শহীদ বুদ্ধিজীবী: আমার বাবা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচিত হয়েছে কোটি মানুষের স্বপ্নে, বীরত্বে, ত্যাগে। ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা উজ্জ্বল হয়ে আছেন আত্মত্যাগের মহিমায়। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে প্রথম আলোর আজকের এ আয়োজন।

ফাইল ছবি

দেয়ালে টানানো ছবি দেখে আর আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে হৃদয়ে এঁকেছি একটি মুখ—সে মুখ আমার একান্ত আপনজনের, আমার বাবার (শেখ মো. শামসুজ্জোহা: শিক্ষক, কোটচাঁদপুর বালিকা বিদ্যালয়, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ}। ’৭১-এর এক শহীদ পিতার একমাত্র স্মৃতি আমি। বাবাকে আমি দেখিনি। আমার জন্মের ছয় মাস আগে ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল, মঙ্গলবার আনুমানিক বেলা তিনটার সময় নিষ্ঠুর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মম-নৃশংসভাবে আমার বাবা শেখ মো. শামসুজ্জোহাকে বাড়ির পেছনে অবস্থিত নলডাঙ্গা ভূষণ হাইস্কুলের মাঠে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুসঙ্গী হয়েছিলেন আমার বড় চাচা শেখ মো. রুস্তম আলী এবং আমার সেজ খালু মো. নূর ইসলাম।

আমার বড় চাচা তখন পাকিস্তান সরকারের অধীনে থানা অ্যাগ্রিকালচার অফিসার ছিলেন এবং আমার সেজ খালু ছিলেন একজন বিশিষ্ট ওষুধ ব্যবসায়ী—কালীগঞ্জ বাজারে ‘হাফিজ মেডিকেল স্টোর’ নামে তাঁর একটা বড় দোকান ছিল। সুদীর্ঘ পাঁচ দিন অনেক খোঁজাখুঁজির পর ২৪ এপ্রিল শনিবার তাঁদের কুকুর-শৃগালে খাওয়া মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে কালীগঞ্জের অদূরে গান্না নামক গ্রামে (আমার নানার বাড়ি) সমাহিত করা হয়।

আমার বাবা-চাচা-খালুর মৃত্যু সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী ১০–১১ বছর বয়সী একটি মেয়ের কাছ থেকে পরে অনেক কিছু জানা গিয়েছিল। মেয়েটির নাম ময়না। সে আমার বড় চাচার বাড়ির পেছনে স্কুলের মাঠসংলগ্ন একটি ঝুপড়িতে পাগলিনী, অসুস্থ মাকে নিয়ে থাকত—আমার বড় চাচাকে সে মেসোমশাই এবং বড় চাচিকে মাসিমা বলে ডাকত, আমার বাবাকে ডাকত ছোট কাকাবাবু বলে। সে প্রতিদিনই আমাদের বাসায় আসত এবং গৃহকর্মে আমার বড় চাচিকে সাহায্য করত। বড় চাচা তাকে খুবই স্নেহ করতেন। বড় চাচি তিনবেলা তাকে যে খাবার দিতেন, তাতে ভালোভাবে মা ও মেয়ের দিন চলে যেত। ঘটনার দিন ময়না তার মাকে নিয়ে ঝুপড়িতে বসে ছিল, হঠাৎ দেখতে পেল খাকি পোশাক পরা অনেক মানুষ (যাদের সবার হাতেই অস্ত্র) আমার বাবা, চাচা ও খালুকে বাড়ির পেছনের পুকুরপাড় দিয়ে নামিয়ে নিয়ে আসছে। ও ভেবেছিল মেসোমশাই এবং কাকাবাবু তো শিক্ষিত মানুষ, নিশ্চয়ই ওরা কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেই ছেড়ে দেবে। ভাঙা বেড়ার ফুটো দিয়ে সে গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে লক্ষ করছিল সবকিছু। হঠাৎ সে অবাক হয়ে দেখল, স্কুলের মাঠের কিনারে নিয়ে গিয়ে ওরা আমার বাবা, বড় চাচা এবং খালুকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি করল। গুলি করার আগমুহূর্তে আমার বড় চাচা নাকি হাত জোড় করে বারবার আমার বাবাকে দেখিয়ে কী যেন বলছিলেন, হয়তো প্রাণপ্রিয় ছোট ভাইটির জীবনভিক্ষা চেয়েছিলেন কিন্তু পাষণ্ডদের মন গলেনি।

