বিশ্বকাপ নিয়ে আইসিসির গোলকধাঁধা
এবারের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ‘এ’ গ্রুপে চার ম্যাচের একটিতেও হারেনি ভারত। নিজেদের গ্রুপে চার ম্যাচের সব কটিতে জিতেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজও। আর অস্ট্রেলিয়া–শ্রীলঙ্কা থাকা গ্রুপে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট নিয়ে সেরা হয়েছে জিম্বাবুয়ে। সাধারণত একই গ্রুপ থেকে একাধিক দল পরের পর্বে উঠলে গ্রুপসেরার জন্য বিশেষ সুবিধা আছে। পরের পর্বে অন্য গ্রুপের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে খেলতে হয় না।
তবে ব্যতিক্রম ঘটছে এবারের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে। নিজেদের গ্রুপ থেকে সেরা হলেও ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়েকে সুপার এইটে একই গ্রুপে খেলতে হচ্ছে। বিপরীতে তাদের গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় সেরা হওয়া পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা খেলবে একই গ্রুপে।
সুপার এইটের এমন লাইনআপে অনেকেরই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। এটা আবার কেমন ব্যবস্থা, যেখানে গ্রুপ পর্বে ভালো খেলা মানে কার্যত শাস্তি পাওয়া! আর গ্রুপ পর্বে তুলনামূলক খারাপ খেলা মানে পরের পর্বে কার্যত সুবিধা পাওয়া?
তবে টুর্নামেন্টটি যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি), তখন এমন অদ্ভুতুড়ে পরিস্থিতি নজিরবিহীনও নয়। ৫০ বছর ধরে হওয়া আইসিসির বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলো একই ফরম্যাট অনুসরণ না করে বারবারই পথ বদলেছে, যা রীতিমতো গোলকধাঁধা মনে হতে পারে অনেকের কাছে।
ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রথম যুগ
১৯৭৫ সালে আয়োজন করা হয় প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ। পরের এক যুগে হয় আরও তিনটি আসর (১৯৭৯, ১৯৮৩ ও ১৯৮৭)। প্রথম চারটি ওয়ানডে বিশ্বকাপের কাঠামো ছিল সহজ—আটটি দল দুটি গ্রুপে বিভক্ত, শীর্ষ দুই দল সেমিফাইনালে। সেখানে এক গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন খেলত অপর গ্রুপের রানার্সআপের সঙ্গে। এই ফরম্যাটের ত্রুটি বলতে ছিল সব দল একে অপরের মুখোমুখি হতো না। মজার বিষয় হচ্ছে এই সময়ে ভারত ও পাকিস্তান প্রতিবারই আলাদা গ্রুপে ছিল। নকআউট পর্বেও দুই দলের দেখা হয়নি, তার আগেই কোনো একটি দল বিদায় নিয়েছে।
’৯২–এ পরিবর্তন
অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ১৯৯২ বিশ্বকাপে অংশ নেয় ৯টি দল। দল বাড়ায় আইসিসি ফরম্যাটেও পরিবর্তন আনে। রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে প্রতিটি দলই অংশগ্রহণকারী বাকি দলগুলোর বিপক্ষে একবার করে মুখোমুখি হয়। শীর্ষ চার দল ওঠে সেমিফাইনালে। এই বিশ্বকাপে কোনো গ্রুপ না থাকায় প্রতিটি ম্যাচই ছিল সব দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি ম্যাচের পয়েন্টের প্রভাব ছিল বাকি দলগুলোর ওপরও। আইসিসি টুর্নামেন্টের এই ফরম্যাটটিকেই এখন পর্যন্ত সেরা মনে করেন অনেকে।
’৯৬–এ উল্টোযাত্রা
উপমহাদেশে এই বিশ্বকাপে অংশ নেয় ১২টি দল। ৬টি করে দল নিয়ে দুটি গ্রুপ করা হয়, যেখানে প্রতিটি গ্রুপ থেকে চারটি করে দল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। ছয়টির মধ্যে চারটি দল কোয়ালিফাই করার অর্থ হচ্ছে দলগুলো দুই ম্যাচ হারলেও কোয়ার্টারে ওঠার পথ খোলা ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁঝ কমে যায় অনেকটাই।
