স্যামির সেই ‘বিশেষ কিছু’ কি হেটমায়ার
শিমরন হেটমায়ার স্বভাবে একটু চটপটে। ফিল্ডিংয়ে দারুণ তৎপর। চুলের রং পাল্টান কয়েক দিন পরপর। দৌড়ে রান নেওয়াতেও বেশ ত্বরিত। শুধু সময় ও পরিস্থিতির মারপ্যাঁচে মাঝেমধ্যে তাঁর দেরি হয়ে যায়।
এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে যেমন পৌঁছেছেন দেরিতে। ভিসা জটিলতায় আটকা পড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ার্ম–আপ ম্যাচটা খেলতে পারেননি। ভারতে পা রাখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নামতে হয়েছিল গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে। হেটমায়ার কি তখনই প্রথম নিজেকে চিনতে পেরেছিলেন? নইলে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দর্শকদের তাঁকে নতুন করে চেনার কথা নয়!
ক্যারিবিয়ানরা যেমন আমুদে, তেমন মুডি। মন চাইলে বাইশ গজে যাচ্ছেতাই করে ছাড়েন—না চাইলে, ক্যারিবিয়ান সাগরের মতোই নিস্তরঙ্গ। হেটমায়ারকে দেখুন—ওয়েস্ট ইন্ডিজের টি–টুয়েন্টি জাতীয় দলে খেলছেন আট বছর হলো। অথচ এটা তাঁর দ্বিতীয় টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ! বলকে পিটিয়ে সীমানাছাড়া করার প্রতিভায় তাঁর মধ্যে অনেকেই ক্যারিবিয়ান পূর্বসূরি কিংবদন্তিদের ছাপ দেখেন। কিন্তু হেটমায়ার নিজে তা সব সময় দেখেননি বলেই হয়তো এই আট বছরে তাঁর ক্যারিয়ার যেন আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের সিনেমা—‘আসা যাওয়ার মাঝে’। কোনো পজিশনেই থিতু হতে পারেননি। কথায় আছে না, ‘মক্কার মানুষ হজ পায় না’—হেটমায়ারও তেমনি হয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এত দিন চিনতে পারেননি নিজেকে, যেটা পেরেছেন এবারের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাই দেখা গেল ৩৬ বলে ৬৪। সেটা তাঁর ক্যারিবিয়ান মুডের পুরোটা নয়, যেমন নেপালের বিপক্ষে তাঁর ৩২ বলে অপরাজিত ৪৬–ও নয়। ২২ গজের আয়নায় হেটমায়ার আসলে দেখতে কত ভয়ংকর—যেন ক্যারিবিয়ান সাগরের ক্যালিপসো—সেটা গতকাল হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে জিম্বাবুয়ে। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার অবশ্য একটি পটভূমি আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোচ ড্যারেন স্যামি বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই বলে আসছেন, ‘এবার বিশেষ কিছু ঘটবে।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে হারেনি। ব্যাটসম্যানরা কম–বেশি রান পাচ্ছেন। কিন্তু জিম্বাবুয়ে ম্যাচটি দেখার পর মনে হবে, এসবের কোনো কিছুই আসলে স্যামির সেই ‘বিশেষ কিছু’ নয়। হেটমায়ার সেই বিশেষ কিছু!
ক্যারিবিয়ান স্ট্রোক–প্লে প্রথাগত ক্রিকেটীয় শট থেকে একটু আলাদা। ওয়াংখেড়েতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বড় রান পাওয়া সব ক্যারিবিয়ানের মধ্যেই এ ব্যাপারটা নিশ্চয়ই দেখেছেন। হেটমায়ারকে কি সেদিন অন্যদের তুলনায় এ বিষয়ে সম্পূর্ণ বলে মনে হয়নি! গায়ের জোরে মারা থেকে, ক্যারিবিয়ান ফ্লিক কিংবা কাভারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারা—এসব কিছু দেখে আপনার মনে হতে পারে, এই ছেলেটি মাঝেমধ্যে রান করে বটে, কিন্তু ব্যাটে ক্যারিবিয়ান সাগরের মতো এমন ভয়াল রূপ অনূদিত হয়েছে কমই!
