বিয়ে করে যেভাবে বদলে গেলেন ‘কিলার মিলার’

স্ত্রী ও পুত্রের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যান ডেভিড মিলারমিলারের ইনস্টাগ্রাম

আপনি ক্রিকেট খেলেন, বয়স ৩০-এর ওপারে চলে গেছে, তার মানে ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় চলে এসেছেন।

ডেভিড মিলারের বয়স ৩৬। এই টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে সবচেয়ে ‘বুড়ো’ তিনি। এই দলেই তাঁর সতীর্থ কোয়েনা মাফাকার বয়স মাত্র ১৯। মিলারের প্রায় অর্ধেক। আসলেই ‘কিলার মিলার’ বুড়ো হয়ে গেছেন?

ক্রিকবাজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজেই হাসতে হাসতে বললেন, ‘ভাবলে আসলে অবাকই লাগে, আমার বয়স এখন ৩৬! কই, নিজেকে তো ৩৬ মনে হয় না...মাঝেমধ্যে অবশ্য ৫৬ বছর বয়সের ক্লান্তি ভর করে শরীরে।’

আরও পড়ুন

তখন কি দলের সিনিয়রদের সেই ক্লিশে কথাগুলো মনে পড়ে? ওই যে তাঁরা বলতেন, ‘সময়টা উপভোগ করো, খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।’ মিলার অবশ্য এখন বুঝতে পারেন, কথাগুলো ভুল ছিল না। আসলেই তো গত পাঁচ-ছয় বছর যেন চোখের পলকেই হাওয়া। তারপরই যোগ করলেন, ‘তবু খেলাটা এখনো আমাকে আনন্দ দেয়। গত কয়েক মাসে ছোটখাটো চোট পেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা কাটিয়ে উঠেছি।’

সর্বশেষ চোটটা ছিল এ বছর জানুয়ারিতে, এসএ টি-টুয়েন্টিতে খেলতে গিয়ে। এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ মাঠের বাইরে। মিলারের কথা, ‘ওটা আসলে আমার জন্য ওয়েক–আপ কল ছিল। বুঝেছি, শরীর নিয়ে এখন আর ঢিলেমি চলবে না।’ এটাও বুঝতে পেরেছেন, এই বয়সে খেলা চালিয়ে যেতে হলে থেরাব্যান্ড আর একঘেয়ে রিহ্যাবকেই নিত্যসঙ্গী বানাতে হবে।

ভারতের বিপক্ষে সুপার এইটের ম্যাচে ৩৫ বলে ৬৩ রান করেছেন মিলার, ৭টি চারের সঙ্গে মেরেছেন ৩টি ছক্কাও।
মিলারের ইনস্টাগ্রাম

পরিবর্তনটা শুধু শরীর নিয়ে এই ভাবনায় নয়, মিলারের মনেও এসেছে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, গত বছরের ১০ মার্চের পর থেকে। ক্যামিলা হ্যারিসকে বিয়ে করার পর মিলার যেন অন্য এক মানুষ। দক্ষিণ আফ্রিকান ধারাভাষ্যকার চার্লস ফরচুন একবার বলেছিলেন, কোনো পুরুষ বিয়ে করলে তাকে থিতু হওয়ার জন্য অন্তত এক বছর সময় দেওয়া উচিত। মিলারের সেই সময়টাও লাগেনি। বিয়ের পর থেকেই তিনি যেন অন্য এক মানুষ, আরও বেশি পরিণত। ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিবিড়। নিজেই বললেন, ‘একা থাকার দিনগুলো আমি দারুণ উপভোগ করেছি, কিন্তু সেটা ছিল খুব স্বার্থপর জীবন। এখন আমি জীবনের অন্য এক অধ্যায়ে। এখন বুঝতে পারি, ক্রিকেটের বাইরেও একটা বিশাল জগৎ আছে। হারলে আগে মনে হতো সব শেষ, এখন বুঝি এটা স্রেফ একটা খেলা মাত্র। খারাপ লাগে ঠিকই, কিন্তু দিন শেষে সব ঠিক হয়ে যায়।’

