বাবা খেলেছেন রাগবি, মা টেনিস, ছেলে ফুটবলার থেকে ক্রিকেটার হয়ে বিশ্বকাপে
ক্রিকেট বৈচিত্র্যময়। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ সম্ভবত আরও এক কাঠি সরেস। টুর্নামেন্ট তো বৈচিত্র্যময় বটেই, খেলোয়াড়েরাও কম যান না!
যেমন ধরুন, কানাডার হয়ে গতকাল সেঞ্চুরি করা খেলোয়াড়টির নাম যুবরাজ সিং। ইতালির হয়ে ট্রমাস ড্রাকা নামে এক পেসার খেলছেন, যাঁর গলায় ঝুলছে ডেনিস লিলির ওয়ার্ল্ড সিরিজ জয়ের সোনার চেইন। ড্রাকার মা ইতালিয়ান, বাবার দেশ সাবেক যুগোশ্লাভিয়া ও তাঁর জন্ম অস্ট্রেলিয়ায়। বাবার মাধ্যমে লিলির কাছে ক্রিকেটের তালিম নেওয়া থেকে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরও শুরু। সেখান থেকে ড্রাকা ইংল্যান্ড ও কানাডা ঘুরে এখন ইতালির।
তাকাতে পারেন ভারতের ক্রিকেট দলেও। তাদের দলের রহস্য স্পিনার বরুন চক্রবর্তী অভিনয় করেছেন সিনেমাতেও। চেন্নাইয়ে এসআরএম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে ডিগ্রিও আছে বরুনের। পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষক, পিৎজার কারিগর এবং যন্ত্র প্রকৌশলীও খেলছেন এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে।
কিন্তু তাঁদের কারও জীবনবৃত্তান্তই সম্ভবত জাখ লিও–ক্যাশের মতো এতটা রোমাঞ্চকর নয়!
জাখ নেদারল্যান্ডস দলের স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার। তাঁর বাবা শাদ খেলেছেন নেদারল্যান্ডসদের রাগবি জাতীয় দলে। মা সারা লুজমোর টেনিসে ব্রিটেনের সাবেক শীর্ষ খেলোয়াড়। ১৯৮৮ সালে ১৬ বছর বয়সে ব্রিটেনের সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে পা রেখেছিলেন উইম্বলডনে। আর অক্সফোর্ডে জন্ম নেওয়া জাখ লিও নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলে ঢোকার আগে খেলেছেন ফুটবল। সেখানে সম্ভাবনাও ছিল। ১৬ বছর বয়সেও ছিলেন সাউদাম্পটন ক্লাবের বয়সভিত্তিক প্রকল্পে। তখন রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার জুড বেলিংহামের সঙ্গেও তাঁর দেখা হতো। বেলিংহাম তখন ছিলেন বার্মিংহাম সিটির বয়সভিত্তিক প্রকল্পে।
আরও একটি বিষয়, জাখের কাজিন কিগান লিও–ক্যাশেও ক্রিকেটার। খেলছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ এসএ২০–এর দল পার্ল রয়্যালসে।
ফেলে আসা এই বৈচিত্র্যময় পথ নিয়ে জাখ কথা বলেন ১৩ ফেব্রুয়ারি চেন্নাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হারের পর। শুনুন তাঁর মুখেই, ‘হ্যাঁ, ছোটবেলায় ফুটবল খেলতাম। সেটা অনেক ছোটবেলা থেকেই, বলতে পারেন ১০ বছর বয়স থেকে। বাবা ও মাও ক্রীড়াবিদ ছিলেন। আমি ক্রিকেটে এসেছি। নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলাতেই এখন আমার সব মনোযোগ। এই টুর্নামেন্টে আশা করি ভালো করতে পারব।’
এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে তিন ম্যাচ খেলে এখনো চোখে পড়ার মতো পারফরম্যান্স করতে পারেননি জাখ। দুবার ব্যাট করতে নেমে করেন মোট ১৫ রান। এক ওভার অফ স্পিন করে ৬ রান নিয়ে উইকেটবিহীন। কিন্তু নিজের দেশে তাঁকে বেশ উঁচুমানের স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবেই দেখা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে জাখ লিও–ক্যাশ কিছুদিন গ্যারি কারস্টেনের অধীনে ছিলেন। সাবেক প্রোটিয়া ওপেনার ও ভারতকে কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতানো কারস্টেনই জাখের বিষয়ে সুপারিশ করেছিলেন নেদারল্যান্ডস কোচ রায়ান কুকের কাছে। কুক সে কথাই বললেন, ‘জাখকে দলে পাওয়া দারুণ ব্যাপার। সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো সব রকম দক্ষতাই তার আছে।’
জাখ কেন ভালো অলরাউন্ডার—তার পক্ষে দু–একটি তথ্য দেওয়া যায়। গত বছর ১৬ জুন গ্লাসগোয় ত্রিদেশীয় সিরিজে নেদারল্যান্ডস–নেপাল ম্যাচটি কি মনে আছে?
ছেলেদের পেশাদার ক্রিকেটে সেটাই প্রথম তিনটি সুপার ওভারের ম্যাচ। তৃতীয় সুপার ওভারে বোলিং করে কোনো রান না দিয়ে ২টি উইকেট নিয়েছিলেন জাখ। সাসেক্সে খেলাকালীন সময়ে জিম্বাবুয়ে কিংবদন্তি গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ারকে পেয়েছিলেন ব্যাটিং কোচ হিসেবে। জাখের ক্রিকেটার হিসেবে বেড়ে ওঠায় তাঁর অবদান কেমন সেটা শুনুন জাখের মুখেই, ‘অনেক সাহায্য পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে। খেলোয়াড়ি সময়ের সব অভিজ্ঞতা ঢেলে দিয়েছেন। আমি শুধু সব অভিজ্ঞতা থেকে শেখার চেষ্টা করছি।’
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগে ভারতের মুম্বাইয়ে ব্যাটিং ক্যাম্পে জাখকে ডেকেছিল নেদারল্যান্ডস টিম ম্যানেজমেন্ট। চেন্নাইয়ের স্পিন ক্যাম্পেও তাঁকে পরখ করে দেখার পর রাখা হয় বিশ্বকাপের দলে। এবার বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে কলম্বো, দিল্লি ও চেন্নাইয়ে ম্যাচ খেলা নেদারল্যান্ডস আজ আহমেদাবাদে নিজেদের শেষ ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হারে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সুপার এইটে ওঠার স্বপ্নে বড় ধাক্কা খায় নেদারল্যান্ডস। সুপার এইটে ওঠার স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে তাদের ভারতকে হারাতেই হবে। এরপর আসবে অন্য হিসাব। জাখ সেই স্বপ্নই দেখছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে আমরা ভালো করতে পারিনি। এখন আমাদের পূর্ণ মনোযোগ আহমেদাবাদে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে। ফ্লাডলাইটের আবারও খেলতে আমরা মুখিয়ে আছি। আমরা এখান থেকে শিক্ষাগুলো নিয়ে তা পরের ম্যাচে কাজে লাগানোর চেষ্টা করব।’
নেদারল্যান্ডস আইসিসির সহযোগী দেশ। বিশ্বকাপের মতো আসরে বড় দলগুলোর বিপক্ষে এখনো শেখার পাঠ নিচ্ছে তারা। কিন্তু ক্রিকেট তো অনিশ্চয়তার খেলা—যেটা এই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া–জিম্বাবুয়ে ম্যাচেই আবারও প্রমাণিত। তাই ভারতের বিপক্ষে ডাচদের আশা করতে দোষ কী! জাখও নিশ্চয়ই তেমন কিছুর আশায় আছেন।