হেটমায়ার কি তাহলে মজা পাচ্ছেন? এটাই! ক্যারিবিয়ানরা মজা পেতে শুরু করলে এটাই ঘটে। আপনি এমন অনেকই দেখেছেন। হেটমায়ারের ক্ষেত্রে তাঁকে সে মজাটা এনে দিয়েছে ক্যারিবিয়ান টিম ম্যানেজমেন্ট। নিকোলাস পুরান অবসর নেওয়ার পর গত জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম টি–টুয়েন্টির পর টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁকে বলেছিল, ‘আমাদের তিনে ব্যাট করার কেউ নেই...তুমি একটু চেষ্টা করে দেখো!’
তিন নম্বর জায়গাটা হেটমায়ারের জন্য নতুন নয়। সংস্করণ যেটাই হোক, ব্যাটিং অর্ডারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পজিশনে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ভালোই সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ওই যে, এক ম্যাচে রান পান তো পরের ছয়–সাত ম্যাচে নেই—এভাবে হেটমায়ারকে চার, পাঁচ, ছয়, সাতেও নামতে হয় ‘আসা–যাওয়ার মাঝে’। অধিনায়ক শাই হোপ তাঁকে ‘রান না পেলেও সমস্যা নেই’ ধরনের লাইসেন্স দেওয়ার পর হেটমায়ার নিজেই বলেছেন, তিন নম্বর জায়গাটা তিনি ‘উপভোগ করছেন...মজাও পাচ্ছেন’।
সেই মজাটা টের পাচ্ছে প্রতিপক্ষও। দক্ষিণ আফ্রিকায় সেই সিরিজে দ্বিতীয় টি–টুয়েন্টি (২৯ জানুয়ারি) থেকে এ পর্যন্ত ৭ ইনিংসে তিনে নেমে ৩৪২ করা হেটমায়ারের গড় ৬৮.৪, স্ট্রাইক রেট ১৮৭.৯১। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংসটির পর তিনি ছিলেন বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, সেটিও পাকিস্তানের সাহিবজাদা ফারহানের চেয়ে মাত্র ১ রান কম করে। স্ট্রাইক রেট ১৮৫.৫৯—যেটা আপনাকে বলবে তিনে ফেরার পর হেটমায়ার আসলে একই ছন্দে ব্যাট করছেন। সেই ছন্দের ভিত সম্ভবত ছক্কা মারা—ক্যারিবিয়ান টি–টুয়েন্টি ব্যাটিংয়ে যেটা সহজাত। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩৪ বলে ৮৫ রানের সেই ইনিংসে ৭ ছক্কায় হেটমায়ার এখন এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ছক্কাবাজও (১৭)। পাশাপাশি নতুন বল, পুরোনো বল—এসবের মুখোমুখি হতে আলাদা কোনো ভাবনা নয়, হেটমায়ারের ভাষায় আসল বিষয় হলো—‘মনটা (মুড) ঠিক জায়গায় থিতু হলে আমি তিনেও পারি, ছয়েও পারি।’
হোপ সেই সামর্থ্যটা জানেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়ের পর তাই সরাসরি বলেছেন, ‘(ব্যাটিংয়ে) নিচে তাকে অপচয় করা হচ্ছিল।’
মারলন স্যামুয়েলস, আন্দ্রে রাসেল, ক্রিস গেইল, লেন্ডল সিমন্সরা যাওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের এ দলটি ধীরে ধীরে তাঁদের সেসব জায়গা পূরণের চেষ্টা করছে। হেটমায়ারকে কার জুতায় পা গলাতে দেবেন, সেটা সিদ্ধান্ত আপনার। কে জানে, ১০ বছর পর হয়তো সবার প্রিয় ‘হেট্টি’র জুতায় পা গলানোর লোক খুঁজতে হবে!