মেসি না রোনালদো: বয়স ৩০ পেরোনোর পর কে বেশি ভালো
১২ অক্টোবর আল নাসরের ঘরের মাঠে গোল করলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগে উজবেক ক্লাব নেফতচি ফারগানার বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয়। বয়স তখন ৪১ বছর ৮ মাস।
পাঁচ দিন পর ১৭ অক্টোবর আটলান্টা ইউনাইটেডের মাঠে ইন্টার মায়ামির ৩-১ জয়ে দুটি গোল করলেন লিওনেল মেসি। বয়স ৩৯ বছর ৩ মাস।
একই সপ্তাহ, একই কাজ, দুই মহাদেশ।
ফুটবলের পুরোনো ব্যাকরণে এই দৃশ্যটা ভুল। ডিয়েগো ম্যারাডোনা ৩০ ছুঁয়েছিলেন ১৯৯০ সালের অক্টোবরে। বিশ্বকাপ ফাইনালে কান্নাভেজা হারের তখন তিন মাসও হয়নি। তারপর নাপোলিতে কোকেনের পরীক্ষায় ধরা পড়ে ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা। এরপর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ পরীক্ষায় ধরা পড়ে টুর্নামেন্ট থেকেই বিদায়। ৩০–এর পর প্রতিভার সূর্যাস্ত, এটাই ছিল ফুটবলের পাঠ্যবইয়ের নিয়ম।
মেসি-রোনালদো সেই পাঠ্যবই ছিঁড়ে ফেলেছেন। এবার দেখা যাক, ছেঁড়া পাতার ওপাশে তাঁরা কী লিখলেন।
সংখ্যার প্রথম অধ্যায়
৩০–এর পর মেসি খেলেছেন ৪৮০ ম্যাচ; গোল ৩৭১, অ্যাসিস্ট ১৯৬ (অপ্টার হিসাবে)। রোনালদো খেলেছেন ৬২২ ম্যাচ; গোল ৫১৮, অ্যাসিস্ট ১০৬।
গোল আর অ্যাসিস্ট যোগ করলে রোনালদো এগিয়ে, ৬২৪ বনাম ৫৬৭। কিন্তু ওই ৬২৪ পেতে তাঁকে ১৪২ ম্যাচ বেশি খেলতে হয়েছে। ম্যাচপ্রতি হিসাবে ছবিটা উল্টে যায়। মেসির ১.১৮, রোনালদোর ১.০০। সময়ের হিসাবে মেসি প্রতি ৭২ মিনিটে একটি গোলে অবদান রাখেন। রোনালদো প্রতি ৮৫ মিনিটে।
শুধু গোল ধরলে ফারাক সামান্য। ম্যাচপ্রতি রোনালদো ০.৮৩, মেসি ০.৭৭। তবে গোলের ভেতরের গল্পটা আলাদা। রোনালদোর ১১০টি গোল এসেছে পেনাল্টি থেকে, মেসির ৪১টি। অর্থাৎ, রোনালদোর ২১ শতাংশের বেশি গোলের জন্মই স্পট–কিকে, মেসির ১১ শতাংশ। পেনাল্টি বাদ দিলেও রোনালদো এগিয়ে, ৪০৮ বনাম ৩৩০। তবে একটা মজার তথ্য আছে। ফ্রি-কিক থেকে মেসির গোল ৪৩টি, রোনালদোর ২২টি। ফ্রি-কিকের ওস্তাদ হিসেবে খ্যাতি যাঁর বেশি, গোল তাঁর অর্ধেক।
যিনি গোল করেন, আর যিনি গোল বানান
অ্যাসিস্টের জায়গায় এসে দুজনের পথ আলাদা হয়ে যায়। অপ্টার হিসাবে ৩০ পেরোনোর পর মেসি সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন ১৯৬টি। একই সময়ে রোনালদোর অ্যাসিস্ট ১০৬টি। ট্রান্সফারমার্কটের হিসাবে ২২৬ বনাম ১২২। মেসি প্রতি ২০৭ মিনিটে একটি গোল করান। রোনালদো প্রতি ৫০০ মিনিটে।
৩০–এর পর রোনালদো ক্রমে বক্সের ভেতরের শিকারি হয়ে উঠলেন। মেসি নামলেন মাঝমাঠে, বল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে অন্যের জন্য গোল বুনলেন। একজন বদলালেন জায়গা, আরেকজন বদলালেন কাজ।
ক্লাব ধরে ধরে দেখলে
ক্লাব ধরলে দুটো রেখা উল্টো দিকে চলে।
রোনালদোর ৩০-পরবর্তী সেরা সময়টা একেবারে ৩০–এর ঠিক পরই। রিয়াল মাদ্রিদে ১৬১ ম্যাচে ১৬২ গোল, ম্যাচপ্রতি অবদান ১.২৭। তারপর রেখা নামতে থাকে। জুভেন্টাসে ০.৯০, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ০.৫৯। আল নাসরে এসে আবার ১.০০।
