‘ডেড ম্যান’ থেকে যেভাবে বেঁচে গেলেন ম্যাককালাম
অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৫–২৬ অ্যাশেজ সিরিজে ৪–১ ব্যবধানে হেরেছে ইংল্যান্ড। এই সিরিজে ইংল্যান্ড দলের পারফরম্যান্সের পর্যালোচনার ফল প্রকাশ করা হবে আগামী সপ্তাহে। অ্যাশেজে ব্যর্থতার পরও ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ পদে ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত তখন সেই পর্যালোচনা–প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস।
সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, ম্যাককালামের ইসিবির বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ পর্যন্ত। তার আগে ঘরের মাঠে একটি অ্যাশেজ সিরিজ খেলবে ইংল্যান্ড। এই চুক্তি এত আগেভাগে বাতিল করা হলে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হতো ইসিবিকে। তবে ইসিবি এ নিয়ে বলতে পারে, ম্যাককালামকে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তে আর্থিক বিষয়টি প্রভাব রাখেনি। তাদের বিশ্বাস, ম্যাককালাম ও স্টোকসের জুটি ইংল্যান্ডকে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে অ্যাশেজ পুনরুদ্ধারের সর্বোত্তম সুযোগ দেবে। আর সে কারণেই তারা ম্যাককালামকে ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) প্রধান নির্বাহী রিচার্ড গোল্ড, ইংল্যান্ড পুরুষ দলের ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা পরিচালক রব কি এবং ম্যাককালামের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মাঠে ও মাঠের বাইরে—দুই ক্ষেত্রেই ইংল্যান্ড দলে পরিবর্তন ও উন্নতির প্রয়োজন। অ্যাশেজ সিরিজ শেষে ম্যাককালামের চাকরি যাওয়ার গুঞ্জনও উঠেছিল বেশ জোরেশোরে। কিন্তু এখন সেই শঙ্কা আর নেই।
টাইমস জানিয়েছে, সব পক্ষই স্বীকার করেছে অ্যাশেজের আগে প্রস্তুতিতে ভুল ছিল। ভবিষ্যতে ইংল্যান্ড ক্রিকেটারদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যার মধ্যে সূচি ও খেলোয়াড়দের খেলার চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেশি করে কাউন্টি ক্রিকেট খেলানোও হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশ সফরের আগে আয়োজক বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে আরও মানসম্মত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজনের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে। ইতিমধ্যে ইসিবি ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) চুক্তি হয়েছে এ নিয়ে। দুই দেশেই ভবিষ্যতে প্রতিটি অ্যাশেজ সিরিজের আগে আরও ভালো মানের প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজন করা হবে।
অ্যাশেজ চলাকালে ইংল্যান্ড দলের খেলার ধরন ও কৌশল নিয়ে কোচ ম্যাককালাম ও টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকসের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, মতপার্থক্য থেকে সরে এসে নতুন করে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে নিতে হবে স্টোকস ও ম্যাককালামকে। নিউজিল্যান্ড কিংবদন্তি ম্যাককালাম অ্যাশেজে আক্রমণাত্মক ও ইতিবাচক খেলার পক্ষে অনড় ছিলেন। স্টোকস কিছুটা ঐতিহ্যগত, রক্ষণাত্মক কৌশলের দিকে ঝুঁকেছিলেন। স্টোকসের যুক্তি ছিল, অস্ট্রেলিয়ায় জিততে হলে দৃষ্টিনন্দন ক্রিকেটের চেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃঢ়তাপূর্ণ লড়াইয়ের মানসিকতা।
পর্যালোচনায় আরও উঠে এসেছে, মাত্র ১১ দিনে সিরিজ হেরে যাওয়ার পেছনে অপেশাদার আচরণেরও বড় ভূমিকা ছিল। ইংল্যান্ড দলে ব্যবস্থাপনার যে সংস্কৃতি সেটা অতিরিক্ত শিথিল হয়ে পড়েছিল, এমন ধারণাও তৈরি হয়। কারণ, কিছু খেলোয়াড়ের মধ্যে অতিরিক্ত মদ্যপান বা রাত করে বাইরে থাকার প্রবণতা দেখা গেছে, এমনকি ম্যাচের আগের রাতেও।
অ্যাশেজের পর থেকে ইংল্যান্ড দলে মধ্যরাতের কারফিউ চালু করা হয়েছে। ইসিবি টিম ম্যানেজমেন্টকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, দলকে আরও পেশাদার হতে হবে এবং পারফরম্যান্সের গ্রাফ আরও উঁচুতে নিতে হবে। গলফ খেলা বা রাত করে বাইরে ঘোরাঘুরিকে সাফল্যের পথ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে।
ইংল্যান্ডের কোচিং ও ব্যাকরুম স্টাফে নতুন মুখ আসতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ টেকনিক্যাল কোচের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে পর্যালোচনায়। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে ফিল্ডিং কোচ হিসেবে কার্ল হপকিন্সকে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ ধারার শুরু করেছে ইংল্যান্ড। ধারণা করা হচ্ছে, কোচিং দলে আরও কিছু নিয়োগ আসবে। কারণ, ম্যাককালামের খুব ছোট পরিসরের ব্যাকরুম স্টাফ রাখার পরিকল্পনা কাজে লাগেনি। অ্যাশেজের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ইংল্যান্ড একজন বিশেষজ্ঞ ফাস্ট বোলিং পরামর্শক নিয়োগ দেয় এবং পুরো সফরে তাদের সঙ্গে কোনো ফিল্ডিং কোচ ছিল না।
এ ছাড়া টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষে লুক রাইট সরে দাঁড়ানোর (পারিবারিক কারণে) পর নতুন জাতীয় নির্বাচক নিয়োগ দেওয়া হবে। ইসিবি চায়, সাম্প্রতিক সময়ে ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলার অভিজ্ঞতালব্ধ কেউ থাকুক এ দায়িত্বে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার অভিজ্ঞতা থাকলে সেটা আদর্শ হয়। টাইমস জানিয়েছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন স্টিভেন ফিন, মার্ক বুচার ও মইন আলী। তবে তাঁদের কেউ এই দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
পর্যালোচনায় আরও বলা হয়েছে, ইসিবির পরিচালনা পর্ষদে ক্রিকেট–সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে প্রয়োজন। ব্যবসা, অর্থনীতি ও আইনি দক্ষতায় তাঁরা সমৃদ্ধ হলেও ক্রিকেট–সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার ঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে চায় বোর্ড।