গ্যারি সোবার্সের ছয় ছক্কার কীর্তিতে অমর এক ম্যালকম ন্যাশ

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এক ওভারে ছয় ছক্কা মারার প্রথম রেকর্ড সোবার্সের।ছবি: ইউটিউব

সেই দিনটা ছিল শনিবার।

কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের মৌসুম তখন প্রায় শেষের দিকে। পয়েন্ট তালিকায় ইয়র্কশায়ারের চেয়ে বেশ পিছিয়ে দুইয়ে ছিল স্বাগতিক গ্ল্যামারগন। নটিংহামশায়ার পাঁচে, দলের অধিনায়ক গ্যারি সোবার্স।

সোয়ানসির সেন্ট হেলেন্সে ওই ম্যাচটা ছিল গ্ল্যামারগনের বিপক্ষে অতিথি নটিংহামশায়ারের। জিতলে চারে উঠে আসবে অতিথিরা। শুধু পয়েন্ট তালিকার হিসাবই নয়, ম্যাচটার সঙ্গে একটা ব্যক্তিগত বাজিও জড়িয়ে ছিল সোবার্সের, হারলে দিতে হতো এক কেস শ্যাম্পেন।

টস জিতে ব্যাটিং নিয়েছিল নটিংহামশায়ার, শনিবারের মধ্যেই মোটামুটি ভালো একটা জায়গায় পৌঁছে যায় তারা। ৩০৮ রানে ৫ উইকেট পড়ার পর সোবার্স বুঝলেন, ইনিংস ঘোষণার আগে দ্রুত আরও কিছু রান দরকার, যাতে দিনের বাকি সময়টায় গ্ল্যামারগনের টপ অর্ডারের ওপর চাপ তৈরি করার সুযোগ পান তাঁর বোলাররা। ক্রিজে তখন অধিনায়ক নিজে। ওপাশে বোলার ২৩ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার ম্যালকম ন্যাশ।

অধিনায়ক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি স্লো লেফট আর্ম বোলিং করতে চাই কি না। সোবার্স এসে আমার স্পিন বোলিং ক্যারিয়ারটাই তো শেষ করে দিলেন। বড্ড সংক্ষিপ্ত একটা পরীক্ষা হয়ে রইল সেটা।
ম্যালকম ন্যাশ

তবে পেস বোলিং ছেড়ে সেদিনই তিনি স্পিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন। পরে দ্য গার্ডিয়ানকে ন্যাশ বলেছিলেন, ‘অধিনায়ক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি স্লো লেফট আর্ম বোলিং করতে চাই কি না। সোবার্স এসে আমার স্পিন বোলিং ক্যারিয়ারটাই তো শেষ করে দিলেন। বড্ড সংক্ষিপ্ত একটা পরীক্ষা হয়ে রইল সেটা।’

গ্ল্যামারগন অধিনায়ক টনি লুইসের অবশ্য ঘটনাটা মনে আছে একটু অন্যভাবে। তাঁর ভাষায়, ‘ন্যাশ ভেবেছিল, ডেরেক আন্ডারউডের স্টাইলে বল করতে পারলে সে বোলিং গড়ের হিসাবে সবার ওপরে থাকতে পারবে।’

সোবার্সকে (মাঝে) পাশে রেখে ছয় ছক্কার গল্প শোনাচ্ছেন ম্যালকম ন্যাশ (বামে)
ছবি : টুইটার

অধিনায়কের কথায় বা নিজের ইচ্ছাতেই হোক, স্লো লেফট আর্মের যে পরীক্ষা তিনি সেদিন করতে চেয়েছিলেন, সেটা ক্রিকেট ইতিহাসেই নতুন একটা অধ্যায় হয়ে যাবে, তা কে জানত!

সোবার্স ততক্ষণে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। নিজেই পরে বলেছিলেন, ‘আউট হওয়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। শুধু দ্রুত রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করতে চেয়েছিলাম।’ পরিস্থিতিও ছিল তাঁর পক্ষে। ন্যাশের বলে তেমন টার্ন ছিল না, লেগের দিকে বাউন্ডারিও ছিল কিছুটা ছোট।

প্রথম বল। মিডউইকেটের ওপর দিয়ে মাঠের বাইরে।

দ্বিতীয় বল। আবার ছক্কা, এবার জনাকীর্ণ গ্যালারিতে।

তৃতীয় বল একটু অফে সরালেন ন্যাশ। তাতেও লাভ হলো না। বাঁ পা শূন্যে ভাসিয়ে সোবার্স মারলেন লং অনের ওপর দিয়ে। ছক্কা!

