default-image

আকাল একটা বিলাসের পেছনে অনেককে টাকা ও সময় ঢালতে দেখা যায়, কৃষিবিজ্ঞানী জামিল আহমেদ যার নাম দিয়েছেন ‘খামারবাড়ি বিলাস’। আমার বন্ধু আলমগীরেরও সিঙ্গাইরে একটা বিশাল খামারবাড়ি আছে। সেখান থেকে সে ঢাকার বাজারে লাউ, করলা, কুমড়ো—এসবের জোগান দেয়। আবার বিদেশেও চালান দেয়। সপ্তাহে-দুই সপ্তাহে একবার সে সিঙ্গাইড় যায়। একজন ম্যানেজার আছে কাজ দেখাশোনার, তাকে আদেশ-উপদেশ দিয়ে আসে। আমার বন্ধুকে অ্যাবসেন্টি ল্যান্ডলর্ড বলা চলে, তবে মোবাইলফোনের যুগে দূরে থেকেও তো কাছে থাকা যায়। আমার বন্ধুর খামারের যে আয়তন, তা প্রায় পুরো কলতাবাজারের সমান! সেই খামারে দু-একবার আমি গিয়েছি এবং খামারবাড়িটা দেখে আমার মাথা ঘোরার জোগাড় হয়েছে। টালির ছাদ দেওয়া দোতলা দালান, কাঠের মেঝে, সাত শোবার ঘর, চার বাথরুম। ফ্রিজ, টিভি, এসি—কী নেই সেই বাড়িতে? 
তবে আমার এ গল্পটি শুধু ওই বন্ধুকে নিয়ে নয়। কাজেই তার খামারবাড়ির বর্ণনা এখানেই শেষ করা যাক। কিন্তু শেষ বললেই কি সব শেষ হয়? একটা গল্পের সুতো যে আরেক গল্পে ঢুকে যায় যখন-তখন, একটা গল্পের হাওয়া যে ঘূর্ণি তুলে ফেরে আরেক গল্পের মাঠে, তা কি আপনারা খেয়াল করেননি?
যেমন, আমার মূল গল্পটা যাকে নিয়ে সেই ইউসুফ হাসান সাহেবের সঙ্গে আমার বন্ধু আলমগীরের কোনো সম্পর্ক নেই। হাসানের বাড়ি ভালুকা। সিঙ্গাইর থেকে এক ভূগোল দূরে। হাসান সাহেব বিপত্নীক, আমার বন্ধুর স্ত্রী এবং তিন সন্তান আছে। হাসান সাহেব দীর্ঘদিন আমেরিকায় থেকে অসংখ্য ডলার কামাই করে দেশে ফিরে ভালুকায় চল্লিশ বিঘা জমি কিনে খামার বানিয়েছেন। আর আমার বন্ধু সিঙ্গাইরে পৈতৃকসূত্রে পাওয়া কুড়ি বিঘা জমির সঙ্গে নানা প্রক্রিয়ায় আরও পঞ্চাশ বিঘা যোগ করে তার খামার গড়ে তুলেছে। এমএ পাস করে কিছুদিন সে মাস্টারি করেছে, তারপর তরকারি রপ্তানির ব্যবসায় নেমেছে। সে ব্যবসায় কিছু পুঁজি হলে গেছে খামার ব্যবসায়। তবে একটা মিল বা সম্পর্ক তাদের অবশ্য রয়েছে: দুজনেরই আছে শানদার খামারবাড়ি, দুজনই মাঝেমধ্যে বন্ধুবান্ধব ডেকে ভোজের আয়োজন করে। ঢাকা থেকে গানঅলা-বাজনাঅলারা যান। গান গল্প আড্ডা-ফুর্তি হয়।
হাসান সাহেব বিপত্নীক হয়েছেন ভাগ্যের ফেরে। তার বিয়ের বয়স যখন কুড়ি পার হয়েছে, তার স্ত্রী নিউইয়র্কের উডহ্যাভেন সাবওয়ে স্টেশনে পাতাল ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যান। মিসেস হাসান কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। সন্তান ধারণে অক্ষম বলে বরাবর ডিপ্রেশনে ভুগতেন। তবে তিনি আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলেন—এ রকম কেউ বলতে পারবে না, তার ডাক্তারও জোর দিয়ে বলেছেন, না, ডলি হাসান আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলেন না। ডলি মারা গেলে ইউসুফ হাসান ইনস্যুরেন্সের সাত লাখ ডলার পেয়েছিলেন। পুলিশ এ জন্য প্রথমে হাসানকে সন্দেহ করলেও পরে যখন দেখল, বার বছরের পুরোনো বিমা, তখন কিছুটা বিব্রত হয়েই সন্দেহের তির ফিরিয়ে নিল। তবু, স্ত্রী মারা যাবার কয়েক দিন আগে থেকে হাসান সাহেবের আচরণ যে কিছুটা সন্দেহজনক ছিল, সে কথা এক প্রতিবেশী বলেছে। তবে প্রতিবেশীকে কি আর সব সময় বিশ্বাস করা যায়, বিশেষ করে যদি সেই প্রতিবেশী হাসান সাহেব থেকে নেওয়া দশ হাজার ডলারের ঋণ ফেরত না দেওয়ার জন্য তাকে ফাঁসানোর একটা সুযোগ খুঁজে বেড়ায়।
নিঃসন্তান ইউসুফ হাসান এরপর আমেরিকার পাট চুকিয়ে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঢাকায় এসে তার ভালোই লেগেছে, শুধু গরম, ধুলোবালি, পল্যুশন আর মশা বাদ দিলে। ভালুকায় গিয়ে অবশ্য তিনি আরও ভালো বোধ করেছেন—শুধু তাপ ও মশা থাকল সেখানে সমস্যা হিসেবে। কিন্তু টাকা থাকলে মশা মারার ব্যবস্থা করা এবং ঘরে এসি লাগিয়ে গরম দূর করা কঠিন কিছু নয়। এরপর ‘ডলি খামার’-এর জীবন তাঁর জন্য প্রচুর আনন্দময় হয়ে উঠল।
তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখলেন, ‘ডলির স্মৃতি আমার হৃদয়জুড়ে। এই খামারে সে থাকলে কী যে ভালো হতো ! ...এই মাটি, এই জল-হাওয়া আমার জীবন। এই খামারের কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সকলে আমার প্রাণ। তাদের সেবায় আমি জীবন উৎসর্গ করলাম।’ হাসান সাহেবের খামারে আশিজন মানুষ কাজ করে। তিনি তাদের ভালো বেতন দেন। নানান সুযোগ-সুবিধাও দেন। একটা ছোট স্কুল করে দিয়েছেন খামারের বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য, দুজন শিক্ষিকাও রেখেছেন। তিন মাস আগে খামারের পুরোনো কর্মচারী আতর মিয়া টাইফয়েডে মারা গেলে তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েটিকে তিনি দত্তকও নিয়েছেন।
তিনি ডায়েরিতে লিখলেন, ‘মায়াকে দেখে মনে হয় না আতর মিয়ার মেয়ে। যথেষ্ট স্মার্ট। শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে স্নো পাউডার মাখিয়ে ভালো কাপড়-চোপড় পরিয়ে দিলে তাকে দেখলে মনে হয় গুলশান বনানীর কোনো বাড়ির ক্লাস টেনপড়ুয়া মেয়ে। মায়াকে পেয়ে আমার সন্তানের শখ মিটল।’
ইউসুফ হাসানকে শুধু মায়া নয়, খামারের সব কর্মচারী বাবার আসনে বসিয়েছে। মায়া তাকে ডাকে বাপী। সে তার মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাপী আজ আমাকে দুটো বই দিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের। আমি যে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের পোকা, বাপী কীভাবে তা আন্দাজ করল, মা?’
