২২ বছর ধরে কেন ‘টেস্টলেস’ ডারউইন

উন্মুক্ত অ্যাকুয়ারিয়ামে সাঁতার কাটছে রঙিন মাছ। সিঙ্গাপুরে চাঙ্গি বিমানবন্দরেতারেক মাহমুদ

এসেই কারণটা খুঁজে বের করতে ইচ্ছা করল। ঠিক এসে নয়, আসলে যাওয়ার পথে। ঢাকা থেকে ডারউইন, মাঝে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমাবন্দরের যাত্রাবিরতি এতটাই দীর্ঘ যে তাতে টেস্টের একটি গোটা দিন শেষ হয়ে খেলোয়াড়েরা চাইলে গোসলটোসল সেরে ঘণ্টা দুয়েকের ঘুমও দিয়ে ফেলতে পারেন।

আমার এক পাশে হাডসন্স কফি, যার সামনের উন্মুক্ত অ্যাকুয়ারিয়ামে সাঁতার কাটছে বড় বড় রঙিন মাছ। ডানে ভারী কাচের ওপাশেই সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজগুলো একটু পরপর যাত্রী ওঠা-নামার টানেলের কাছে এসে নাক ঢোকাচ্ছে। কিন্তু আমি তো সিঙ্গাপুর দেখতে আসিনি! আর বিমানবন্দরে বসে একটা দেশের কতটুকুই–বা দেখা যায়!

চাঙ্গি বিমানবন্দরে সুন্দর একটা ফ্রি সিটি ট্যুরের ব্যবস্থা আছে অবশ্য। যেসব যাত্রীর ট্রানজিট অন্তত পাঁচ ঘণ্টার, তাঁদের জন্য আছে সময় আর গন্তব্য ধরে শহর ঘুরিয়ে আনার বিভিন্ন প্যাকেজ। সারা দিনের ট্রানজিট বলে আশাবাদী হয়ে ফ্রি সিটি ট্যুরের কাউন্টারে গিয়ে নিরাশা নিয়ে ফিরলাম। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের মানুষই সিঙ্গাপুরের ভিসা না থাকলেও এই ট্যুরটা নিতে পারেন। ব্যতিক্রম যে অল্প কিছু দেশের মানুষের ফ্রি সিটি ট্যুরের জন্যও অন্তত দুই সপ্তাহ আগে সিঙ্গাপুরের ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়, দেখতে পেলাম, কাউন্টারের টেবিলে রাখা সেই ‘হতভাগ্য’দের তালিকায় আমরাও আছি!

চাঙ্গি বিমানবন্দরের শানশওকত দেখা ছাড়া সারা দিনে তাই আর কোনো কাজ থাকল না। এখানে ১১ ঘণ্টার যাত্রাবিরতির পর উঠব সমুদ্রের ওপারের শহর ডারউইনে যাওয়ার উড়োজাহাজে। আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া প্রথম টেস্টের ভেন্যু শহর, যেখানে টেস্ট ম্যাচ হয়নি দীর্ঘ ২২ বছর।

চাঙ্গি বিমানবন্দরের শানশওকত বেশ দেখার মতো
তারেক মাহমুদ

মাত্র দুই টেস্টের সাক্ষী

টেস্ট সিরিজের আবহে ঢুকতে ঢাকায় বসে গত কয়েক দিন এই একটি কথাই ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে লিখতে হয়েছে। ডারউইনে ২২ বছর টেস্ট হয় না, বাংলাদেশ এর আগে এখানে খেলেছে, এবারও খেলবে। কেমন হতে পারে ডারউইনের উইকেট? গরম কেমন? লিটন দাস কি খেলবেন প্রথম টেস্টে?

চাঙ্গি থেকে ডারউইনে খোঁজ নিয়ে শেষ প্রশ্নটার যেটুকু উত্তর দেওয়া যাচ্ছে তা হলো, ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্টে লিটনের খেলার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু প্রথম যে প্রসঙ্গটির কথা বলা হলো, সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক তো সেটিই!

ডারউইনে ২২ বছর ধরে টেস্ট হয় না, কিন্তু কেন হয় না? মারারা স্টেডিয়াম তো আর বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম নয়! তাহলে কেন প্রায় দুই যুগ ‘টেস্টলেস’ থেকে যাবে ডারউইন! টেস্টের ‘টেস্ট’ কেন পাবে না ডারউইনের মানুষ!