আরও পড়ুন

মাঠের মধ্যেই ন্যাশের কাছে গিয়ে লুইস বললেন, ‘পুরোনো কায়দায় ফিরে গিয়ে ব্লকহোলে বল ফেলতে চাইলে ফেলতে পারো, আমার আপত্তি নেই।’ ন্যাশের চোখে তখন অহংকার, ‘আমি সামলে নিতে পারব। ওকে আমার ওপরই ছেড়ে দিন।’

সেই অহংকারের দাম চুকাতে হলো চতুর্থ বলে। সোজা বল, সোবার্স পুল করলেন ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগ দিয়ে, বল কংক্রিটের দেয়ালে লেগে ফিরে এল স্কয়ার লেগ আম্পায়ারের কাছাকাছি। সোবার্স নিজেই পরে বলেছেন, ‘তখনই প্রথম মাথায় এল, ছয় ছক্কার কথা ভাবা যায়।’ ততক্ষণে গ্যালারি অবশ্য তাঁর চিন্তার চেয়েও এগিয়ে, দর্শকেরা তখন সমস্বরে চিৎকার করছেন, ‘সিক্স, সিক্স, সিক্স।’

সোবার্সের ছয় ছক্কা
ছবি: বিবিসি

পঞ্চম বল। স্লোয়ার। সোবার্স শট খেললেন বটে; কিন্তু ভালো টাইমিং হলো না। লং অফে লাফিয়ে উঠলেন রজার ডেভিস। বল হাতে জমেও গেল। কিন্তু ভারসাম্য? ডেভিস বাউন্ডারি লাইনের ওপারে সামলাতে পারলেন না নিজেকে। মাঠজুড়ে তখন কিছুক্ষণের বিভ্রান্তি। আউট ভেবে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটাও শুরু করে দিয়েছিলেন সোবার্স। ডেভিস কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানালেন, ক্যাচ পরিষ্কার হয়েছে কি না নিশ্চিত নন তিনি নিজেও। ডেভিসের কাছের ফিল্ডার টনি কর্ডল বললেন, এটা ছক্কাই। গ্যালারি ততক্ষণে চিৎকার করে বলছে সোবার্সকে খেলা চালিয়ে যেতে। দুই আম্পায়ার ধীরেসুস্থে একে অপরের কাছে গিয়ে আলোচনা করলেন। এরপর এডি ফিলিপসন ঘুরে দাঁড়িয়ে দর্শকদের করতালির মধ্যে ইশারা করলেন, ছক্কাই হয়েছে।

আরও পড়ুন

পাঁচ ছক্কা হয়ে গেছে। বাকি আর একটি বল। লুইস তখন প্রায় সব ফিল্ডারকেই পাঠিয়ে দিলেন বাউন্ডারির কাছে, বেশির ভাগই লেগ সাইডে। সোবার্স আন্দাজ করলেন, এবার ন্যাশ বল করবেন আরও জোরে। অনুমানে ভুল হলো না তাঁর। বলটি সত্যিই দ্রুত এল, শর্টও।

সোবার্স পরে বলেছেন, বলটা তখন তাঁর কাছে দেখাচ্ছিল ফুটবলের মতো বড়। পেছনের পায়ে ভর দিয়ে মিড উইকেটের ওপর দিয়ে উঁচু করে মারলেন। বল মাঠ পেরিয়ে গড়াতে গড়াতে চলে গেল কিং এডওয়ার্ড রোড পর্যন্ত। পরদিন এক স্কুলপড়ুয়া ছেলে বলটা কুড়িয়ে ফেরত দিয়েছিল। আজও সেটি শোভা পাচ্ছে ট্রেন্ট ব্রিজের জাদুঘরে।

এই জুলাইয়ের মারা গেছেন গ্যারি সোবার্স
এএফপি

ক্রিকেটে ততক্ষণে নতুন এক ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে। এক ওভারের ছয় বলে ছয় ছক্কা! শুধু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নয়, প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটেই সেই সময় পর্যন্ত যা প্রথম।

