বিরাট কোহলির ‘ফেক ফিল্ডিং’য়ের জরিমানা হিসেবে বাংলাদেশ ৫ রান পেতে পারত, সেটা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে আম্পায়ারদের ভুলে। বৃষ্টির পর তড়িঘড়ি ম্যাচ শুরু করা নিয়ে আপত্তি ছিল বাংলাদেশের। সেখানেও মেনে নিতে হয়েছে আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তই। তবে এসবের পরও তো ম্যাচটা বাংলাদেশের হাতেই ছিল। ১০ উইকেট হাতে রেখে ৯ ওভারে ৮৫ রান করতে না পারলে আর টি–টোয়েন্টি খেলা কেন! ভারতকে হারানোর এমন সুযোগ কি আর পাবে বাংলাদেশ? ম্যাচ শেষে সাকিবকে সেদিন এ নিয়েই বেশি হতাশ মনে হয়েছিল।

দুই ম্যাচেই টপ অর্ডার থেকে মোটামুটি ভালো শুরু পাওয়া গিয়েছিল এবং দুই ম্যাচেই সেই শুরুটা ধরে রাখতে পারেনি মিডল অর্ডার। এ নিয়ে যে দলের মধ্যেই অতৃপ্তি আছে, তা সাকিব–নাজমুলদের কথায়ই পরিষ্কার। গতকাল ম্যাচ শেষে নাজমুলের আক্ষেপ, ‘আমরা নিশ্চিত ছিলাম আউট (সাকিব) হয়নি। সিদ্ধান্ত আম্পায়ারের, এর ওপর কিছু বলার নেই। তবে আমার মনে হয়নি এতে আমাদের মনোযোগ নড়ে গেছে। মাঝের ওভারগুলোতে এবং শেষের দিকে আমরা ভালো খেলিনি।’

আগের ম্যাচেও বৃষ্টি বিরতির পর এই একই কারণে ওভার প্রতি ৯.৪৪ রান তাড়া করতে পারেনি বাংলাদেশ, যেটা অন্য যেকোনো দলই হয়তো করে ফেলত। বাংলাদেশ যে তা পারছে না, এর বড় কারণ হতে পারে আত্মবিশ্বাসের অভাব, সাহসের ঘাটতি।

ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এই বিশ্বাসটাই হয়তো আসছে না যে বড় শট খেলে এ রকম ‘ক্লোজ’ ম্যাচ তারা বের করে আনতে পারেন। আবার শুধু বড় শট খেললেই হবে না, রান তাড়া বা রান করা—দুই ক্ষেত্রেই পরিকল্পনাটা হতে হবে সঠিক হিসাব কষে। বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখে মাঝের ওভারগুলোতে এর কোনো ছাপ পাওয়া যায়নি।

মাঝের ওভারগুলোতে সাধারণত দায়িত্ব বেশি নেওয়ার কথা সাকিব আল হাসান, আফিফ হোসেন, মোসাদ্দেক হোসেন ও নুরুল হাসানের। সবারই বড় শট খেলার সামর্থ্য আছে এবং তারা সেটা আগেও দেখিয়েছেন। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে নুরুলের ১৪ বলে ২৫ রান ছাড়া এই দুই ম্যাচে টি–টোয়েন্টিসুলভ তেড়েফুঁড়ে ব্যাটিংয়ের চেষ্টাই দেখা যায়নি কারও মধ্যে।

পাকিস্তান ম্যাচের এক দিন আগে কারেন রোল্টন ওভালে অনেক ছক্কা মারার অনুশীলন করেছেন সাকিব। মোসাদ্দেককেও দেখা গেছে বড় শট খেলতে, উইকেটের সামনে–পেছনে শট বানিয়ে খেলার চেষ্টা করতে। কালকের ম্যাচে সাকিব তো প্রথম বলেই এলবিডব্লু, মোসাদ্দেককেও দেখা যায়নি অনুশীলনের ব্যাটিংয়ের মেজাজে। উল্টো অজানা জড়তায় ভুগেছেন তিনি। নিজেকে যেন আটকে রাখলেন খোলসে।

