গর্বিত-তৃপ্ত সাকিবের মা

ছেলের পুরস্কার নিতে একবার মঞ্চে উঠেছেন। অনুষ্ঠান শেষে আরেকবার উঠলেন, সব পুরস্কারজয়ীকে নিয়ে ‘অফিশিয়াল’ ফটোসেশনের জন্য। সেই যে উঠলেন, আর নামাই হচ্ছে না শিরিন আখতারের। দর্শকদের অনেকেই হুড়মুড় করে ছুটল তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য। ছেলে ছবি তুলছে, মা-ও তুলছেন। মেয়ে তুলছে, বাবাও তুলছেন। আক্ষরিক অর্থেই ছেলে-বুড়ো সবাই।
মঞ্চ থেকে নামার পরও তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। রূপসী বাংলার হল রুম থেকে অনুষ্ঠানের মূল ফটক পর্যন্ত ১০০ মিটার মতো জায়গা পেরিয়ে আসতে লেগে গেল প্রায় ১৫ মিনিট। একটা ছবি তোলা, একটু কথা বলার সুযোগ চায় সবাই। শরীরটা খুব বেশি ভালো নেই, এর মধ্যেই আসতে হয়েছে সেই মাগুরা থেকে। তার পরও সবার আবদার রাখছেন। হাসিমুখে ছবি তুলছেন, ধৈর্য ধরে কথা শুনছেন, কথা বলছেন। ছেলে কতটা জনপ্রিয়, আরেকবার বুঝতে পারলেন সাকিব আল হাসানের মা!
অনেকক্ষণ পর তাঁর সঙ্গে কথা বলার ফুরসত পাওয়া গেল। খ্যাতির এই বিড়ম্বনায় তিনি মোটামুটি অভ্যস্ত। গত বছর আরেকটি অনুষ্ঠানে সাকিবের হয়ে পুরস্কার নিয়েছিলেন। সেখানেও এমন হুড়োহুড়ি। ‘সাকিবের মা’ জানলে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় সব জায়গাতেই। তবে ‘বিড়ম্বনা’ নয়, এসবকে তিনি মনে করেন বড় পাওয়া, ‘লোকে সাকিবকে অনেক ভালোবাসে বলেই তো আমার জন্য এই ভালোবাসা, সম্মান। আমার হাতের এই ট্রফি যেমন ভালো খেলার পুরস্কার, লোকের ভালোবাসাও তেমনি ভালো খেলার পুরস্কার। বরং এটাকেই আমি সবচেয়ে বেশি মূল্য দিই। মানুষের এত ভালোবাসা কজন পায়! সাকিব দেশের জন্য ভালো খেলে এই ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছে।’
বছর পাঁচেক ধরেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন সাকিব আল হাসান। সেটিরই প্রতিফলন গ্রামীণফোন-প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারেও। পারফরম্যান্সে যেমন নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন সাকিব, গ্রামীণফোন-প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারেও তেমনি সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি। এবার নিয়ে গত পাঁচ বছরে চারবারই বর্ষসেরা। সাকিবের আধিপত্য এবং কৃতিত্ব বোঝাতে একটি তথ্যই যথেষ্ট, সাকিব ছাড়া একবারের বেশি বর্ষসেরাও হতে পারেননি আর কেউ!
এবারও যেমন নাম ঘোষণাটা ছিল আনুষ্ঠানিকতামাত্র। গোপনীয়তা রক্ষা শুধুই আয়োজনের নৈতিক অবস্থানটা ধরে রাখা। বিবেচনায় যখন ২০১২ সালের পারফরম্যান্স, বর্ষসেরা সাকিব ছাড়া আর কেই-বা হতে পারেন! এশিয়া কাপে উপমহাদেশের সব মহাতারকাকে ছাপিয়ে, প্রথম বিপিএলে বিদেশি তারকাদের ভিড়ে তিনিই টুর্নামেন্ট-সেরা। টেস্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান, উইকেটেও দুইয়ে।
আগের তিনটি ট্রফি সাকিব নিজেই নিয়েছেন। এবার তিনি শ্বশুড়বাড়ি, যুক্তরাষ্ট্রে। তবে মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে নিয়মিতই। প্রথম আলোর আমন্ত্রণ পাওয়ার পর সাকিব নিজেই ফোন করে মাকে বলেছেন অনুষ্ঠানে আসতে। কেমন লাগে ছেলের সাফল্যের স্বীকৃতি গ্রহণ করতে? ‘এটা তো আসলে ভাষায় বোঝানো যায় না। সব বাবা-মাই চান সন্তানের সাফল্য। আর সন্তানের কারণে যখন এত সম্মান পাওয়া যায়, গর্বে তখন বুকটা ভরে যায়।’
চোখের সামনেই ছোট্ট ছেলেটাকে দেখলেন বড় হয়ে উঠতে। এত বড়, যেখানে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখে বাকিরা। আজ সাকিব হতে চান দেশের লাখো কিশোর-তরুণ, দেশের সব বাবা-মা চান এমন একজন সন্তান। তো একজন সাকিব আল হাসান হওয়ার রেসিপি কী? যিনি সবচেয়ে ভালো বলতে পারেন, সেই মা বললেন, ‘তীব্র ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও সততা। সাকিব এই নিয়েই এগিয়েছে।’
আগে ক্রিকেট কিছুই বুঝতেন না শিরিন আখতার। সাকিবের কারণেই খেলা দেখতে দেখতে এখন অনেক কিছু বোঝেন। এখন সাকিবের খেলা দেখতে টিভির সামনে বসলে বুক কাঁপে। ছেলের অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা অবশ্য অতটা বোঝেন না। শুধু জানেন, তাঁর ছেলেকে পুরো দেশ ভালোবাসে। ছেলেকে প্রায় কাছেই পান না বলতে গেলে। তার পরও রাতে তৃপ্তি নিয়েই ঘুমাতে যান, ‘আমার ছেলে এখন গোটা দেশের সন্তান, এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কি আছে!’