আমার বাবা ছিলেন মাত্র ২৬ বছর বয়সী এক স্বাস্থ্যবান যুবক, তাই গুলি করার পরও তিনি নাকি উঠে বসার চেষ্টা করছিলেন, তখন নরপিশাচেরা রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে আমার বাবার মাথাটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তাঁর কণ্ঠকে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দেয়। আমার বড় চাচা এবং খালু নাকি বহুক্ষণ আর্তনাদ করে করে একসময় নিস্তব্ধ হয়ে যান। ময়না নামের সেই ছোট্ট মেয়েটি ঘটনার আকস্মিকতায় এবং ভয়ে আমার বাবা-চাচার মুখে একটুও পানি দিতে পারেনি বা কাছে এগিয়ে যেতে পারেনি। আজও দেখা হলে সে সেই দুঃখ করে। বড় হওয়ার পর তার মুখ থেকে যতবার এ ঘটনা শুনি, এক দুঃসহ বেদনা অনুভব করি। আমার হৃদয়ের এ রক্তক্ষরণ হয়তো কোনো দিনই বন্ধ হবে না!

আমার বাবা ছিলেন কোটচাঁদপুর বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক। এ ছাড়া স্থানীয় আরও দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তিনি পার্টটাইম চাকরি করতেন। তিনি সম্মিলনী ইনস্টিটিউট, যশোর থেকে ম্যাট্রিক এবং যশোর এমএম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের অধীনে বিএসসি পাস করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।

আত্মীয়স্বজন বিশেষ করে আমার বড় চাচির কাছে আমার বাবার অনেক গল্প-কথা শুনেছি। যত দূর জেনেছি, তিনি ছিলেন কৌতুকপ্রিয়, পরোপকারী প্রাণোচ্ছল এক সুদর্শন যুবক। যেকোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনাকে তিনি অত্যন্ত সহজভাবে গ্রহণ করতেন এবং তার মধ্যে সীমাহীন আনন্দরস খুঁজে পেতেন। শিশুকালে মাতৃহারা হওয়ার পর তিনি প্রথমে তাঁর দাদিমা এবং পরে তাঁর বড় ভাবির (আমার বড় চাচি, যিনি একই সময়ে আমার মায়ের সঙ্গে বিধবা হন) একান্ত স্নেহ-আদরে প্রতিপালিত হন। শুনেছি, আমার বাবার শিশুবয়সের সব দুষ্টুমি আর দৌরাত্ম্য আমার বড় চাচি হাসিমুখে সহ্য করতেন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের ১৭ তারিখে মায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে এবং এর মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তিনি শহীদ হন। তাঁর স্বল্পকালীন শিক্ষকতার জীবনে তিনি অনেক গরিব ছেলেমেয়েকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন এবং বই–পুস্তক কিনে দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁর সারল্য ও বন্ধু-বাৎসল্যের কথা এখনো তাঁর বন্ধুবান্ধবের মুখে শুনি। তিনি নাকি ভালো বক্তা ছিলেন, খেলতেন (ক্যারাম, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি) এবং চা খেতে খুব পছন্দ করতেন। সাঁতারেও তিনি বেশ দক্ষ ছিলেন বলে শুনেছি।

তিনি খুব সাহসী, পরোপকারী এবং গোছানো স্বভাবের ছিলেন। এসবই আমার শোনা কথা। জন্মে যে পিতাকে চোখে দেখিনি, তাঁর স্নেহ-আদর পাইনি, কল্পনায় তাঁর সঙ্গে আমি কত কথা বলি। সংঘাতময় জীবনের প্রতি পদে তাঁর অভাব আমি অনুভব করি। আমার মা, যিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলেন, মাত্র তিন মাসের মধ্যে যাঁর সব আশা, সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, তিনি আজও পাননি কোনো সরকারি সাহায্য বা অনুদান। বহু কষ্টে তিনি আমাকে লালনপালন করেছেন এবং অদ্যাবধি আমার শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করছেন। আমার ভবিষ্যৎ কী, তা আমি জানি না!

আমার মা-চাচি-খালার সদা ম্লান মুখ দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়, তবু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা আমার বাবা-চাচা-খালুর আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্ত, এ দেশের শ্যামল মাটিতে তাঁদের শোণিত ধারা মিশে আছে—এ কথা ভাবলে গর্বে আমার বুক ভরে ওঠে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে—এসেছে শপথ নেওয়ার দিন। আমার বাবা-চাচা-খালুর মতো লাখো শহীদের রক্ত যেন বৃথা না যায়, কোনো অশুভ শক্তিই যেন স্বাধীনতাযুদ্ধের আদর্শ আর চেতনাকে মুছে দিতে না পারে—সেই প্রচেষ্টা করতে হবে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে রুখতে হবে—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

সূত্র: স্মৃতি ১৯৭১. দ্বিতীয় খণ্ড (সম্পাদনা: রশীদ হায়দার, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম সংস্করণ ২০১৮, বাংলা একাডেমি) গ্রন্থ থেকে।