পার্থ টেস্টে আজ ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করছিলেন জেমি স্মিথ। অস্ট্রেলিয়ার অভিষিক্ত পেসার ব্রেন্ডন ডগেট ২৮তম ওভারে প্রথম বলটি করেন লেগ স্টাম্পের বাইরে। পুল করেছিলেন স্মিথ। বল অস্ট্রেলিয়ার উইকেটকিপার অ্যালেক্স ক্যারির হাতে জমা পড়তেই আউটের আবেদন করেন ক্যারি। মাঠের আম্পায়ার নীতীন মেনন সাড়া না দেওয়ায় রিভিউ নেয় অস্ট্রেলিয়া। ১৫ রান করা স্মিথ আউট হয়েছেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার ভার পড়ে টিভি আম্পায়ারের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশের শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদের ওপর।
স্টেডিয়ামের স্ক্রিনে ঘটনার প্রথম ফুটেজ দেখাতেই ড্রেসিংরুমের উদ্দেশে হাঁটা ধরেন স্মিথ। সম্ভবত তিনি টের পেয়েছিলেন বল ব্যাটে লেগেছে। শরফুদ্দৌলা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে থেমেও যান তিনি। স্নিকোর ফুটেজ অন্তত পাঁচ মিনিট যাচাই করে তারপর নীতীন মেননকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বলেন শরফুদ্দৌলা। অর্থাৎ স্মিথকে আউট ঘোষণা করেন তিনি। শরফুদ্দৌলার এই সিদ্ধান্ত পার্থে ইংল্যান্ডের সমর্থকদের শিবির মোটেও ভালোভাবে নিতে পারেনি। গ্যালারিতেই অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
শুধু তা–ই নয়, এই ম্যাচ নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের লাইভ বিবরণীতে শরফুদ্দৌলার সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখা হয়, ‘এটা হাস্যকর। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কোনো প্রমাণই ছিল না। একদম নিশ্চিত কোনো কিছু নয়। প্রযুক্তি ঠিকমতো কাজ না করলে অবশ্যই মাঠের সিদ্ধান্তেই থাকা উচিত। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত বদলাতে সময় নিলেন মাত্র পাঁচ মিনিট।’
বিবিসি স্পোর্টের ধারাভাষ্যকার ও প্রতিবেদক হেনরি মোয়েরান তাঁর এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘স্মিথের হাঁটা ইঙ্গিত দেয় সে হয়তো বলে (ব্যাট) লাগিয়েছে। কিন্তু এতটুকু ইঙ্গিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। হতে পারে প্রযুক্তিটা ঠিকমতো সমন্বিত ছিল না। কিন্তু যদি টিভি আম্পায়ার তাঁর সিদ্ধান্ত এই তথ্যের ভিত্তিতেই নিয়ে থাকেন, তাহলে ইংল্যান্ডের ক্ষুব্ধ হওয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক।’
ঠিক কী ঘটেছিল সেটা একটু জেনে নেওয়া যাক।
ইএসপিএনক্রিকইনফোর লাইভ বিবরণীতে লেখা হয়, স্মিথ পুল শটটি খেলার সময় একটা শব্দ হয়েছে। শর্ট লেগে দাঁড়ানো ট্রাভিস হেড ও উইকেটকিপার ক্যারির আউটের আবেদনেও বোঝা গেছে, বল ব্যাট পাড়ি দেওয়ার সময় একটা শব্দ তাঁরা শুনেছেন। স্নিকোয় প্রথম ফুটেজে বল ব্যাটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ‘স্পাইক’ (বল ব্যাটে লাগার নির্দেশক তরঙ্গ চিহ্ন) দেখে ড্রেসিংরুমের পথে হাঁটা ধরেন স্মিথ। কিন্তু তিনি হাঁটা থামান যখন স্ক্রিনে স্পষ্ট হয়ে ফুটেজের ফ্রেমগুলো ঠিক মিলছে না।
