বিমানবন্দরে বর্ণবাদের শিকার হওয়ার অভিযোগ সাঙ্গাকারার, পাল্টা জবাব রায়ানএয়ারের
ক্রিকেট মাঠে ভদ্রলোকের প্রতিচ্ছবি ছিলেন কুমার সাঙ্গাকারা। দারুণ ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তাঁর মার্জিত আচরণও মুগ্ধ করেছে ক্রিকেটপ্রেমীদের। সেই সাঙ্গাকারাই এবার মেজাজ হারালেন। ক্রিকেট মাঠে নয়, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন বিমানবন্দরে। স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিমানযাত্রার সময় এমন এক অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর, যেটিকে সরাসরি ‘বর্ণবাদী আচরণ’ বলছেন শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক।
অভিযোগের তির ইউরোপের স্বল্প খরচের বিমান সংস্থা রায়ানএয়ারের কর্মীদের দিকে। তবে বিমান সংস্থাটিও চুপ করে থাকেনি। সাঙ্গাকারার অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছে তারা।
ঘটনাটি ২৮ অক্টোবরের। সেদিন ডাবলিন থেকে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে যাওয়ার কথা ছিল সাঙ্গাকারা ও তাঁর পরিবারের। বিমানবন্দরের বোর্ডিং গেটে রায়ানএয়ারের কর্মীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয় তাঁদের। সাঙ্গাকারার অভিযোগ, কর্মীরা তাঁদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ও হুমকিমূলক আচরণ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সাঙ্গাকারা প্রথমে লেখেন, ‘ডাবলিনে রায়ানএয়ারের বোর্ডিং গেটের কর্মীদের কাছ থেকে কেউ কি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন? আমি ও আমার পরিবার এইমাত্র হয়েছি। অভিজ্ঞতাটা ছিল ভয়াবহ। আমাদের সঙ্গে কথা বলার ধরন, নিয়মকানুন সামলানোর পদ্ধতি ও হুমকিমূলক আচরণ। কোনো যাত্রীর সঙ্গেই এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। ডাবলিনে এটাই আমার প্রথম খারাপ অভিজ্ঞতা।’
সাঙ্গাকারার অভিযোগের জবাবে রায়ানএয়ারের দাবি, ভিসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য মিররকে দেওয়া বিবৃতিতে বিমান সংস্থাটি বলেছে, ‘বাধ্যতামূলক অভিবাসন যাচাইয়ের দায়িত্ব পালনরত বোর্ডিং গেটের একজন কর্মী প্রয়োজনীয় ভিসার কাগজপত্র দেখতে চাইলে এই যাত্রী তা দিতে অস্বীকৃতি জানান।’
তবে শেষ পর্যন্ত সাঙ্গাকারার বিমানযাত্রায় কোনো বাধা আসেনি। রায়ানএয়ার জানিয়েছে, ‘যাচাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এই যাত্রীর ভ্রমণের যোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়। এরপর ২৮ অক্টোবর ডাবলিন থেকে ব্রিস্টলগামী নির্ধারিত ফ্লাইটেই তিনি ভ্রমণ করেন।’
কিন্তু বিমান সংস্থার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন সাঙ্গাকারা।
এক্সে একজন তাঁকে খোঁচা দিয়ে মন্তব্য করেন, তারকা হওয়ার কারণে সাঙ্গাকারা হয়তো এখন আর বুঝতে পারছেন না, সবার সঙ্গে সমান আচরণ করা হচ্ছে। এর জবাবে সাঙ্গাকারা আরও গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি লেখেন, ‘যখন বলা হয়, আপনাদের মতো মানুষ, আপনাদের মতো পাসপোর্ট যাঁদের, তাঁদের এমন আচরণই প্রত্যাশা করা উচিত, আর এমন জঘন্য মন্তব্যের প্রতিবাদ করলে আমাদের অন্য যাত্রীদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং বিমানে উঠতে দেওয়া হবে না, তখন সেটাকে সবার সঙ্গে সমান আচরণ বলা যায় না। এটা বর্ণবাদ।’
সাঙ্গাকারার অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছেন ব্রিটিশ টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব পিয়ার্স মরগানও। সাবেক এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছেন, ‘কুমারের চেয়ে বেশি ভদ্র ও মর্যাদাবান মানুষ খুব কমই দেখেছি। তিনি যখন এমন কথা বলছেন, তখন নিশ্চয়ই সত্যিই লজ্জাজনক কিছু ঘটেছে। আশা করি, রায়ানএয়ার বিষয়টি দ্রুত ও যথাযথভাবে দেখবে।’
সাঙ্গাকারার অভিজ্ঞতার কথা শুনে নিজের জীবনে বৈষম্যের শিকার হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরেন শ্রীলঙ্কার ব্যবসায়ী সঞ্জীবা বিরাওয়ারানা। তিনি লেখেন, ‘কুমার, পশ্চিমা বিশ্বের সব জায়গাতেই আমি বৈষম্যের শিকার হয়েছি। সেখানে ১৬ বছর থেকেছি, এরপর আরও ২৫ বছর নিয়মিত যাতায়াত করেছি। এখন আর এসব চাই না।’
সঞ্জীবা বিরাওয়ারানাকে সাঙ্গাকারার জবাব, ‘নিজে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে সেটা সত্যিই খুব ধাক্কা দেয়।’
আরেকজন সমর্থক বিস্ময় প্রকাশ করেন, সাঙ্গাকারার মতো একজন ব্যক্তিত্বকেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে! সাঙ্গাকারা তাঁকে মনে করিয়ে দেন, ‘শুধু আমি নই, কারও সঙ্গেই এমন হওয়া উচিত নয়।’
বিষয়টি নিয়ে সাঙ্গাকারা ও রায়ানএয়ারের কাছে আরও মন্তব্য চেয়েছে ইংল্যান্ডের মেইল স্পোর্ট।
শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান সাঙ্গাকারা তাঁর দেশের হয়ে ১৩৪টি টেস্ট, ৪০৪টি ওয়ানডে ও ৫৬টি টি-টুয়েন্টি খেলেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর রান ২৮০১৬। সর্বকালের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় শচীন টেন্ডুলকার ও বিরাট কোহলির পরেই অবস্থান তাঁর।
৪৯ বছর বয়সী সাঙ্গাকারা ২০২২ সাল থেকে ইংল্যান্ডের ডরসেটে থাকেন। শ্রীলঙ্কার গলেও তাঁর বাড়ি আছে। তাঁদের দুটি যমজ সন্তান আছে।
বর্তমানে আইপিএলের দল রাজস্থান রয়্যালসের প্রধান কোচ ও ক্রিকেট পরিচালক সাঙ্গাকারা। পাশাপাশি স্কাই স্পোর্টসের ধারাভাষ্যকার ও ক্রিকেট বিশ্লেষক হিসেবেও কাজ করেন। ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানকে নিয়ে চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজেও তিনি ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করছেন।