মৃত‍্যুর খাঁচায়’ ডুবে কুমিরের মুখে পড়ার রোমাঞ্চ

ডারউইনকে বলা হয় অস্ট্রেলিয়ার কুমিরের রাজধানী। সেই ‘রাজধানী’র অন্যতম আকর্ষণ ক্রোকোসোরাস কোভে দেখা মেলে জীবন্ত কুমিরেরপ্রথম আলো

—ডারউইনের কয়েকটি জায়গায় আপনি জীবন্ত কুমির দেখতে পাবেন। তার মধ্যে দ্য বিগ ক্রোক ফিল্ড, ক্রোকোসোরাস কোভের কেইজ অব ডেথ—এই দুটি জায়গা বেশি বিখ্যাত।
—কিন্তু আমি তো শুনেছি, এখানে সব জায়গায়ই কুমির! ওরা লোকালয়েও আছে নাকি!
—বছর তিনেক আগে শহরের রাস্তায় নাকি কুমির দেখা গেছে। তবে ওটা মিথ, কোনো প্রমাণ নেই।

কথোপকথনটা ডারউইন টেস্টের একদিন মাঠ থেকে হোটেলে ফেরার পথে ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে। ডারউইন কুমিরের জন্য বিখ্যাত, সেটি আগে থেকেই জানা। নর্দার্ন টেরিটরির রাজধানী শহরের পরিচিতিই তো ‘অস্ট্রেলিয়ার কুমিরের রাজধানী’ হিসেবে। কিন্তু এখানে এসে শুরুর দিকে লোকজনের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, এই শহরে বুঝি কুমির পদে পদে!

আসলে তা নয়। তবে হ্যাঁ, ডারউইনে নোনাপানি ও মিঠাপানি দুই ধরনের কুমিরই আছে। এখানকার কুমির বিখ্যাত সে কারণেই। একেবারে প্রাকৃতিক পরিবেশে সেগুলো দেখতে হলে আপনাকে শহর থেকে একটু দূরে যেতে হবে। টেস্ট ম্যাচ কাভার করতে এসে, তার ওপর টেস্টটা বাংলাদেশ জিতে যাওয়ায় খেলা থেকে মনোযোগ সরিয়ে পুরোপুরি কুমিরের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। যেটুকু কুমির দর্শন হয়েছে, সেটা শহরের মধ্যেই।

ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ডারউইন শহরে অন্তত তিনটি জায়গায় নিরাপদ পরিবেশেই পর্যটকদের জন্য জীবন্ত কুমির দেখার ব্যবস্থা আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বলে খ্যাতি মিচেল স্ট্রিটের ক্রোকোসোরাস কোভের, যেখানে আছে ‘কেইজ অব ডেথ’ নামে ১৫ মিনিটের ভয়ংকর এক অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগও।

মৃত্যুর খাঁচা স্বচ্ছ পুরো কাচের তৈরি। পর্যটকেরা চাইলে এই খাঁচায় ঢুকে পানির নিচে নেমে সরাসরি কুমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ সেরে আসতে পারেন। খাঁচার ভেতর থেকেই আপনি দেখবেন, বিশাল এক কুমির কীভাবে লোভী চোখে আপনার দিকে তাকাচ্ছে, আপনার আশপাশে ঘুরঘুর করছে, ইচ্ছা হলে হাতের থাবায় খাঁচার মধ্যে দু-একবার সে নখের দাগ ফেলবে অথবা দাঁত বের করে কামড়ও দিতে চেষ্টা করবে।

ক্রোকোসোরাস কোভের বিখ্যাত কেইজ অব ডেথে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার নাথান ব্র্যাকেন। ছবিটি ২০০৮ সালের
এএফপি

মূলত ওয়েন্ডেল, লিও আর উইলিয়াম অ্যান্ড কেট নামে কুমিরগুলোই পালা করে মৃত্যুর খাঁচায় নামা পর্যটকদের সামনে আসে। এগুলোর মধ্যে ওয়েন্ডেলই নাকি সবচেয়ে বড়, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ ফুট।

‘মৃত্যুর খাঁচায়’ ঢুকে কুমিরের হাত থেকে বেঁচে আপনি নিশ্চিত ফিরবেন। তবে এত কাছ থেকে, এত জীবন্ত পরিবেশে কুমির দেখার পরও যদি আপনার আরও কুমির দেখার ইচ্ছা থাকে, কোকোসোরাস কোভে সেই ব্যবস্থাও আছে। শুধু কুমির কেন, পর্যটকদের জন্য আরও অনেক সরীসৃপজাতীয় প্রাণীই রাখা আছে এখানে, আছে কুমিরের ছোট ছোট বাচ্চা। সব মিলিয়ে এক কোকোসোরাস কোভেই নাকি আছে ২০০টি মিঠা ও নোনাপানির কুমির!

