বটে। শহীদ মিনার, প্রভাতফেরি, সংশ্লিষ্ট আল্পনা এবং দেয়াললিখনও ফোকলোরের নবনির্মাণেরই অংশ। এর প্রকৃত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করাই আধুনিক ফোকলোরের কাজ।

বিজ্ঞাপন
অমর একুশে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন