ইউরোপে কোন দলের আক্রমণভাগ এখন সবচেয়ে ভয়ংকর

গত মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে সবচেয়ে বেশি গোল করা আক্রমণত্রয়ী ছিল বায়ার্ন মিউনিখের। কিন্তু নতুন মৌসুমে সেই মুকুট আপাতত অন্যের মাথায়।বার্সেলোনা, ম্যান সিটি ও রিয়াল মাদ্রিদ

তিনজন মিলে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ত্রাস ছড়াচ্ছেন। একজন গোল করছেন, আরেকজন গোলের সুযোগ তৈরি করছেন। কখনো আবার তিনজনই হয়ে উঠছেন গোলশিকারি। ফুটবলে এমন আক্রমণত্রয়ী যেকোনো দলের জন্য আশীর্বাদ। প্রতিপক্ষের জন্য রীতিমতো দুঃস্বপ্ন।

একসময় বার্সেলোনার লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ ও নেইমারের ‘এমএসএন’ কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, করিম বেনজেমা ও গ্যারেথ বেলের ‘বিবিসি’ ছিল প্রতিপক্ষের রক্ষণের আতঙ্ক। সেই দিনগুলো এখন ইতিহাসের পাতায়। তবে ইউরোপের ফুটবলে গোলের উৎসব থেমে নেই। বদলেছে শুধু উৎসবের আয়োজকেরা।

গত মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে সবচেয়ে বেশি গোল করা আক্রমণত্রয়ী ছিল বায়ার্ন মিউনিখের। কিন্তু নতুন মৌসুমে সেই মুকুট আপাতত অন্যের মাথায়। আর সেই দলটির নাম বার্সেলোনা।

আরও পড়ুন

চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করা তিন ফুটবলারের হিসাব করলে অনেকটা এগিয়ে বার্সেলোনা। রাফিনিয়া, লামিনে ইয়ামাল ও ফেরমিন লোপেজ মিলে করেছেন ২৮ গোল। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বায়ার্ন মিউনিখের তিন ফুটবলারের সম্মিলিত গোল ২৩টি।

তবে এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। এই হিসাব প্রচলিত অর্থে আক্রমণভাগের তিন ফুটবলারের নয়। প্রতিটি দলের সর্বোচ্চ গোল করা তিনজনকে নিয়ে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা একই সঙ্গে মাঠে খেলেছেন কি না, কিংবা তিনজনই ফরোয়ার্ড কি না, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

মৌসুমের এখনো অনেকটা পথ বাকি। ফলে এই তালিকায় যে অদলবদল হবে, তা বলাই যায়। আপাতত দেখে নেওয়া যাক গোলের হিসাবে ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর পাঁচ আক্রমণত্রয়ীকে।

১. রাফিনিয়া, ইয়ামাল ও লোপেজ (বার্সেলোনা): ২৮ গোল

রাফিনিয়া, ইয়ামাল ও লোপেজ মিলে করেছেন ২৮ গোল।
বার্সেলোনা

রবার্ট লেভানডফস্কি চলে গেছেন। তাতে কী! বার্সেলোনার গোল করার লোকের অভাব হয়নি। বরং পোলিশ স্ট্রাইকারের বিদায়ের পর নতুন এক রাফিনিয়ার দেখা মিলেছে।
ব্রাজিলিয়ান এই ফুটবলার এখন খেলছেন সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে। আর নতুন ভূমিকায় নিজেকে এমনভাবে মানিয়ে নিয়েছেন, যেন এই জায়গাতেই খেলার জন্য তাঁর জন্ম!
রাফিনিয়ার পাশে আছেন লামিনে ইয়ামাল। বয়স কম, কিন্তু ফুটবলীয় প্রতিভা আর মাঠের পারফরম্যান্সে তিনি যেন বয়সের হিসাব মানতেই নারাজ। প্রতিপক্ষের রক্ষণে আতঙ্ক ছড়ানো তাঁর কাছে এখন নিত্যদিনের ব্যাপার।
এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোল রাফিনিয়ার, ১৪টি। ইয়ামাল করেছেন ৯ গোল। এই দুজনের সঙ্গে গোলের হিসাবে যোগ দিয়েছেন ফেরমিন লোপেজ। ৫ গোল করেছেন স্প্যানিশ এই মিডফিল্ডার। যদিও তিনি পুরোদস্তুর আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নন। ফলে মৌসুম এগোনোর সঙ্গে বার্সেলোনার সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনজনের তালিকায় তাঁর জায়গা বদলে যেতে পারে।
কিন্তু আপাতত বার্সেলোনার এই তিনজনই ইউরোপের সবার ওপরে। ২৮ গোলের সামনে বাকিরা যেন অনেকটা দূরের পথিক।