মা বললেন, ‘ভালো মানুষেরা মানুষের মনের কথা বুঝতে পারে’।
মায়া ভাবল, বাবার সঙ্গে জীবনটাতে কোনো সুখ ছিল না। বাবা ঈদে একটা জামাও কিনে দিতে পারত না—কখনো দেয়ওনি। যেটুকু তার জামাকাপড়, বড় মামা-ই দিয়েছেন। আর শ্যাম্পু-স্নো-পাউডারের তো প্রশ্নই ওঠে না। অথচ মায়া যখন যা চায়, বাপী কিনে আনে। বাপীর সঙ্গে অনেক কথাও বলা যায়, যা কখনো বাবার সঙ্গে বলা হয়নি তার, হয়তো সম্ভবও ছিল না। আর, তার কথাগুলো কী মন দিয়ে যে শোনে বাপী!
ইউসুফ হাসান ডায়েরিতে লিখলেন, ‘একই সঙ্গে বাবা এবং শিক্ষক হওয়ার আনন্দটাই আলাদা। মায়া যে কত কিছু জানে না, ভেবে অবাক হই। সামনে তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা। পরীক্ষার বিষয়গুলিই আপাতত পড়াব তাকে। তারপর জীবন সম্পর্কে কিছু পাঠ দেব।’
গোড়ার দিকে হাসান সাহেব সপ্তাহে এক-দু দিন ভালুকায় থাকতেন, কিন্তু এখন থাকেন প্রায় প্রতিদিন। কাজকর্ম মন দিয়ে দেখেন। ফলে তার খামারের উৎপাদনে জোয়ার এসেছে। আর যত তার আয়, তত কর্মচারীদের লাভ। ছোটখাটো বোনাস, এটা-সেটা উপহার।
তুলনায় আমার বন্ধু আলমগীর অনেকটাই অ্যাবসেন্টি। সপ্তায়-দু সপ্তায় চার-পাঁচ দিন থাকে সিঙ্গাইড়ে। তবে যতক্ষণ থাকে, কাজে ডুবে থাকে। আর রাতে খামারবাড়িতে তার অফিসঘরে বসে কাজকর্মের খতিয়ান লিখে রাখে। একদিন আমাকে জানাল, যৌথ খামারের স্বপ্ন দিয়ে শুরু করেছিল। যৌথ মালিকানার। কিন্তু এক সিজন খরায় আর পতঙ্গে সব ফলন নষ্ট হলো, গরু-মুরগি মরল রোগে। আর যৌথ খামারের স্বপ্নটাও গেল। সকলে মিলে এসে ধরনা দিল, সায়েব এই রকম মালিকানা চাই না। বরং মাসে মাসে বেতন দেন। তাতেই খুশি। অবাক ব্যাপার, সে দুঃখভরা গলায় বলল, মানুষ একটা স্বপ্নকে ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়াবার কষ্টটাও করতে চায় না।
ঘটনাটা আমি জানি। খামার ব্যবসার গোড়াতে আলমগীর ব্যবস্থা করেছিল, সকল কর্মচারীর মালিকানা থাকবে ১০ বিঘা জমি ও সকল জীবজন্তু ও ফলনের ওপর। কিন্তু বয়স্ক কর্মচারীরা সবাই বোঝাল তরুণ কর্মচারীদের, ‘এর মধ্যে একটা প্যাঁচ রইয়া গেছে। পরে দেখবা, আমাগো মালিকানা বলতে হাতে আসব যে কয়টা টেকা, সেই কয়টা টেকা আধা মাসের বেতনের সমানও না।’
