ফুটবলের ইতালির সঙ্গে সাফল্যে যেখানে সমান ক্রিকেটের ইতালি
হ্যারি মানেন্তির এ সংবাদ সম্মেলনে আসার কথা ছিল না। নিয়মিত অধিনায়ক ওয়েন ম্যাডসেন চোট পাওয়ায় অধিনায়ক হিসেবে কাল তিনি এসেছিলেন ইতালি ক্রিকেট দলের জন্য ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলনে। তাঁর কিছুক্ষণ আগেই মাঠে ইতিহাস গড়েছে ইতালি।
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে এবার অভিষেকে ইতালি প্রথম জয় পেয়েছে ইংল্যান্ডকে ভয় দেখানো নেপালের বিপক্ষে। একটি ফুটবলপাগল দেশে জনপ্রিয়তার বিচারে তৃতীয় কিংবা চতুর্থ কাতারে পড়ে থাকা ক্রিকেট দল যখন এমন সাফল্য পায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে কিছু দাহকালের গল্প, কিছু আশার কথাও।
মানেন্তিও বললেন তেমন কথাই, ‘আমাদের স্কোয়াড যদি দেখেন, ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনকেই ক্রিকেটের বাইরে অন্য কাজ করতে হয়। কৃশ (কালুগামাগে) এর ভালো উদাহরণ। বিশ্বকাপে জয়ের ম্যাচে সে ম্যাচসেরা, কিন্তু জীবিকা নির্বাহে সে পিৎজা বানায় এবং সেই আয় থেকে অনুশীলনের খরচ মেটায়। আশা করি, কয়েক বছরের মধ্যে ইতালিতে খেলাটার ব্যাপ্তি এতটা বড় হয়ে উঠবে যেন আমরা পূর্ণ মেয়াদে (পেশাদার) খেলতে পারি।’
কাল ইতালির জয়ের নায়ক মস্কা ভাইদের আসল পেশাটা জেনে নিতে পারেন—জাস্টিন মস্কা সিডনির স্কুলে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক। তাঁর ভাই অ্যান্থনি মস্কা কিশোর সংশোধন সেন্টারে কাঠের কাজ শেখান। জৈন আলী প্রকৌশলী কিংবা জসপ্রীত সিং ইংল্যান্ডে উবার চালিয়েছেন। তবে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটেও খেলার অভিজ্ঞতা আছে কয়েকজন ক্রিকেটারের।
আইসিসি টি–টুয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ে ইতালি এখন ২৬তম দল। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপকে যদি ধরা হয় এই সংস্করণের সেরা ২০ দলের টুর্নামেন্ট, তাহলে ইতালি তো ‘বহিরাগত।’ মানেন্তি জানালেন এই বহিরাগত হিসেবে কুলীনদের সঙ্গে লড়াইয়ের রোমাঞ্চটাই নাকি তাদের আলাদা অনুপ্রেরণা, ‘২০ দলের একটি প্রতিযোগিতায় বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে আমরা ২৭তম। অতএব আমরা নেপাল, স্কটল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া—যার সঙ্গেই খেলি না কেন, আমরা আসলে বহিরাগত। সব সময় আমরা তাই থাকব এবং এটা আমরা ভালো করার প্রেরণা হিসেবে উপভোগ করি।’
মানেন্তি–মস্কাদের এই উপভোগের মন্ত্র তাদের কোথায় পৌঁছে দিয়েছে, সে কথা একবার বলা যাক। ফুটবলে ইতালি চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তাদের সিরি আ ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের একটি। কিন্তু যদি ২০০৬ বিশ্বকাপের পর থেকে হিসাব কষেন তাহলে দেখা যায়, বিশ্বকাপে ইতালি ফুটবল দল ও ক্রিকেট দলের সাফল্য সমান। দুই দলই জিতেছে একটি করে ম্যাচ!
২০০৬ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ২০১০ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ে ইতালি। দুই ড্র ও এক হার। কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি সেবার। ২০১৪ বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্বে জিতেছিল শুধু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। হেরেছিল বাকি দুই ম্যাচ। ইতালিকে এরপর বিশ্বকাপে আর দেখা যায়নি। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপেও তারা খেলার সুযোগ পাবে কি না, তা অনিশ্চিত। মার্চের প্লে–অফ পরীক্ষায় উতরে যেতে পারলে মিলবে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার টিকিট।
ইতালিয়ান ফুটবলের অবকাঠামোর সঙ্গে তাদের ক্রিকেট কাঠামোর কোনো তুলনাই চলে না। শক্তি কিংবা ঐতিহ্যে তো নয়ই। তবু একটি বিষয় এড়ানোও যায় না।
ক্রিকেটের তিন সংস্করণ মিলিয়ে এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসে ইতালি প্রথম জয় পেয়েছে বেশির ভাগ আধা পেশাদার খেলোয়াড়ে গড়া স্কোয়াড নিয়ে। ইতালি ফুটবল দলে কিন্তু সেই সুযোগ নেই। তবু ফুটবলে তাদের বাজে সময় যাচ্ছে, আর সে কারণেই ক্রিকেট দলের সাফল্যে এই তুলনাটা উঠছে।
অবশ্য এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরপেক্ষ ক্রিকেট সমর্থকদের মাঝেই বেশি আলোচনা হচ্ছে। ইতালি আপাতত মজে আছে শীতকালীন অলিম্পিকে। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগের দিন ৬ ফেব্রুয়ারি মিলানে শুরু হয়েছে শীতকালীন অলিম্পিক। দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনামে তাই শীতকালীন অলিম্পিক এবং ফুটবলের প্রাধান্যই বেশি। ইতালি ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ জন ডেভিসনের আশা, কালকের জয় ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমের এই ধারায় ছেদ ফেলবে। ক্রিকেট উঠে আসবে ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনামে।
সাংবাদিকদের ডেভিসন বলেন, ‘এটা (জয়) অনেক দেশের এবং ইতালির অনেক প্রকাশনার প্রথম পাতার খবর হবে… অন্তত আমি তা–ই আশা করছি। আমাদের এমন প্রচার পাওয়া এবং হয়তো শীতকালীন অলিম্পিককে খেলার পেছনের পাতায় ঠেলে দেওয়া দেশের ক্রিকেটের জন্য হবে অবিশ্বাস্য ব্যাপার, আর এতে ক্রিকেটের দিকে একটু হলেও বাড়তি মনোযোগ আসবে।’