ডেমিয়েন মার্টিন, জেক ওয়েদারাল্ড ও ডারউইনের ক্রিকেট ইতিহাস

যে শহরে জেক ওয়েদারাল্ডরা শৈশব থেকে তারুণ্যে যায় ক্রিকেটে গড়াগড়ি খেতে খেতে, যে শহর জন্ম দিয়েছে ডেমিয়েন মার্টিনের মতো একজনকে—সেই শহর থেকে টেস্ট ক্রিকেট হারিয়ে গিয়েছিল কেন?

অথচ নর্দান টেরিটরি ক্রিকেটের ওয়েবসাইটে এই অঞ্চলের ক্রিকেটের দেড় শ বছর পুরোনো ইতিহাসের কথাও উল্লেখ আছে। ১৮৬৯ সালে ইউরোপীয়রা বসতি স্থাপনের পর এখানে প্রথম যে খেলাগুলো হয়, ক্রিকেট ছিল সেগুলোর অন্যতম। ইতিহাস বলে, এই অঞ্চলে প্রথম ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হয় ১৮৭৪ সালে এবং ১৯১১ সাল পর্যন্ত পোর্ট ডারউইন ক্রিকেট ক্লাব ছিল এখানকার ক্রিকেটের প্রধান ভিত্তি।

১৮৮৯ সালে ওয়েস্ট কিম্বার্লির সোনার খনির শ্রমিকদের দল আর পোর্ট ডারউইন দলের মধ্যে টেরিটরির প্রথম আন্ত–ঔপনিবেশিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নর্দান টেরিটরির বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতেও নাকি নিয়মিত ক্রিকেট খেলা হতো।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ডেমিয়েন মার্টিনকে নিশ্চয়ই মনে আছে? তাঁর ব্যাটিং দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত
এএফপি

তবু কেন ২২ বছর টেস্ট হয়নি ডারউইনে

এর উত্তরে শুধু ক্রিকেট নেই। এতে মিশে আছে অস্ট্রেলিয়ার ভূগোল, আবহাওয়া, জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং হ্যাঁ, ক্রিকেটের বদলে যাওয়া বাস্তবতাও।

২০০৩ সালে খালেদ মাহমুদ-হাবিবুল বাশারদের বাংলাদেশ দলই ছিল ডারউইনের প্রথম টেস্ট অতিথি। এক বছর পর, ২০০৪ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট আয়োজন করে মারারা (আজকের টিআইও স্টেডিয়াম)। সেই দুটি টেস্টের পরই ডারউইন থেকে টেস্ট ক্রিকেট নির্বাসিত ‘জীবন’ কাটাচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া আর বাংলাদেশের মধ্যে তিনটি ওয়ানডে হয়েছে ডারউইনে। এরপর লম্বা বিরতি। নর্দান টেরিটরির রাজধানী শহরে পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজা আবার খোলে ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি দিয়ে। কিন্তু আরেকটি টেস্টের জন্য ডারউইনকে অপেক্ষায় থাকতে হলো ২২টি বছর।

ডারউইনের ভৌগোলিক অবস্থান এর বড় কারণ। অস্ট্রেলিয়ার উত্তর প্রান্তের শহরটি সিডনি-মেলবোর্ন-ব্রিসবেনের মতো ক্রিকেটের ঐতিহ্যবাহী শহরগুলো থেকে বেশ দূরে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার মূল কাঠামো ঐতিহাসিকভাবেই দক্ষিণ ও পূর্বের বড় শহরগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে। সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড, পার্থ—টেস্ট ক্রিকেটের পরিচিত এবং ঐতিহাসিক পাঁচ শহর। ডারউইনের অবস্থান সেই ক্রিকেট মানচিত্রের বেশ বাইরে।

তবে দূরত্বই সব নয়। ডারউইনের সবচেয়ে বড় সুবিধাটিই এখানে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য অন্যতম বড় সমস্যাও হয়ে দাঁড়ায়—আবহাওয়া।

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়াম
শামসুল হক

অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট মৌসুম মূলত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি। তখন ডারউইনে বর্ষাকাল, থাকে প্রবল বৃষ্টির সম্ভাবনা। কিন্তু জুন থেকে আগস্ট শীতের সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। আকাশ পরিষ্কার, বৃষ্টি কম, তাপমাত্রা দারুন ক্রিকেট উপযোগী।