তখন প্রশ্নটি ওঠে স্নিকোর ফুটেজে যখন তরঙ্গ চিহ্ন দেখাচ্ছে তখন বলটা ব্যাটে লেগেছিল কি না? নাকি ব্যাটের খুব কাছাকাছি ছিল? ইএসপিএনক্রিকইনফোর ধারাবিবরণীতে লেখা হয়, সাইড-অন রিপ্লে দেখে মনে হয়নি বলটা ব্যাটের কাছে ছিল। শরফুদ্দৌলা তখন পেছন ফুটেজ জুম করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করেন। এরপর তিনি নিশ্চিত হন ‘স্পাইক’টি ব্যাট থেকেই এসেছে, যার অর্থ হলো বলটা ব্যাটে লেগেছে। নীতীন মেননের সিদ্ধান্ত পাল্টে স্মিথকে আউট ঘোষণা করেন শরফুদ্দৌলা।
দ্য টেলিগ্রাফের ধারাভাষ্যে জানানো হয়, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ও কোচ ড্যারেন লেম্যান মনে করেন স্মিথ আউট হননি। অস্ট্রেলিয়ার রেডিও এবিসির হয়ে ধারাভাষ্য দেওয়া ইংল্যান্ডের সাবেক স্পিনার ফিল টাফনেলেরও শরফুদ্দৌলার সিদ্ধান্ত পছন্দ হয়নি, ‘ওটা হালকা একটা শব্দ—স্পাইক বলা যায় না। একজনের জন্য এক নিয়ম, আরেকজনের জন্য অন্য নিয়ম। প্রথম ইনিংসে নট আউটের সিদ্ধান্তটি মনে আছে তো? এটা কি সিদ্ধান্ত বদলানোর মতো যথেষ্ট? এটা তো স্পাইকই না। ট্রাভিস হেড হয়তো হাঁচি দিয়েছে বা অন্য কিছু কে জানে! আমার মনে হয় না সিদ্ধান্ত বদলানোর মতো কোনো যথেষ্ট প্রমাণ এখানে আছে। যদি সিদ্ধান্ত নিতে এত সময় লাগে (তাহলে এটা আউট নয়), লাবুশেন ঠিক একই অবস্থায় ছিল, আর তখন আম্পায়ার বলেছিলেন তিনি যথেষ্ট প্রমাণ দেখছেন না।’
আইসিসির টানা পাঁচবারের বর্ষসেরা সাবেক আম্পায়ার এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা আম্পায়ার হিসেবে পরিচিত সাইমন টফেল শরফুদ্দৌলার এই আউটের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম চ্যানেল সেভেনে। এই অস্ট্রেলিয়ান মনে করেন শরফুদ্দৌলার সিদ্ধান্ত সঠিক।
টফেল বলেন, ‘যখন আমরা বিশ্বজুড়ে দুই ধরনের এজ ডিটেকশন (বল ব্যাটে লেগেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার প্রযুক্তি) প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তখন এই সমস্যা দেখা দেয়। আমরা মূলত হক-আই আলট্রা এজ ব্যবহার করি। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যারা রিয়েল টাইম-স্নিকো (আরটিএস) ব্যবহার করে। সীমিত অভিজ্ঞতা দিয়ে আরটিএস কীভাবে ব্যবহার করবেন, সিরিজে (আম্পায়ারিংয়ের সময়) সেটা বোঝা কঠিন। কিন্তু আরটিএসের চূড়ান্ত প্রমাণ নীতি অনুযায়ী, যদি বল ব্যাট পার হয়েও একটি ফ্রেম পর্যন্ত স্পাইক দেখা যায়, তবে সেটা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। আর এই ঘটনায় ঠিক এটাই দেখা গিয়েছে।’
টফেল তাঁর ব্যাখ্যায় আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, যতটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হতো, তিনি (শরফুদ্দৌলা) তত দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে চাননি। আর ট্র্যাকে (আরটিএস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা) মানুষেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে তাকে (ফুটেজ) দেখানোর, ধীর করেছে (ফুটেজ), ঘুরিয়েও দেখিয়েছে। আমার মতে, সঠিক সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে। (বল) ব্যাট পার হয়ে এক ফ্রেম পর স্পাইক দেখালে ব্যাটসম্যান অবশ্যই আউট।’
ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর জয়ের জন্য ২০৫ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমেছে অস্ট্রেলিয়া। পার্থে ফল যা–ই হোক, শরফুদ্দৌলার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যে কয়েক দিন বিতর্ক চলবে তা বলাই যায়।