সিডনিতেও জিতে অ্যাশেজে মধুর সমাপ্তি অস্ট্রেলিয়ার

ওয়াটারফোর্ড ক্রিস্টাল অ্যাশেজ ট্রফি হাতে অস্ট্রেলিয়া দল। আজ সিডনিতেএএফপি

নাহ, আজ পঞ্চম ও শেষ দিনে লড়াইটা করতে পারল না ইংল্যান্ড। ৭৫ ওভারে ৮ উইকেটে ৩০২ রান নিয়ে চতুর্থ দিন শেষ করা ইংল্যান্ডের ইনিংস আজ সকালের সেশনে টিকেছে মাত্র ১৩.২ ওভার। রান যোগ হয় মাত্র ৪০। তাতে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৪২ রানে অলআউট হওয়ায় জয়ের জন্য মাত্র ১৬০ রানের লক্ষ্য পায় অস্ট্রেলিয়া। ইংল্যান্ড আরও অন্তত ৫০ রান যোগ করতে পারলে ম্যাচটা কি আরেকটু বেশি রোমাঞ্চকর হয়ে উঠত?

প্রশ্নটি তোলার কারণ এ টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের ধরন। এই রান তাড়া করতে নেমেই হালকা কেঁপেছে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং। ১২১ রান তুলতেই পড়ে গিয়েছিল ৫ উইকেট। তবে অ্যালেক্স ক্যারি (১৬*) ও ক্যামেরন গ্রিন (২২*) মিলে আর বিপর্যয় বাড়তে দেননি। সিডনি টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটের জয় এনে দেওয়ায় দুজনে শেষ পর্যন্ত মাঠে ছিলেন। তাতে পাঁচ ম্যাচের এই অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্র্রেলিয়ার পাশে লেখা হলো ৪–১ ব্যবধানের জয়ের গৌরবতিলক।

আরও পড়ুন

অথচ কাল জ্যাকব বেথেল বিরুদ্ধ স্রোতে যেভাবে ব্যাট করেছেন, তাতে আজ শেষ দিনে লড়াইটা আরেকটু বেশি সময় স্থায়ী হওয়ার ভাবনাটা মাথায় ছিল টেস্ট ক্রিকেটপ্রেমীদের। ১৪২ রান নিয়ে আজ ব্যাট করতে নামা বেথেলকে সঙ্গ দেওয়ার সামর্থ্য ছিল পেসার ম্যাথু পটসের। কাউন্টি ক্রিকেটে তাঁর সেঞ্চুরিও আছে। কিন্তু দিনের খেলার ৯.২ ওভারে মিচেল স্টার্কের বলে ইংলিশ সমর্থকদের ভরসা জায়গা সেই বেথেলই আউট হন সবার আগে। উইকেটকিপার ক্যারিকে ক্যাচ দেন ২৬৫ বলে ১৫৪ রানে ধ্রুপদি ইনিংস খেলা বেথেল। এরপর শেষ উইকেট জুটিতে মাত্র ১৪ রান যোগ করতে পারেন পটস (১৮*) ও জশ টাং (৬)। স্টার্কই আউট করেন টাংকে।

সিডনি টেস্টে স্মরণীয় এক ইনিংস খেলে আউট হয়ে ফেরার পথে বেথেল
এএফপি

অনেকে ভেবেছিলেন, রান তাড়ায় অস্ট্রেলিয়ার হয়ে উসমান খাজা ওপেন করতে পারেন। এই টেস্ট খেলেই যেহেতু খাজা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়বেন, সে কারণে ফিরিয়ে আনা হতে পারে তাঁকে পুরোনো পজিশনে। অস্ট্রেলিয়া তা করেনি। এবারের সিরিজে ধারা বজায় রেখে ট্রাভিস হেড ও জেক ওয়েদারাল্ড ওপেন করেন এবং ভালো শুরুও এনে দেন তাঁরা। ১০.৩ ওভারে টাংয়ের বলে হেড (২৯) আউট হওয়ার আগে দুজনের ওপেনিং জুটিতে উঠেছে ৬২ রান। দলের স্কোরবোর্ডে ১০০ রান ওঠার আগে ফিরে যান ওয়েদারাল্ড (৩৪) এবং অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথও (১২)। ওয়েদারাল্ডের উইকেটটি নেন টাং ও স্মিথকে দারুণ বাঁক খাওয়ানো স্পিনে বোল্ড করেন উইল জ্যাকস। লাঞ্চের আগে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ছিল ১৪.৪ ওভারে ২ উইকেটে ৭১।

