শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের ‘পদ্মফুল’ পাতুম নিশাঙ্কা
সুপারম্যান তাহলে সত্যিই আছেন!
কথাটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করা হয়েছে। ক্যাপশনের নিচে পাতুম নিশাঙ্কার দুটি ছবি। প্রথমটি ফিল্ডার হিসেবে উড়ন্ত ক্যাচ নেওয়ার। পরেরটি সেঞ্চুরি করে ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে উদ্যাপনের।
‘এটা কি পাখি? নাকি বিমান? নাহ, এটা পাতুম নিশাঙ্কা’—আইসিসির এক্স পোস্টে লেখা। ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক এ সংস্থাটি আর সুপারম্যানের দ্বারস্থ হয়নি। কিংবা অন্য কারও মতো স্পাইডারম্যানকেও টেনে আনেনি। নিশাঙ্কার অবিশ্বাস্য উড়ন্ত ক্যাচ দেখে প্রথমে পাখি বা বিমান মনে করার ভ্রমের ছলে তারা আসলে নিশাঙ্কার গুণকীর্তন করেছে। যেমনটা করেছে উইজডেনের এক্স হ্যান্ডল।
গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচ ছেড়ে পরের ওভারেই অবিশ্বাস্য দক্ষতায় সেই একই খেলোয়াড়ের ক্যাচ ধরেন নিশাঙ্কা। পরে অস্ট্রেলিয়ার ১৮১ রানের পুঁজি নিয়ে ছেলেখেলা করেন ৫২ বলের অপরাজিত সেঞ্চুরিতে। এমন পারফরম্যান্সের ছটায় উইজডেনের মনে পড়েছে অস্কারজয়ী সিনেমা ‘গ্লাডিয়েটর’কে। রক্তক্ষয়ী লড়াই জয়ের পর নায়ক রাসেল ক্রো কলোসিয়ামের মাঝে দাঁড়িয়ে চারপাশের দর্শককে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আর ইউ নট এন্টারটেইনড?’—অর্থাৎ, আপনারা কি বিনোদিত হননি?
উইজেডেন এক্স হ্যান্ডলেও নিশাঙ্কার ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আর ইউ নট এন্টারটেইনড?’
উত্তরটা সবারই জানা—‘পয়সা উশুল!’
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে ১৬তম ওভারে ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচ ছাড়ার পর নিশাঙ্কার কি কালুতারা বৌদ্ধ মন্দিরের সেই দিনগুলো মনে পড়েছিল? জুঁই আর পদ্মফুলের বদলে যখন হাতের তালুতে ছোট ছোট সংখ্যার কয়েন জমা হতো। সংসারটা চলত সেসব দিয়েই। ১৭তম ওভারে সেই ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচই ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ফাইটার বিমানের ‘নোজ ডাইভে’র মতো করে নিয়ে নিশাঙ্কা শুধু প্রায়শ্চিত্তই করেননি, মানুষের যে দিন কিংবা সময় বদল হয়, চাইলে সে সত্যিই বদলাতে পারে, সেটাও বুঝিয়েছেন।
আর ব্যাটিং? টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে গতকাল রাতের আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অত রান তাড়া করে কেউ কখনো জিততে পারেনি। কিন্তু কাল রাতে নিশাঙ্কা ক্রিজে থাকতে মনে হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া অন্তত ২০-২৫ রান কম করেছে। ১২ বল হাতে রেখে শ্রীলঙ্কার ৮ উইকেটের জয়ই তার প্রমাণ।
সেই জয়ের পর সতীর্থ পবন রত্নায়েকেকে নিয়ে মাঠ ছাড়ার সময় নিশাঙ্কার মুখে মিটিমিটি হাসিটা নিশ্চয়ই মনে আছে? কোচ সনাৎ জয়াসুরিয়া তাঁকে বুকে টেনে নেওয়ার আগে চোখের ভাষায় তাঁকে যেন জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘কোচ, আর ইউ নট এন্টারটেইনড?’
