ওরা বাবাকে জেলের ভেতরেই মেরে ফেলতে চায়: শঙ্কা ইমরান খানের দুই ছেলের
দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের এক শান্ত, নিরিবিলি গলি। শেষ বিকেলের হালকা মিষ্টি রোদ ঝরে পড়ছে বাগানে। একটা সাদা রঙের অ্যালসেশিয়ান কুকুর আলসে পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিচেনে দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে জরুরি ব্যবসায়িক কথাবার্তা বলছেন চলচ্চিত্র প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার জেমিমা গোল্ডস্মিথ।
বাইরে থেকে দৃশ্যটা পরিপাটি, নিস্তরঙ্গ মনে হতে পারে। কিন্তু এই নীরবতার নিচেই জ্বলছে সীমাহীন যন্ত্রণা আর উদ্বেগের তুষানল। এ বাড়িটি কাসিম খান আর সুলাইমান খানের। তাঁরা জেমিমা গোল্ডস্মিথ ও পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইমরান খানের দুই ছেলে।
লন্ডনের এমন দারুণ বিকেলেও দুই ভাইয়ের মন পড়ে আছে পাঁচ হাজার মাইল দূরের এক কারগারের নির্জন কক্ষে। রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের সেই ছয় বাই আট ফুটের দমবন্ধ করা সেল, যেখানে বন্দী তাঁদের বাবা। ৭৩ বছর বয়সী এক ক্রিকেট কিংবদন্তি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, রক্ত জমাট বাঁধার কারণে যাঁর এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেছে প্রায় ৮৫ শতাংশ। পান করার জন্য সেখানে নেই ন্যূনতম পরিষ্কার পানিটুকুও, আছে কেবল পচা দূষিত জল।
অক্সফোর্ডে পড়াশোনা থেকে শুরু করে উস্টারশায়ার কিংবা সাসেক্সে কাউন্টি ক্রিকেট খেলা, ব্রিটেনে ইমরান খানের শিকড় বেশ গভীর। ফলে তাঁর এই রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অমানবিক বন্দিদশার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ এখন আকাশচুম্বী। লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টের প্রথম দিনে তো এক অভূতপূর্ব নাটকই ঘটে গেল। স্কাই স্পোর্টসে ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা নিয়ে ক্ষোভে-বিক্ষোভে দুপুরের বিরতির পর মাঠে নামতেই অস্বীকৃতি জানিয়ে বসেছিল পাকিস্তান দল!
‘ওরা নিজেদের পুরোপুরি গর্দভ বলে প্রমাণ করেছে,’ বেশ কড়া সুরেই বললেন ২৭ বছরের ছোট ছেলে কাসিম। আর ২৯ বছর বয়সী বড় ছেলে সুলাইমানের গলায় স্পষ্ট একধরনের বিষণ্ন বিরক্তি, ‘একটা প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু তাই বলে মাঠে না নামার হুমকি দেওয়ার মতো বোকামি করবে, তা ভাবিনি। পাকিস্তানের হয়ে খেলা এবং ২২ বছর ইংল্যান্ডে থাকা একজন সাবেক খেলোয়াড়ের সাক্ষাৎকার যেন তুলে নেওয়া হয়, সে কথা বলার এখতিয়ার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) থাকার কথা নয়। বিষয়টায় কোনো রাজনীতি ছিল না, এটা ছিল পুরোপুরি মানবিক অধিকার আর তাঁর স্বাস্থ্যের ব্যাপার।’
দিন যত যাচ্ছে, মাস যত গড়াচ্ছে, মিথ্যা ও সাজানো দুর্নীতির অভিযোগে ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ইমরান খানের ওপর চলা নির্মমতার মাত্রা যেন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। যে সেলে তাঁকে রাখা হয়েছে, তা সাধারণত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের জন্য নির্দিষ্ট। পানির মান এতটাই জঘন্য যে সহ-বন্দীদের শত শত মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। পবিত্র কোরআন ছাড়া আর কোনো বই পড়তে দেওয়া হয় না তাঁকে। দিনে ২৩ ঘণ্টাই রাখা হয় নির্জন কারাবাসে। অথচ জাতিসংঘের নিজস্ব বিধিতে স্পষ্ট বলা আছে, টানা ১৫ দিন কাউকে এভাবে নির্জন কারাবাসে রাখাটা সরাসরি নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে।
