আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি—মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে শশী থারুরের প্রশ্ন

মোস্তাফিজুর রহমান ও শশী থারুরপ্রথম আলো গ্রাফিকস

বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) কড়া সমালোচনা করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার সদস্য শশী থারুর। ভারতীয় এই রাজনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিক এই প্রশ্নও তুলেছেন, ‘আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি—একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তার ধর্মকে।’

মোস্তাফিজ আদৌ এবারের আইপিএলে খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গত কিছুদিন নানা রকম খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা হচ্ছে দাবি করে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু অংশ, ধর্মীয় কিছু সংগঠন ও ধর্মীয় গুরুদের কয়েকজন মোস্তাফিজকে কলকাতা দলে নেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন কড়া ভাষায়। কিছু সংগঠন ও নেতাদের কেউ কেউ মোস্তাফিজকে কলকাতা দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন।

মোস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নেওয়ায় কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক শাহরুখ খানকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা সঙ্গীত সোম। ‘অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইজেশন’-এর প্রধান ইমাম উমর আহমেদ ইলিয়াসি মোস্তাফিজকে কেনার জন্য শাহরুখ খানের সমালোচনা করেন। শাহরুখকে ক্ষমা চাইতেও বলেন তিনি। শিবসেনার নেতা সঞ্জয় নিরুপমও নাইটদের স্কোয়াড থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলেন।

এই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) মোস্তাফিজকে কেকেআর দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে কলকাতা নাইট রাইডার্সও আজ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এমন কিছু যে ঘটতে পারে, সেটা সম্ভবত আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন শশী থারুর। এ কারণে তিরুভনন্তপুরমে গতকাল সাংবাদিকদের শশী থারুর বলেছিলেন, ‘আমি সত্যিই মনে করি না যে ক্রিকেটকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ভার বহন করতে দেওয়া উচিত। আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট—আমাদের উচিত কিছু ক্ষেত্রকে অন্য ক্ষেত্র থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করা।’

আরও পড়ুন

থারুর আরও বলেন, ‘মোস্তাফিজুর রহমান একজন ক্রিকেটার, যার এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই নেই। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণাসূচক কথা, হামলা বা এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন কিংবা ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য কখনো অভিযুক্ত হননি। তিনি একজন ক্রীড়াবিদ আর এ দুটি বিষয়কে মিশিয়ে ফেলাটা অনুচিত।’

থারুর ভবিষ্যতের কথাও ভেবেছেন। তাঁর মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে খেলাধুলায় বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাদা করে ফেলাটা ভারতের জন্য কখনোই গঠনমূলক ফল বয়ে আনবে না। আইপিএলেই যেমন প্রথম আসরের পর রাজনৈতিক কারণে আর কোনো পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে দেখা যায়নি। থারুর বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তান—কোনো দেশেরই নাম উচ্চারণ না করেই বিষয়টি সামনে টেনে নিজেদের হৃদয়টা বড় করার পরামর্শ দিয়েছেন, ‘যদি ভারত এমন দেশ হয়ে যায় যে তার সব প্রতিবেশী দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং বলে যে কারও সঙ্গেই তাদের খেলা উচিত নয়, তাতে কোনো উপকার হবে না। এ বিষয়ে আমাদের বড় মন ও হৃদয় থাকতে হবে।’

আজ বিসিসিআই মোস্তাফিজকে কলকাতার স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর থারুর তাঁর বলা এসব কথার একটি ভিডিও শেয়ার করেন নিজের এক্স হ্যান্ডলে। সেখানে ক্যাপশনে তিনি একটি প্রশ্ন তোলেন, ‘এ বিষয়ে আমার মতামত আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি—বিশেষ করে এখন, যখন বিসিসিআই নিন্দনীয়ভাবে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি খেলোয়াড়টি যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলে কী হতো? এখানে আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি—একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তাঁর ধর্মকে? খেলাধুলাকে এভাবে নির্বিচার রাজনৈতিক রঙে রাঙানো আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে?’

আরও পড়ুন