অ্যাডিলেড ওভালে আজ একদিনেই ছিল দুই ম্যাচ এবং এক অর্থে দুটি ম্যাচই ছিল বাংলাদেশের। প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডস দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারালে বাংলাদেশের সেমিফাইনালে যাওয়ার পথ সহজ হবে। পরের ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে দিতে পারলেই তখন নিশ্চিত শেষ চারে বাংলাদেশ।

একই মাঠে খেলা হলে এক টিকিটে দুই ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশের সমর্থকেরা সকাল থেকেই মাঠে। উদ্দেশ্য, নেদারল্যান্ডস দলকে সমর্থন দিয়ে অনুপ্রাণিত করা। নেদারল্যান্ডস সমর্থন পেয়েছে পাকিস্তানের দর্শকদেরও। কারণ তাদের জন্যও সমীকরণটা ছিল একই, দক্ষিণ আফ্রিকা হেরে গেলে বাংলাদেশকে হারালেই সেমিফাইনালে চলে যাবে পাকিস্তান।

বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের দর্শকদের সমর্থন নিয়ে শেষ পর্যন্ত বড় অঘটনই ঘটিয়ে দিয়েছে ডাচরা। তাদের ১৩ রানের জয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান পরের ম্যাচটা হয়ে দাঁড়ায় কোয়ার্টার ফাইনাল, যে জিতবে সেই সেমিফাইনালে।

টসে জিতে ব্যাটিং নিয়ে শুরুটা ভালোই হয়েছিল। নাজমুল হোসেনের বাউন্ডারিতে শাহিন শাহ আফ্রিদির প্রথম ওভারেই ৬ রান। নাসিম শাহর পরের ওভারে পয়েন্ট দিয়ে নাজমুলের আরেকটি বাউন্ডারি, এই ওভারে ৭।

আফ্রিদির করা তৃতীয় ওভারে আরেক ওপেনার লিটন দাস যে ছক্কাটা মারলেন, মনে হলো ভারতের বিপক্ষে আগের ম্যাচের ফর্মটাই হয়তো টেনে নিয়ে এলেন পাকিস্তান ম্যাচেও। তখন কে জানত, ওই ওভারের বিধিলিপিতেই বিদায় লেখা লিটনের! পঞ্চম বলটা সামনের পা একটু এগিয়ে স্ল্যাশ করতে গেলেন, কিন্তু শটটা জুতসই না হওয়ায় বল গিয়ে জমা পড়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের ফিল্ডার শান মাসুদের হাতে।

দলের ২১ রানে লিটনের বিদায় অবশ্য টের পেতে দিচ্ছিলেন না নাজমুল ও তিনে নামা সৌম্য সরকার। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ফিফটি করা নাজমুলের ব্যাট থেকে আজও এসেছে ৪৮ বলে ৫৪ রান। চতুর্থ ওভারে মোহাম্মদ ওয়াসিমের বলে ব্যক্তিগত ১১ রানে জীবন পেয়েছেন শাদাবের হাত থেকে, সেটি কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে সৌম্যর সঙ্গে নাজমুল গড়েছেন ৫২ রানের জুটি।

১৭ বলে ২০ রানের ইনিংসে সৌম্যকেও মনে হচ্ছিল আত্মবিশ্বাসী। রানের খাতাই খুলেছেন ওয়াসিমের ওই ওভারের শেষ বলে ডিপ মিডউইকেট পার করে গ্যালারিতে বল পাঠানো ছক্কায়। ১১তম ওভারে শাদাবের বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে সৌম্যর ক্যাচে জুটিটা ভাঙার পরের বলেই সাকিবের সেই দুর্ভাগ্যজনক আউট, যেটা বদলে দেয় বাংলাদেশ ইনিংসের ছবিটাই।

