‘ওয়ানডে ক্রিকেট শুধু বিশ্বকাপেই খেলা উচিত, এর বাইরে নয়।’

কথাটা এমন একজন বলেছেন, যিনি ক্রিকেটের আইনকানুনের অভিভাবক সংস্থা মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) সবচেয়ে উঁচু পদে বসেছেন সম্প্রতি। ১ অক্টোবর দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন সম্ভবত নিজের প্রথম সাক্ষাৎকারেই এই মন্তব্য করেছেন এমসিসির নতুন সভাপতি মার্ক নিকোলাস।

আরও পড়ুন

কঠিন, তবে অসম্ভব নয়

এটা শুধু যে তাঁর মত, এমন নয়। এমসিসির ক্রিকেট কমিটিও এমনটাই মনে করে। ক্রিকেটের আইনকানুন পরিবর্তন ও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলাটির ভালো-মন্দ নিয়ে আইসিসিকে সুপারিশ করে এই ক্রিকেট কমিটি। ওয়ানডে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের সঙ্গে এমসিসির সভাপতির ভাবনার মিলটা টের পাওয়া যাবে ইএসপিএন-ক্রিকইনফোর সঙ্গে নিকোলাসের ওই সাক্ষাৎকারেই, ‘আমরা মনে করি, ওয়ানডে শুধু বিশ্বকাপেই খেলা উচিত। দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজগুলোর যৌক্তিকতা প্রমাণ করা এখন খুব কঠিন। অনেক দেশে এসব ওয়ানডে ম্যাচে গ্যালারিই ভরছে না। আর এই মুহূর্তে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রায় অতিপ্রাকৃত এক শক্তি হয়ে উঠেছে।’

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র তিন দিন আগে এমসিসি সভাপতির এই মন্তব্য ওয়ানডে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা শঙ্কাটাই আরও উসকে দিচ্ছে। শুধুমাত্র বিশ্বকাপ দিয়ে কি আসলে ওয়ানডে সংস্করণকে টিকিয়ে রাখা যাবে? আর ওয়ানডেই যদি না থাকে, একটা সময় গিয়ে তো ওয়ানডে বিশ্বকাপও শঙ্কার মুখে পড়তে পারে।

শচীন টেন্ডুলকার এর আগে ওয়ানডেকে ঢেলে সাজানোর কথা বলেছিলেন
ছবি: এএফপি

শঙ্কাটাও অবশ্য নতুন নয়। টি-টোয়েন্টির আবির্ভাবের কয়েক বছর পর থেকেই ওয়ানডে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল। এক যুগ আগেই  কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার বলে দিয়েছিলেন, ওয়ানডে ক্রিকেট দিন দিন একঘেয়ে হয়ে উঠছে। নতুন কিছু দিতে না পারলে এটা একসময় হারিয়ে যেতে পারে। টেন্ডুলকার তখন ওয়ানডে ক্রিকেটকেই টেস্টের মতো ২৫ ওভারের দুটি ইনিংসে ভাগ করার কথাও বলেছিলেন। দিন দিন সেই শঙ্কাটা আরও বেড়েছে, পাশাপাশি ওয়ানডেকে টিকিয়ে রাখার জন্য অভিনব অনেক প্রস্তাবও এসেছে। কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছেন, ৫০ ওভারের বদলে ওয়ানডে ক্রিকেট ৪০ ওভারের করে দেওয়ার। প্রয়াত সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার টনি গ্রেগ ২০১২ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ওয়ানডে ক্রিকেটের টিকে থাকা নির্ভর করছে পরের দুই-তিনটি বিশ্বকাপ কতটা সফল হয়, তার ওপর। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে ২০১৫ বিশ্বকাপ দারুণ জমজমাট হয়েছে, ইংল্যান্ডে ২০১৯ বিশ্বকাপ তো একেবারে ব্লকব্লাস্টার। কিন্তু দুশ্চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে, পরপর কয়েকটা জমজমাট ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরও ওয়ানডের টিকে থাকা নিয়ে শঙ্কা তো কমছেই না, বরং বেড়েছে।

আরও পড়ুন

কে চ্যাম্পিয়ন হবে, এটা কেন ৪৪ কোটি টাকার প্রশ্ন

কেন বেড়েছে, সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে গেলে বেন স্টোকসকে উদাহরণ হিসেবে টানা যায়। গত বছরের জুলাইয়ে হুট করে ওয়ানডে থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন স্টোকস। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ঠাসা সূচিতে শারীরিক ও মানসিক ধকল সামলাতে একটা সংস্করণ ছেড়ে দিতেই হতো তাঁকে। তিনি অনেক ভেবেচিন্তে ওয়ানডেই ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনেও যুক্তি আছে। যত যাই–হোক, এখনো ক্রিকেটারদের কাছে টেস্ট ক্রিকেট হচ্ছে সামর্থ্যের সর্বোচ্চ পরীক্ষা, নিজেকে যাচাই করার, মেলে ধরার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। টেস্ট এখনো ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত সংস্করণও। অন্যদিকে টি-টোয়েন্টি হচ্ছে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ এবং এখন ক্রিকেটারদের রুটিরুজির সবচেয়ে বড় উৎস। সেই তুলনায় ওয়ানডে এখন কিছুটা একঘেয়ে, কিছুটা ক্লান্তিকর এবং বেশ কিছুদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে। সুতরাং বেন স্টোকস যখন একটা সংস্করণ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি ওয়ানডেকেই বেছে নিয়েছিলেন।

