default-image

শব্দের অর্থ না জানলে, তখন খোঁজ পড়ে অভিধানের। নয়তো ঢাউস অভিধানগুলোর জায়গা হলো বইয়ের তাকে। অভিধান? বোরিং, আনইন্টারেস্টিং! কিন্তু অভিধানে কি কেবল শব্দের অর্থ থাকে? অবশ্যই থাকে। শব্দটা কোথা থেকে এসেছে, শব্দটা কী ধরনের—নাম, না ক্রিয়াপদ, নাকি বিশেষণ—এসবও জানা যায় অভিধান থেকে। শব্দটার কত রকমের অর্থ হতে পারে, এক নম্বর দুই নম্বর তিন নম্বর দিয়ে তার তালিকাও দেখতে পাবেন অভিধান খুললে। কীভাবে শব্দটাকে বাক্যের মধ্যে ব্যবহার করতে হয়, তারও দৃষ্টান্ত থাকে। কোনো কোনো অভিধান থেকে শব্দের উচ্চারণও জানা যায়।
এত রকমের অভিধান থাকা সত্ত্বেও বাংলা একাডেমি সম্প্রতি আর একটি অভিধান প্রকাশ করেছে, যার নাম বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান। যে-সে অভিধান নয়: এতে আছে তিন হাজারের বেশি পৃষ্ঠা, আর তিন খণ্ডে এর ওজন হলো নয় কিলোগ্রাম। কিন্তু এই পেল্লায় অভিধান রচনার দরকার হলো কেন? তবে তার আগে বলে নিই, একে বিবর্তনমূলক অভিধান বলা হচ্ছে কেন? তার পরে বলা যাবে, কী করে এই অভিধান রচনা করা হলো।
‘বিবর্তন’ শব্দটার মানে হলো পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘ক্রমবিকাশ’। যুগে যুগে শব্দের অর্থ বদলে যায়। যেমন, এক কালে ‘সন্দেশ’ কথাটার মানে ছিল: খবর। কিন্তু এখন এ শব্দটার প্রধান অর্থ হলো ছানা আর চিনি বা গুড় দিয়ে তৈরি একরকমের মিষ্টি। যেমন ‘রাগ’। এর দুটো অর্থ—একটা অর্থ অন্যটার প্রায় উল্টো। প্রধান অর্থ এখন ‘ক্রোধ’ বা ‘অত্যন্ত বিরক্তি’। কিন্তু আগে এর অর্থ ছিল ‘অনুরাগ’, ‘প্রণয়’। এর তৃতীয় একটা অর্থ আছে—সুরের নাম। যেমন, ভৈরোঁ অথবা ভৈরব একটা রাগ। গোড়াতে ‘পাষণ্ড’ ছিল একটা বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের নাম। কিন্তু এখন এর মানে হলো হৃদয়হীন, নির্দয়, নিষ্ঠুর, অত্যাচারী। আবার যুগে যুগে শব্দের অর্থ বদলে গিয়ে একই শব্দের অনেকগুলো অর্থ দাঁড়িয়ে যায়। ‘আসা’ শব্দটা যেমন। এর মূল অর্থ আগমন করা। যেমন, ‘আমি আসি।’ কিন্তু যখন বলি: ‘এখন তবে আসি?’ তখন এর অর্থ হয়: এখন যাই, এখন বিদায় নিই। আবার যখন একজনের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করি: ‘আসি?’ তখন আসলে ঢোকার অনুমতি চাওয়া হয়। ‘ভীষণে’র মানে কি শুধু ভয়ানক অথবা ভয়ংকর? ‘দারুণ’ মানে কি কেবল তীব্র অথবা প্রবল? ‘ভীষণ’ এবং ‘দারুণ’—উভয়ের অর্থই হতে পারে ‘খুব’, ‘চমৎকার’।
অর্থের মতো শব্দের চেহারাও বদলায়। যেমন, একসময়ে সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী লেখা হতো ‘বাটিকা’ সেই থেকে হলো বাটী। বাটী থেকে হলো বাড়ী; শেষ পর্যন্ত বাড়ি। হস্ত থেকে হাথ, হাথ থেকে হাত। সুবর্ণ থেকে স্বর্ণ, স্বর্ণ থেকে সোণা, সোণা থেকে সোনা। রাজ্ঞী থেকে রাণী, রাণী থেকে রানী বা রানি। উনিশ শতকের গোড়ায় সংস্কৃত ব্যাকরণ মেনে ফারসি ভাষার একটি শব্দের বানান লেখা হতো ‘পোষাক’। রবীন্দ্রনাথ সেটাকে করলেন পোসাক। তারপর রবীন্দ্রোত্তর কবি বুদ্ধদেব বসু লিখলেন পোশাক—উচ্চারণ অনুযায়ী। রবীন্দ্রনাথের খৃষ্ট/খৃস্ট, তাঁর জীবদ্দশাতেই হলেন খ্রিস্ট। কেবল আধুনিক যুগের বানানই বদলায়নি, মধ্যযুগে ব্যবহৃত হাজার হাজার শব্দের চেহারা পাল্টে গেছে। সত্যি বলতে কি, সেকালে বাংলা ভাষার মতো বাংলা বানানগুলোও সুনির্দিষ্ট রূপ নেয়নি—ছিল নীহারিকার মতো সুনির্দিষ্ট আকারবিহীন। কোনো আদর্শ বানান ছিল না। একটা দৃষ্টান্ত দিই হ্যালহেডের কাগজপত্র থেকে (১৭৭২-৮০):