’৯৯ বিশ্বকাপে ‘সুপার সিক্স’ বিভ্রান্তি
ইংল্যান্ডে হওয়া শতাব্দীর শেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপ প্রবর্তন করা হয় সুপার সিক্স পদ্ধতি। প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ তিনটি দল সুপার সিক্সে ওঠে, সঙ্গে অন্য কোয়ালিফায়ারদের বিপক্ষে পাওয়া পয়েন্টও নামের সঙ্গে থেকে যায়। পদ্ধতিটি এতটাই জটিল ছিল যে নিয়মিত ক্রিকেট অনুসারীও পয়েন্ট তালিকা বুঝতে হিমশিম খেতেন। সেবার ভারত মাত্র দুই পয়েন্ট নিয়ে সুপার সিক্সে ওঠে, এরপর দুই ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। অস্ট্রেলিয়া আধিপত্য বিস্তার করে সব ম্যাচ জেতায় কাঠামোগত ত্রুটিগুলো অনেকটা আড়ালে পড়ে যায়। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার টাই হওয়া সেমিফাইনাল আর নেট রান রেটে বিদায়ের বিষয়টি এই বিভ্রান্তিকর সুপার সিক্স পদ্ধতির মধ্যেই ঘটেছিল। টাই হওয়া সেমিফাইনালের পরও যে ফরম্যাটে নেট রান রেটের ভিত্তিতে দল বাদ পড়ে, তা নিয়ে তখন তীব্র সমালোচনা হয়।
২০০৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: সুপার সিক্সের পুনরাবৃত্তি
এবার অংশ নেয় ১৪টি দল। এবারও ছিল সুপার সিক্স। পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা বিদায় নেয় প্রথম রাউন্ড থেকেই। অন্যতম স্বাগতিক কেনিয়া সেমিফাইনালে উঠে যায় সেবার। তত দিনে আইসিসির ভেতরে একটি নির্দিষ্টি কাঠামোয় স্থির থাকার চেয়ে ম্যাচের সংখ্যা এবং সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের আয়ের বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া শুরু হয়ে যায়।
২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: অধঃপতন
ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই আসরটিতে অংশ নেয় ১৬টি দল। চারটি করে দল নিয়ে চারটি গ্রুপ। শীর্ষ দুই দল সুপার এইটে। এরপর শীর্ষ চার দল সেমিফাইনালে। সাত সপ্তাহব্যাপী ৪৭ দিনের টুর্নামেন্ট। ভারত ও পাকিস্তান বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকেই। সুপার এইটে আবার পয়েন্ট ‘ক্যারি ফরোয়ার্ড’ করার নিয়ম ছিল। এই বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়া–শ্রীলঙ্কা ফাইনাল শেষ হয়েছিল প্রায় অন্ধকারের মধ্যে, যা এখনো আইসিসি ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি।
২০১১ এবং ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: স্থিতিশীলতার ফেরা
১৪ দলের বিশ্বকাপে ৭টি করে দল নিয়ে দুটি গ্রুপ। প্রতি গ্রুপের সেরা চার দল কোয়ার্টার ফাইনালে। সেখান থেকে নকআউটের মাধ্যমে চার দল সেমিফাইনালে। এই ফরম্যাট সব ধরনের দর্শকের কাছেই পরিষ্কার। টানা দুটি বিশ্বকাপ এভাবেই চালিয়েছে আইসিসি।
আবার রাউন্ড রবিন পদ্ধতি
২০১৯ বিশ্বকাপে ফিরে আসে ১৯৯২ আসরের রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতি। ১০টি দলই একে অপরের বিপক্ষে একবার করে খেলে। শীর্ষ চার দল ওঠে সেমিফাইনালে। নেট রান রেট ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ক্যারি ফরোয়ার্ড পয়েন্ট বা অস্পষ্ট সিডিং ছিল না। এই নিয়মটি আইসিসি বজায় রাখে ২০২৩ আসরেও। তবে ক্রিকেটের বিশ্বায়নের এ সময়ে দলসংখ্যা কম বলে সমালোচনাও আছে।
