প্রতিদিন এক–দেড় শ ছক্কা মারা মুকুলের ‘যাত্রা তাঁর জন্মের আগে’
সবার জহুরির চোখ নেই। জাস্টিন ল্যাঙ্গারের আছে। গতকাল রাত ১২টা ৪৮ মিনিটে লক্ষ্মৌ সুপারজায়ান্টসের এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করা ছোট্ট এক ভিডিও ক্লিপে সেটা বোঝা গেল। নেটে থ্রোয়ারকে লক্ষ্মৌর এই কোচ বলছেন, ‘আগামী চার মাসে আমি তাঁকে ভারতের সবচেয়ে ভীতিকর ছয়–সাত নম্বরের ব্যাটসম্যানে পরিণত করব।’
কাকে? মুকুল চৌধুরী।
লক্ষ্মৌ পুরোনো এই ভিডিও ক্লিপ প্রকাশের আগেই ইডেন গার্ডেনে সত্য প্রমাণিত হয় ল্যাঙ্গারের কথা। সবচেয়ে ভীতিকর এখনো হয়তো হয়ে ওঠেননি, তবে মুকুল যে সেই পথেই আছেন, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। তাদের ১৮১ রান তাড়ায় মুকুল ১২.৫ ওভারে যখন সাতে ব্যাটিংয়ে নামেন, জয়ের জন্য ৪৩ বলে ৭৬ দরকার লক্ষ্মৌর। হাতে ৫ উইকেট। মুকুল এখান থেকে ২৭ বলে অপরাজিত ৫৪ রানের এমন এক অবিশ্বাস্য ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছেন, যা দেখে আইপিএলে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
মুকুলের ব্যাটিংয়ের ধরনও প্রতিপক্ষের জন্য ভীতিকর। না, সব বলেই মারেন, তা নয়। বরং উল্টোটা, বুঝেশুনে মারেন। আর সেসব মারের মাঝে যেভাবে ঠান্ডা মাথায় ব্যাট করেন, তাতে দুর্দান্ত এক ফিনিশারের সন্ধানই পেয়েছে ভারত। তাঁর মুখেই শুনুন, ‘বোলার হয়তো চারটি পারফেক্ট বল করবে। কিন্তু অন্তত একটি তো নিজের আওতায় পাব। ছক্কা মারতে তো একটি বলই লাগে।’
মুকুল গতকাল এভাবেই মেরেছেন ৭টি ছক্কা। সেটাও কোন পরিস্থিতিতে? ক্রিজে নামার পর প্রথম ১২ বলের মধ্যে মুকুল মাত্র ১ বল খেলতে পারেন। এর মধ্যে আয়ুশ বাদোনির আউটের মধ্য দিয়ে অন্য প্রান্তে শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান হারায় লক্ষ্মৌ। মুকুল তখনই বুঝে যান, যা করার তাঁকে একাই করতে হবে। মুকুল এরপর পরবর্তী ৩০ বলের মধ্যে একাই ২৫ বল খেলেন। পাশাপাশি ১৯তম ওভারে ক্যামেরন গ্রিনকে মারা দুটি ছক্কা ও শেষ ওভারে মারা ছক্কায়ও তাঁর শক্তিশালী কবজি ও পরিণত মাথাটা টের পাওয়া গেল। সব মিলিয়ে একজন ‘ফিনিশার’–এর মধ্যে যা যা উপকরণ থাকতে হয়, তার সবটুকুই আছে মুকুলের। প্রশ্ন হলো, প্রথম শ্রেণিতে মাত্র ৪ ম্যাচ, লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৫ ম্যাচ ও ১০ ম্যাচ খেলা মুকুলের উত্থানটা হলো কীভাবে?
মুকুলের এবার আইপিএলেই অভিষেক। আগের দুই ম্যাচে ২* ও ১৪ রান করেন, ছক্কা ছিল না। গতকালই প্রথম ছক্কার মার, গতকালই প্রথম বড় কিছু হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেন। নাহ, একটু ভুল হলো। মুকুল যে বড় মাপের ব্যাটসম্যান হবেন, সেটার প্রথম ইঙ্গিত পেয়েছিলেন তাঁর বাবা দালিপ কুমার চৌধুরী। স্থানীয় অনূর্ধ্ব–১৯ পর্যায়ের একটি লো স্কোরিং ম্যাচে ভালো ব্যাট করেছিলেন মুকুল। এরপরই তাঁর বাবার বিশ্বাসটা ভিত পেয়ে যায়। তবে মুকুলের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু তারও আগে।
মুকুলের ভাষায়, তাঁর জন্মেরও আগে!
