প্রথম শ্রেণিতে প্রথম সেঞ্চুরিই ৪০০ রানের, খুলল ভারতের ৭৮ বছর আগের ‘দরজা’
ভাউসাহেব বাবাসাহেব নিম্বলকর। এই নামে এখন তাঁকে চেনা কষ্ট। তবে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে ১৯৪৮ সালের মৌসুম দেখা কিংবা জানাশোনা থাকা কেউ চিনতে পারেন। চিনতে পারেন ক্রিকেটের পাঁড় ভক্তরাও, যদি তাঁর আরেক পরিচয় বলা হয়। ১৪ বছর আগে মৃত্যুর আগে ভদ্রলোককে নিয়ে গুঞ্জন ছিল, ‘আরেকটু হলেই ব্র্যাডম্যানকে পেছনে ফেলত’!
কিংবা তাঁকে দেখলে কেউ কেউ ওই কথা বলতেন। সেটা সেই আটচল্লিশের ১৮ ডিসেম্বর পুনেতে রঞ্জি ট্রফির প্রথম রাউন্ডের ম্যাচ শেষে। মহারাষ্ট্রের বিপক্ষে সেই ম্যাচে তৃতীয় দিনে গিয়ে হার মেনে নিয়েছিলেন কাথিয়াওয়াড় অধিনায়ক রাজকোটের মহারাজা ঠাকুর সাহেব। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল প্রদ্যুমনসিংহজি।
নিম্বলকরের ব্যাটিং ছিল সেই হার মেনে নেওয়ার কারণ। কাথিয়াওয়াড় আগে ব্যাট করে প্রথম দিনে ২৩৮ রানে অলআউট হয়। এরপর মহারাষ্ট্রের স্কোরে ম্যাচে বাকি সময়ে উঠল ৪ উইকেটে ৮২৬। নিম্বলকরের ব্যাট থেকে এল অপরাজিত ৪৩৪! মহারাজা ঠাকুর সাহেব ম্যাচ ছেড়ে দেওয়ায় নিম্বলকরের আর এগোনো হয়নি। নইলে সিডনিতে তার ১৮ বছর আগে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ৪৫২* হয়তো সেদিন ভেঙে যেত। ক্রিকেট খেলায় নিয়মের মারপ্যাঁচে পরে তাই নিম্বলকরের ৪৩৪* তখন হয়ে রইল প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। তার পর থেকেই লোকে নিম্বলকরকে দেখলে ওই কথাটা বলতেন।
৭৮ বছর পর নিম্বলকরের সেই ইনিংসের গল্পের ‘দরজা’ খোলার কারণ মিজোরামের চিন্ময় সুতর। তবে সত্যিটা হলো, চিন্ময়ই একখণ্ড উইলো দিয়ে টেনে তুলেছেন নিম্বলকরকে!
রঞ্জি ট্রফির প্লেট লিগ ম্যাচে সোভিমার নাগাল্যান্ড ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছে নাগাল্যান্ড–মিজোরাম। আজ দ্বিতীয় দিনে ৯ উইকেটে ৫৮১ রানে ইনিংস ঘোষণা করে সফরকারীরা। চিন্ময় ৭টি ছক্কা ও ৪৬ চারে ৫১৭ বলে অপরাজিত ছিলেন ৪০০ রানে!
অথচ কে বিশ্বাস করবে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এটা চিন্ময়ের দ্বিতীয় ম্যাচ। আগের ম্যাচে খেলেছিলেন ৩৫ ও ৯৯ রানের ইনিংস।
এতটুকু দেরি না করে ভারতীয় ক্রিকেটের এই সংস্করণের ইতিহাসের একটি পাতায় নিম্বলকরের একাকিত্ব ঘোচালেন চিন্ময়। ভারতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ন্যূনতম ৪০০ রানের ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যান এখন দুজন। ৭৮ বছর আগের সেই বাবাসাহেব এবং আজকের চিন্ময় সুতর।
৪০০—কতটা বিরল সেই সাক্ষ্যও দিচ্ছে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাস। ২০০ বছরের বেশি বয়সী এই সংস্করণে ৪০০ রানের দেখা পেয়েছেন চিন্ময়সহ মাত্র ১০ জন। এর মধ্যে দুজনের আবার দুবার করে ন্যূনতম ৪০০ রানের ইনিংস আছে।
ব্রায়ান লারার ৪০০* ও ৫০১* তো নিশ্চয়ই মনে আছে? প্রথমটি ২০০৪ সালে টেস্টে, পরেরটি ১৯৯৪ সালে ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে। অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি বিল পন্সফোর্ড ১৯২৩ ও ১৯২৭ সালে যথাক্রমে ৪২৯ ও ৪৩৭ করেন ঘরোয়ায়। চিন্ময়ের ৪০০* প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ‘কোয়াড্রপল’ সেঞ্চুরির ১২তম ঘটনা।
চিন্ময় ৪০০ ছোঁয়ার আগেই ভারতের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস খেলার কীর্তি গড়েন। সেটা ৩৮০ রান করার পর। পেছনে পড়ে ২০২৩ সালে এই রঞ্জিতেই মুম্বাইয়ের হয়ে পৃথ্বী শর ৩৭৯।
চিন্ময়ের এই ইনিংসে আরও বিস্ময়কর হলো দশম উইকেটে তাঁর সঙ্গে লালরেমপুনিয়া শাকচুয়াকের ১৯০ রানের জুটি। তাতে মিজোরাম স্পিনারের অবদান ৭৬ বলে মাত্র ১৪। রঞ্জির ইতিহাসে দশম উইকেটে এটা তৃতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি। ১৯৯১–৯২ মৌসুমে দিল্লির হয়ে অজয় শর্মা ও মনিন্দর সিংয়ের রেকর্ড ২৩৩ রানের জুটির চেয়ে ৪৩ কম।
স্থানীয় লিগে দারুণ খেলে এ বছর বিজয় হাজারে ট্রফিতে মুম্বাইয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন ২৯ বছর বয়সী চিন্ময়। গত জুনে মুম্বাই টি-টুয়েন্টি লিগেও দলের শিরোপা জয়ে ভালো ভূমিকা রাখেন। গত সপ্তাহে মিজোরামের হয়ে রঞ্জিতে অভিষেকে মনিপুরের বিপক্ষে ৩৫ ও ৯৯ করেন। ৩ উইকেটে হারলেও মিজোরামের দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াইয়ে ফেরার কারণ ছিল চিন্ময়ের সেই সেঞ্চুরির সুবাস পাওয়া ইনিংসটি।
রান আউট হওয়ায় সে ইনিংসে আর সেঞ্চুরি পাওয়া হয়নি। প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় ম্যাচে পাওয়া প্রথম সেঞ্চুরিকে ৪০০ রানের পর্বতে রূপান্তরের পথে চিন্ময় একাই দলের ৬৮.৮০ শতাংশ রান করেছেন। জেহু অ্যান্ডারসনের ৬৯ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর। শুধু তা–ই নয়, ৭৮ বছর পর নিম্বলকরের একাকিত্ব ঘোচানো চিন্ময় নিজে কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের এক পাতায় এখন একা। এ সংস্করণে যেকোনো ব্যাটসম্যানের প্রথম সেঞ্চুরিটাই ৪০০ রানে রূপ দেওয়ার এটাই প্রথম ঘটনা! ২০২২ সালে বিহারের সাকিবুল গনির ৩৪১ এত দিন ছিল সর্বোচ্চ।