নাজমুলের সেঞ্চুরি আর মোস্তাফিজের ৫ উইকেটে সিরিজ বাংলাদেশের
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৬৫/৮। নিউজিল্যান্ড: ৪৪.৫ ওভারে ২১০। ফল: বাংলাদেশ ৫৫ রানে জয়ী।
হেঁটে হেঁটেই চলে যাওয়া যাবে, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়াম থেকে সমুদ্র এতটাই কাছে। বাতাসের আর্দ্রতা এখানে বেশি। আর গরম? চট্টগ্রামে আজ সারা দিনই অনুভূত হয়েছে ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা।
ক্রিকেটের খবরে আবহাওয়া নিয়ে এত কথা কেন? কারণ, আজ নিউজিল্যান্ডকে ৫৫ রানে হারিয়ে সিরিজ জেতা ম্যাচে এমন অসহনীয় গরমের মধ্যেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান নাজমুল হোসেন ব্যাটিং করেছেন ৩ ঘণ্টা ৬ মিনিট, করেছেন ১১৯ বলে ১০৫ রান। ৩২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর লিটন দাসকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসটা তো টেনে তুলেছেন তিনিই। এ ম্যাচেই ২০ ইনিংস আর ২৫ মাস পর সেঞ্চুরি পেয়েছেন নাজমুল। বাংলাদেশও তাতে ৮ উইকেট হারিয়ে পেয়ে যায় ২৬৫ রানের পুঁজি।
ফর্মে থাকা বাংলাদেশের বোলারদের জন্য কাজটা এরপর আর কঠিন হয়নি। আগের ম্যাচে নাহিদ রানার পর এ ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। ৪৪.৫ ওভারে নিউজিল্যান্ড অলআউট ২১০ রানে। মিরপুরে প্রথম ম্যাচ হারলেও পরের দুই ম্যাচই জিতে বাংলাদেশ ওয়ানডে সিরিজ জিতে নিয়েছে ২–১ এ।
অথচ আজ শুরুতে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে টসে হেরে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশ বড় বিপদেই পড়ে গিয়েছিল। ইনিংসের নবম ওভার শেষ হওয়ার আগেই ড্রেসিংরুমে ফেরেন সাইফ হাসান, তানজিদ হাসান আর সৌম্য সরকার। শেষের দুজন নিজেদের ব্যাট থেকেই বল টেনে নিয়ে যান স্টাম্পে। হতাশার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল একটা ভয়ও—এ রকম উইকেটে লড়াই করতে হলেও তো স্কোরকার্ডে অন্তত আড়াই শ রান দরকার!
এই পরিস্থিতিতে যা দরকার ছিল, প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও লিটন–নাজমুল জুটি বেঁধে করেছেন সেটাই। ১৭৮ বলে ১৬০ রানের জুটি, এর মধ্যে ১২৪ রানই তাঁরা নিয়েছেন দৌড়ে। লিটন তো ব্যাটিংয়ের পুরোটা সময়ই ঘাড়ে ভেজা তোয়ালে ঝুলিয়ে খেলেছেন। এ ম্যাচেই কেটেছে তাঁর আরেকটি অস্বস্তিও।
২০২৩ সালের বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ফিফটি পেয়েছিলেন লিটন, এরপর আর নয়। এর মধ্যে দল থেকে বাদ পড়ে আবার ফিরেছেন, ওপেনিং ছেড়ে থিতু হয়েছেন মিডল অর্ডারে, তবু এই সংস্করণে তাঁর রান পঞ্চাশ পার হচ্ছিল না। আজ সেই কাঙ্ক্ষিত ফিফটিটাও তিনি পেয়েছেন ৭১ বলে। ব্যক্তিগত ৭৬ রানে লিটন আউট হয়ে যাওয়ার পরই সেঞ্চুরি পূর্ণ হয় নাজমুলের। ২০২৪ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রামের মাঠেই সর্বশেষ সেঞ্চুরিটি পেয়েছিলেন।
নাজমুল যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, ততক্ষণ বাংলাদেশের স্কোরটা ২৮০ পেরোনোর সম্ভাবনাও টিকে ছিল। মাঝে মেহেদী হাসান মিরাজের ১৮ বলে ২২ রানও সে পথে দলকে কিছুটা এগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর আউটের পরই শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশের ‘টেল’।
২৯ বলে অপরাজিত ৩৩ রানের ইনিংসে নিচের দিকের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে তাওহিদ হৃদয় যে রকম ব্যাটিং করলেন, তাতে বাংলাদেশের রান ২৭০ পার না হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কখনো ওভারের শেষ বলে রান নিয়ে স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখেননি তিনি, কখনোবা দুই রান নিয়ে স্ট্রাইক দিয়েছেন সঙ্গী ব্যাটসম্যানকে। শেষ দুই ওভারে বাংলাদেশ তাই করতে পেরেছে মাত্র ৯ রান।
সেই সংগ্রহটাই নিউজিল্যান্ডের জন্য অনেক বড় হয়ে যায় বাংলাদেশের বোলারদের কল্যাণে। আগের দুই ম্যাচেই বাংলাদেশের পেসারদের গতি–সুইং–বাউন্সে নাভিশ্বাস উঠেছে নিউজিল্যান্ডের। চোটের কারণে সেই দুই ম্যাচে না থাকা মোস্তাফিজও একাদশে ঢোকেন আজ। বল হাতে নিউজিল্যান্ডকে থামিয়ে দেওয়ার নেতৃত্বটাও দেন তিনিই। ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ৫ উইকেটে লম্বা একটা অপেক্ষাও শেষ হয়েছে তাঁর। ২০১৯ বিশ্বকাপের পর যে আর ফাইফারের স্বাদ পাননি মোস্তাফিজ। চট্টগ্রামের এ মাঠে এটাই কোনো পেসারের প্রথম পাঁচ।
আগের ম্যাচে ৫ উইকেট পাওয়া নাহিদের গতি তাঁকে কালও এনে দিয়েছে দুই উইকেট, শরীফুলের উইকেট ১টি। তাঁদের দাপটের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে কিছুটা গতি এনে দিতে পেরেছিলেন আগের ম্যাচেও ৮৩ রান করা ওপেনার নিক কেলি। তবে ৮০ বলে তাঁর ৫৯ রানের ইনিংস লড়াইয়ের জন্য যথেষ্ট হয়নি, কাজে লাগেনি শেষ দিকে ডিন ফক্সক্রফটের ৭২ বলে ৭৫ রানের প্রতিরোধও।
নাজমুল–মোস্তাফিজের দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ হওয়ার ম্যাচটা জিতে টানা তৃতীয় ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। তিনটি জয়ের ব্যবধানও একই রকম—তিন ম্যাচের সিরিজে ২–১।