২. মাইকেল ওলিসে, লুইস দিয়াজ ও হ্যারি কেইন (বায়ার্ন মিউনিখ): ২৩ গোল

মাইকেল ওলিসে, লুইস দিয়াজ ও হ্যারি কেইন মিলে করেছেন ২৩ গোল
ট্রান্সফারমার্কেট

গত মৌসুমের রাজারা এবার দুই নম্বরে। তবে বায়ার্ন মিউনিখের আক্রমণভাগের তিন তারকাকে দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা পুরোনো মুকুট ফিরে পেতে বেশ মরিয়া।
লাইপজিগের বিপক্ষে বায়ার্নের ৬-১ গোলের জয়টিই ধরুন। সেই ম্যাচে এই তিনজন মিলে করেছেন পাঁচ গোল। লুইস দিয়াজ একাই করেছেন হ্যাটট্রিক।
কলম্বিয়ান এই উইঙ্গারের সঙ্গে আছেন মাইকেল ওলিসে। এরই মধ্যে সব প্রতিযোগিতা মিলে তাঁর ৯ গোল হয়ে গেছে।
আর হ্যারি কেইন? ইংল্যান্ড অধিনায়ককে নিয়ে নতুন করে বলার কী আছে! গোল করা যাঁর প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তাঁকে নিয়ে অনুমান করাও সহজ। মৌসুমে তাঁর গোলসংখ্যাও ৯। ওলিসে, দিয়াজ ও কেইন মিলে এখন পর্যন্ত করেছেন ২৩ গোল।

৩. আর্লিং হলান্ড, রায়ান শেরকি ও সেমেনিও (ম্যানচেস্টার সিটি): ১৯ গোল

ম্যান সিটিতে হলান্ডের পাশে রায়ান শেরকিও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন।
ম্যান সিটি

মাঠের বাইরে ম্যানচেস্টার সিটিকে ঘিরে নানা আলোচনা। কিন্তু মাঠে বল গড়ালেই যেন সব ভুলে যায় পেপ গার্দিওলার দল। গোল করা আর ম্যাচ জেতার কাজটা তারা চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের মতো করেই।
আর গোলের কথা উঠলে আর্লিং হলান্ডের নাম আসবে না, তা কি হয়!
নরওয়ের এই স্ট্রাইকার প্রিমিয়ার লিগে প্রথম সাত ম্যাচেই করেছেন আট গোল। অর্থাৎ গোল করার যন্ত্রটি নতুন মৌসুমেও পুরোনো ছন্দেই চলছে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তাঁর গোল ১২টি।
হলান্ডের পাশে রায়ান শেরকিও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন। গত মৌসুমে চার গোল করেছিলেন। এবার এরই মধ্যে সেই সংখ্যা পেরিয়ে গেছেন। তালিকার তৃতীয় নাম সেমেনিও। তিনজন মিলে ১৯ গোল করে ইউরোপের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোল করা আক্রমণত্রয়ী এখন সিটির।
বার্সেলোনার সঙ্গে ব্যবধানটা বড়। তবে হলান্ড যে ছন্দে আছেন, তাতে এই লড়াইয়ের শেষ কথা এখনই বলে দেওয়া কঠিন।