মেসির রেখা উল্টো। বার্সেলোনায় ১৯৫ ম্যাচে ১৬৫ গোল ও ৭৪ অ্যাসিস্ট, ম্যাচপ্রতি ১.২৩। পিএসজিতে ৭৫ ম্যাচে ৩২ গোল ও ৩৪ অ্যাসিস্ট, ০.৮৮। এটাই তাঁর ৩০–এর পরের একমাত্র পড়তি অধ্যায়। কিন্তু ইন্টার মায়ামিতে ১২০ ম্যাচে ১০৬ গোল ও ৫৭ অ্যাসিস্ট, ম্যাচপ্রতি ১.৩৬। ৩০–এর পর তাঁর সর্বোচ্চ।
অবশ্য এমএলএস আর লা লিগা এক নয়। সৌদি প্রো লিগ আর প্রিমিয়ার লিগও নয়। তাই এই সংখ্যাগুলো পড়তে হবে একটু সাবধানে।
ফাইনালের আলো
শিরোপার হিসাবে রোনালদো সামান্য এগিয়ে, ১৯ বনাম ১৭। ৩০–এর পর তাঁর ঝুলিতে বড় শিরোপা রিয়ালের তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ২০১৬ সালের ইউরো। সেই ইউরো ফাইনালের ছবিটা ভোলার নয়। প্যারিসে হাঁটু চেপে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ছেন রোনালদো। কিছুক্ষণ পর টাচলাইনে দাঁড়িয়ে তিনিই কোচের মতো চিৎকার করছেন। মেসির ঝুলিতে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা, আর ২০২২ সালে লুসাইলের সেই অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ।
ফাইনালের পরিসংখ্যানে আছে চমক। রোনালদো ২০ ফাইনালে জিতেছেন ১৪টি, মেসি ১৭ ফাইনালে ১২টি। জয়ের হার প্রায় সমান, ৭০ আর ৭১ শতাংশ। ফাইনালে গোল রোনালদোর বেশি, ১৪টি; মেসির ১০টি। কিন্তু অ্যাসিস্টে মেসির ৯টির বিপরীতে রোনালদো শূন্য। মেসি ফাইনালে প্রতি ৮৯ মিনিটে একটি গোলে অবদান রাখেন। রোনালদো ১২১ মিনিটে।
ব্যালন ডি’অরেও এই দুই ধারা। ৩০–এর পর রোনালদো দুটি জিতেছেন, ২০১৬ ও ২০১৭। মেসি জিতেছেন তিনটি, ২০১৯, ২০২১ ও ২০২৩।
একই প্রতিপক্ষ, দুই বিদায়
এই গ্রীষ্মের বিশ্বকাপই সম্ভবত দুজনের ৩০-পরবর্তী অধ্যায়ের শেষ বড় মঞ্চ ছিল।
৬ জুলাই আরলিংটনে পর্তুগাল স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রাউন্ড অব সিক্সটিনেই বিদায় নিল। ছয় বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড় রোনালদো মাঠ ছাড়লেন নির্বিকারভাবে। এই আসরে তাঁর গোল তিনটি। বিশ্বকাপে তাঁর সর্বোচ্চ সাফল্য ২০০৬ সালের সেমিফাইনাল।
আর মেসি? আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক দিয়ে শুরু করেছিলেন ৩৮ বছর বয়সে। সেই হ্যাটট্রিকে ছুঁয়েছিলেন মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার রেকর্ডটি অবশ্য পরে ভেঙে দিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এরপর ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে সেই স্পেনই ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে থামিয়ে দিল তাঁকে। মেসির একটি শট ফিরে এল মিকেল মেরিনোর মুখে লেগে।
একই স্পেন, একই গ্রীষ্ম, বিশ্বকাপ থেকে দুই কিংবদন্তির দুই বিদায়।
তাহলে রায়?
কার্যকারিতায় মেসি এগিয়ে। ম্যাচপ্রতি অবদান, অ্যাসিস্ট, পেনাল্টি বাদ দিলে গোলে অংশগ্রহণ, ফাইনালে প্রভাব—সবখানেই। স্থায়িত্ব আর সংখ্যায় এগিয়ে রোনালদো। বেশি ম্যাচ, বেশি গোল, মোট অবদান, ফাইনালে বেশি গোল, শিরোপাও দুটি বেশি। আর ৩০ পেরোনোর পর ৬২২ ম্যাচ খেলে ফেলা নিজেই এক অবিশ্বাস্য কীর্তি।
রোনালদো জানতেন, গোল কীভাবে নিজের নামের পাশে লিখতে হয়। মেসি শিখে নিলেন, গোল কীভাবে অন্যের নামের পাশে লিখে দিতে হয়। ৩০–এর পর দুজনের তফাত বোধ হয় এটুকুই।
ফুটবলের পুরোনো পাঠ্যবইয়ের শেষ পাতায় লেখা ছিল—৩০–এর পর আর কিছু নেই।
এই দুজন পাতাটা উল্টে দিলেন। দেখা গেল, ওপাশেও নতুন এক মহাকাব্য!