তার মানে ডারউইন একদিক দিয়ে যেমন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে জায়গা করতে পারেনি, অন্যদিকে আবার এই শহরকে সেই মানচিত্রে জায়গা দিলে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মৌসুমের সময়টা যায় বেড়ে। কারণ, অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে যখন শীত, ‘টপ এন্ডে’র আবহাওয়া, তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য উপযুক্ত।

আরও পড়ুন

প্রশ্নটা এখানেই—টেস্ট ক্রিকেট তাহলে গত ২২ বছরে কেন এল না ডারউইনে? আসলে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ক্রিকেটের মৌসুম দক্ষিণের শহরগুলোর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যে ডারউইনের আবহাওয়া কাজে লাগানোর প্রয়োজনই তৈরি হয় না। তবে এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচি খেলায় ঠাসা। আইসিসির টুর্নামেন্ট, দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আর ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের চাপে ক্রিকেট ক্যালেন্ডারে জায়গা বের করাই কঠিন। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতি ডারউইনের জন্য আবারও টেস্ট আয়োজনের সুযোগ তৈরি করেছে।

ডারউইনে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটার জেক ওয়েদারাল্ড
জেক ওয়েদারাল্ডের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল

বদলাচ্ছে পরিস্থিতি

গত বছর আগস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি সিরিজের দুটি ম্যাচ দিয়ে ডারউইনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরার পর খেলোয়াড়দের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী ট্রড গ্রিনবার্গও তখন উত্তরাঞ্চলে আরও বেশি খেলা আয়োজনের কথা বলেছিলেন।

কিন্তু ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া যে তা করবে, ডারউইনে ক্রিকেট বিক্রি হবে তো! ডারউইনের জনসংখ্যা সিডনি-মেলবোর্নের তুলনায় অনেক কম। বড় দলের বিপক্ষে টেস্ট মানে তো শুধু ১১ জন ক্রিকেটার নন; দর্শক, সম্প্রচারকারী দল, নিরাপত্তা, পৃষ্ঠপোষক, আতিথেয়তা, যাতায়াতব্যবস্থারও বিষয় থাকে। বড় শহরে ক্রিকেট যে বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা পায়, ডারউইনে তা পাওয়া সহজ নয়।

এবার সেই হিসাবও বদলেছে। আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্টের নাকি প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে! দর্শকদের প্রায় অর্ধেকই নর্দান টেরিটরির বাইরে থেকে আসবেন বলে ধারণা। এর তো একটাই অর্থ দাঁড়ায়, পর্যটন শহর ডারউইনে ক্রিকেটও হয়ে উঠছে পর্যটনের পণ্য।

আরও পড়ুন

বর্তমান সময়ে ডারউইনে ক্রিকেট পণ্যের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনের কথা বলতে গেলে আসে ওয়েদারাল্ডের প্রসঙ্গই। ডারউইন ক্রিকেট ক্লাব থেকে উঠে আসা এই তরুণ ডেমিয়েন মার্টিনের পর ডারউইনের দ্বিতীয় টেস্ট ক্রিকেটার। ২০০৩ সালে আট বছর বয়সে বাংলাদেশের টেস্ট দেখতে মাঠে গিয়েছিলেন ওয়েদারাল্ড। ২০২৬ সালে হয়তো ডারউইনবাসী ঘরের মাঠে তাঁকেই দেখবে টেস্টের পোশাকে।

টেস্ট সিরিজের ট্রফি নিয়ে ক্যামেরার সামনে দুই দলের অধিনায়ক। ডারউইনে আগামীকাল শুরু হবে প্রথম টেস্ট
শামসুল হক

ডারউইনের ‘টেস্টলেস’ ২২ বছরের অপেক্ষা তাই বৃথা যায়নি। প্রত্যাবর্তনের টেস্টে এই শহর ফিরছে নতুন ক্রিকেটীয় পরিচয় নিয়ে। সে পরিচয়ের নাম জেক ওয়েদারাল্ড। আর অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট–সূচিকে ছড়িয়ে দিতে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পরিকল্পনার সঙ্গেও দারুণভাবে খাপ খায় বাংলাদেশের এবারের দুই টেস্ট ভেন্যু ডারউইন ও ম্যাকাই।

নর্দান টেরিটরির ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের স্বপ্নটা কি তাহলে এখন আরও বড় হবে? চাঙ্গি থেকে উড়ে সাগরের ওপারে গেলে নিশ্চয়ই তা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব।

আরও পড়ুন