এই তো নাহিদ রানা, কেমন সেই নাহিদ রানা?
এই তো নাহিদ রানা!
কেমন? প্রশ্নের উত্তরটা শুরু করা যাক এক ম্যাচ পেছনে ফিরে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ১০ ওভারে খরচ করলেন ৬৫ রান। ওভারপ্রতি ছয়েরও বেশি। কিউইরা করেছে ২৪৭ রান, এই বিবেচনায় নিশ্চিতভাবেই খুব খরুচে।
অথচ দুই দিন বিরতির পর দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই বদলে গেল সবকিছু। নাহিদ ৫ উইকেট পেলেন, কৃপণ থাকলেন রান খরচেও। সংখ্যাতেই এর প্রমাণ আছে। তবে সংখ্যা কি আর সব বলে! নাহিদ রানা আজ যা করলেন, শুধুই সংখ্যা তা পুরোটা বোঝাতে পারছে না।
কী করেছেন? এক কথায় উত্তর দিলে ‘পেস’ বলাটাই যথেষ্ট হয়তো। তিনি যে ৫টা উইকেট নিলেন, শুধু সেগুলোর গতির হিসাবটাই দেখুন— ১৪৪.৭, ১৪৬.৮, ১৪৬.১, ১৪৪.১ আর ১৪১.৬। উইকেট নেওয়া বলগুলোর কোনোটারই গতি ঘণ্টায় ১৪১ কিলোমিটারের কম নয়।
বলের গতির হিসাব রাখার চল খুব বেশিদিনের নয়। যখন থেকে রাখা হয়, তা–ও ম্যাচ ধরে ধরে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবু বাংলাদেশের কোনো বোলার তাঁর ৫ উইকেটের সবগুলোই ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে করা বলে পেয়েছেন, এমন ঘটনা যে খুব বেশি নেই— তা বলে দেওয়া যায় দ্বিধাহীনভাবেই।
শুধু কি গতি? তা–ও নয়।
নাহিদের প্রথম দুটি উইকেটের কথাই ধরুন। ফুল লেন্থে করা তাঁর বলটা চমকেই দিয়েছিল ব্যাটসম্যান হেনরি নিকোলসকে, বলের গতিও হয়তো একটা কারণ। যতক্ষণে তিনি সেই ঘোর থেকে বেরিয়েছেন, ততক্ষণে তাঁর প্যাডে লেগেছে বল। এলবিডব্লিউয়ের আবেদনে এরপর সাড়া দিয়ে ফেলেছেন আম্পায়ারও। সেটিই ইনিংসে নাহিদের প্রথম বল!
নাহিদ দ্বিতীয় ওভারটা করতে এলেন। প্রথম বলটা করলেন বাউন্সার। প্রায় দেড় শ কিলোমিটার ছোঁয়া সেই বাউন্সারটাও চমকে দেয় উইল ইয়াংকে। ব্যাকফুটে গিয়ে তিনি যে ডিফেন্সটা করলেন, তা ক্যাচ হিসেবে গেছে পয়েন্টে দাঁড়ানো ফিল্ডারের হাতে।
পরের দুটি উইকেটও এসেছে বাউন্সারে— মোহাম্মদ আব্বাস বলে পুল করতে গেছেন, অনেকটা দৌড়ে দুর্দান্ত এক ক্যাচ নেন লিটন দাস। একই চেষ্টায় স্কয়ার লেগ ফিল্ডারের হাতে ক্যাচ দেন ডিন ফক্সক্রফটও।
শুধু কি গতি আর বাউন্সই? আসলে তা–ও নয়।
নাহিদ রানার নেওয়া উইকেটগুলোর সময়গুলো একটু খেয়াল করে দেখুন। প্রথম বোলিংয়ে আসেন ইনিংসের অষ্টম ওভারে। আগের ৭ ওভারে শরীফুল ইসলাম আর তাসকিন আহমেদ মিলে চাপ তৈরি করেছেন, কখনো কখনো ব্যাটসম্যানকে নাচিয়েছেনও। কিন্তু উইকেটের দেখা পাননি।
উইকেট না পাওয়া মানে চাপে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা। নাহিদ পাওয়ার প্লেতেই পরপর দুই ওভারের প্রথম বলে উইকেট এনে দেন দলকে। ৫ ওভারের প্রথম স্পেলে ১০ রান দিয়ে ২ উইকেট।
মাঝের সময়ে সৌম্য সরকার একটা উইকেট নিয়েছিলেন বটে, তবু চাপটা সেভাবে সরাতে পারেনি বাংলাদেশ। নিক কেলির সঙ্গে আব্বাসের ৫৬ বলে ৬৬ রানের জুটিতে বরঞ্চ স্বচ্ছন্দেই এগোচ্ছিল নিউজিল্যান্ড।
তাহলে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আবার বোলিংয়ে এলেন নাহিদ রানা। ইনিংসের তখন ২৮তম ওভার। এবার তাঁর লাগল তিন বল— আব্বাসকে ফিরিয়ে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় জুটিটা ভাঙলেন। ৩ ওভারের স্পেলে ১০ রান দিয়ে এই একটিই উইকেট।
ততক্ষণে নিউজিল্যান্ডই চাপে। কিন্তু তবু্ বাংলাদেশের ভয় তো পুরোপুরি কাটেনি। কিউইদের দুই শর আগে থামানো গেলে রান তাড়াটা সহজ হওয়ার কথা তাদের জন্য। নাহিদ রানা আজ করে দিয়েছেন সেই কাজটাও— শেষ দুই ওভারে ডিন ফক্সক্রফট আর জেডন লেনেক্সকে ফিরিয়েছেন ড্রেসিংরুমে। নিউজিল্যান্ড থেমেছে ১৯৮ রানে।
নাহিদ রানা আসলে কেমন?
শুরুর সেই প্রশ্নের উত্তরটা সম্ভবত এতক্ষণে মিলে যাওয়ার কথা। একদিন তিনি খরুচে থাকবেন, তা হয়তো গতির কারণেই। কিন্তু তাঁর সেই গতিই আরেক দিন বদলে দেবে ম্যাচের রং। নাহিদের বলের সেই গতি সেদিন প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলতে, ভয় ধরাতে কিংবা আরেকটু বাড়িয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে যথেষ্ট হবে। পরপর দুই সিরিজেই সেই প্রমাণ রেখেছেন নাহিদ। গত মার্চে এই মিরপুরেই পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ২৪ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন। মাঝখানের তিন ম্যাচে ৪ উইকেট নিলেও রান দিয়েছেন অনেক (৫৯, ৬২ ও ৬৫)। আজ ওয়ানডে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় ৫ উইকেটে ফিরলেন ভয়ঙ্কর সুন্দরের রূপে।