কাসিম তাই পাকিস্তান সরকারের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয়ে নেই। সোজা বলে দিলেন, ‘ওরা স্পষ্টতই তাঁকে ভেতরেই মেরে ফেলতে চায়। খুব নীরবে তাঁকে স্তব্ধ করে দিতে চায়, যেন আস্তে আস্তে মানুষ তাঁকে ভুলে যায়। অবশ্য এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষটাকে নিয়ে এমনটা করা সহজ নয়। তাই যখনই কথা হয়, আমরা বুঝি ওদের কৌশলটা কী। জল ঘোলা করে সময় ক্ষেপণ করা, আর তারপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে তাঁর বেঁচে থাকাটাই অসম্ভব করে তোলা।’
সুলাইমান খোলাসা করলেন আসল ভয়ের জায়গাটা, ‘সবচেয়ে দুশ্চিন্তার যে তত্ত্বটা আমরা শুনছি তা হলো, সরকার নাকি ইচ্ছা করেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির খবরগুলো একটু একটু করে প্রকাশ করছে। এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন ওরা তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। আসলে ভেতরে–ভেতরে আরও মারাত্মক কিছুর পটভূমি তৈরি করা হচ্ছে। যাতে একদিন বলতে পারে, একজন বয়স্ক মানুষ মরে গেছে, এতে আমাদের কী করার আছে!’
ওরা সোজা আমাদের বলল আমরা যেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে না যাই। এমনকি আমরা যদি পাকিস্তানে যাই এবং সেখানে গ্রেপ্তার বা আটক হই, তারা আমাদের কোনো সহায়তা দেবে না।ইমরানকে জেল থেকে ছাড়াতে ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে সাহায্য প্রসঙ্গে তাঁর ছেলে কাসিম খান
দুই তরুণকে দেখলে খুব সহজেই ইমরান খানের অবয়ব আর ব্যক্তিত্বের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। কাসিম পেয়েছেন বাবার সেই বিখ্যাত লম্বা চুল। আর সুলাইমানের ঝোঁকটা বাবার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার দিকে।
দেশ বদলে দেওয়ার স্বপ্নই ২০১৮ সালে ইমরানকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছিল। ক্ষমতায় এসে প্রথম ভাষণেই ওয়াদা করেছিলেন দুর্নীতিগ্রস্তদের জবাবদিহির আওতায় আনার। কিন্তু জীবনের সেরা স্বপ্নের সেই আনন্দ বিষে রূপ নিতে সময় নেয়নি। ২০২২ সালে অনাস্থা প্রস্তাবে ক্ষমতাচ্যুত হতে হলো, তারপর ঘাতকের গুলিতে ঝাঁজরা হলো পা। আর তার এক বছরের মাথায় প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাঁকে ঠাঁই নিতে হলো কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে।
দুই ভাই চান ব্রিটিশ সরকার অন্তত পাকিস্তান সরকারের এই নগ্ন রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিবাদ জানাক। কারণ, পাকিস্তান দল বা সরকার যদি কাউকে ভয় পায়, তবে তা বিদেশি শক্তির ক্ষোভ। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে যা মিলেছে, তাকে আর যা-ই হোক শক্ত পদক্ষেপ বলা যায় না। গত সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার আগে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির যে ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে চরম ক্ষোভ কাসিমের।
‘সাহায্য তো দূরের কথা, আমরা উল্টো বাধা পেয়েছি,’ পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে বললেন কাসিম, ‘ওরা সোজা আমাদের বলল আমরা যেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে না যাই। এমনকি আমরা যদি পাকিস্তানে যাই এবং সেখানে গ্রেপ্তার বা আটক হই, তারা আমাদের কোনো সহায়তা দেবে না।’ ল্যামি নাকি পাকিস্তানের বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়াকে ‘ওদের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন!