আরও পড়ুন

এই মানসিক প্রশান্তিই তাঁকে মাঠে করে তুলেছে আরও বিধ্বংসী। ভারতের বিপক্ষে সুপার এইটের সেই ম্যাচটার কথাই ধরুন। ২০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে যখন দল ধুঁকছে, মিলার নামলেন ক্রিজে, ইনিংসের পঞ্চম ওভারেই। ১৬তম ওভারে যখন আউট হয়ে ফেরেন, তাঁর নামের পাশে ৩৫ বলে ৬৩ রান, ৭টি চারের সঙ্গে মেরেছেন ৩টি ছক্কাও। ভারতকে ৭৬ রানে হারানো সেই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ও মিলার।

শুধু স্ত্রী নন, এখন মিলারের পৃথিবীজুড়ে আছেন তাঁর ছেলে বেঞ্জামিন ডেভিড মিলারও।
মিলারের ইনস্টাগ্রাম

তবে তাঁর জীবনে সব গল্পের শেষটা এমন সুখের নয়। বারবাডোজে ২০২৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালটার কথাই মনে করে দেখুন। দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ ওভারে ১৬ দরকার ছিল। মিলার ক্রিজে ছিলেন। কিন্তু প্রথম বলেই আউট! হার্দিক পান্ডিয়ার বলে লং-অফে সূর্যকুমার যাদবের অবিশ্বাস্য ক্যাচ। সেদিন ম্যাচ শেষে কেঁদেছিলেন অনেক। পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামিলা সান্ত্বনা দিয়েছেন। সেই স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘ওটা খুব কঠিন মুহূর্ত ছিল। কিন্তু ও পাশে ছিল। স্ত্রীকে আপনি অনেক কথা বলতে পারেন, যা সতীর্থকে বলা যায় না।’

আরও পড়ুন

শুধু স্ত্রী নন, এখন মিলারের পৃথিবীজুড়ে আছেন তাঁর ছেলে বেঞ্জামিন ডেভিড মিলারও। বাবা হওয়ার আনন্দই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রেরণা। বলেন, ‘বেঞ্জিকে নিয়ে মাঠে হাঁটার স্বপ্ন আমি সব সময় দেখতাম।’

সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব। বিমানবন্দরে গেলে ছোট বাচ্চার উসিলায় যখন লাইনের সবার আগে চলে যান, সেই ছোট্ট আনন্দগুলোও এখন মিলারের কাছে পরম পাওয়া। ভারতের ধুলোমাখা বিমানবন্দর বা হোটেলের মেঝেতে যখন ছোট্ট বেঞ্জি হামাগুড়ি দেয়, খুঁতখুঁতে মিলার তখন জীবাণুর ভয় ভুলে বাবার আনন্দেই বুঁদ হয়ে থাকেন।

৩৬ বছর বয়সেও মিলার নিয়মিতই ঝড় তুলছেন ব্যাট হাতে।
আইসিসি

ক্রিকেটজীবনের ১০ শতাংশ সময় ভারতেই কাটিয়েছেন মিলার। সেখানকার মানুষের আতিথেয়তা তাঁকে মুগ্ধ করে, আবার মাঝেমধ্যে একটু অস্বস্তিতেও ফেলে। কেউ যখন তাঁর ছোট্ট একটা ট্রলিব্যাগও বয়ে নিয়ে সাহায্য করতে চায়, মিলার তখন গর্ব ভরে বলেন, ‘আরে, আমি দক্ষিণ আফ্রিকান, আমরা একবারে ১০টা ব্যাগ বইতে পারি!’

১২টি আইসিসি টুর্নামেন্ট খেলে ফেলেছেন, ঝুলিতে কোনো ট্রফি নেই—আক্ষেপ কি পোড়ায় না? মিলার এটাকে ‘বোঝা’ হিসেবে মনে করেন না। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘চোকার্স’ তকমা নিয়েও তিনি ভাবেন না। তাঁর কাছে প্রতিটি টুর্নামেন্ট মানেই ইতিহাস বদলানোর নতুন একটা সুযোগ। ২৪-এ যা হয়নি, ২৬–এ তা হতেই পারে!

আরও পড়ুন