ফল বিক্রেতা হায়দার যেভাবে জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে

আরব আমিরাতের ক্রিকেটার হায়দার আলীআমিরাত ক্রিকেট বোর্ড

পাকিস্তানের পাঞ্জাবে আজমত শাহ নামে এক ছোট্ট গ্রাম। সেই গ্রামেরই মধ্যবিত্ত এক পরিবারে জন্ম হায়দার আলীর। ক্রিকেটের হাতেখড়িও সেখানে। কৈশোর থেকেই স্বপ্নটা ছিল বিশাল—পাকিস্তানের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা।

সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য একসময় চলে যান লাহোরে। বড় শহরে টিকে থাকা সহজ ছিল না তাঁর জন্য। রাতের বেলা রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের চাকরিসহ আরও অনেক ছোটখাটো কাজ করতে হয়েছে দুবেলা খাবার জোগাতে।  

সবই করেছেন মুখ বুজে। তাঁর বেড়ে ওঠা এমনিতেই খুব সহজ ছিল না। খুব ছোটবেলায় মা-বাবার বিচ্ছেদের পর একটা বয়স পর্যন্ত বড় হয়েছেন চাচার কাছে। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁর সামনে খুব বড় হয়ে উঠতে পারেনি।

ক্রিকেটই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। বাঁহাতি স্পিন করতেন। অনেক কষ্টের মধ্যেও খেলাটা চালিয়ে গেছেন। যার পুরস্কার পান ২০১৮ সালে, পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর।

কিন্তু স্বপ্নটা সেখানেই থমকে যায়। ইএসপিএন ক্রিকইনফোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সেই অধ্যায় নিয়ে খুব বেশি বলতে চাননি হায়দার, ‘পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে আমি ভালোই করছিলাম। কিন্তু তারপর কী হয়েছিল, তা নিয়ে এখন আর মুখ খুলতে চাই না। জীবন এমনই, অনেক কিছু ঘটে যায়। তবে আমি ইতিবাচক থাকতে ভালোবাসি।’

লাহোরে থাকার সময় একপর্যায়ে জীবন চালাতে তাঁকে রাস্তায় ফলও বিক্রি করতে হয়েছে। করোনা মহামারিতে আর্থিক অনটন আরও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আবার জীবন বদলাতে ২০২২ সালে দেশান্তরি হন হায়দার, পাড়ি জমান সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

হায়দারের জীবনে ঝড়ঝাপটা কম যায়নি
এসিসি

চারপাশের এত ঝড়ঝাপটা কিন্তু তাঁর ক্রিকেটের প্রতি টান কমাতে পারেনি। মরুর দেশে গিয়েও বুনতে শুরু করেন নতুন স্বপ্ন—সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা। আইসিসির তিন বছরের বসবাসের নিয়ম পূরণ করে ২০২৫ সালে তিনি আমিরাত দলের হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন। ওই বছরই প্রথম সুযোগ পেয়ে করেন বাজিমাত!

আরও পড়ুন

শারজায় বাংলাদেশের বিপক্ষে অভিষেক সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে মাত্র ৭ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। আরব আমিরাত পায় কোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয়ের স্বাদ। এর আগে একই বছর দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে জিতেছিলেন আইএল টি-টোয়েন্টি ট্রফি। সব মিলিয়ে বদলে যায় হায়দার আলীর ভাগ্য। ডাক পান আমিরাতের বিশ্বকাপ দলে।

৩১ বছর বয়সী হায়দার এখন পর্যন্ত আমিরাতের হয়ে ২৩টি টি-টুয়েন্টি খেলেছেন। ৩৩ উইকেট পেয়েছেন ১৫.৭২ গড়ে, ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন মাত্র ৫.৮৩ করে। গত বছরই অক্টোবরে তাঁর ওয়ানডে অভিষেকও হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। এখন পর্যন্ত ৪টা ম্যাচ খেলে পেয়েছেন ২ উইকেট। আজ চেন্নাইয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে খেলতে নামলে ছোটবেলার সেই স্বপ্নপূরণ হবে তাঁর। বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন!

