এবারের এশিয়া কাপ কেন আলাদা

গ্রাফিকস: মো. মাহাফুজার রহমান

১৯৯০ সালের পর এশিয়া কাপ আয়োজন করে না ভারত, করছে না এবারও।

অর্ধযুগ ধরে এশিয়া কাপ অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে, ব্যতিক্রম হচ্ছে না এবারও।

প্রায় চার দশক আগে শুরু হওয়ার পর থেকেই এশিয়া কাপের মূল দ্বৈরথে ভারত ও পাকিস্তান, ভিন্নতা নেই এবারও।

এমন অভিন্ন, ব্যতিক্রমহীন আর ‘রুটিন’ এশিয়া কাপ যখন আবারও সামনে, তখন দর্শক-সমর্থক প্রশ্ন তুলতেই পারেন, এবারের এশিয়া কাপ আলাদা কিসে? ‘থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’ কায়দার একই স্বাদের, বর্ণের আর গন্ধের বৈচিত্র্যহীন টুর্নামেন্ট নয় তো? আর দলগুলোরই এতে কী উপকার হয়? এই তো, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপের ট্রফি হাতে তুলল শ্রীলঙ্কা, ঠিক পরের মাসেই অস্ট্রেলিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের প্রথম রাউন্ড নামের বাছাইপর্বে খেলতে হলো। তারও আগে ২০১৬ আসরে রানার্সআপ হওয়া বাংলাদেশকেও তিন দিন পরই নামতে হয়েছিল সেবারের বিশ্বকাপের একই সিঁড়িতে, পা গলাতে হয়েছিল একই জুতায়। এমন এশিয়া কাপ খেলে দলগুলোরই–বা কী উন্নতি ঘটে? এবারের আসরই-বা কী এমন কারণে বিশেষ হয়ে থাকবে?

আরও পড়ুন

২.

এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) বৈঠকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে (পিসিবি) এশিয়া কাপের আয়োজক স্বত্ব দেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। তখন ২০২০ সালের জন্য বলা হলেও পরে কোভিড-১৯-এর প্রকোপ, আয়োজকে অদলবদল ও দলগুলোর নানা ব্যস্ততার চক্করে পড়ে এটি ২০২৩ সালে এসে ঠেকে। তবে পিসিবি আয়োজিত এশিয়া কাপ নিয়ে নাটকীয়তার সেটা শুরু মাত্র। ২০২২ সালের অক্টোবরে শুরু হয় ম্যারাথন আকৃতির ‘নতুন এপিসোড’। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের বার্ষিক সাধারণ সভা শেষে এর সচিব জয় শাহ জানান, এশিয়া কাপ খেলতে ভারতীয় দলকে পাকিস্তানে পাঠানো হবে না। জয় শাহ এসিসিরও সভাপতি। তিনি জানান, এশিয়া কাপ অতীতে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে হয়েছে, এবারও হবে। এর প্রতিক্রিয়ায় পিসিবির এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৩ বিশ্বকাপ বর্জন করতে পারে তারা। একপর্যায়ে তৎকালীন পিসিবি চেয়ারম্যান রমিজ রাজা এমনও হুমকি দেন যে পিসিবির আয়োজন–স্বত্ব কেড়ে নেওয়া হলে পাকিস্তান এশিয়া কাপই খেলবে না।

পাকিস্তান বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বলে হুমকি দিয়েছিলেন পিসিবির তৎকালীন চেয়ারম্যান নাজাম শেঠি
ফাইল ছবি: এএফপি

দুই ক্রিকেট বোর্ডের দ্বান্দ্বিক অবস্থানের অবসানের লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারিতে বাহরাইনে অনুষ্ঠিত হয় এসিসির বৈঠক। সেখানে সব সদস্যদেশের উপস্থিতিতে একটা সমাধানে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন সবাই। তত দিনে পিসিবি চেয়ারম্যান পদে রমিজ রাজার জায়গায় নাজাম শেঠি এসে গেছেন। বিসিসিআইয়ের সঙ্গে যাঁর তুলনামূলক সদ্ভাব আছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু শেঠি বা এসিসি সদস্যদের উপস্থিতি কোনোটারই সুফল পাওয়া যায়নি। নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়োজন করা যেতে পারে, এমন একটা আলাপ ওঠার পর পিসিবি-প্রধান পাকিস্তানের মাটিতেই এশিয়া কাপ হতে হবে বলে জোরালো অবস্থান নেন। নইলে পাকিস্তান বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না হুমকিও দেন।

আরও পড়ুন

পিসিবি এশিয়া কাপকে বিশ্বকাপের দর-কষাকষিতে নিয়ে যাওয়ার পর এ নিয়ে আলোচনা ওঠে আইসিসিতেও। মার্চে আইসিসির ত্রৈমাসিক বৈঠকের সাইডলাইনে নতুন একটি প্রস্তাব নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করেন শেঠি, যা পরের মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে এসিসিকে জানানো হয়। পিসিবির এই প্রস্তাবের নাম দেওয়া হয় ‘হাইব্রিড মডেল’। এই মডেলে এশিয়া কাপের ভেন্যু হবে দুটি। একটি নিরপেক্ষ ভেন্যু, যেখানে সব দলই খেলবে; আরেকটি পাকিস্তান, যেখানে ভারত খেলবে না।

এপ্রিলে তোলা পিসিবির এই প্রস্তাব সবাই মেনে নেবে বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল, পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। ভারত পুরো টুর্নামেন্টই নিরপেক্ষ ভেন্যুতে নিয়ে যেতে অনড়। আর বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার আপত্তি নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে প্রস্তাবিত আরব আমিরাতের গরমে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা আগ বাড়িয়ে এশিয়া কাপ আয়োজনের আগ্রহ দেখানোয় আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পাকিস্তান। পিসিবি চেয়ারম্যান ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এশিয়া কাপকে বিশ্বকাপের দর-কষাকষিতে নিয়ে যান। দাবি করেন, বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে হোক। সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার নামও বলে দেন।

এ নিয়ে লাহোরে পিসিবির সঙ্গে বৈঠক করতে ছুটে যান আইসিসি চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী। যা পাকিস্তানের মাটিতে কোনো আইসিসি–প্রধানের ১৫ বছর পর প্রথম সফর।

আরও পড়ুন

শেষ পর্যন্ত এশিয়া কাপের ভেন্যু নিয়ে অচলাবস্থার অবসান ঘটে জুনে। এসিসি জানায়, হাইব্রিড মডেলেই খেলবে ভারত, নিরপেক্ষ ভেন্যু হবে শ্রীলঙ্কা। থামে আট মাস ধরে চলা দীর্ঘ নাটকীয়তা।

এশিয়া কাপের ৩৯ বছর আর ১৬ আসরের ইতিহাসে স্রেফ ভেন্যু ঠিক করা নিয়ে এত টানাহেঁচড়া এবারই প্রথম। তবে এখানেই শেষ হচ্ছে না। সামনে অপেক্ষা করছে আরও নজিরবিহীন দৃশ্য। ৩০ আগস্ট মুলতানে এশিয়া কাপের উদ্বোধনী ম্যাচে খেলবে পাকিস্তান-নেপাল। পরদিন বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা খেলবে ২৭০০ কিলোমিটার দূরের পাল্লেকেলেতে। ৬ দলের একটা মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে দুই আয়োজকের এমন কিছুও তো এশিয়া কাপ আগে দেখেনি।

বিসিসিআই সভাপতি রজার বিনি
ফাইল ছবি: এএফপি

আরেকটা দিকও আছে। এশিয়া কাপের খেলা দেখতে পাকিস্তানে যাবেন বিসিসিআই সভাপতি রজার বিনি ও সহসভাপতি রাজীব শুক্লা। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত-পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্পর্ক যে বিরূপ অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল, তারপর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কেউও আর পাকিস্তানে যাননি, বিনি-শুক্লা যাবেন দেড় দশক পর এই প্রথম।

মাঠের বাইরের এত এত ‘প্রথম’ বা ‘নতুনত্ব’ কি এবারের এশিয়া কাপকে আলাদা করে তুলছে না!

আরও পড়ুন