উফ, কী অবিশ্বাস্য মসৃণ ক্রিকেটীয় ব্যাটিং। এতটুকু জবরদস্তি নেই কোনো শটে, স্রেফ টাইমিং ও বুদ্ধির ঝিলিক—যেমনটা ম্যাক্সিমাস চরিত্রে রাসেল ক্রোর অসি চালানো এবং মায়ের বিক্রি করা সেই জুঁই আর পদ্মের পেলব পাপড়ির মতো।
রিডলি স্কটের ‘গ্লাডিয়েটর’ সিনেমায় ম্যাক্সিমাস ছিলেন রোমান জেনারেল। জীবন তাঁকে নামিয়ে এনেছিল গ্লাডিয়েটরদের কাতারে। নিশাঙ্কার উল্টো। জীবন তাঁকে এখন হয়তো লঙ্কান ব্যাটিংয়ের ‘জেনারেল’ বানিয়েছে, কিন্তু শুরুটা এমন ছিল না।
দাহকালের সেই গল্পের শুরুতে প্রথমে আসবেন প্রদীপ নিশান্থা। ভদ্রলোক শ্রীলঙ্কার প্রথম শ্রেণির সাবেক ক্রিকেটার। তিনি সেদিন নিশাঙ্কাদের বাড়ি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
লোকমুখে পাতুম নিশাঙ্কার ব্যাটিং প্রতিভার কথা শুনে তাঁর এলাকায় যান খোলনলচে সব জানতে ও দেখতে। পরিকল্পনা ছিল কলম্বো স্কুলের দলে তাঁকে খেলাবেন। নিশাঙ্কা তাঁর পরিবারের সঙ্গে তখন থাকতেন সুনামিদুর্গতদের জন্য শ্রীলঙ্কা সরকারের বানিয়ে দেওয়া ছোট্ট বাড়িতে। কিন্তু একই বাড়ি আরও অনেকের থাকায় নিশান্থার জন্য ব্যাপারটা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অগত্যা তিনি ফোন করে নিশাঙ্কাকে আসতে বলেন সেখানকার পরিচিত কালুতারা বৌদ্ধ মন্দিরে। সেখানেই তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ।
নিশান্থা সাক্ষাতের জন্য মন্দিরটি এমনিতেই বেছে নেননি। নিশাঙ্কার মা সেখানে ভক্তদের মাঝে ফুল বিক্রি করতেন। জুঁই, পদ্ম থেকে আরও কত রকম ফুল! সেসব বেচে যতটুকু আয় হতো, তা দিয়েই সংসারটা টেনেটুনে চলে যেত।
বাবাকে সঙ্গে নিয়ে সেদিন সেই মন্দিরে গিয়েছিলেন নিশাঙ্কা। ওদিকে নিশান্থা ভর্তির ফরম নিয়ে প্রস্তুত। সেদিন সেই মন্দিরের সিঁড়িতে সেই ভর্তি ফরমে সই করে নিশাঙ্কা আসলে নিজের ভবিষ্যতেরই দ্বার খুলেছিলেন।
শ্রীলঙ্কানরা এমনিতেই ধর্মপ্রাণ মানুষ। নিশাঙ্কাও সম্ভবত আলাদা নন। মন্দিরের সিঁড়িতে সই করার বিষয়টি তাঁকে কতটা আন্দোলিত করেছিল সেটা বেশ পরে বলেছিলেন শ্রীলঙ্কান সংবাদমাধ্যম ‘দ্য আইল্যান্ড’কে, ‘আর কোনো বাচ্চা কালুতারা মন্দিরে ভর্তি ফরম সই করেছে কি না, আমি ঠিক জানি না। এটাই জীবনের সেরা আশীর্বাদ। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।’
নিশাঙ্কার বাবা ছিলেন কালুতারা এসপ্ল্যানেড ক্রিকেট মাঠের মাঠকর্মী। অন্যের সন্তানদের ভালো খেলা নিশ্চিত করতে মাঠের যত্ন নিতেন। আর মনে মনে স্বপ্ন দেখতেন, একদিন তাঁর ছেলেও ক্রিকেটার হবে। কিন্তু সেটা হয় কলম্বোয়—যা কালুতারা জেলা থেকে বেশ দূরের পথ। বাংলাদেশে যেমন ঢাকায় না এলে ক্রিকেটার হওয়া যায় না, শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও তেমনি তাদের রাজধানী শহর কলম্বো—তাদের ক্রিকেটেরও রাজধানী এ শহর।