এক সন্ধ্যায় খামারবাড়ির দোতলার বারান্দায় বসে ধলেশ্বরীর স্রোত দেখতে দেখতে আমাকে দুঃখভরা গলায় বলল আলমগীর, ‘দ্যাখ ভাই, আমার ড্রিম ওয়ার্কের কী অবস্থা! সবাই সবকিছুতে প্যাঁচ খোঁজে। আমি ছোট একটা ক্লিনিক করে দিলাম, বললাম, প্রতিবার ডাক্তার দেখাতে এলে এক টাকা সার্ভিস চার্জ দিতে হবে, যাতে একটা ওনারশিপ ডেভেলপ করে তাদের মধ্যে, কিন্তু সবাই খুব যেন দুঃখ পেল এই ব্যবস্থাতে। বলল, সায়েব গরিবের সামান্য অসুখবিসুখ তার ওপর ট্যাক্স বসান কেন? বুঝলি, মানুষ সব ফ্রি চায়। কালেকটিভ ওনারশিপ চায় না। জিনিসটা বোঝেও না, শুধু বোঝে প্রাইভেট ওনারশিপ।’
আলমগীর ছাত্র ইউনিয়ন করত। মণি সিংহের কম্যুনিস্ট পার্টি করত। তার হয়ে আমি কথা দিতে পারি আপনাদের, যৌথ খামারের স্বপ্নটাও বাস্তবেই ওর ছিল। কিন্তু আশাহত হয়ে এখন বাজারের চলতি নিয়মে চলেছে। মাসোহারা, বেতন, বোনাস, সুযোগ-সুবিধা। কর্মচারীরা খুশি। একদিন সবচেয়ে চতুর কর্মচারী আলাউদ্দিন, যে শুরুতে অন্যদের বলেছিল ‘সায়েব একটা প্যাঁচ কষতাছে, সাবধান,’ এসে বলল, ‘সায়েব, এবার ভুট্টা ফলান। বাজারে ভুট্টার চড়া দাম।’ কথাটা সত্যি, কথাটা আমিও জানি। দেশের পোলট্রির খামারগুলোর জন্য হাজার হাজার মণ ভুট্টার প্রয়োজন। আলমগীর বলল, ‘ভুট্টার জন্য জমি দিতে পারব না। জমি নাই।’ আলাউদ্দিন বলল, ‘জমি আছে। ইসমাইল মিয়াজির জমি।’ আলমগীর বলল, ‘সে বিক্রি করবে না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।’ আলাউদ্দিন বলল, ‘দাম পাইলে একশবার বিক্রি করবে।’ ‘মনে হয় না,’ আলমগীর বলল। আলাউদ্দিন চোখে কিছুটা চতুর আলো ছড়িয়ে বলল, ‘জমিটা শুধু মিয়াজির না। তার দুইটা ভাই আছে না? ওগো সে ঠগাইছে না? সেই দুই ভাইরে ডাহেন। কথা কন ওগো লগে।’
আলমগীর বলল, ‘না, অত ভেজালের দরকার নাই।’
এর কিছুদিন পর এক রাতে আমাকে কেন জানাল আলমগীর, ১৫ বিঘা জমি দুই ভাইকে ঠকিয়ে একাই ভোগ করছিল ইসমাইল মিয়াজি। দুই ভাই বোধ হয় এবার শোধ নিল। তাকে মেরে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে ধলেশ্বরীতে। পুলিশ ধারণা করছে, দু-ভাই মেরেছে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। কনফুসিয়াস এ জন্যই বলেছিলেন, ‘যে জমিতে পা রাখবে, সে জমিতেই শুয়ে পড়তে হবে। জমি এমনই ক্ষমাহীন এক চুম্বক।’