এর আগে ছয় বলের এক ওভারে সর্বোচ্চ রান ওঠার রেকর্ড ছিল ৩২। ১৯৬৫ সালে ট্রেন্ট ব্রিজে নটিংহামশায়ারের বিপক্ষে লেস্টারশায়ারের ক্লাইভ ইনম্যান এবং ১৯৩২ সালে কার্ডিফে হ্যাম্পশায়ারের বিপক্ষে গ্ল্যামারগনের সিরিল স্মার্ট এই কীর্তি গড়েছিলেন। ১৯১১ সালে হোভে সাসেক্সের বিপক্ষে নটিংহামশায়ারের টেড অ্যালেটসন এক ওভারে ৩৪ রান তুলেছিলেন ঠিকই, তবে তাতে দুটি নো বলও ছিল।

আরও পড়ুন
খেলোয়াড়ী জীবনে স্যার গ্যারি
এএফপি

সেই সময় স্থানীয় ম্যাচও সরাসরি সম্প্রচার করত আঞ্চলিক বিবিসি কেন্দ্রগুলো, সোয়ানসির মাঠেও উপস্থিত ছিল বিবিসি ওয়েলস। ধারাভাষ্যে ছিলেন গ্ল্যামারগন ক্রিকেটের প্রবাদপুরুষ উইলফ উলার, যাঁর হাত ধরেই ১৯৪৮ সালে প্রথম কাউন্টি শিরোপা জিতেছিল গ্ল্যামারগন। ওভার শুরুর আগেই প্রযোজক তাঁকে স্টুডিওতে ফিরে যেতে বলেছিলেন। উলার রাজি হননি। লুইসের ভাষায়, ‘তিনি এতটাই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন যে পুরো ওভার খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেই ধারাভাষ্য পরে সম্প্রচারযোগ্য করতে সম্পাদনা করতে লেগেছিল কয়েক দিন।’

ওভার শেষেই ইনিংস ঘোষণা করে মাঠ ছাড়লেন সোবার্স। ওদিকে গ্ল্যামারগনের ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের দুশ্চিন্তা না করতে বলছিলেন ন্যাশ, ‘এটা থেকেই তো রীতিমতো নাম কামিয়ে ফেলব, সিনেমাও তো বানিয়ে ফেলতে পারে কেউ।’ একজন সতীর্থ পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, ‘সিনেমার নাম কী দেবে তাহলে, “গন উইথ দ্য উইন্ড”?’

পরে ন্যাশ বলেছিলেন, ‘চাইলে ওয়াইড বল করে ওকে আটকাতে পারতাম; কিন্তু সেটা আমার চরিত্রের সঙ্গে যায় না।’ নিজের বোলিং নিয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন ছিল, ‘ফিরে তাকালে মনে হয়, ওভারটা খুব একটা খারাপ ছিল না। সত্যিকারের খারাপ বল করেছিলাম মোটে একটা, একদম শেষেরটা।’

আরও পড়ুন

ক্যারিয়ারে ৯৯১টি প্রথম শ্রেণির উইকেট নেওয়া ম্যালকম ন্যাশকে পৃথিবী আজও মনে রেখেছে স্রেফ ওই একটা ওভারের জন্য। আফসোস ছিল না তাঁর। কারণ, প্রতিপক্ষ ছিলেন এক অবিশ্বাস্য প্রতিভা, তর্কযোগ্যভাবে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার, সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার। ক্যারিয়ার শেষে দুজন একসঙ্গে গলফ খেলেছেন বহুবার। হেসেছেন পুরোনো স্মৃতি নিয়ে।

ভাবছেন হঠাৎ করে কেন সোবার্সের সেই ছয় ছক্কার গল্প হচ্ছে? বলাই তো হয়নি। যে শনিবারে এই কীর্তিটা গড়েছিলেন, সেই দিনটা ছিল ১৯৬৮ সালের ৩১ আগস্ট। মানে, ৫৮ বছর আগে আজকের এই দিনে।

ও আচ্ছা, আরও একটা তথ্য দেওয়া হয়নি। ১৯৭৭ সালের ২৯ আগস্ট আবারও সেই সোয়ানসির সেন্ট হেলেন্সেই এক ওভারে ৩৪ রান তুলেছিলেন ফ্র্যাঙ্ক হেইজ, বোলার আবারও সেই ম্যালকম ন্যাশ। হেইজের সেই ওভারের ছক্কার ভিড়ে দ্বিতীয় শটটি ছিল চার!