তানজিদের কাছে এরপর ‘ড্যাডি হানড্রেড’ চান ডাবল সেঞ্চুরিয়ান গিলেস্পি

বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করেন তানজিদশামসুল হক

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেস বোলার হিসেবেই জেসন গিলেস্পিকে মনে রাখার যথেষ্ট কারণ আছে। তবে বাংলাদেশ তাঁকে মনে রেখেছে অন্য কারণেও। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তিটা যে বাংলাদেশের বিপক্ষেই!

সেটাও আবার বোলার হিসেবে নয়, একজন টেল এন্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে। ২০০৬ সালে চট্টগ্রামে ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টে ‘নাইটওয়াচম্যান’ হিসেবে ব্যাটিংয়ে নেমে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন। এখনো সুযোগ পেলেই গিলেস্পি মনে করিয়ে দেন নিজের সেই কীর্তির কথা।

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া চলতি টেস্ট সিরিজে গিলেস্পি ডারউইনে আছেন এবিসি রেডিওর ধারাভাষ্যকার হিসেবে। আজ মারারা স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে তিনি কথা বলেছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে। ডাবল সেঞ্চুরির পুরোনো প্রসঙ্গ তো এসেছেই, গিলেস্পি কথা বলেছেন এই টেস্টে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আর বাংলাদেশের পেসারদের নিয়েও।

বাংলাদেশের বোলিংয়ের প্রশংসা করে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৭১টি টেস্ট, ৯৭টি ওয়ানডে আর ১টি টি-টুয়েন্টি খেলা গিলেস্পি বলেছেন, ‘প্রথম ইনিংসে তারা সত্যিই খুব ভালো বোলিং করেছে। এখন তারা দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিং করছে এবং ভালোভাবেই শুরু করেছে। তবে প্রথম ইনিংসটি ছিল অসাধারণ।’

এখানে নাহিদ রানাকে দেখতে পারলে ভালো লাগত। আমি তাকে পিএসএলে দেখেছি।
জেসন গিলেস্পি, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার

গিলেস্পির চোখে বাংলাদেশের এত ভালো বোলিংয়ের কারণ—বোলাররা ফুলার লেংথে বল করেছেন, অফ স্টাম্প ও চতুর্থ স্টাম্পের লাইনে চ্যালেঞ্জ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের।

প্রথম ইনিংসে ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার–সেরা বোলিং করা হাসান মাহমুদের প্রশংসা করেছেন আলাদা করেই, ‘অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটাই সেরা বোলিং ফিগার। এটি অসাধারণ এক অর্জন এবং এটি তার প্রাপ্য ছিল; কারণ, সে সত্যিই খুব ভালো বোলিং করেছে। অন্য সিমাররাও ভালো বোলিং করেছে। এখন পর্যন্ত এই টেস্ট ম্যাচে তারা সত্যিই ভালো ক্রিকেট খেলেছে।’

তবে আরও অনেকের মতো তিনিও এই টেস্টে মিস করছেন চোটের কারণে দলের বাইরে থাকা নাহিদ রানাকে, ‘এখানে নাহিদ রানাকে দেখতে পারলে ভালো লাগত। আমি তাকে পিএসএলে দেখেছি। সে সত্যিই দারুণ গতি ও আগ্রাসন নিয়ে বোলিং করেছে। নাহিদ একজন মানসম্পন্ন বোলার। তাই তাকে এখানে দেখতে পারলে ভালো লাগত। আশা করি, সে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।’

একজন সাবেক পেসার হিসেবে নাহিদের জন্য গিলেস্পির পরামর্শ, ‘চোট খেলারই একটি অংশ। আপনি যেটা করার চেষ্টা করতে পারেন, তা হলো চোটে পড়ার সম্ভাবনা কমিয়ে আনা। নিজের যত্ন নিতে হবে, জিমের কাজ করতে হবে, ক্রিকেটের অনুশীলন করতে হবে, আবার রিকভারি প্রোটোকলও মেনে চলতে হবে—সবকিছু। মাঠের বাইরে প্রশিক্ষণ, বিশ্রাম ও রিকভারির ক্ষেত্রে খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ থেকে আপনি নিজের সম্ভাবনাটা বাড়াতে পারেন।’