কথাগুলো অবশ্যই কনফুসিয়াসের না, কথাগুলো লাইৎসু-এর। তেরো শতকের চৈনিক দার্শনিকের। কিন্তু উদ্ধৃতি ভুল দিলেও আলমগীর একটা সত্য বুঝতে পেরেছিল—বাংলাদেশের মতো একটা জমি—অভাবী দেশে জমিই হতে পারে জীবন, আবার হতে পারে মৃত্যুও।
ইউসুফ হাসানের গল্প থেকে এত দূর চলে আসায় দুঃখিত। তবে তার গল্প অনেকটা সময় নিয়ে তৈরি হচ্ছে। এত দিনে অবশ্য সেটি মাঝামাঝি একটা পর্যায়ে এসেছে, এখন কোনো একটা দিকে মোড় নেবে। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, খামারবাড়িগুলোতে সময় যেন আটকে থাকে। সেখানে সময় ঘড়ির কাঁটায় চলে না, চলে শস্যের এবং প্রাণিকুলের জৈব ঘড়ির কাঁটায়। কিন্তু হাসানের কাছে তবু এই ঘড়ি বেশ তাড়াতাড়িই চলে। তাঁর ডায়েরির পাতায় একরাতে তিনি লিখলেন, ‘মায়া এক অবাক মেয়ে। সে আমাকে নানান বিব্রতকর প্রশ্ন করে। যেমন সেদিন জিজ্ঞেস করল, বাপী আমি যদি কাউকে ভালোবাসি, ধরো একটা ছেলেকে, তাহলে তার সঙ্গে লিভটুগেদার করাটা কি খারাপ? বুঝলাম, মায়া বড় হচ্ছে। তার নানা জিজ্ঞাসার সঙ্গে চাহিদাও বাড়ছে। সেদিন সে আমার থেকে দু-হাজার টাকা চাইল। প্রথমে দিতে চাইনি। কিন্তু এমনভাবে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বাপী বলল, আমি একদম গলে গেলাম।’
আরও দুই মাস পর হাসান লিখলেন, ‘আমি কি আতর আলীর গিন্নির সঙ্গে কথা বলব? বলা নিশ্চয় উচিত। মায়া সেদিন অবাক একটা প্রশ্ন করল আমাকে, আচ্ছা বাপী, আমি যদি তোমার সত্যিকার মেয়ে হতাম, তাহলে কত বছর বয়স পর্যন্ত আমাকে গোসল করিয়ে দিতে? বাথরুমে একদিন আমাকে বাথটাবটা ভরতে দেখে সে জিজ্ঞেস করেছিল, ছোট্ট বাচ্চারা এতে ডুবে যেতে পারে কি না। আমি বলেছিলাম, বাবার হাত ফসকে কোনো বাচ্চা টাবে ডুবে যায় না। কথাটা নিয়ে নিশ্চয় মায়া অনেক ভেবেছে।
‘মায়ার প্রশ্নের কোনো উত্তর কি সত্যিই আমার জানা আছে? তার প্রশ্নে একটা পুরোনো ব্যথা জাগল। চোখ বন্ধ করলে দেখলাম, একটা ছোট টাবে যাতে পানি টলটল করছে, তুলতুলে শরীরের ছোট একটি বাবুকে নামাচ্ছি। তার নরম শরীরে পানি ডলে দিচ্ছি। আহ্। আমি বুকে কষ্ট ধরে রেখে বললাম, বাবারা কত বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েদের গোসল করিয়ে দেয়, এ কথা তুই তোর মাকে বরং জিজ্ঞেস করিস।’