নিশাঙ্কাদের জীবনে নিশান্থার আবির্ভাব ঘটার আগপর্যন্ত ওই পরিবার থেকে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নটা আসলে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গেই মিলিয়ে যেত।
নিশান্থা আসার পর সেই স্বপ্নের অঙ্কুরোদ্গম ঘটলেও সমস্যা ছিল। গরিবের সংসারে যেমন হাজারটা সমস্যা থাকে, ঠিক তেমনি নিশাঙ্কার জন্যও সমস্যা হয়ে দেখা দেয় কলম্বোয় থাকার খরচ মেটানো। অবশ্য ভালো বন্ধু থাকলে এসব থেকেও পরিত্রাণ মেলে। নীলান্থা তেমনই এক বন্ধু নিশাঙ্কার। সেদিন মন্দিরে নিশাঙ্কা ভর্তি ফরমে সই করার সময় নীলান্থা ছিলেন তাঁর সঙ্গে। নীলান্থা তখন ‘জয়ারত্নে ফ্লোরিস্ট’ নামে ফুলের দোকানে কাজ করতেন। নিজের চাকরিদাতাকে নীলান্থা তখন বুঝিয়েছিলেন যে নিশাঙ্কাকে মাসিক ভাতা দেওয়া হোক। যুক্তি? ছেলেটির মধ্যে বিশেষ প্রতিভা আছে। তাতে কাজ হলো।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সেই ফুলের দোকান থেকে নিশাঙ্কা পেলেন আড়াই লাখ রুপি। সেটি তাঁর অভিষেক টেস্ট সিরিজ। অর্থপ্রাপ্তির পর কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করেন নিশাঙ্কা। যেহেতু ব্যাটসম্যান তাই কৃতজ্ঞতাটুকু স্বীকার করেছিলেন সেঞ্চুরিতে।
আসলে জীবন হোঁচট খাওয়ার হলে সব মানুষ সব সময় একা উঠে দাঁড়াতে কিংবা ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। মানুষের ওপর মানুষের বিশ্বাস থাকতে হয়, পেছন থেকে একটু ঠেলাও দরকার হয়। সেই যে ফুলের দোকানমালিক—তিনি নিশাঙ্কাকে সেভাবে চিনতেন না। কিন্তু বিশ্বাস রেখেছিলেন আর এমন সব বিশ্বাসের চক্রপূরণ হলো যেন কাল রাতে পাল্লেকেলেতে। ফুল বিক্রেতা মা ও মাঠকর্মীর ছেলের কাছ থেকে এবার প্রথম সেঞ্চুরি দেখা গেল টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে। সেটাও ধারে ও ভারে অনেক এগিয়ে থাকা এমন এক দলের বিপক্ষে, যারা দক্ষতার পাশাপাশি পেশির জোরেও ক্রিকেট খেলতে অভ্যস্ত। কিন্তু নিশাঙ্কার পেশি না টিম ডেভিড, না মিচেল মার্শের মতো ভারী। তাঁর পেশি সম্ভবত তাঁর মায়ের বিক্রি করা কোনো একটি পদ্মফুলের মতো—ব্যাট হাতে একটু নাড়াচাড়াতেই সুবাস ছড়ায়।