কথাটা ঠিক, আবার ভুলও। তবে শুনতে বেশ মজাই লাগতে পারে। কাল ম্যাচসেরা হওয়ার পর মুকুল বলেছেন, ‘আমার যাত্রা আসলে শুরু হয়েছিল আমার জন্মের আগেই। বাবার স্বপ্ন ছিল, তাঁর ছেলে একদিন ক্রিকেট খেলবে। সেই সময়ে আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না, তাই খুব আগেভাগে খেলা শুরু করতে পারিনি। ১২-১৩ বছর বয়সে খেলা শুরু করি। ঝুনঝুনুতে তেমন কোনো একাডেমি ছিল না, তাই পরে জয়পুরে চলে যাই।’
মুকুলের জীবনে জয়পুরের আগে আসে রাজস্থানের শহর ঝুনঝুনুর গল্প। সেখানেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কিন্তু ক্রিকেট খেলতে কিংবা ক্রিকেটার হয়ে ওঠার জন্য ঝুনঝুনুতে তেমন একটা ব্যবস্থা ছিল না। সে জন্য বাবা তাঁকে ভর্তি করেন একটু দূরবর্তী শহর সিকরের এক একাডেমিতে। মুকুল তখন পেসার। কিন্তু একদিন একাডেমিতে এক ম্যাচে উইকেটকিপারের দরকার পড়ল। মুকুল কিপিং–গ্লাভস হাতে স্টাম্পের পেছনে দাঁড়িয়ে যান, তারপর ব্যাট হাতে স্টাম্পের সামনে। সেই শুরু, মুকুল তার পর থেকেই উইকেটকিপার–ব্যাটসম্যান।
সেই একাডেমিতে কোচরা মুকুলের ভেতরে বড় শট খেলার স্ফুলিঙ্গ দেখেছিলেন। উচ্চতা ও শারীরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বল অনেক দূরে মারতে পারতেন মুকুল। তাঁর এই সামর্থ্যে শুরু হয় কোচদের শাণ দেওয়া। দিন পেরিয়ে, বছর গড়িয়ে সেই মুকুল এখন ‘ক্লিন হিটার’।
কিন্তু মুকুলের ‘ক্লিন হিটার’ হয়ে ওঠার যাত্রাটা আরামপ্রদ ছিল না। বিশেষ করে তাঁর বাবার জন্য।
অল্প বয়সী কারও পরিবার থেকে দূরে থাকার অভিজ্ঞতাটা ভালো হয় না। মুকুলের আবার অ্যালার্জি ছিল, হোস্টেলে তাই ভালো ছিলেন না। পরিবার তাই বাধ্য হয়েই তাঁর জন্য পার্শ্ববর্তী একটি বাসা ভাড়া করে দেয়। মুকুল জয়পুরে গিয়ে আরও বড় একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর মা ও বোন চলে যান সেখানে। একাকিত্বে ভুগে ছেলে যেন ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পথ না হারায়, সে জন্যই এই সিদ্ধান্ত। ত্যাগের গল্প আছে আরও। ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে তাঁর বাবাকে বাড়ি বিক্রির পাশাপাশি জেলও খাটতে হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দালিপ চৌধুরী বলেছেন, ‘২০০৩ সালে গ্র্যাজুয়েশন করার বছর বিয়ে করি। স্বপ্ন ছিল যদি কখনো আমার ছেলে হয় তবে তাকে ক্রিকেটার বানাব। পরের বছর ছেলে হলো। খুব অল্প বয়সেই সিদ্ধান্ত নিই, তাকে ক্রিকেটার বানাতে যা যা করা দরকার সবই করব।’
ছয় বছর ধরে চেষ্টার পর সরকারি চাকরি পাননি দালিপ। ফেল মারেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসাতেও। এর মাঝে সিকরে সেই একাডেমিতে ছেলেকে ভর্তি করানোর পর দালিপ বুঝতে পারেন, খরচ চালানোর সামর্থ্য তাঁর নেই। সে কারণে ২১ লাখ রুপিতে বাড়ি বিক্রি করে দেন। ধারকর্জ করে শুরু করেন হোটেল ব্যবসা। সেই ধারের কিস্তি শোধ করতে না পেরে জেলও খাটতে হয় দালিপকে। আত্মীয়স্বজনেরাও দালিপকে ‘পাগল’ ঠাউরে তাঁর সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করেন। অনেকে মুখের ওপর তাঁকে বলেছিলেন, ‘নিজের জীবনটা তো নষ্ট করেছ, অন্তত ছেলেটাকে তো ছেড়ে দাও!’
