ক্যাচ, রান আউট, স্টাম্পিং মিস করে জয় হাতছাড়া বাংলাদেশের
‘চাপ, চাপ ও চাপ।’
দুই বলে দুই রান আউট মিসের ঘটনার বর্ণনায় ধারাভাষ্যকক্ষ থেকে ভেসে এল তিনটা শব্দ। হাসান মাহমুদ যখন ক্যাচ মিসের ক্ষোভ আর হতাশায় বাতাসে লাথি মারছেন, তখনো চাইলে বলে দেওয়া যেত এমন। চাপ ছাড়া এমন হাতে আসা ক্যাচ ছেড়ে দেওয়ার আর কী ব্যাখ্যা!
চাপ বাংলাদেশের ওপর ভর করল আরও অনেকবারই। ব্যাটিং ও ডিসমিসাল মিলিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেলা লিটন দাসও যেমন স্টাম্পিং মিস করে ফেললেন! স্টাম্পে লেগেও বল পড়েনি, ঘটেছে এমন ঘটনাও। আবুধাবির উইকেট পঞ্চম দিনে এসেও বোলারদের তেমন সাহায্য করেনি, চাইলে জুড়ে দেওয়া এমন অজুহাতও!
কিন্তু সবকিছু সরিয়ে রেখে আসলে যা করা উচিত, তা আফগানিস্তানকে কৃতিত্ব দেওয়া। শুরু থেকে শেষ পর্যন্দ তাদের প্রায় সব ব্যাটসম্যানই যে দৃঢ়তা দেখালেন—সেটিই তো আসলে আবুধাবিতে এ রকম অবিশ্বাস্য ড্রয়ের সাক্ষী করল টেস্ট ক্রিকেটকে।
চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় সেশনে ৪৭৯ রানের বিশাল লক্ষ্য দিয়ে আফগানিস্তানকে যখন বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছিল, তখন সুদূর কল্পনাতেও ছিল না এমন কিছু। আজ শেষ দিনে ৩ উইকেটে ১৩২ রান নিয়ে যখন আফগানিস্তান ব্যাটিংয়ে নেমেছিল, তখনো তাই। কিন্তু চতুর্থ ইনিংসে ১৪২ ওভার ব্যাট করে ম্যাচটা ড্র করে সুদূরের সেই কল্পনাকেই বাস্তব বানিয়ে ফেলেছে আফগানিস্তান!
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ ইনিংসে এর চেয়ে বেশি ওভার খেলে ড্র করার ঘটনা আছে কেবল একটি, ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করাচিতে ১৭২.৪ ওভার ব্যাট করে ড্র করেছিল পাকিস্তান। আফগানিস্তানের সমান ১৪২ ওভার খেলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০০৫ সালে ঢাকায় ড্র করেছিল বাংলাদেশও।
কিন্তু এসব তো শুধুই সংখ্যা। আফগানিস্তান যা করেছে, তা আসলে সংখ্যা কিংবা বর্ণনা করার মতো ঘটনার চেয়েও বেশি কিছু। প্রথম সেশনটা প্রায় উইকেট ছাড়াই কাটিয়ে দিয়েছিল আফগানিস্তান। ‘প্রায়’ লিখতে হচ্ছে, কারণ তা হতে দেননি আসলে লিটন দাস!
প্যাড আর গ্লাভস ছেড়ে তিনি বল হাতে তুলে নেননি ঠিক, কিন্তু বাঁদিকে প্রায় উড়ে যেভাবে ক্যাচটা ধরলেন, তা বিশ্বাসই করতে পারেননি ব্যাটসম্যান রহমত শাহ। একই টেস্টে ৯ ডিসমিসালের সঙ্গে ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরি ও হাফ সেঞ্চুরি করে তিনি তখন গড়ে ফেলেছেন বিশ্ব রেকর্ডও। দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেই লিটনের হাতে এসেছিল আরও একটা উইকেট এনে দেওয়ার সুযোগও।
কিন্তু তাইজুল ইসলামের একটু লাফিয়ে ওঠা বলটা হাতে জমাতে পারেননি লিটন। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য আর হতাশার তখন শুধুই শুরু। সেই হতাশার কথা তো শুরুতেই কিছুটা বলা হয়ে গেছে।
তবু আরও একবার মনে করিয়ে দেওয়া যাক—নাজমুলের থ্রো ধরেও স্টাম্পে লাগাতে পারেননি বোলার নাঈম হাসান, দিনের শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে যাওয়া ব্যাটসম্যান কায়েস আহমেদ তখনো ক্রিজ থেকে অনেকটা দূরে। পরের বলে তাঁর কাছে থ্রোটাই ঠিকঠাক আসেনি।
তবু বাংলাদেশের আশা জেগে উঠেছিল সেদিকুল্লাহ আতালকে ফেরানোর পর। দৃঢ়তা ও সংযমের মিশেল এই ইনিংসের ইতি ঘটে তাইজুলের বলে ৩৩২ বলে ১১১ রান করে আতাল ক্যাচ দিলে। আফগানিস্তানের সপ্তম উইকেট যখন পড়েছে, দিনের খেলার তখনো কমপক্ষে দেড় ঘণ্টা বাকি। বাংলাদেশের জয়ই তখন ম্যাচের একমাত্র সম্ভাব্য ফল বলে মনে হচ্ছিল।
সেটি হয়তো হয়েও যেত। মিরাজের বলে একটা সহজ ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন কায়েস, কিন্তু তা আর হাসানের হাতে জমেনি; তারপরই পা ছুড়ে তাঁর সেই হতাশা। শেষবার বাংলাদেশ আশা দেখেছিল ইয়ামিন আহমেদজাইকে ফিরিয়ে। মিরাজের বলে শর্ট লেগে দুর্দান্ত একটা ক্যাচ নেন মুমিনুল।
কিন্তু এতটুকুই! শেষ ২ উইকেট আর বাংলাদেশ নিতে পারেনি। ৮০ বল খেলে ৪৯ রান করে কায়েস আর ১২ বলে শূন্য রান করা জিয়া–উর–রেহমান অপরাজিত থেকে যান ইনিংসের শেষ অবধি। বাংলাদেশকে হতাশার ড্র নিয়ে ফিরতে হয়, আফগানিস্তানকে আনন্দের।
জয়–পরাজয় ছাড়াও বুঝি দুই দলের এমন ভিন্ন অনুভূতি থাকে!