অস্ট্রেলিয়ার সা্বেক পেসার জেসন গিলেস্পি
প্রথম আলো

খেলোয়াড়ি জীবনের স্মৃতি হাতড়ে গিলেস্পি এখনো মনে করতে পারেন মাশরাফি বিন মুর্তজা, শাহাদাত হোসেনদের, ‘আমি মাশরাফি ও শাহাদাতের বিপক্ষে খেলেছি, যাঁরা খুব ভালো বোলার ছিলেন। মাশরাফি বল সুইং করাত, শাহাদাত ছিল একটু বেশি গতির, তাঁরা দুজনই অসাধারণ বোলার ছিল।’ পরে আবার বলেছেন বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল এবং সাবেক বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিকের কথাও।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের বর্তমান পেস বোলিং নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই ক্রিকেটারের পরামর্শ, ‘আপনারা নিশ্চয়ই শুধু একজন বা দুজন বোলারের ওপর নির্ভর করতে চাইবেন না। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের কোচিং স্টাফরা এমন একদল সিমার তৈরি করতে চাইবে, যারা সব সংস্করণে খেলতে পারে। সেই গভীরতা তৈরি করা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।’

গিলেস্পি কথা বলার সময়ই ট্রাভিস হেডের আউটে দ্বিতীয় ইনিংসে দ্বিতীয় উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ইতিহাস তখন তাঁকে মনে করাচ্ছিল, এই টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি, ‘অস্ট্রেলিয়া মাত্র তিনবার এমন টেস্ট ম্যাচ জিতেছে, যেখানে প্রথম ইনিংসে তারা ২০০ রানে পিছিয়ে ছিল। ইতিহাস পুরোপুরি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবং বাংলাদেশের পক্ষে। তবে তারা এক ইনিংসে জিতবে কি না? আমি তা মনে করি না। আমার মনে হয়, আজ এই পিচটি বেশ স্থিতিশীল হয়ে এসেছে এবং সম্ভবত আগামীকাল প্রথম সেশনই ডারউইনের মারারা মাঠে ব্যাটিং করার সবচেয়ে ভালো সময় হবে।’

আজ অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসেও বোলিংয়ে ভালো করছে বাংলাদেশ
শামসুল হক

সেটি হলে প্রথম ইনিংসের তুলনায় অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাটিং করবে বলেই আশা তাঁর। ‘বাংলাদেশকে এই টেস্ট ম্যাচ জিততে হলে সম্ভবত তাদের একটু কঠিন রান তাড়া করতে হবে। তাই আমার মনে হয়, এটি একটি দারুণ রোমাঞ্চকর টেস্ট ম্যাচ হতে যাচ্ছে’—বলেছেন গিলেস্পি।

বাংলাদেশে ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলেছেন বলে বাংলাদেশের স্মৃতি গিলেস্পির কাছে সবসময়ই মধুর। তাঁর ইচ্ছা আবার কখনো বাংলাদেশে যাবেন, সেটি ধারাভাষ্যকার হিসেবেই হোক বা অন্য কোনোভাবে।

বাংলাদেশে গিলেস্পির সবচেয়ে মধুর স্মৃতি শেষ টেস্টের সেই ডাবল সেঞ্চুরিটাই। এরপর থেকে কেউ ডাবল সেঞ্চুরি করলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তিনি তাঁকে ‘ডাবল সেঞ্চুরির ক্লাবে’ স্বাগত জানান।

তানজিদের ব্যাটে ডাবল সেঞ্চুরি দেখার আশায় ছিলেন গিলেস্পি
শামসুল হক

গিলেস্পির আশা ছিল ডারউইনে তা জানাতে পারবেন বাংলাদেশের তানজিদ হাসানকেও, ‘আমি ভেবেছিলাম তানজিদ আমার সঙ্গে (ডাবল সেঞ্চুরি ক্লাবে) যোগ দেবে। কিন্তু এরপর সে বড় একটি স্লগ খেলার চেষ্টা করল এবং আউট হয়ে গেল। তার আদর্শ একটি সুযোগ ছিল, সে দারুণ ব্যাটিং করেছে। কোচিং স্টাফরা তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলতে পারতেন, “দেখো, ১০০ রান করে তুমি আসল কঠিন কাজটা করে ফেলেছ। এখন অনেক সহজ, শুধু বোলিংটা দেখে দেখে রান নিতে থাকো এবং বড় স্কোর করো, ১৫০-এর বেশি রান করো।” কারণ, এ ধরনের ইনিংসই আপনাকে টেস্ট ম্যাচ জেতায়।’

গিলেস্পি মনে করিয়ে দিলেন, ‘১০০ রান করার পর আপনার দায়িত্ব হলো বড় একটি ১০০-তে যাওয়া, শুধু ১০১ করা নয়। এটাই তার প্রতি আমার প্রত্যাশা। আপনি আবার সেই অবস্থানে গেলে অস্ট্রেলিয়াকে তার মূল্য দিতে বাধ্য করুন। আমরা যাকে “ড্যাডি হান্ড্রেড” বলি—সেই বড় ড্যাডি হান্ড্রেড করুন।’

আরও পড়ুন