হাসান সাহেবের জীবনে বেশ জটিলতা শুরু হয়েছে। মায়া কলেজে ভর্তি হয়েছে ঢাকায়। বেশির ভাগ সময় সে হোস্টেলে থাকে। হাসান সাহেবও মেয়েকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য ঢাকাতে সপ্তাহে দু-তিন দিন থাকেন। বাবা-মেয়েতে মিলে চায়নিজ খান, সিনেমা দেখেন, শপিং করেন। হাসান সাহেব দেখছেন, শপিংটা মায়াকে খুব আনন্দ দেয়। আমেরিকাতে তিনি শপিং করাকে অপছন্দ করতেন। অথচ এখন নিত্য শপিং করেন। মেয়ের জামাকাপড়, শাড়ি, গয়না, কসমেটিকস, জুতা, কত কী! বারিধারায় তাঁর ফ্ল্যাটের একটা ঘর ভরে গেছে মায়ার জিনিসপত্রে। মায়া মাঝেমধ্যে রাতে থাকে, বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। তারপর বাবার পাশে একটা বাচ্চার মতো কুঁকড়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
সে তুলনায় আমার বন্ধু আলমগীরের জীবনে জটিলতা কম, অথবা, কম না হলেও ভিন্ন। ইসমাইল মিয়াজির ১৫ বিঘা জমি কেনা হয়ে গেছে, ভুট্টা চাষের আয়োজনও চলছে। কিন্তু এরই মধ্যে আলাউদ্দিন আরও জমির তালাশ নিয়ে এসেছে। তবে আলমগীর শুনেছে, সিঙ্গাইড়ের দু-তিন গ্রামের মানুষজন নাকি আলাউদ্দিনকে দেখলে ভয়ে পালায়। সে কারও বাড়ি গেলে দরোজা লাগিয়ে দেয়। দু-তিন দিন তাকে থানার পুলিশের সঙ্গে ঘুরতেও দেখা গেছে।
এক রাতে হাসান সাহেবের খামারবাড়িতে হইহই করে খামারের কয়েকজন কর্মচারী এবং গ্রামের মানুষ ঢুকে পড়ল। সকলের সামনে আতর আলীর বিধবা স্ত্রী। হাসান সাহেব হইহই শুনে বারান্দায় নেমে এসেছিলেন। মানুষগুলোর সামনে দাঁড়াতেই তিনি শুনলেন, আতর আলীর স্ত্রীর ফরিয়াদ, ‘আমার মাইয়াডারে ফিরাইয়া দেন স্যার।’
হাসান সাহেব কিছুই বুঝতে পারলেন না। কী বলবেন, তাও মাথায় এল না। কিন্তু তাঁকে কিছু বলতে হলো না, মায়া তাঁর পেছনে পেছনে দোতলা থেকে নেমে এসে বলল, ‘না, আমি বাপীর সঙ্গে থাকব। বাপীকে ছেড়ে যাব না।’
মায়াকে একজন শক্তিশালী লোক, তার বড় মামা, হাত ধরে টানতে থাকলেন, ‘গরিবের মাইয়া গরিবের ঘরে ফির্যা আয়। ধনীর ঘরে বান্দীগিরি করন লাগব না। আয়।’—বলে বড় মামা জোর করে মায়াকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। হাসান সাহেব হতবাক হলেন, লোকগুলোর অভিযোগের মানেটা ধরতে পেরে লজ্জায়-ঘৃণায়-রাগে দিশাহারা হয়ে পড়লেন। তা ছাড়া, তাঁরই কিছু কর্মচারী ঢিল মেরে তাঁর জানালার কাচ ভেঙেছে, ফুলের গাছ উপড়ে দিয়েছে, খারাপ স্লোগান দিয়েছে। এটা কী করে সহ্য করা যায়?