কী আজ্ঞা মহাঁরাজ: কী কহিব কহ/ রাজা কহিলেন—তুমি কন্যার খাটে গিয়া বইসহ/ আমি জীজ্ঞাসা করিলে কথা কহিও/ তাল: বিতাল গিয়া কন্যার খাটে বসিল/ পরে রাজা ভাবীয়া কহিলেন: এ ঘরে কে জাগ্রত আছহ/ তাল: বিতাল উত্তর দীলেক: কীজন্যা ডাক মহাঁরাজ/ রাজা কহেন একী আশ্চয্য / কন্যার কথা নাঞী/ তুমি কে/ তালবিতাল কহিলেক/ রাজা কহিলেক তবে তুমি ষুনহ/ এক দেশে এক সওদাগর ছীল
ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসব শব্দের মধ্যে মহাঁরাজ, বইসহ, জীজ্ঞাসা, ভাবীয়া, আছহ, দীলেক, আশ্চঘ্য, নাঞী, কহিলেক, ষুনহ, ছীল এখন আর ওভাবে লেখা হয় না। এও শব্দের রূপগত বিবর্তন।
কিন্তু কেবল শব্দের চেহারা এবং অর্থের ক্রমপরিবর্তন—এটুকুই নয়, আমাদের বিবর্তনমূলক অভিধানে আরও আছে: একটা শব্দ প্রথমবার কখন ব্যবহৃত হলো, তার সময় এবং দৃষ্টান্ত। সেই সঙ্গে তার তখনকার অর্থ। তারপর শব্দের অর্থ বদলে গিয়ে থাকলে, তার দৃষ্টান্ত। সেই সঙ্গে সে দৃষ্টান্তের তারিখ এবং অর্থ। সেটি কে ব্যবহার করেছিলেন, তাঁর নামও আছে সেই সঙ্গে। যেমন, আনুমানিক ১৫৫০ সালে চণ্ডীদাস লিখেছিলেন, ‘সাধ বহু করে বিহি করে অনুবাদ।’ এখানে অনুবাদ কথাটার মানে প্রতিকূলতা। আনুমানিক ১৬৫০ সালে মাধবাচার্য্য অনুবাদ লেখেন প্রশংসা অর্থে, ‘ধন্য ধন্য করিয়া করিল অনুবাদ।’ একই সময়ে বিজয় গুপ্ত অনুবাদ কথাটা লেখেন অপরাধ বা দোষ অর্থে, ‘নাহি দোষ অনুবাদ খেমা কর আমা।’ আনুমানিক একই সময়ে জ্ঞানদাসও অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার অর্থ করেছেন বাসনা, ‘মনে ছিল অনুবাদ পুরাল মনের সাধ।’ অনুবাদ অর্থ বিতর্কও হয়, যেমন, বাদ-অনুবাদ। বর্ণনা অর্থেও অনুবাদ শব্দটা ব্যবহৃত হয়—যেমন, গুণানুবাদ। কিন্তু একেবারে ভুল অর্থে অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করেছেন অক্ষয়কুমার দত্ত, ১৮৪২ সালে। তিনি এ শব্দ দিয়ে বুঝিয়েছেন ‘তরজমা’ অর্থাৎ ‘ট্রান্সলেশন।’ এখন আমরা এই ভুল অর্থেই অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করি। এ অভিধানে এভাবে প্রতিটি শব্দের ক্রমবিকাশের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। শব্দের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস হলো বিবর্তনমূলক অভিধান।
এমন একটা অভিধান করতে পারলে সেটা হবে একেবারে নতুন এবং দারুণ কৃতিত্বের ব্যাপার—এ কথাটা আমি বলেছিলাম বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানকে, ২০১০ সালের আগস্ট মাসে। জামান সাহেব আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, প্রায় অর্ধশতাব্দীর। সে কারণে তিনি আমার এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন বলে আমার মনে হয় না। এ প্রস্তাবের গুরুত্ব তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তা ছাড়া, তাঁর মনেও হয়তো এমন একটি অভিধান করার ধারণা ছিল। মোট কথা, কারণ যাই হোক, প্রস্তাবটি তিনি রীতিমতো লুফে নিলেন। তারপর এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য যা যা দরকার, সবই তিনি করেছিলেন গভীর উৎসাহের সঙ্গে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। অন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি টেলিফোনের মাধ্যমে আমারও কথা বলিয়ে দেন।