সুলাইমান আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘এটা চরম হতাশাজনক। জাতিসংঘ যেখানে স্পষ্ট বলেছে তাঁকে অবৈধভাবে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে, সেখানে ব্রিটিশ সরকার আরও অনেক চাপ সৃষ্টি করতে পারত। এই ঘটনা আমার আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর চরম বিতৃষ্ণা এনে দিয়েছে। এখন বুঝতে পারি, দেশগুলো শুধুই নিজেদের স্বার্থ দেখে, সত্য বা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে কেউ গায়ে পড়ে ঝামেলা বাড়ায় না।’
পাকিস্তান সরকার অবশ্য বলছে, বিদেশে থাকা নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইসিওপি) ব্যবহার করে ছেলেরা চাইলে বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারে। কিন্তু জেমিমা গোল্ডস্মিথ এই যুক্তিকে স্রেফ একটা চাল বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, পাকিস্তানে ল্যান্ড করলেই যেন দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যায়, এ তারই এক ফাঁদ।
ভিসার জন্য আবেদন করেছিলেন দুই ভাই। সাধারণ নিয়মে ১০ দিনের মধ্যে যা পাওয়ার কথা। কিন্তু কোনো কারণ না দর্শিয়ে বারবার তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ফলে এক তীব্র ঝুলন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের। এখন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব নেওয়া অ্যান্ডি বার্নহাম ও এড মিলিব্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন তাঁরা। কাসিম জানালেন, খুব শিগগির তাঁরা বার্নহামের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার অনুরোধ পাঠাবেন।
এই মুহূর্তে পাকিস্তান সরকারের কোনো কথা বিশ্বাস করার ন্যূনতম কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না কাসিম ও সুলাইমান। সম্প্রতি সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসলামাবাদে শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে রেখে ইমরানের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু রক্ত জমাট বেঁধে এক চোখের আলো প্রায় হারানো ইমরানকে নিয়ে যাওয়া হলো এক সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, সেখানে নামকাওয়াস্তে পরীক্ষা করিয়েই আবার ফেরত পাঠানো হলো সেই নির্জন কারাবাসে!
‘পুরোটাই একটা নাটক, খুবই সন্দেহজনক’—কাসিমের ক্ষোভ, ‘শাফা হাসপাতালের ডাক্তারেরা আমাদের ফুফুর (যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক) সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন। যাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয়েছিল, যা যা অর্ডার করা হয়েছিল, সব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া হলো।’ সুলাইমান যোগ করলেন, ‘আইওয়াশ ছাড়া কিছু নয়। শাফা হাসপাতালের দিকে একটা গাড়ির বহর পাঠিয়ে সবাইকে বিভ্রান্ত করা হলো, আর বাবাকে চালান করে দেওয়া হলো সেই পুরোনো পিমসে (পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস)। যেখানে আগেও তাঁকে কয়েকবার নেওয়া হয়েছে।’
ছেলেরা এভাবে বিশ্বের সামনে সত্যটা ফাঁস করে দেওয়ায় পাকিস্তান সরকারের ক্ষোভও চড়ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, যিনি কিছুদিন আগেই ইমরানকে ‘পুরুষের মতো’ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁদের সরকার দাবি করেছে অন্য কথা। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ইমরান নাকি সাত কক্ষের এক প্রকাণ্ড প্রাঙ্গণে আছেন, সেখানে জিম করার সরঞ্জাম আছে, ঘরে রান্না করা খাবার আর টিভি দেখার সুযোগ আছে। এমনকি এ পর্যন্ত নাকি ৯০০–এর বেশি লোক তাঁর সঙ্গে দেখাও করে গেছেন!