সেই সুবাসটা আপনার চেনা লাগতে পারে? শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে এমন ‘জুঁই, পদ্ম কিংবা গোলাপ’ তো কম নেই। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, জয়াসুরিয়া, অরবিন্দ ডি সিলভা...। শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের গল্পে তাঁরা আসবেনই। তবে এখন থেকে সেই গল্পে নিশাঙ্কাকেও রাখতে হবে। কারণ, ছেলেদের টি-টুয়েন্টিতে শ্রীলঙ্কার হয়ে একাধিক সেঞ্চুরি শুধু নিশাঙ্কারই আছে। ছেলেদের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সেই যে ২০১০ সালে জয়াবর্ধনে সেঞ্চুরি করেছিলেন, এত দিন এই আসরে এই একটি সেঞ্চুরিই ছিল শ্রীলঙ্কার। নিশাঙ্কার ব্যাটে কাটল ১৬ বছরের খরা।
ব্যাপারটা এমন নয় যে ভালো ফর্মে ছিলেন তাই সেঞ্চুরিটি হয়ে গেছে। এই বিশ্বকাপে তিন অঙ্কের দেখা পেতে হবেই হবে—এমন একটা জেদ ছিল নিশাঙ্কার মনে, ‘এই বিশ্বকাপে ১০০ করার বড় একটা লক্ষ্য ছিল। ভালো লাগছে যে এটা করতে পেরেছি।’
মজার বিষয়, বিশেষ কিছু একটা করতে হবে—নিশাঙ্কার এই ভাবনাটা আরও ভালোভাবে জেঁকে বসে ম্যাক্সওয়েলের সে ক্যাচটি ছাড়ার পর, ‘(ক্যাচ ছাড়ার পর) খুব হতাশ লেগেছে, কারণ জানতাম তার উইকেট নিতে হবে। সে মুহূর্তে ভেবেছি দলের জন্য বিশেষ কিছুই করতে হবে। সে (ম্যাক্সওয়েল) রিভার্স সুইপ খেলতে পারে, এই চিন্তাটা ছিল। মাঠেই অনুসরণ করেছি তাকে। সৌভাগ্যের বিষয় যে ক্যাচটি ধরতে পেরেছি।’
না নিশাঙ্কা, এমন ক্যাচ শুধু সৌভাগ্যের বশে নেওয়া যায় না। বাঁ দিকে শূন্যে উড়াল দিয়ে ক্যাচটি ধরতে যে দক্ষতা এবং টাইমিংয়ের দরকার হয়, সেসব আসে শুধু অনুশীলনের সাধনা থেকে। কিংবা ব্যাটিংয়ে ১৭তম ওভারে চতুর্থ বলে নাথান এলিসকে অনেকটা হাফ সুইপে (ঠিক কী শট সেটা?) ফাইন লেগের ওপর দিয়ে মারা ছক্কাটি?
শুধু সৌভাগ্য এমন সব শটের ঠিকানা ঠিক করে দিতে পারে না। অনুশীলন, পরিষ্কার মাথা এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞারও দরকার হয়। ঠিক যেভাবে শটটি খেলার আগমুহূর্তে গ্রিপ পাল্টে ব্যাটের হাতলের মাথায় ধরেছিলেন ‘ড্রাইভিং হ্যান্ড’ (বাঁ হাত), তাতে শট খেলার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাঙ্গেলটা যেভাবে বেরিয়ে এল, সেটা যেন কালুতারা মন্দিরে একসময় তাঁর মায়ের ফুল বিক্রির মতোই—জীবন চালাতে মা তাঁর ব্যাগ থেকে একের পর এক ফুল বের করিয়ে তুলে দিচ্ছেন পূজা দিতে আসা ভক্তদের হাতে। নিশাঙ্কাও তেমনি তাঁর ব্যাটের ‘সুইট স্পটে’ একের পর এক শটের ‘ফুল’ ফুটিয়েছেন শ্রীলঙ্কার সমর্থকদের হৃদয়ে।
জীবন যখন তাঁর প্রতি বিরূপ ছিল, তখন যাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন—তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে এর চেয়ে ভালো নৈবেদ্য আর কী হতে পারে!