কিন্তু অ্যাডিলেড ওভালের শুকনো খটখটে উইকেটে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানরা পারতেন রানটা দ্রুত বাড়িয়ে নিতে। সাকিব ফিরে যাওয়ার পর হাতে ছিল ৯ ওভার ১ বল। অথচ এই সময়ে রান এসেছে মাত্র ৫৪! সেটি আর ১০-১৫ বেশি হলেও হয়তো ম্যাচের চেহারাটা অন্যরকম হতো।

২০ বলে ২৪ রান করে এক আফিফ হোসেনের ব্যাটেই যা একটু চেষ্টা ছিল। শাহিনের বলে বোল্ড হওয়ার আগে মোসাদ্দেকের ১১ বলে ৫ রান, ৩ বলে কোনো রান না করে ওই ওভারেই নুরুল হাসানের ফিরে যাওয়া বাংলাদেশের ইনিংসের চাকাটাই দেয় থামিয়ে। কারও মধ্যেই দ্রুত রান বাড়িয়ে নেওয়ার তাড়না দেখা যায়নি।

এর আগে উইকেটে এসেই শাদাবের লো ফুলটস প্রথম বলটা ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে খেলতে চেয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু শটটা ঠিকভাবে হয়নি। বল তাঁর বুট ছুঁয়ে চলে যায়। পাকিস্তানের বোলার-ফিল্ডারদের আবেদন সাড়া দিয়ে আম্পায়ার দিয়ে দেন এলবিডব্লুর সিদ্ধান্ত।

সাকিব সঙ্গে সঙ্গেই রিভিউ নেন। তাঁর শরীরিভাষাও বলে দিচ্ছিল, তিনি নিশ্চিত এলবিডব্লু হননি। টেলিভিশন রিপ্লেতেও পরিষ্কার দেখা গেছে সাকিবের ব্যাট অতিক্রম করার সময় শাদাবের বল ছুঁয়ে গেছে সেটি। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকান টিভি আম্পায়ার ল্যাংটন রুসেরে শেষ পর্যন্ত ফিল্ড আম্পায়ারের এলবিডব্লুর সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন।

এই সিদ্ধান্তে মাঠেই বিস্ময় প্রকাশ করেন সাকিব। কারণ তিনি নিশ্চিত ছিলেন বল তাঁর ব্যাট ছুঁয়ে তবেই বুটে লেগেছে। ওদিকে আম্পায়ারের নাকি মনে হয়েছে বল ব্যাটে লাগেনি, সরাসরি বুটে লেগেছে। আল্ট্রা এজে যেটা দেখা গেছে সেটা ব্যাট এবং মাটির সংঘর্ষ। যদিও পরে টিভি রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা গেছে, সাকিবের ব্যাট মাটিতে স্পর্শই করেনি।

ভারতের বিপক্ষে আগের ম্যাচেও আম্পায়ারিং নিয়ে ক্ষোভ ছিল বাংলাদেশের। ভারতের ‘ফেক ফিল্ডিং’ সত্ত্বেও ৫ রান না পাওয়া, বৃষ্টির পর দ্রুত খেলা শুরু করে দেওয়া; আপত্তি ছিল এসব নিয়ে।

ভারতের বিপক্ষে হারের পরও বাংলাদেশের সেমিফাইনালের আশা বেঁচে ছিল। আজ অ্যাডিলেড ওভালের প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের চমক জাগানো জয়ের পর তো বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অঘোষিত কোয়ার্টার ফাইনালই, যে জিতবে সেই সেমিফাইনালে।

কিন্তু এই ম্যাচেও দুর্ভাগ্যের শিকার বাংলাদেশ, দুর্ভাগ্য সাকিবেরও। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হয়তো বড় কোনো আশা ছিল না বাংলাদেশের। তবু পর পর দুই ম্যাচে আম্পায়ারদের ‘ভুলে’র শিকার হওয়াটা অপ্রত্যাশিত। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ে তাই হারের যন্ত্রণার চেয়েও যেন বেশি হচ্ছে বঞ্চনার অনুভূতি।