এই দাবিগুলো কতটা হাস্যকর ও অবান্তর, তা বোঝাতে কোনো প্রমাণের দরকার পড়ে না। সত্যটা হলো, গত তিন বছর ধরে দুই ছেলে তাঁদের বাবাকে চোখের দেখা দেখতে পাননি। এমনকি চলতি বছরের মার্চের পর একটা টেলিফোন কল পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি।
‘ওরা এর কোনো প্রমাণ দিতে পেরেছে?’ সুলাইমান প্রশ্ন তোলেন, ‘সবই সরকারের ফাঁপা কথা। কোনো স্বচ্ছতা নেই, কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। তাহলে আমরা ওদের কথা বিশ্বাস করব কীভাবে? আমরা বাবাকে নিয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেয়েছিলাম ছয় মাস আগে, যখন তিনি নিজে তাঁর নষ্ট হতে বসা চোখের ব্যাপারে আর অবহেলার ব্যাপারে কথা বলেছিলেন।’
কাসিম আর সুলাইমান—দুজনই শুধু চান বাবার সঙ্গে একটা স্বাভাবিক সাধারণ গল্প করতে। রাষ্ট্রীয় কোনো গোয়েন্দার নজরদারি ছাড়া কথা বলতে চান পড়া বই নিয়ে, নিজেদের ক্যারিয়ারের অগ্রগতি নিয়ে। চলতি বছরের মার্চের আগে পর্যন্ত একটা অজ্ঞাত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন পেতেন তাঁরা। বড়জোর ছয় মিনিটের কথা, তারপরই সংযোগ কেটে দেওয়া হতো। এখন সেই নূন্যতম সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেই শূন্যতা প্রতিদিন গ্রাস করছে তাঁদের।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান কর্তাদের ওপর দুই ভাইয়ের বিরক্তি ও ঘৃণা ছাড়া আর কিছু নেই। মূল সমস্যাটা হলো, পিসিবি আর পাকিস্তান সরকারের মধ্যে এখন আর কোনো তফাত নেই। বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভি একই সঙ্গে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বটে!
‘বাবাকে নিয়ে সামান্য একটু শোরগোল হলেই ওদের প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়ে যায়,’ হেসে ফেলেন কাসিম, ‘ওরা ঘাবড়ে যায় বলেই পরপর ভুল করতে থাকে। ওই যে যেমন লর্ডসে দল নামতে দেবে না বলে কেলেঙ্কারি করল, আর উল্টো বিষয়টাকে আরও বড় বানিয়ে ফেলল।’ পিসিবির হীনম্মন্যতা কোন পর্যায়ের, তার প্রমাণ মেলে ২০২৩ সালে। দেশের ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে পিসিবি এক ভিডিও বানিয়েছিল। ১৯৯২ সালের সেই একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের ১১টি ছবি দেখানো হলেও পুরো ভিডিও থেকে উধাও করে দেওয়া হয়েছিল অধিনায়ক ইমরান খানকেই! যে অধিনায়ক ফাইনালে ৭২ রানের মহামূল্যবান ইনিংস খেলেছিলেন আর সতীর্থদের হুংকার দিয়েছিলেন, ‘কোণঠাসা বাঘের মতো লড়ো!’
তবে সত্য চাপা থাকে না। প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে বেশ সতর্ক থাকেন যিনি, অস্ট্রেলিয়ার সেই টেস্ট অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও ইমরান খানের অবিলম্বে চিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘যেকোনো মানুষের যে ন্যূনতম মর্যাদা পাওয়া উচিত, তাঁর সঙ্গে যেন সেই আচরণ করা হয়।’
আরও হৃদয়বিদারক মন্তব্য এসেছে সাবেক সতীর্থ জাভেদ মিয়াঁদাদের কাছ থেকে। গত সপ্তাহে এক সাক্ষাৎকারে কান্নাভেজা চোখে মিয়াঁদাদ বলছিলেন, ‘ওর সঙ্গে যা করা হচ্ছে, তা একদম ঠিক নয়, একদম অপ্রয়োজনীয়। ওর একটা পরিবার আছে। আমি সারাক্ষণ ভাবি, জেলখানায় লোকটা কীভাবে আছে? আমরা কত ঘনিষ্ঠ ছিলাম, আমরা পাকিস্তানকে কোন উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিলাম! ভেবে আমার বুকটা ফেটে যায়।’
দুই ছেলের লড়াইয়ের আইনি ও নৈতিক ধার কমেনি ঠিকই, কিন্তু সেই শক্ত বর্মের নিচে লুকিয়ে আছে এক অথই বিষাদ। কাসিম আর সুলাইমান—দুজনই শুধু চান বাবার সঙ্গে একটা স্বাভাবিক সাধারণ গল্প করতে। রাষ্ট্রীয় কোনো গোয়েন্দার নজরদারি ছাড়া কথা বলতে চান পড়া বই নিয়ে, নিজেদের ক্যারিয়ারের অগ্রগতি নিয়ে। চলতি বছরের মার্চের আগে পর্যন্ত একটা অজ্ঞাত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন পেতেন তাঁরা। বড়জোর ছয় মিনিটের কথা, তারপরই সংযোগ কেটে দেওয়া হতো। এখন সেই নূন্যতম সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেই শূন্যতা প্রতিদিন গ্রাস করছে তাঁদের।