মোসাদ্দেক ব্যাটিংয়ে নামেন ১৪তম ওভারে, দলের রান তখন ৪ উইকেটে ৯১। মোসাদ্দেকের একটা ক্যামিও ইনিংসও পারত সেখান থেকে বাংলাদেশের রানটাকে দুম করে বাড়িয়ে দিতে। অথচ শাহিন শাহ আফ্রিদির ইয়র্কারে বোল্ড হওয়ার আগে ১১ বল খেলে তিনি করলেন মাত্র ৫ রান! আর নুরুল তো ৩ বল খেলে কোনো রান না করেই বিদায় নিয়েছেন।

আফিফের ২০ বলে অপরাজিত ২৪ রানের ইনিংসেও টি–টোয়েন্টিসুলভ বিদ্যুৎ–স্ফুলিঙ্গ ছিল না। অবশ্য এক ওভারেই মোসাদ্দেক, নুরুলের আউটের পর তিনি অনেকটা সঙ্গীহীনও হয়ে পড়েন।

ভারত, পাকিস্তানের কাছে পরপর দুই ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপ থেকেই বিদায় নিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। আজ সকালে একযোগে অ্যাডিলেড ছাড়বেন দলের বেশির ভাগ সদস্য। কেউ মেলবোর্ন থেকে, কেউবা সিঙ্গাপুর থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন ভিন্ন গন্তব্যে। সাকিব যেমন মেলবোর্ন থেকে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রে, টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট শ্রীধরন শ্রীরাম সিঙ্গাপুর থেকে যাবেন ভারতে।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পথে দল বরাবরই বলেছে, নিজেদের পারফরম্যান্সে তারা খুশি। সুপার টুয়েলভে দুই ম্যাচ জিতে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ তো এবারই সেরা অর্জন পেল। পরশু জুম সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য আরো কিছু কথাও বলেছিলেন শ্রীরাম। যার সারমর্ম, টি–টোয়েন্টি খেলাটা যখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে হয়, তখন আর সেটি শক্তির প্রদর্শনী থাকে না। কন্ডিশন, উইকেট, মাঠের আকৃতি—সবকিছুর প্রভাবে এটা এখানে অনেক বেশি হিসাব–নিকাশের খেলা।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে সেই হিসাব–নিকাশ যে ছিল না, তার কারণ হয়তো এই অঙ্ক বুঝে ওঠারই সময় পাননি ক্রিকেটাররা। বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত ওপেনিং জুটি ঠিক করতেই গলদঘর্ম হয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। অথচ অনেক এদিক–সেদিক করে বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত অনুমিত জুটিতেই আস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু সেটা করতে গিয়েই অস্থিতিশীল করে তোলা হয়েছে মিডল অর্ডার।

ওপেনিং জুটি নিয়ে নাড়াচাড়ার নেতিবাচক প্রভাব মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ওপরও পড়েছে। ব্যাটিং অর্ডারে ওঠা–নামার সঙ্গে বারবার ভূমিকাও তো বদলেছে আফিফ, মোসাদ্দেক, নুরুলদের।

বিশ্বকাপের দেড়–দুই মাস আগে যে দলের কোচ বদলে যান, সেই দলে অবশ্য এ রকম অস্থিতিশীলতা অস্বাভাবিক নয়। অপরিকল্পিত যাত্রার শুরু তো সেখান থেকেই! আর নেদারল্যান্ডস ও জিম্বাবুয়েকে হারানোর তৃপ্তিই যদি সব হবে, তাহলে বিশ্বকাপ খেলার দরকার কী?

এই দুই দলের বিপক্ষে একটার পর একটা দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজন করতে থাকুন, অথবা ত্রিদেশীয় সিরিজই করুন না। দেখবেন, টি–টোয়েন্টিতে কত ম্যাচ জেতা যায়!