অবসর ভেঙে ওয়ানডেতে ফিরেছেন বেন স্টোকস
ছবি: রয়টার্স

তবে সেই স্টোকস অবসর ভেঙে আবার ফিরেছেন ওয়ানডেতে এবং এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ওয়ানডে বিশ্বকাপ। চার বছর আগে লর্ডসের ফাইনালে অতিমানবীয় এক ইনিংস খেলে যিনি ইংল্যান্ডের প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁকে ছাড়া এবার ভারত যেতে চায়নি ইংল্যান্ড। স্টোকসও সাড়া দিয়েছেন ইংল্যান্ডের ডাকে।

আরও পড়ুন

ইংল্যান্ড ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন, মানতে পারছেন না বাটলার

তবে ঠাসা সূচিতে একই সঙ্গে তিন সংস্করণে খেলা চালিয়ে যাওয়া এখন স্টোকসের মতো অনেক ক্রিকেটারের জন্যই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ক্রিকেটারদের খেলায় রাখতে হলে সেই সূচি থেকে কিছু না কিছু কাটছাঁট করতেই হবে। কিন্তু সে কাটছাঁটটা হবে কোথায়? ২০১৯-২৩ পর্যন্ত আইসিসির যে ভবিষ্যৎ সফরসূচি ছিল, সেখানে সব দেশ মিলিয়ে টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা ছিল ১৫২টি। ২০২৩-২৭ পর্যন্ত আইসিসির ভবিষ্যৎ সফরসূচিতে টেস্টের সংখ্যা ১৭৩টি। যেটা আগের চার বছরের চেয়ে ২১টি বেশি। তার মানে আইসিসি বা টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো টেস্টের সূচি কাটছাঁটে খুব একটা আগ্রহী নয়।

অন্যদিকে সর্বশেষ পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক সূচিতে টি-টোয়েন্টির সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০১৪ জানুয়ারি থেকে ২০১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে সব মিলিয়ে খেলা হয়েছিল ৩৬৬টি টি-টোয়েন্টি। আর ২০১৯ জানুয়ারি থেকে এই বছর এখন পর্যন্ত খেলা হয়েছে ১ হাজার ৫৬০টি। এটা শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির পরিসংখ্যান। এর সঙ্গে আছে প্রায় সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগ, যা এখন ক্রিকেটারদের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। বাস্তবতা হচ্ছে, এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যেকোনো একটা সংস্করণে সক্রিয় থেকেই, কিংবা কোনো সংস্করণে না থেকেও শুধুমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগ খেলেই জীবিকা নির্বাহ করা যাচ্ছে। এমনি এমনি তো আর এমসিসি সভাপতি টি-টোয়েন্টিকে ‘অতিপ্রাকৃত এক শক্তি’ বলেননি।

টি–টোয়েন্টিতে গ্যালারি ফাঁকা থাকে না। এই সংস্করণই ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ
ছবি: রয়টার্স

সুতরাং বাস্তবতা যা দাঁড়িয়েছে, তা হলো টেস্ট এখনো সবচেয়ে মর্যাদার ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। এর মধ্যে স্টোকসের পুরো ঘটনাটায় যে বিষয়টা সামনে নিয়ে এসেছে, তা হলো ওয়ানডে এখন ক্রিকেটারদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে ওয়ানডে বিশ্বকাপ এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

বুড়োদের দল ইংল্যান্ড, তরুণতম আফগানিস্তান

কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝা কঠিন কিছু নয়। মর্যাদায় এখনো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঠিক ওয়ানডে বিশ্বকাপের কাছাকাছি যেতে পারেনি। যে কারণে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক বললে ক্লাইভ লয়েডের নাম যতটা চোখের সামনে ভাসে, ড্যারেন স্যামির নাম ততটা ভাসে না। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক বললে স্টিভ ওয়াহ, রিকি পন্টিংদের ছবি যেমন হুট করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, অ্যারন ফিঞ্চ ততটা আসেন না। শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে লাসিথ মালিঙ্গার আগে অর্জুনা রানাতুঙ্গার নামটাই মনে হয়।

এটা একটা কারণ, তবে প্রধান কারণ নয়। প্রধান কারণটা হচ্ছে, ওয়ানডে বিশ্বকাপ এখনো আইসিসির মূল আয়ের উৎস এবং বলা যায় পুরো ক্রিকেটেরই চালিকা শক্তি। আর ওয়ানডে বিশ্বকাপ থেকে আয়ের একটা বড় অংশই পায় আইসিসির সদস্য বোর্ডগুলো, যেটা আবার অনেক বোর্ডেরও আয়ের প্রধান উৎস।

আইসিসির মূল আয়ের উৎস এখনো ওয়ানডে বিশ্বকাপ
আইসিসি

এই সত্যটা আইসিসি জানে। জানেন এমসিসির হর্তাকর্তারা ও ক্রিকেট কমিটিও। এ কারণেই এ বছরের মাঝামাঝি সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক গ্যাটিংয়ের নেতৃত্বে এমসিসির ক্রিকেট কমিটি আইসিসিকে সুপারিশ করেছে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে ক্রিকেট কমিয়ে নিয়ে আসার, বলেছে দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজ বন্ধ করে দিতে। এমসিসি মনে করে, শুধু বিশ্বকাপের বছর কিছু ওয়ানডে হতে পারে, অন্য বছরগুলোতে নয়।

তার মানে, একটা সময় গিয়ে ওয়ানডে শুধু বিশ্বকাপেই থাকবে। ঘুরেফিরে তাই সেই শুরুর প্রশ্নটাই আসছে, যে সংস্করণটা বিশ্বকাপের বাইরে আর খেলা হবে না, সেই সংস্করণের বিশ্বকাপ আসলে কত দিন টিকবে?

দেখার অপেক্ষায় থাকতেই হচ্ছে।