কিন্তু দালিপ ও তাঁর পরিবার স্বপ্নে তা দেওয়া ছাড়েনি। সন্তানও দিতে শুরু করেন আস্থার প্রতিদান। ২০২৫-২৬ সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে দেখা যায় মুকুলের প্রতিভার ছটা। দিল্লির বিপক্ষে ১৭৬ রান তাড়ায় রাজস্থানের হয়ে মাত্র ২৬ বলে ৬২ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন। ছিল সাতটি ছক্কার মার। পুরো টুর্নামেন্টেই ১৯৮.৮৫ স্ট্রাইকে ৫৭.৬৬ গড়ে ১৭৩ রান করেন মুকুল।
লক্ষ্মৌ মুকুলকে কীভাবে পেল, সেই গল্পটা বলেছেন ল্যাঙ্গার। সে জন্য দলের ডেটা বিশ্লেষককে ধন্যবাদ দিয়েছেন এই অস্ট্রেলিয়ান কোচ। রাজস্থানের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে তখনো নিয়মিত হয়ে ওঠেননি মুকুল। তবে তাঁর পেশিশক্তি এবং কবজির জোরটা অনেকেরই নজরে পড়েছিল। সেই সুবাদেই গত ডিসেম্বরে তাঁর নাম ওঠে আইপিএল নিলামে। ২ কোটি ৬০ লাখ রুপিতে তাঁকে নিতে দ্বিতীয়বার ভাবেনি লক্ষ্মৌ।
কেন? জিও হটস্টারকে উত্তরটা দিয়েছেন ল্যাঙ্গার, ‘কয়েক মাস আগে এক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আমরা ওকে প্রথমবার দেখি। আমাদের ডেটা অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাসকে বড় ধন্যবাদ দিতেই হয়। সেই আমাকে বলেছিল, “কোচ, এই ছেলেটাকে আমাদের নিতেই হবে।” আমরা তাকে নিয়েছি এবং ভাগ্য ভালো যে তাকে পেয়েছি।’
সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ বইয়েও এক খুদে মুকুল ছিল। আইপিএলের বিশাল মানচিত্রের মাঝে মাত্র ২১ বছর বয়সী মুকুলও তো বেশি বড় নয়। গতকাল ইডেন গার্ডেনকে নিজের ‘সোনার কেল্লা’য় পরিণত করার পথে মুকুলের হেলিকপ্টার শটের ভিডিও ভেসে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আন্দাজ করা যায়, মুকুলের প্রেরণায় আছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। সংবাদ সম্মেলনে সেটাই বোঝা গেল মুকুলের কথায়, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি ওই শটটি অনুশীলন করেছি। ধোনি যেভাবে ম্যাচ শেষ করতেন, সেটা আমার ভালো লাগত। তিনি ইয়র্কার বলেও ছক্কা মারতে পারেন।’
কলকাতার বিপক্ষে লক্ষ্মৌর যখন ২৪ বলে ৫৪ দরকার, ৭টি উইকেট পড়ে গেছে—তারপর পরের ২২ বলে ৫৩ রান তোলেন মুকুল। ৭টি ছক্কা ও ২টি চার মেরেছেন এই পথে। অর্থাৎ দরকারের সময় ছক্কা মারায় ধোনির মতোই সামর্থ্য আছে মুকুলের। সেটার কারণও খোলাসা করলেন মুকুল, ‘প্রাকৃতিকভাবেই আমার শরীর কিছুটা শক্তিশালী। এ ছাড়া আমি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি ছক্কা মারার অনুশীলন করি। নিয়মিত এমনটা করলে ব্যাটের গতি (ব্যাট স্পিড) বাড়ে। গত পাঁচ-ছয় মাস আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি, যার সুফল এখন পাচ্ছি।’
সেই সাফল্য পাওয়ার পেছনে ল্যাঙ্গারেরও অবদান দেখেন মুকুল, ‘তিনি আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। তাই আমার জন্য এখন প্রতিদান দেওয়ার সময়। প্রতিদিন অনুশীলনে তিনি আমাকে আলাদা করে ১০–১৫ মিনিট সময় দিয়েছেন। যেটাই তিনি শিখিয়েছেন কাজে লেগেছে।’
ওদিকে ল্যাঙ্গার কী বলছেন শুনুন, ‘ওর বয়স অনেক কম। চোখেমুখে ক্ষুধাটা আছে।’
সত্যজিতের ‘জাতিস্মর’ মুকুলের চোখেমুখেও একরকম ক্ষুধা ছিল। সেটা সেই কেল্লা খুঁজে বের করার ক্ষুধা। অন্য ভুবনের, অন্য আঙিনায় এই মুকুলের চোখেমুখেও সেই একই রকম চার, ছক্কা ও রানের খোঁজ করার ক্ষুধা। পাতার সেই মুকুল অমরত্ব পেয়েছে বাংলা গোয়েন্দা বইয়ের ইতিহাসে। আইপিএলের মুকুল ক্রিকেটে পাবে কি?
সময় হলেই বোঝা যাবে।