সেতুর এমাথা থেকে ওমাথা হয়ে স্টেডিয়ামের গেট পর্যন্ত মানুষের যে বহমান স্রোত, তাতে ঢেউ হয়ে উড়ছে ভারতের পতাকা। আকাশি-গেরুয়া জার্সি গায়ে দর্শকদের মুখেও তেরঙ্গার উপস্থিতি। এ স্রোতে দু-একটা লাল-সাদা পতাকা যে ওড়েনি, তা নয়। তবে সেগুলো যাদের হাতে ছিল, মাঠমুখী ইংল্যান্ডের সেই হাতেগোনা দর্শকেরাও বিস্ময় নিয়ে মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দী করছিলেন ভারতীয় জনস্রোত।

ইংল্যান্ড অধিনায়ক জস বাটলার আগের দিন বলেছিলেন, অ্যাডিলেড ওভালের সেমিফাইনালে সমর্থনের জোয়ারে ভাসবে ভারতীয় দল। বাটলারের কথা সত্যি প্রমাণ করে প্রায় ৫৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটিও হয়ে উঠেছিল ইডেন কিংবা ওয়াংখেড়ে। সেমিফাইনাল দেখতে আসা ৪০ হাজার ৯৪ দর্শকের বেশির ভাগই ভারতীয় সমর্থক। ব্যাট হাতে হার্দিক পান্ডিয়ার ঝড়ে একটু পরপর উত্তাল হয়ে উঠছিল গ্যালারি।

অ্যাডিলেড ওভালে আজকের আগপর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে টসে জিতে কোনো দল ম্যাচ জিততে পারেনি। ব্যতিক্রম হলো সেটিরও।

পাওয়ার প্লেতে মাত্র ৩৮, ১০ ওভার শেষে ২ উইকেটে ৬২ রান। ভারত সেদিকেই যাচ্ছিল। দ্বিতীয় ওভারে লোকেশ রাহুলের বিদায়ের পর রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি মিলেও যখন স্কোরবোর্ডের আড়ষ্টতা ভাঙতে পারছিলেন না, মনে হচ্ছিল এই উইকেটে ব্যাটিং করাটা বুঝি অনেক কঠিন। সেমিফাইনালের আগেই সেমিফাইনালের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হওয়া সূর্যকুমার যাদবও এক ছক্কা আর এক চার মেরেই সম্ভাব্য ঝড়ের সমাপ্তি ঘোষণা করে ফিরে গেলেন।

মাঝের ওভারগুলোতেও ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের হাতে শৃঙ্খল পরিয়ে রেখেছিলেন ইংল্যান্ডের বোলাররা। পাওয়ার প্লেতে ৩৮ রানের পর ৭ থেকে ১৬ ওভারে রান এসেছে মাত্র ৭২। তাহলে ভারতকে বাঁচাবে কে? এই যে অ্যাডিলেড ওভালকে আজ ইডেন বানানোর আয়োজন, তাতে পূর্ণতার রং চড়াবে কে? আরেকটি ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল কি তবে দেখবে না টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ?

স্বপ্নভঙ্গ না হওয়ার স্বপ্ন দেখালেন বিরাট কোহলি আর পান্ডিয়া। কোহলি তো আগে থেকেই ফর্মে, আজ করলেন এই বিশ্বকাপে নিজের চতুর্থ ফিফটি। সঙ্গে টুর্নামেন্টে ব্যাট হাতে প্রথমবারের মতো জ্বলে উঠলেন অলরাউন্ডার পান্ডিয়া। ভারতের ইনিংসের শেষ বলে হিট আউট হওয়ার আগে করেছেন ৩৩ বলে ৬৩। পাঁচ ছক্কা আর চার বাউন্ডারিতে যার ৪৬-ই এসেছে বল মাঠছাড়া করে। এতে ১৫ ওভার শেষে করা ভারতের ১০০ রানের সঙ্গে শেষ ৫ ওভারে যোগ হলো ৬৮। ক্রিস জর্ডানের ১৯তম ওভারেই ২০ রান।

উত্তাল অ্যাডিলেড ওভাল যেন তখন সত্যিকার অর্থেই ইডেন হওয়ার পথে। কিন্তু কে জানত, একটু পরই থেমে যাবে এই উম্মাদনা, ইডেন নয় ভেতরে ভেতরে অ্যাডিলেড ওভাল আসলে প্রস্তুত হয়ে আছে লর্ডস হতে!

জস বাটলার আগের দিনে বলেছিলেন, এই বিশ্বকাপে তারা ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল হতে দেবেন না। অ্যালেক্স হেলসকে নিয়ে ওপেনিংয়ে ইংল্যান্ড অধিনায়ক যেন সেই প্রতিজ্ঞা নিয়েই নামলেন। পাওয়ার প্লেতে ৬৩, ১০ ওভার শেষে ৯৮, ১৫ ওভার পর ১৫৬, ১৬তম ওভারের শেষ বলে মোহাম্মদ শামিকে লং অনের ওপর দিয়ে মারা ছক্কায় তো ম্যাচই শেষ করে দিলেন বাটলার! তার আগে ইংল্যান্ড অধিনায়ক একবার ক্যাচ তুললেও ভারতীয় ফিল্ডাররা যেন তখন এসব ধরার মানসিকতায়ই নেই। মিডঅফে সূর্যকুমার বল হাতে নিয়েও রাখতে পারেননি। উল্টো হয়ে যায় ৪ রান।

তার আগে একটার পর একটা হার্ডল ইংল্যান্ড পেরিয়ে গেছে নীরবে, যেন মাঠে তখন কিছুই হচ্ছে না। কেন এমন, কেন এমন নীরবতা? বাটলার-হেলস কি চার ছক্কা মারেননি? মেরেছেন। বাটলারের ৪৯ বলে অপরাজিত ৮০ রানে ৯ বাউন্ডারির সঙ্গে ৩ ছক্কা। হেলসের ৪৭ বলে অপরাজিত ৮৬ রানে চার বাউন্ডারির সঙ্গে ৭ ছক্কা। প্রতিটি চার-ছক্কাতেই অ্যাডিলেড ওভালে হাততালি পড়েছে। কিন্তু তাতে ‘জিতে গা ভাই জিতে গা...’–জাতীয় শোরমাচানো ছিল না। ঠিক যেন লর্ডস কিংবা ওল্ড ট্রাফোর্ডের মতো। সৌম্য, সুশৃঙ্খল হাততালিতে ইংলিশ–সমর্থকেরা অনুপ্রাণিত করে গেছেন বাটলার-হেলসকে। তবে সেই মৃদু হাততালিই হয়তো তিরের মতো বিঁধছিল ভারতীয়দের বুকে।

১০ উইকেটের জয়ের পথে বাটলার-হেলস মিলে গড়লেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের রেকর্ড জুটি। ভারত-পাকিস্তান ফাইনালের আলোচনা নিভিয়ে দিয়ে বাটলারের ইংল্যান্ড জানিয়ে দিল, ক্রিকেটটা শুধু দর্শকসমর্থনেরই খেলা নয়, খেলাটা মাঠেও খেলতে হয়। সে মাঠ ইডেন হোক, লর্ডস হোক কিংবা অ্যাডিলেড ওভাল। খেলা যার, মাঠ তার।