‘এক গিয়ারে’ গাড়ি চালিয়ে ভারতের ‘সবচেয়ে বিব্রতকর’ হার
নিজেদের মাঠে ভারতের এমন অসহায় আত্মসমর্পণ শেষ কবে দেখা গেছে? আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে গতকাল রাতে যা হলো, তাকে স্রেফ হার বললে কম বলা হয়; এ যেন আক্ষরিক অর্থেই এক ‘ধোলাই’। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৭৬ রানে হেরে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের পথটা নিজেরাই কঠিন করে তুলল ভারত। ২০২২ সালের সেমিফাইনালের পর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে এটি ভারতের প্রথম হার।
অথচ ভারতের শুরুটা ছিল দারুণ। প্রোটিয়াদের ২০ রানেই ৩ উইকেট তুলে নিয়ে গ্যালারিতে উৎসবের আবহ তৈরি করেছিলেন ভারতের বোলাররা। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। এইডেন মার্করামের দল ভারতকে শুধু হারায়নি, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, অতি আত্মবিশ্বাস আর প্রস্তুতির অভাব কী পরিণতি ডেকে আনতে পারে। প্রশ্নবিদ্ধ একাদশ, ছন্নছাড়া অধিনায়কত্ব আর ব্যাটিং বিপর্যয়ের পর ভারতীয় গ্রেটরাই এখন তুলাধোনা করছেন সূর্যকুমার যাদবদের।
ভারতের এই ভরাডুবির ময়নাতদন্ত করেছেন পাঁচ সাবেক ক্রিকেটার। চলুন দেখা যাক, তাঁরা কী বলছেন—
‘সবচেয়ে লজ্জাজনক হারগুলোর একটি’
—কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত
সাবেক ওপেনার ও নির্বাচক শ্রীকান্ত সরাসরি তোপ দেগেছেন কোচ গৌতম গম্ভীরের দিকে। বিশেষ করে সহ-অধিনায়ক অক্ষর প্যাটেলকে একাদশের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত তিনি মানতেই পারছেন না। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে শ্রীকান্ত বলেন,‘আমি জানি না গম্ভীর কী করছে! পরিকল্পনা আর একাদশ ঠিক করার কাজটা কি তার নয়? এমন অদ্ভুত কৌশল নিয়ে এগোলে তার কপালে দুঃখ আছে। এমন হারের পর সূর্যকুমার ও গম্ভীর আবার কথা বলছে! অক্ষর প্যাটেলকে বসিয়ে রাখার পর ওদের কথা বলাই মানায় না। এটা টি-টুয়েন্টিতে ভারতের সবচেয়ে বিব্রতকর হারগুলোর একটি। মিষ্টি কথা বলে এই তিতা হার হজম করানোর চেষ্টা করবেন না। এখন জিম্বাবুয়ে-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। আমি জানি না ভারত এখন কোন দলের জয়ের জন্য প্রার্থনা করবে। আসলে সবার আগে ওদের উচিত নিজেদের জন্য প্রার্থনা করা।’
‘এক গিয়ারে গাড়ি চলে না’
—ইরফান পাঠান
সাবেক অলরাউন্ডার ইরফান পাঠানের মতে, ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের অতি আগ্রাসী মনোভাবই বিপদ ডেকে এনেছে। তাঁর কথা, টি-টুয়েন্টি মানেই শুধু অন্ধের মতো মারা নয়। তিনি বলেছেন, ‘সব সময় এক গিয়ারে খেলা যায় না। পরিস্থিতি বুঝে গিয়ার পাল্টাতে হয়। কম ঝুঁকির বাউন্ডারি খুঁজতে হবে। ক্রিজে সময় কাটাতে হবে। কিন্তু মনে হচ্ছে ভারত দলটা চলছে, হয় মারো, না হয় মরো—এই তত্ত্বে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সূর্যকুমার যেভাবে খেলেছিল, তেমন এক-দুজন ফর্মে থাকা ব্যাটসম্যান দরকার। তিলক বর্মা এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু অন্যদের ব্যর্থতায় তার ওপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে।’
‘সহ-অধিনায়ক কেন দর্শক’
—আকাশ চোপড়া
সাবেক ওপেনার আকাশ চোপড়া সরাসরি দল নির্বাচনের সমালোচনা করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, সহ-অধিনায়ক হয়েও অক্ষর প্যাটেল কেন ডাগআউটে বসে? অক্ষরের জায়গায় ওয়াশিংটন সুন্দরকে খেলানোর সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ মনে করছেন তিনি। আকাশের প্রশ্ন, ‘যদি অক্ষর প্যাটেলকে খেলাতেই না পারেন, তবে তাকে সহ-অধিনায়ক করার কী দরকার ছিল? চোট নেই, বিশ্রামও নয়, তবু সহ-অধিনায়ক দলের বাইরে!’
‘শুধু নামের ভারে জেতা যায় না’
—মাইকেল ভন
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন মনে করেন, ভারত কিছুটা আত্মতুষ্টিতে ভুগছিল। ক্রিকবাজকে তিনি বলেছেন, ‘এটা ভারতের জন্য একটা বড় ধাক্কা। আপনি যত বড় দলই হোন না কেন, শুধু মাঠে নামলেই জেতা যায় না। ১৮৮ রান তাড়া করতে হলে স্রেফ মারলে হয় না, মগজও খাটাতে হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে আরও স্মার্ট হওয়া উচিত ছিল।’
‘পরিকল্পনাহীন ভারত’
—রবিচন্দ্রন অশ্বিন
সাবেক ভারতীয় স্পিনার অশ্বিন আঙুল তুলেছেন দলের প্রস্তুতির অভাবের দিকে। রিংকু সিংকে ৮ নম্বরে নামানো আর ওয়াশিংটন সুন্দরকে ৫ নম্বরে প্রমোশন দেওয়াকে তিনি আত্মঘাতী বলে মনে করেন। অশ্বিন বলেছেন, ‘আপনার দলে যদি আটজন ব্যাটসম্যান থাকে এবং তাদের একজনের নাম রিংকু সিং হয়, তাহলে সে কিছুতেই ৮ নম্বরে নামতে পারে না। সুন্দরকে অসম্মান করছি না। সে দারুণ ব্যাটসম্যান। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে অপ্রস্তুত হয়ে মাঠে নামলে কী হয়।’