আরও পড়ুন

একটা শহরের এক জায়গাতেই ২০০ কুমির আছে, ভাবলেই কেমন গা শিউরে ওঠে। তবে আশার কথা, এসব কুমির আপনার কোনো ক্ষতি করার মতো অবস্থায় নেই। কোকোসোরাস কোভ ছাড়াও শহরে এ রকম জীবন্ত কুমির দেখার ব্যবস্থা আরও আছে। যদিও শহরের পদে পদে কুমিরের ভয়, সেই ভুল ধারণা ভেঙে গেছে গত ছয় দিন এখানে থেকে।

অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ শহরের মতোই ডারউইনও সমুদ্রের পাশে। শহরের সামনেই বিস্তৃত জলরাশি, দূরে দিগন্ত, সৈকতে নরম বালু, সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার অপূর্ব দৃশ্য। এমন শহরে সমুদ্র তো মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গীই হওয়ার কথা। বিকেলে কাজ শেষে সমুদ্রের পানিতে নেমে পড়া, ছুটির দিনে সাঁতার কাটা—এটাই স্বাভাবিক।

ক্রোকোসোরাস কোভ ছাড়াও ডারউইনে আরও অনেক জায়গায় কুমির দেখার ব্যবস্থা আছে
প্রথম আলো

কিন্তু কুমিরের কারণেই এ শহরের সমুদ্রের গল্পটা অন্য রকম। এখানে সমুদ্র আছে, কিন্তু সমুদ্রের পানিতে নামার আগে মানুষকে দুবার ভাবতে হয়। ডারউইনে সমুদ্র যে শুধু মানুষের নয়! সল্ট ওয়াটার ক্রোকোডাইলেরও নিরাপদ আবাস। নর্দার্ন টেরিটরি সরকারের স্পষ্ট সতর্কবার্তা—টপ এন্ডের বিচে সাঁতার কাটা নিষেধ। আর লবণাক্ত পানির কুমির মিঠাপানি ও নোনাপানি—দুই জায়গাতেই থাকতে পারে। কাজেই এখানে জলাশয়মাত্রই সাবধান।

সমুদ্রের কাছে গেলে ‘কুমির হতে সাবধান’–জাতীয় সতর্কবার্তাও চোখে পড়বে। পানির কিনারা থেকে আপনাকে অন্তত ৫ মিটার দূরে থাকতে হবে, মাছ ধরার সময় হাত-পা নৌকার ভেতরে রাখতে হবে এবং কখনোই পানিতে নেমে আটকে যাওয়া ফিশিং গিয়ার তোলা যাবে না। কুমির এমন এক শিকারি, যে পানিতে প্রায় অদৃশ্য হয়ে থাকতে পারে এবং মানুষ বুঝে ওঠার আগেই আক্রমণ করে বসে।

আরও পড়ুন

নৌকায় বসেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। ছোট নৌকায় ঝুঁকি বেশি। এসব কুমির নৌকায় থাকা মানুষকেও আক্রমণ করতে পারে। মাছ ধরার পর পানির ধারে মাছ পরিষ্কার করাও বিপজ্জনক—মাছের গন্ধ নাকি কুমিরকে কাছে টানে।

অবশ্য ডারউইনের সমুদ্রে বিপদ শুধু কুমিরের কারণে নয়। আছে বক্স জেলিফিশও, যেগুলোর কামড়ে মুহূর্তে প্রাণ হারানোর ভয় থাকে।

ডারউইনের এক কুমিরের পার্কের ছবি এটি
এএফপি

তবে এমন নয় যে কুমির আর জেলিফিশের ভয়ে ডারউইনের মানুষ সমুদ্রকে এড়িয়ে চলে। বরং নিয়মের মধ্যে থেকেই তারা সাগরের রোমাঞ্চ খোঁজে। মাছ ধরা এখানে বেশ জনপ্রিয়। নৌকায় ডারউইন হারবার ঘোরা যায়, কায়াকিংও হয়। সূর্যাস্ত দেখার জন্য মানুষ সৈকতে যায়। সমুদ্র এখানকার জীবনের বাইরে নয়; জীবনেরই অংশ। শুধু এর সঙ্গে সম্পর্কটাতে সতর্কতা। আপনাকে বুঝতে হবে সমুদ্র কখন আপনার, কখন কুমিরের।

ডারউইনের কুমিরের একটা সাংস্কৃতিক গুরুত্বও আছে এখানকার অ্যাবোরোজিনাল বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে। ১৯৭১ সালে তাই কুমির শিকার নিষিদ্ধ করে সরকার। এতে নর্দার্ন টেরিটরিতে কুমিরের সংখ্যা আবার আগের মাত্রায় ফিরে এসেছে। এখন তারা টপ এন্ডের জলাভূমি ও নদী-সমুদ্রে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরও পড়ুন

ডারউইনে কুমির আছে কি নেই, সেটা আসলে কোনো প্রশ্নই নয়। মানুষ ও কুমির কীভাবে এখানে একই ভূগোল ভাগ করে টিকে আছে, প্রশ্নটা সেখানে। এখানে মানুষ সমুদ্রের কাছে যায়, কিন্তু কুমিরের স্বাভাবিক জীবনে বিরক্তি না এনে। দূর থেকে ডারউইন হারবারের দিকে তাকালে অবশ্য এই সবকিছুই বোঝার উপায় নেই। সমুদ্র এখানেও নীল, বাতাসে নোনা গন্ধ, আকাশে সূর্যের আলো। তা পানির নিচে যা–ই থাকুক না কেন! সেখানে কেউ হয়তো নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে।

ডারউইনের মানুষ তাই সমুদ্রকে জয় করার চেষ্টা করেনি। তারা শিখেছে—সমুদ্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে কীভাবে টিকে থাকতে হয়।

আরও পড়ুন