পাঁচে নামা খাজাও ৬ রান করে টাংয়ের বলে বোল্ড হওয়ার পর আবেগ নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা দিতে হয় সিডনির দর্শকদের। খাজা ড্রেসিংরুমে ফেরার সময় তুমুল করতালিতে ফেটে পড়ে সিডনির গ্যালারি। মাঠের মাঝে থাকতেই সবুজ ঘাসে একবার সিজদা করেন খাজা। উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান দেখান দর্শক। এর আগে ব্যাটিংয়ে নামার সময় তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়েছে ইংল্যান্ড দল।

খাজা আউট হওয়ার (২২.১) পরের ওভারেই (২৩.১) অস্ট্রেলিয়াকে ধাক্কা দেন মারনাস লাবুশেন। স্লিপে ‘জীবন’ পেয়ে কোথায় শেষ পর্যন্ত থেকে অস্ট্রেলিয়াকে জেতাবেন, তা না লাবুশেন (৩৭) রানআউট হন! এরপর অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার বিপদ আর বাড়তে দেননি ক্যারি ও গ্রিন। ষষ্ঠ উইকেটে ৪০ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে ৩১.১ ওভারে অস্ট্রেলিয়াকে জয় এনে দেন দুজন। চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিং করেননি ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস।

শেষবারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মাঠ ছাড়ার আগে সিজদা করেন উসমান খাজা
এএফপি

সিডনিতে আজ দর্শক হয়েছিল ২৬ হাজারের কাছাকাছি (২৫,৮৪৭)। এবারের অ্যাশেজে মোট দর্শকসংখ্যা ৮ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮০। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত টেস্ট সিরিজে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ দর্শকের নজির। তাদের সামনে অ্যাশেজের এই শেষ টেস্টে দিয়ে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করতে পেরে খুশি খাজা। যদিও মনে মনে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর ব্যাট থেকেই আসবে জয়সূচক রান। কিন্তু সেটা করতে না পারলেও নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে সন্তুষ্ট খাজা।

ম্যাচ শেষে ফক্স স্পোর্টসকে খাজা বলেন, ‘(ক্যারিয়ার) আমার কাছে অনেক কিছু। এটার সঙ্গে অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। আমি শুধু জয়টা চেয়েছি, জয়সূচক রান করার ইচ্ছাও ছিল। টেস্টজুড়েই আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন ছিল আমার জন্য। মাঠে মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হয়েছে। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে আমি কৃতজ্ঞ।’

আরও পড়ুন

সিডনি টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ১৬৩ রানের ইনিংস খেলা ট্রাভিস হেড হন ম্যাচসেরা। অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি ও সাবেক অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহর কাছ থেকে ম্যাচসেরার পদক নেন তিনি। ৩১ উইকেট নেওয়া অস্ট্রেলিয়ান পেসার মিচেল স্টার্ক সিরিজসেরা। ২০১৩–১৪ অ্যাশেজে মিচেল জনসনের পর এই সিরিজে স্টার্কই প্রথম বোলার হিসেবে অন্তত ৩০ উইকেট নিলেন।

ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে বলেন, ‘এমন একটি দারুণ ম্যাচের অংশ হতে পেরে ভালো লাগছে। আমাদের আরও ১০০ রান করা উচিত ছিল, আর প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে আমরা ১০০ রান বেশি করতে দিয়েছি। অস্ট্রেলিয়া অসাধারণ একটি দল। তাদের কয়েকজন খেলোয়াড় ঠিক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের পূর্ণ কৃতিত্ব প্রাপ্য।’

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ইংল্যান্ড: ৩৮৪ ও ৩৪২ (বেথেল ১৫৪, ব্রুক ৪২, ডাকেট ৪২, পটস ১৮*; ওয়েবস্টার ৩/৬৪, স্টার্ক ৩/৭২, বোল্যান্ড ২/৪৬)।

অস্ট্রেলিয়া: ৫৬৭ ও ১৬১/৫ (লাবুশেন ৩৭, ওয়েদারাল্ড ৩৪, হেড ২৯, গ্রিন ২২*, ক্যারি ১৬*)।

ফল: অস্ট্রেলিয়া ৫ উইকেটে জয়ী।

ম্যাচসেরা: ট্রাভিস হেড (অস্ট্রেলিয়া)

সিরিজসেরা: মিচেল স্টার্ক (অস্ট্রেলিয়া)

সিরিজ: অস্ট্রেলিয়া ৪–১ ব্যবধানে জয়ী।