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম দশক
২০০৭ সালে শুরুর পর প্রথম দশকে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ হয়েছে আরও ৪ চারবার (২০০৯, ২০১০, ২০১২, ২০১৬)। এই আসরগুলোতে গ্রুপ পদ্ধতি ছিল সহজ, সুপার এইট বা সুপার ফোর। প্রথম আসরের ‘বোল আউট’ পদ্ধতিটিই যা একটু প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, পরে তা আর দেখা যায়নি।
২০২১ ও ২০২২ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ: সুপার টুয়েলভের যুগ
করোনো–পরবর্তী যুগে হওয়া ২০২১ ও ২০২২ আসরে অংশ নেয় ১৬টি দল। র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকার ভিত্তিতে আটটি দল টুর্নামেন্ট শুরু করে সরাসরি সুপার টুয়েলভ থেকে। অন্য আটটি দল দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রথম রাউন্ডে খেলে। প্রতি গ্রুপের সেরা দুই দল যোগ দেয় সুপার টুয়েলভে। সেখানে আবার ছয় দলের দুটি গ্রুপ। শীর্ষ দুই দল সেমিফাইনালে।
এই পদ্ধতিতে শুরুতে কিছুটা গোলমেলে লাগলেও টুর্নামেন্টের সামনের দিকের পথ ছিল পরিষ্কার। পয়েন্ট ক্যারি ফরোয়ার্ড বা প্রি-সিডিং বলতে কিছু ছিল না।
২০২৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ: প্রি–সিডিং
যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে হওয়া এই আসরে ঢুকে পড়ে প্রি–সিডিং ব্যবস্থা। ২০ দলের টুর্নামেন্ট, ৫টি করে দল নিয়ে চারটি গ্রুপ। প্রতি গ্রুপের সেরা দুই দল নিয়ে ৮ দলের সুপার এইট। গ্রুপ পর্ব থেকে সুপার এইটে উঠলে কোন দল কোন গ্রুপে খেলবে, সেটি র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে আগেই ঠিক করে ফেলা হয়। তবে এর নেতিবাচক ফল কেমন হতে পারে, সেটা তখন বোঝা যায়নি।
২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ: ত্রুটি উন্মোচিত
এবারও আগেভাগেই ঠিক করা ছিল গ্রুপ পর্ব পার হলে কোন দল সুপার এইটের কোন গ্রুপে উঠবে। যাকে বলা হয় ‘প্রি–সিডিং’। এই ব্যবস্থায় আগে থেকে অনুমান করা সুপার এইটে না উঠলে গ্রুপের অন্য দল তাঁর জায়গা নেয়। যেমন ‘বি’ গ্রুপ থেকে অস্ট্রেলিয়া সুপার এইটে উঠলে ভারতে গিয়ে খেলার কথা ছিল। অস্ট্রেলিয়া বাদ পড়ায় সেই জায়গাটি নিয়েছে জিম্বাবুয়ে। এবারের আসরে প্রি–সিডিংয়ের সবচেয়ে অদ্ভুত ফল দেখা গেছে এখানেই। চারটি গ্রুপের চার চ্যাম্পিয়নই সুপার এইটে একই গ্রুপে। অর্থাৎ গ্রুপে প্রথম হওয়ার ‘পুরস্কার—আরও কঠিন পথ’! সেমিফাইনালে ওঠার আগেই দুই গ্রুপসেরা দল ছিটকে পড়া নিশ্চিত।
প্রশ্ন উঠছে—তাহলে গ্রুপে সেরা হওয়ার মানে কী?
নির্দিষ্ট দলকে নির্দিষ্ট ভেন্যু ও সময়ে খেলানোর নিশ্চয়তা দিতে গিয়েই আইসিসির এই প্রি–সিডিং ব্যবস্থা। মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক পরিকল্পনা—সম্প্রচার, দর্শকসংখ্যা, বাজার। কিন্তু সেই বাণিজ্যিক হিসাব কষতে গিয়ে প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা–সমালোচনা।
যেখানে প্রায় সব খেলার বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের কাঠামো থাকে সরল ও স্বচ্ছ, সেখানে আইসিসি ৫০ বছরের ইতিহাসে বারবার পথ বদলেছে—কখনো সুপার সিক্স, কখনো সুপার এইট, কখনো ক্যারি ফরোয়ার্ড, কখনো প্রি–সিডিং। যার ফল দাঁড়াচ্ছে গোলকধাঁধার মতো, যেখানে নিয়ম বোঝার চেয়ে বাণিজ্যিক যুক্তিই বড় হয়ে উঠেছে।