‘গত একটা বছরে আপনার জীবনে কী কী হলো, তা কি ২০ মিনিটের একটা ফোনে স্বাভাবিকভাবে বলা যায়?’ কাসিমের গলায় হাহাকার, ‘কোনো অনুভূতি থাকে না সেই কথায়। ফলে আমরা বড় হয়ে কেমন মানুষ হলাম, সেটাই বাবা আজ আর জানেন না। প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আমাদের চেনাটা তাঁর জন্য খুব দরকার ছিল।’
কাসিম একজন ডিজিটাল উদ্যোক্তা, তৈরি করেছেন ‘মিফু’ নামের অনলাইন মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম। আর সুলাইমান লন্ডনের মেয়র পদে তাঁর মামা জ্যাক গোল্ডস্মিথের ২০১৬ সালের নির্বাচনের ক্যাম্পেইনে কাজ করার পর থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। ছোটবেলায়, যখন ইমরান আর জেমিমার বহুল আলোচিত সংসার ভেঙে গেল, তখন তাঁরা বছরের অর্ধেকটা লন্ডনে মায়ের সঙ্গে থাকতেন, আর ছুটির দিনগুলোতে পাকিস্তানে বাবার কাছে চলে যেতেন।
‘পাহাড়ের দেশে যখন হাইকিংয়ে যেতেন, বাবা তখন নিজের আসল রূপে থাকতেন,’ স্মৃতির পাতা উল্টালেন সুলাইমান, ‘দুনিয়ায় এটাই তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল। দিনে হালকা গরম, রাতে আগুনের পাশে সবাই মিলে সোয়েটার পরে বসে থাকা। তা ছাড়া দাদির বাড়িতেও তাঁর সঙ্গে কত সময় কেটেছে। মা-বাবার ডিভোর্সের পর বাবা সেখানে এসে টানা কয়েক সপ্তাহ থাকতেন। ক্রিকেট খেলতাম, টেনিস খেলতাম। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি এগুলোই।’
সেনাবাহিনীর প্রভাবটা আমি বুঝতে পারিনি। সেনাবাহিনীর সঙ্গে একবার সম্পর্কে চির ধরলেই খেলা ঘুরে যায়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই আমাদের উদ্বেগ শুরু হয়, আর ২০২২ সালের হত্যাচেষ্টা সেই ভয়কে সত্যি প্রমাণিত করে। তার পর থেকে জীবনটা কী পরিমাণ মানসিক চাপের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, তা বলে বোঝানো যাবে না।বাবা ইমরানের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে সুলাইমান খান
‘দাদির বাড়ির পেছনের বাচ্চাদের খেলার জায়গায় একটা নিচু মাংকি বার ছিল। বাবা সেখানে ঝুলে ঝুলে পুল-আপ দিতেন,’ মৃদু হেসে মনে করলেন কাসিম, ‘দেখতে বেশ বিদঘুটে লাগত তাঁকে। সন্ধ্যায় সবাই মিলে সিনেমা দেখতাম। খবরের শিরোনামের বাইরে বাবা মানুষটা কেমন, তা বোঝার জন্য ওটাই ছিল আমাদের আসল সময়। তাঁর সঙ্গে সেই সাধারণ আড্ডাটাই আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি।’
ইমরান খানের যদি একটাই শক্তি থেকে থাকে, তবে তা হলো তাঁর মোহনীয় ব্যক্তিত্ব। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে স্লোয়ান স্কয়ারের ফ্ল্যাট কিনার পর লন্ডনের নাইট ক্লাবগুলোতে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তৎকালীন ট্যাবলয়েডগুলোর বিনোদন পাতা ইমরানের খবর ছাড়া চলতই না। মডেল মেরি হেলভিন একবার বলেছিলেন, ‘ইমরানের মতো মারাত্মক আকর্ষণীয় পুরুষ আর একটাও নেই। যে কেউ তাঁর প্রেমে পড়তে বাধ্য।’
বিলিয়নিয়ার জেমস গোল্ডস্মিথের মেয়ে জেমিমাকে যখন বিয়ে করলেন, তখন তাঁদের ২২ বছরের বয়সের ফারাক আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ফ্লিট স্ট্রিটের মিডিয়ায় তুলকালাম ফেলে দিয়েছিল। ২০০৪ সালে বিচ্ছেদ হলেও জেমিমা কিন্তু ইমরানের এই পরিস্থিতিতে ভীষণ উদ্বিগ্ন। গত মাসেই বার্নহাম আর মিলিব্যান্ডকে লেখা এক খোলাচিঠিতে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, ‘এটা আর কেবল পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিষয় হয়ে নেই। এটা এখন একটা মানবিক জরুরি অবস্থা!’
কাসিম আর সুলাইমানের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন অতীত আর বর্তমানের সীমানা বারবার আবছা হয়ে আসে। ৭৩ বছরের ইমরান খান এখনো বেঁচে আছেন, কিন্তু তাঁদের মনে এক হিমশীতল ভয় প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে—আর কি কখনো দেখা হবে বাবার সঙ্গে? ধৈর্য প্রায় শেষ সীমায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁরা কোনো ভিসা ছাড়াই পাকিস্তানে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন, পরিণতি যা-ই হোক না কেন!
‘বাবা কখনোই চাইবেন না আমরাও জেলে যাই,’ সুলাইমান মনে করিয়ে দিলেন। ইমরানের বর্তমান স্ত্রী বুশরা বিবির কারাদণ্ড যে ইমরানের ওপর কী পরিমাণ মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে, তা সুলাইমান জানেন, ‘আমি চাই না আমাদের জন্য তাঁর সেই কষ্ট আরও দ্বিগুণ হোক।’
দুই ভাইকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইমরান খান যখন রাজনীতিতে পা বাড়াচ্ছিলেন, তখন কি তাঁদের মনে কোনো শঙ্কা জাগেনি? কারণ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদটা তো যেন এক অভিশাপের নাম!
সুদীর্ঘ ৭৯ বছরের ইতিহাসে পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রীই তাঁদের পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি! বেনজীর ভুট্টোকে দু-দুবার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বরখাস্ত করেছিলেন প্রেসিডেন্ট, আর ২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালে তাঁকে তো শেষই করে দেওয়া হলো। তাঁর বাবা জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাঁকেও সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৯৭৯ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল!
‘তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, আমি আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলাম। কারণ, ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি রাজনীতিতে তাঁকে কেউ কখনো গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করত না,’ সুলাইমান বললেন, ‘আমি ভেবেছিলাম তিনি দেশের সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন, এমনকি ক্রিকেট দলেরও! কিন্তু আমি অনুভিজ্ঞ ছিলাম, বোকা ছিলাম। সেনাবাহিনীর প্রভাবটা আমি বুঝতে পারিনি। সেনাবাহিনীর সঙ্গে একবার সম্পর্কে চির ধরলেই খেলা ঘুরে যায়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই আমাদের উদ্বেগ শুরু হয়, আর ২০২২ সালের হত্যাচেষ্টা সেই ভয়কে সত্যি প্রমাণিত করে। তার পর থেকে জীবনটা কী পরিমাণ মানসিক চাপের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, তা বলে বোঝানো যাবে না।’
‘বাবা আমাদের একবার বলেছিলেন, ধর্ম ও বিশ্বাস তাঁকে মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি দিয়েছে,’ কাসিম স্মৃতির পাতায় ডুব দিলেন, ‘বাবা বলতেন, এই চোর আর অপরাধীদের মুখোমুখি হতে আমার বিন্দুমাত্র ভয় করে না। আমার কপালে যদি মৃত্যু লেখা থাকে, তবে তা-ই হবে। তিনি আরও বলতেন, আমরা পাশে থাকলে হয়তো তিনি এতটা শক্ত হতে পারতেন না। তাই এক অর্থে, আমাদের দূরে রাখাটা তাঁর নিজের আদর্শের পেছনে জীবন দেওয়ার এক উপায় ছিল।’
এক মুহূর্ত থামলেন কাসিম। তারপর নরম কণ্ঠে বললেন, ‘আমি নিশ্চিত বাবা চাইবেন না আমরা অযথা নিজেদের ঝুঁকিতে ফেলি। কিন্তু আমরা তাঁকে দেখতে চাই। ভীষণভাবে দেখতে চাই।’
দুই ভাইয়ের এই সামান্য ইচ্ছা কি আর কোনো দিন পূরণ হবে?