তিনি পরদিন পুলিশ ডাকলেন।
আশ্চর্য, পুলিশ আমার বন্ধু আলমগীরকেও ডাকতে হলো। কারণটা অবশ্য ভিন্ন, খামারের পশ্চিম দিকের যে খালটা কিছুটা দক্ষিণে গিয়ে ধলেশ্বরী নদীতে পড়েছে, সে খালে একদিন ইজ্জত আলীর লাশ ভেসে উঠল। ইজ্জত আলী তাঁর আড়াই একর জমি বিক্রি করতে চাননি। অথচ আলাউদ্দিন বলেছে এবং আলমগীর তাঁর বক্তব্যের যুক্তিটা অস্বীকার করতে পারেনি—‘যদি ৪০ ফ্রিজিয়ান গরু আনতেই হয় এই খামারে, তবে ওই জমিটুকু দরকার। ওই জমির ঘাসগুলো দেখেন স্যার। এই কিসিমের ঘাস বাংলাদেশের কোথাও পাইবেন না।’
কিন্তু ইজ্জত আলীর বিধবা স্ত্রী আর ভাই মিলে গোটা তিরিশেক মানুষ নিয়ে হামলা করেছে আলমগীরের বাগানবাড়িতে। পুলিশ একে হামলাই বলেছে, যদিও আলমগীর স্বীকার করেছে, তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। ‘কিন্তু ভাই,’ আলমগীর আমাকে বলেছে, ‘চাদরের নিচে যে দু-একটা দা লুকিয়ে আনেনি তারা, সেটা হলফ করে কীভাবে বলতে পারি?’
সত্যিই তো।
ইউসুফ হাসান ডলি খামারের সব কর্মচারীকে ছাঁটাই করে দিয়ে নতুন কর্মচারী নিয়েছেন। আতর আলীর বিধবা স্ত্রীকেও ছাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁকে তিনি মানবিক কারণে মুরগি ফার্মে একটা ভালো চাকরি দিয়েছিলেন। কিন্তু সে যে তাঁর দয়ার যোগ্য, তা প্রমাণ করতে পারেনি। যারা নতুন এসেছে তারা সব বাইরের। স্থানীয় কেউ নেই। কিছু কম বেতনেই তারা সন্তুষ্ট। আবাসিক ডাক্তারকে বিদেয় করেছেন হাসান সাহেব। ভালুকায় এখন প্রচুর ডাক্তার, দরকার হলে কর্মচারীরা তাঁদের কাছে যাবে। হাসান সাহেব দুজন সুপারভাইজার রেখেছেন। এখন এদের সঙ্গেই তাঁর একমাত্র যোগাযোগ। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘মানুষ শক্তের ভক্ত, নরমের যম, কথাটা প্রথম বোধ হয় কনফুসিয়াস বলেছিলেন। এখন এর সত্যতার প্রমাণ পাচ্ছি।’ হাসান অবশ্য মায়ার কথা কিছু লিখেননি। মায়ার খবর আমরাও জানি না। আপনারা কেউ জানলে আমাদের জানাবেন।
এবং কী আশ্চর্য, আলমগীর ও তার খামারের সব কর্মচারী পাল্টেছে! এখন দেখে দেখে শক্ত-সমর্থ শরীরের অস্থানীয় কামলা রেখেছে। আলাউদ্দিনকে অবশ্য ছাঁটাই করতে হয়নি, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে, ইজ্জত আলীকে খুন করার অভিযোগে।
আলমগীর এক সন্ধ্যায় আমাকে ফোনে বলেছে, যদি মানুষ আফিম খেয়ে শুয়ে থাকতে চায়, তাহলে তাকে জাগাবার, তাকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে পথে ফেরাবার ভার কি আমার একার? তা আর বলতে—আমি বলেছি।
হাসান সাহেব ও আমার বন্ধু আলমগীর তাদের খামারবাড়িতে ভোজের ব্যবস্থা করেছে। ঢাকা থেকে গানঅলা-বাজনাঅলা যাবেন। আমোদফুর্তি আর গানবাজনা হবে। দুজনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই, দুজন দুই ভূগোলের মানুষ। অথচ আশ্চর্য, তাদের খামারবাড়িতে ভোজ ও আনন্দের ব্যবস্থা হয়েছে একই দিনে! এখন সমস্যা হচ্ছে, আমার মতো যারা তাদের দুজনের দাওয়াতই পেয়েছে, তারা কী করবে? কোথায় যাবে? সিঙ্গাইর, না ভালুকা?

বিজ্ঞাপন
অমর একুশে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন