৫ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস বৈঠকের আগে ঘুড়ি উৎসব: লাহোরে কী করে এলেন আমিনুল
লাহোর বিমানবন্দরে নেমে হোটেলে যাননি আমিনুল ইসলাম, যাননি গাদ্দাফি স্টেডিয়ামেও। অবাক করা ব্যাপার, ক্রিকেট কূটনীতি করতে গিয়ে তিনি আগে গিয়েছিলেন ঘুড়ি ওড়াতে!
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম লাহোরে পৌঁছান ৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে। বসন্তের ঘুড়ি উৎসব চলছে তখন পাকিস্তানে। তারই অংশ হিসেবে গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের কাছে বড় এক হলের ছাদেও ওড়ানো হচ্ছিল ঘুড়ি। সেই উৎসবে আমিনুলকে শুধু নিয়েই যাননি পিসিবির প্রধান মহসিন নাকভি, বসিয়ে দেন ‘চিফ গেস্টের’ আসনেও।
আজ সকালে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমিনুল লাহোরে তাঁর ঝটিকা সফরের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেছেন, ‘লাহোরে বসন্তের ঘুড়ি উৎসব ছিল। ম্যাসিভ! পুরো শহর একদম অন্য লেভেলে ছিল। যেহেতু পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্লাস লাহোরে তাঁর বাসা, পিসিবিও ওখানে, কাজেই সেই উৎসবে আমাকে “চিফ গেস্ট” বানানো হলো। এয়ারপোর্ট থেকে সেখানে গিয়ে নিজেও একটু ঘুড়ি ওড়ালাম (হাসি)।’
ঘুড়ি উৎসবে বাংলাদেশ ক্রিকেট এবং পাকিস্তান ক্রিকেট নিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা হলো। বলতে পারেন, আমাদের সম্পর্কটা ক্রিকেট দিয়ে আরও মসৃণ করার একটা মাধ্যম হয়ে গিয়েছিল ঘুড়ি উৎসবটা। আমরা চীনের “পিং পং ডিপ্লোমেসি”র কথা জানি। লাহোরে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা একটা “কাইট ডিপ্লোমেসি”।প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম
বিসিবি সভাপতি লাহোরে গিয়েছিলেন মূলত আইসিসি ও পিসিবির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এক সভায় যোগ দিতে, যে সভার পর চলমান টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের মহাসংকট কেটে গেছে। কলম্বোয় ভারতের বিপক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচ খেলতে রাজি হয়েছে পাকিস্তান। আইসিসিও বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে, ভারতে নিরাপত্তাশঙ্কার কারণে বিশ্বকাপ না খেলায় বাংলাদেশকে কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না। উপরন্তু ২০৩১ সালের আগে বাংলাদেশে হবে আইসিসির একটি বড় ইভেন্ট। আমিনুল জানিয়েছেন, সেটি হতে পারে নারী বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি।
গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের পিসিবি কার্যালয়ে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মোট তিনটি সভায় যোগ দেন আমিনুল। আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা ও পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভির সঙ্গে মূল সভাটির ব্যাপ্তি ছিল ৫ ঘণ্টার মতো। তার আগে দুপুরে ঘুড়ি উৎসবে যোগ দিয়ে আমিনুলের মনে পড়েছে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র টেবিল টেনিস দলের চীন সফরের মাধ্যমে হওয়া ‘পিং পং ডিপ্লোমেসি’র কথা।
সাক্ষাৎকারে বিসিবি সভাপতি বলেছেন, ‘ঘুড়ি উৎসবে বাংলাদেশ ক্রিকেট এবং পাকিস্তান ক্রিকেট নিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা হলো। বলতে পারেন, আমাদের সম্পর্কটা ক্রিকেট দিয়ে আরও মসৃণ করার একটা মাধ্যম হয়ে গিয়েছিল ঘুড়ি উৎসবটা। আমরা চীনের “পিং পং ডিপ্লোমেসি”র কথা জানি। লাহোরে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা একটা “কাইট ডিপ্লোমেসি”।’
এই ‘ডিপ্লোমেসি’তে বাংলাদেশকে আপাতদৃষ্টিতে লাভবানই মনে হচ্ছে। ‘লাভবান’ বলতে ভারতের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ করে বিশ্বকাপ না খেলেও ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই এর আগে জানিয়েছিল, টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেললে সব মিলিয়ে ৩৩০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হবে বাংলাদেশের। আর লড়াইটা যেহেতু ‘ক্রিকেট সুপারপাওয়ার’ ভারতের বিপক্ষে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানচিত্রে ভবিষ্যতে নানা জটিলতায় পড়ার শঙ্কা তো ছিলই।
কিন্তু পরশু লাহোরের সভার পর কাল রাতে দেওয়া বিবৃতিতে আইসিসি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপ না খেলায় কোনো ক্ষতির মধ্যে পড়বে না বাংলাদেশ। এ দেশের ক্রিকেট নিয়ে তাদের মন্তব্য, ‘গর্ব করার মতো ক্রিকেট ঐতিহ্য এবং বৈশ্বিক ক্রিকেট বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশের।’ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যেন না ফেলে, সেটিও দেখার আশ্বাস দিয়েছে আইসিসি।
লাহোর সভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল—ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে পাকিস্তান। সাক্ষাৎকারে আমিনুলের কথায় মনে হয়েছে, পিসিবির সঙ্গে বিসিবির অনেকটা অলিখিত লেনদেনেরই ফল এটি। পিসিবি বাংলাদেশকে সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে জোরালো অবস্থান নিয়ে আইসিসির সঙ্গে লড়েছে। এদিকে বিসিবিও পিসিবিকে তাদের ম্যাচ বয়কটের ‘অটল’ অবস্থান থেকে নড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
আমিনুল বলেছেন, বাংলাদেশের দাবি জানানোর পাশাপাশি পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে রাজি করানোও তাঁর লাহোরে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল। তিনি বলেন, ‘সভার এজেন্ডা ছিল বাংলাদেশকে যে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে, (বাংলাদেশ না খেলায়), সেটা যাতে না হয়। সঙ্গে আমার লক্ষ্য ছিল ভারতের সঙ্গে খেলতে কীভাবে পাকিস্তানকে রাজি করানো যায়। কারণ, পাকিস্তান অ্যাডাম্যান্ট ছিল খেলবে না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যে পাকিস্তান যদি না খেলে, ইট উইল বি ডিজাস্টার ফর আইসিসি।’
সব ক্ষতি এড়িয়েও আমিনুলের দুঃখবোধ আছে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে পারল না বলে। তবে সিদ্ধান্তটা ‘ওপর থেকে এসেছে’ জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সিকিউরিটি থ্রেট এখানে বড় ছিল। আমার মনে হয়, সরকারের সিদ্ধান্তটা আর কোনোভাবে বিবেচনার সুযোগ ছিল না।’
বিশ্বকাপ নিয়ে সিদ্ধান্তের জেরে ভারতের সঙ্গে ক্রিকেট কূটনীতি হয়তো আপাতত স্থগিতই থাকবে বাংলাদেশের। তবে আমিনুলের আশা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানেও উষ্ণতা ফিরবে। নাটকীয় লাহোর সফর ক্রিকেট কূটনীতির দারুণ এক অভিজ্ঞতাই যে দিয়েছে তাঁকে!
আমিনুল দেখেছেন, কীভাবে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাঁর পাকিস্তানের ভিসা হয়ে গেল, কীভাবে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে আইসিসি ঢাকা-দুবাই-করাচি-লাহোর-দুবাই-করাচি-ঢাকা বিমান টিকিট মিলিয়ে দিল এবং ভোজবাজির মতো দেখলেন, পাকিস্তান থেকে আমন্ত্রণ আসার মাত্র দেড়-দুই ঘণ্টার মধ্যে তিনি বিমানের সিটে!
কিন্তু তখনো আমিনুল জানতেন না, সেখানেই আসলে শুরু ‘কাইট ডিপ্লোমেসি’র।
* আমিনুল ইসলামের পুরো সাক্ষাৎকার পড়ুন আগামীকাল প্রিন্ট ও অনলাইন সংস্করণে।