কাজ করতে আমি রাজি হই কয়েকটা শর্তে। তার মধ্যে একটা হলো অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার আর ড. সাইফুল ইসলামকে আমার সহকর্মী হিসেবে দিতে হবে। সব সহকর্মীর জন্য কম্পিউটার, সফটওয়্যার আর অত্যাধুনিক ইন্টারনেটের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এর জন্য যেসব বইপত্র, পাণ্ডুলিপি, সরঞ্জাম, আসবাবপত্র লাগবে—তা অকৃপণভাবে দেওয়া হবে। এবং আমাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। জামান সাহেব আমার প্রতিটি শর্তই মেনে নেন। তখনকার মতো আমিও কাজ করার সম্মতি দিয়ে লন্ডনে ফিরে যাই।
লন্ডনে বসে আমি কাজের বিশালত্ব এবং জটিলতার কথা ভালো করে ভেবে দেখি। আমার মনে হলো, অভিধানের কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দশ-বারোজন সহকর্মী লাগবে কাজটা করতে হলে। আমার ব্যক্তিগত গবেষণার কাজও বিঘ্নিত হবে। এসব ভেবে আমি ঘাবড়ে যাই এবং ঠিক করলাম যে, কাজটা আমি করব না। আমি লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরে ২০১১ সালের পয়লা জানুয়ারি জামান সাহেবকে আমার অপারগতার কথা বলি। সব শুনে জামান সাহেব শুধু একটা কথা বললেন। ‘আপনার কথায় এ কাজে নামলাম, এখন আপনি বলছেন কাজটা আপনি করবেন না!’ জামান সাহেবের কথাটা এত সত্য যে, আমি আমার কথাটা প্রত্যাহার করলাম।
তার পরের দিন থেকেই শুরু হলো লোক খোঁজা। জন পঁচিশ প্রার্থীর মধ্য থেকে প্রথমে আটজনকে বেছে নিলাম। এঁদের কেউই আগে কোনো দিন অভিধানের কাজ করেননি। কাজেই সহকর্মী নির্বাচন করে উল্লসিত অথবা আশাবাদী হয়েছিলাম—এ কথা বলতে পারছি না। কিন্তু নতুন অভিধান, নতুন কর্মী—এটা একধরনের সুবিধা।
কিছুদিন গেল অভিধানের কাজটা কী করে করতে হবে, তার প্রশিক্ষণ দিতে। আমার নিজেরও এ ধরনের অভিধান রচনা করার অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে ধারণা ছিল। এ অভিধান করার কাজটা অন্য অভিধান থেকে শব্দ এবং তার অর্থ কপি করার কাজ নয়। মূল কাজ হলো রচনা পড়ে তার মধ্য থেকে শব্দ সংগ্রহ করা এবং শব্দটা কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা খুঁজে বের করা। কে লিখেছেন এবং কখন লিখেছেন, তা-ও লিখে রাখা। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। ‘ঘর’ শব্দটার সবচেয়ে পুরোনো ব্যবহার আমরা পেয়েছি চর্যাপদে, ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।’ অর্থ ‘আবাস’। কিন্তু এর চার শ বছর পরে মুকুন্দরাম শব্দটা লিখেছেন ‘সংসার’ অর্থে, ‘হইআ সতন্তর তুমি করহ ঘর।’ মুকুন্দরাম ‘স্ত্রী’ অর্থেও ঘর শব্দটা ব্যবহার করেছেন। মোট কথা, বই আর পাণ্ডুলিপি পড়ে আমাদের বের করতে হয়েছে নতুন নতুন শব্দ, তাদের বানান আর অর্থের ক্রমবিকাশ, লেখকের নাম এবং রচনার সময়। বিবর্তন সাজিয়েছি সময় অনুসারে। এভাবে এক লাখ বিশ হাজার ভুক্তি তৈরি করতে হয়েছে। অন্য অভিধান থেকে নকল করিনি আমরা।
কিন্তু আমাদের মস্ত সীমাবদ্ধতা ছিল দুই রকমের। আমরা তো প্রাচীন বাংলা থেকে আরম্ভ করে আধুনিক বাংলা পর্যন্ত তাবৎ রচনা পাঠ করিনি! করার সময় ছিল না, সব রচনা জোটানোও সম্ভব ছিল না। সময় পেয়েছিলাম মাত্র তিন বছর—তিন বছরেরও খানিকটা কম। অপরপক্ষে, অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি করতে সময় লেগেছিল ৪৯ বছর। বই জোটানো ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ফলে যে-শব্দটা হয়তো পাওয়া যেতে পারত মালাধর বসুর রচনায়, তা আমরা পেয়েছি হয়তো তার এক শ বছর পরের কোনো রচনায়। যে শব্দটা পাওয়ার কথা ছিল সতেরো শতকের কবি আলাওলের রচনায়, তা হয়তো আমরা পেয়েছি আঠারো শতকের কবি ভারতচন্দ্রে, যে শব্দ পাওয়া উচিত ছিল ভারতচন্দ্রে, তা পেয়েছি হয়তো উনিশ শতকের কবি ঈশ্বর গুপ্তে, কারণ কারও রচনাই পুরো পড়ার মতো সময় আমাদের ছিল না। এমনকি, রবীন্দ্রনাথের নয়, নজরুল ইসলামের নয়, অথবা জীবনানন্দ দাশেরও নয়।
রচনা পড়ে সংকলকের যে অর্থ মনে হয়ছে, তা সর্বত্র মিলিয়ে দেখাও সম্ভব হয়নি। তাও সময়ের অভাবে। আমার ধারণা, পাঁচ বছর সময় পেলে অভিধানটা আর একটু ভালো হতো। দশ বছর সময় আর দশজন অভিজ্ঞ কর্মী পেলে অভিধানটা সত্যি সত্যি ভালো হতো। কিন্তু আমরা কথা বলছি, কী হতে পারত তা নিয়ে নয়, কী হয়েছে, তা নিয়ে।
এই অভিধানটা টাইপ করা সংগ্রাহকদের সকলের। দুবার-তিনবার প্রুফ দেখা হয়েছে, কিন্তু তার পরও টাইপিংয়ের ভুল থেকে গেছে। সবগুলো অর্থ সঠিক কি না, তাও সন্দেহের বিষয়। আর একটা সীমাবদ্ধতা ছিল আমার অবস্থান নিয়ে। আমি বছরের অর্ধেক সময় কাটিয়েছি ঢাকায়, অর্ধেক লন্ডনে। আমি লন্ডনে বসে অফিসে কে কী করছেন, তা দেখতে পেতাম একটা ক্যামেরায়। রোজ অন্তত দুবার ভিডিও কনফারেন্সিং করতাম। প্রতিদিনের কাজ আমাকে ই-মেইল করে পাঠানো হতো। আমি সেসব কাজ সাধ্যমতো শুদ্ধ করে ফেরত পাঠাতাম, ভিডিও কনফারেন্সিং করে ফিড-ব্যাক দিতাম। কিন্তু প্রতিটি শব্দ সহযোগী সম্পাদক স্বরোচিষ সরকারের পক্ষে অথবা আমার পক্ষে পড়ে সংশোধন করা সম্ভব ছিল না। একবার রাধিকা ‘অনাথিনী’ এই কথাটার অর্থ একজন লিখেছিলেন ‘এতিম’। একজন ‘কৌপীন’ শব্দটার অর্থ লিখেছিলেন ইংরেজি কফিন অর্থাৎ ‘শবাধার’। এ রকমের শত শত দৃষ্টান্ত দিতে পারি।
বহু ত্রুটিবিচ্যুতি এবং অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও আমরা যে এ অভিধানটা করতে পেরেছি, সেটাই বড় কথা। কারণ, বাংলায় লেখা প্রথম বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়েছিল প্রায় দুই শ বছর আগে, ১৮১৭ সালে। রচয়িতা-রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ। তারপর গত দুই শতাব্দীতে ছোট-বড় বহু অভিধানই প্রকাশিত হয়েছে। এই তাবৎ অভিধানপ্রণেতার এই বিপুল অবদান সত্ত্বেও, বাংলা ভাষায় অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির মতো বিবর্তনমূলক অভিধান আজও রচিত হয়নি। অক্সফোর্ড অভিধানে শব্দগুলোর ব্যুৎপত্তি এবং প্রথম ব্যবহারের তারিখ ও দৃষ্টান্ত দেওয়া আছে। এ ছাড়া দেওয়া আছে দৃষ্টান্তসহ তাদের পরবর্তী অর্থান্তরসমূহ এবং রূপান্তরসমূহ। অর্থাৎ বহু শতাব্দীর পথ বেয়ে ইংরেজি শব্দ কীভাবে বর্তমান রূপ এবং অর্থ লাভ করেছে, এ অভিধান ব্যবহার করে তা জানা যায়।
অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি (ওইডি) প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৮ সালে। তার আগেই প্রকাশিত হয়েছিল সুবল মিত্রের সরল বাঙ্গালা অভিধান (১৯০৬) এবং জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান (১৯১৭)। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর অভিধানের কাজ শুরু করেছিলেন ওইডি প্রকাশিত হওয়ার প্রায় দুই দশক আগে। তাঁদের সামনে ওইডির আদর্শ না থাকলেও, জ্ঞানেন্দ্রমোহন এবং হরিচরণ—উভয়েই শব্দগুলোর সম্ভাব্য ব্যুৎপত্তি ও যত দূর সম্ভব অর্থান্তর দিয়েছিলেন। শব্দও সংগ্রহ করেছিলেন প্রচুর। কিন্তু জ্ঞানেন্দ্রমোহন এবং হরিচরণের প্রভূত পরিশ্রম এবং আন্তরিক নিষ্ঠা সত্ত্বেও তাঁদের অভিধানে অনেক অপূর্ণতাই থেকে গিয়েছিল।
অপূর্ণতা ছাড়া, জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধান প্রকাশিত হওয়ার পরে প্রায় এক শ বছর এবং হরিচরণের অভিধান প্রকাশিত হওয়ার পরে আশি বছর চলে গেছে। ইতিমধ্যে হাজার হাজার নতুন শব্দ, বিশেষ করে যৌগিক শব্দ তৈরি হয়েছে এবং অন্যান্য ভাষা থেকে নতুন শব্দ আমদানি হয়েছে বাংলা ভাষায়। বিচিত্র ব্যবহারের মাধ্যমে শব্দের অর্থান্তরও বৃদ্ধি পেয়েছে বহুলভাবে। হারিয়ে যাওয়া হাজার হাজার শব্দও আবিষ্কৃত হয়েছে অজানা ভান্ডার থেকে। গত এক শ বছরের বেশি সময় ধরে নিরন্তর গবেষণা করে পণ্ডিতেরা মধ্যযুগের বিপুল কাব্যসাহিত্য এবং আঠারো শতকের ক্রমবিকাশশীল বাংলা গদ্যের প্রচুর উপাদান আবিষ্কার করেছেন। মোট কথা, গত এক শতাব্দীতে বাংলা শব্দসংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেসব শব্দের হদিস ও বিচিত্র অর্থ আমাদের অজ্ঞাত ছিল এবং অভিধানে যাদের ঠাঁই ছিল না, তেমন বহু শব্দের সঙ্গে আমাদের এখন বিলক্ষণ পরিচয় হয়েছে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ও বাংলা ভাষার ওপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছে। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে লাখ লাখ লোক স্থায়ীভাবে চলে যান পশ্চিমবঙ্গে। এর ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রামাণ্য ভাষার ওপর বাস্তুহারাদের প্রভাব পড়েছিল নানাভাবে। বহু পূর্ববঙ্গীয় শব্দ গৃহীত হয়েছে। শব্দের অভিধাও বদলেছে। দেশভাগের চব্বিশ বছরের মধ্যে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। ফলে, বাংলা ভাষা এই প্রথম একটা দেশের সরকারি ভাষায় পরিণত হলো। সেন আমল, পাঠান আমল, মোগল আমল, ইংরেজ আমল—এক হাজার বছরের মধ্যে—কোনো সময়েই বাংলা ভাষা বঙ্গদেশের সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করেনি অথবা যথেষ্ট পরিমাণে সরকারি আনুকূল্যও পায়নি, পাঠান ও ইংরেজ আমলে সরকারি পৃষ্ঠপোষণায় কিছু অনুবাদকর্ম