আরও পড়ুন

৪. কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহাম ও কার্লোস এসপি (রিয়াল মাদ্রিদ): ১৭ গোল

এমবাপ্পের সঙ্গে বেলিংহাম। রিয়ালের দারুণ ফর্মে থাকা জুটি।
রিয়াল মাদ্রিদ

রিয়াল মাদ্রিদে জোসে মরিনিওর দ্বিতীয় অধ্যায় এখনো পুরোপুরি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তবে পর্তুগিজ কোচের স্বস্তির জায়গা দলের আক্রমণভাগ।
বিশেষ করে কিলিয়ান এমবাপ্পে।
ফরাসি তারকা লা লিগায় এরই মধ্যে করেছেন সাত গোল। গোল করার দায়িত্বটা যেন নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন তিনি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তাঁর গোল ১১টি।
এমবাপ্পের পাশে জুড বেলিংহামও গোল করছেন। ইংলিশ মিডফিল্ডারের আক্রমণে উঠে আসা, সুযোগ বুঝে বক্সে ঢুকে পড়া কিংবা গোলের সামনে হাজির হওয়ার দক্ষতা রিয়ালের জন্য বাড়তি শক্তি।
এই দুজনের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন গ্রীষ্মকালীন দলবদলে আসা কার্লোস এসপি। নতুন পরিবেশে তিনিও নিজের কার্যকারিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনজনের মিলিত গোলসংখ্যা ১৭টি। ইউরোপের সেরা আক্রমণত্রয়ীর লড়াইয়ে তাই রিয়ালও আছে। তবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার সঙ্গে ব্যবধানটা যে এখন বেশ বড়!

৫. আন্তোনিও রাইমন্দো, জর্জি কেভেরনাদজে ও জাকোমো কালো (ফ্রোজিনোনে): ১৫ গোল

ইউরোপের বড় বড় তারকার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে ফ্রোজিনোনের আক্রমণভাগ।
এএফপি

এই তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক সম্ভবত ফ্রোজিনোনে।
বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার সিটি, বায়ার্ন মিউনিখ কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের তারকাদের সবাই চেনেন। কিন্তু আন্তোনিও রাইমন্দো, জর্জি কেভেরনাদজে ও জাকোমো কালোর নাম শুনে অনেক ফুটবলপ্রেমীকেই হয়তো একটু ভাবতে হবে।
অথচ গোলের হিসাবে ইউরোপের বড় বড় তারকার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন ইতালিয়ান ক্লাবটির ত্রয়ীরা।
ফিওরেন্তিনার মাঠে ৩-০ গোলের জয়, সেস্ক ফ্যাব্রিগাসের কোমোকে হারানো কিংবা সাসসুয়োলোর জালে চার গোল দেওয়ার মতো পারফরম্যান্সে ফ্রোজিনোনের আক্রমণভাগ নিজেদের শক্তির পরিচয় দিয়েছে।
এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোল রাইমন্দোর, আটটি। কেভেরনাদজে করেছেন পাঁচ গোল, কালোর দুটি।
সব মিলিয়ে ১৫ গোল। নামের চাকচিক্যে তাঁরা হয়তো অনেকের পেছনে। কিন্তু গোলের হিসাবে বড় তারকাদের পাশে নিজেদের নামটা ঠিকই লিখিয়ে নিয়েছেন।
ফুটবল যে শুধু বিখ্যাতদের খেলা নয়, ফ্রোজিনোনের এই তিনজন যেন সেটিই মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
মৌসুম যত এগোবে, গোলের এই প্রতিযোগিতাও তত জমে উঠবে। কেইন, হলান্ড কিংবা এমবাপ্পেরা নিশ্চয়ই বার্সেলোনার তিনজনকে এত সহজে মুকুট নিয়ে যেতে দেবেন না।
কে জানে, মৌসুম শেষে সিংহাসনটা কার দখলে থাকবে!