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও পরিচিত মুখ হায়দার
আইএলটি২০

স্বপ্নপূরণের সামনে দাঁড়িয়ে রোমাঞ্চিত হায়দার, ‘এটাই ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। বিশ্বকাপে খেলা প্রতিটি ক্রিকেটারের স্বপ্ন। অনেক খেলোয়াড়কে দেখেছি, তারা দশ বছর দেশের হয়ে খেলেছে; কিন্তু কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। তারকা হতে হলে বা দেশের জন্য বিশেষ কিছু করতে হলে বড় মঞ্চেই পারফর্ম করতে হয়।’

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে কিউই ওপেনার ফিন অ্যালেন ও টিম সাইফার্টের সামনে পাওয়ারপ্লেতেই হয়তো নতুন বল হাতে দেখা যাবে হায়দারকে। এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে তিনি পরিচিত। আইএল টি-টুয়েন্টিতেও প্রায়ই এই দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে প্রথম ৬ ওভারে তাঁর ইকোনমি রেট ৫.৯৩, যা টুর্নামেন্টে অন্তত ২০ ইনিংস বল করা বোলারদের মধ্যে সেরা।

আরও পড়ুন

বিশ্বকাপেও পাওয়ারপ্লেতে এই চ্যালেঞ্জ নিতে চান হায়দার, ‘পাওয়ারপ্লেতে বল করতে আমার ভালো লাগে। অস্ট্রেলিয়া, ভারত বা নিউজিল্যান্ড—কোন দলের বিপক্ষে খেলছি, সেটা নিয়ে চাপ নিই না। শুধু বলটার দিকে মন দিই। ইতিবাচক ভাবি। দলের জন্য কী করতে হবে, সেটাই বোঝার চেষ্টা করি।’

দুবাই ক্যাপিটালসে খেলার সময় ডেভিড ওয়ার্নার, রোভম্যান পাওয়েলের মতো তারকাদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করেছেন হায়দার। ওই অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেক আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। হায়দারের কথা, ‘আইএল টি-টুয়েন্টি আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আমিরাত ক্রিকেট বোর্ডের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। স্থানীয় খেলোয়াড়দের জন্য এটা অনেক বড় সুযোগ। প্রথম বছর দলে ঢোকার পর একটু নার্ভাস ছিলাম। চারপাশে এত তারকা! কিন্তু প্রথম ম্যাচে ভালো বোলিং করার পর ওয়ার্নার এসে বললেন, তুমি সেরা, এমন বাঁহাতি স্পিনার আমি দেখিনি। পরে আমাদের অধিনায়ক বিলিংসও আমাকে অনেক আত্মবিশ্বাস দিয়েছেন। এখন তিনি আমার বন্ধু। বড় তারকাদের সঙ্গে খেললে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।’

টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে আলো ছড়াতে চান হায়দার
আমিরাত ক্রিকেট এক্স হ্যান্ডল

এই অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাসই হায়দার কাজে লাগিয়েছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র তৃতীয় ম্যাচেই তিনি হয়ে যান নায়ক। শিশির পড়ছিল। তবু দারুণ নিয়ন্ত্রণ রেখে বল করে গেছেন স্টাম্প সোজা। আবার ভেতরে ঢোকা বল আর ড্রিফটে ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলেছেন।

আরও পড়ুন

সেই ম্যাচের স্মৃতিচারণা করে হায়দার বলেছেন, ‘বাংলাদেশের বিপক্ষে স্পেলটি আমার ক্যারিয়ারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কোচ লালচাঁদ রাজপুত স্যারকে বলেছিলাম, এই দেশটির জন্য বিশেষ কিছু করতে চাই। কারণ, আরব আমিরাত আমাকে সম্মান আর ঠিকানা দিয়েছে। এই ব্যাজ আমাকে সব দিয়েছে। কোচ আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। পাওয়ারপ্লেতে ৩ উইকেট নিয়েছিলাম। বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে এটা ছিল স্বপ্নের স্পেল।’

দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে খেলার সময় সাবেক আমিরাত স্পিনার আহমেদ রাজা ও দলের বিশ্লেষক মনপ্রীত সিধুর কাছ থেকেও শিখেছেন হায়দার। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমি তাদের হাজারটা প্রশ্ন করে বিরক্ত করি। লালচাঁদ স্যার লড়াকু মানসিকতার খেলোয়াড়দের পছন্দ করেন।’

হায়দারও সেই লড়াকুদের একজন। বাধা এসেছে অনেক, তবু হাল ছাড়েননি। লড়াই চালিয়ে গেছেন। সেই লড়াই–ই তাঁকে আজ নিয়ে এসেছে জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।