ছাড়া। ১৯৭১ সালের পর বাংলা ভাষার একটা সার্বভৌম স্বদেশ গঠিত হলো। সে দেশের লেখাপড়া ও সরকারি কাজকর্ম হতে আরম্ভ করল বাংলা ভাষায়। এর ফলে বাংলা ভাষার পালে রাতারাতি একটা হাওয়া লাগল। শতাধিক দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হলো, হাজার হাজার বই প্রকাশিত হলো, লাখ লাখ নথি লেখা হলো বাংলায় এবং বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য এমন সরকারি পৃষ্ঠপোষণা পাওয়া গেল, বাংলা ভাষার জন্মের পর থেকে কখনোই যা দেখা যায়নি। দেশভাগের পরে পূর্ব বাংলার ভাষায় আরবি-ফারসি ও আঞ্চলিক ভাষার উপকরণ আসতে আরম্ভ করার যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, সেই প্রবণতা বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে বহুগুণে বৃদ্ধি পেল।
এককথায় বলা যায়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ও হরিচরণ যে ভাষার অভিধান রচনা করেছিলেন, সেই বাংলা ভাষা আর এখনকার বাংলা ভাষা ঠিক এক নয়—বাংলাদেশে নয়, পশ্চিমবঙ্গেও নয়। হরিচরণ তাঁর শব্দকোষে সংস্কৃত ভাষার প্রতি যে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষার চর্চায় তার প্রাসঙ্গিকতাও এখন অনেকটা হারিয়ে গেছে—উভয় বাংলাতেই। বস্তুত, নতুন অভিধান তৈরি করা এ জন্য একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।
আমরা একটা জানালাবিহীন ঝুল আর ধুলোভরা পরিত্যক্ত বড় কক্ষ পেয়েছিলাম আমাদের অভিধান নির্মাণের কারখানা হিসেবে। সেখানে নতুন আসবাবপত্র এসেছিল। পুরোনো কম্পিউটার এসেছিল। সমস্ত ঘরটা ভরে গিয়েছিল মাল্টিপ্লাগ আর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বৈদ্যুতিক তারে। মোট কথা, কাজের জন্য খুব অনুকূল পরিবেশ পেয়েছিলাম, সে কথা হলফ করে বলতে পারছি না। অনেক সময় কর্মচারীরা বেতন পেতেন মাসের আট-দশ দিন চলে যাওয়ার পর। কিন্তু যা পেয়েছিলাম, তা তুলনাহীন—আমার সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও ভালোবাসা। আমাদের কাজের কক্ষে কোনো টেলিফোন ব্যবহারের নিয়ম ছিল না। পরস্পরের মধ্যে গল্প করারও নয়। কর্মীরা কাজে আসতেন নয়টায় অথবা নয়টার আগে, যেতেন পাঁচটায়। এমন শৃঙ্খলাপূর্ণ অফিস আমি বাংলাদেশে দেখিনি। চা-কফি তৈরি করে খেতে হতো নিজেদেরই। কোনো সহায়ক কর্মচারী ছিলেন না তার জন্য।
একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের অকুণ্ঠ সহযোগিতা ছাড়া এ অভিধান প্রকাশ অসম্ভব ছিল। তা সত্ত্বেও লাল ফিতা কখনো কখনো পথ আগলে দাঁড়াত। কিন্তু ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ছোটখাটো বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও এই অভিধান বাংলা ভাষার প্রথম বিবর্তনমূলক অভিধান। আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। আমার যাত্রাপথে যথাসাধ্য সহযোগিতা পেয়েছি সহকর্মীদের কাছ থেকে। আর এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে শামসুজ্জামান খানের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়।

বিজ্ঞাপন
অমর একুশে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন