হলান্ডকে নিয়ে ব্রাজিলের কোনো হোমওয়ার্ক ছিল না

বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের মতো দলের বিদায় সব সময়ই বেদনাদায়ক। কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে তাদের হারটি ছিল পুরোপুরি প্রাপ্য। নরওয়ে যে যোগ্যতর দল হিসেবে জিতেছে, তা তাদের পরিকল্পনা এবং মাঠের শরীরী ভাষাতেই স্পষ্ট ছিল। আমার বিশ্লেষণে ব্রাজিলের এই হারের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ এবং নরওয়ের কিছু কার্যকর কৌশল উঠে এসেছে।

প্রথমত, নরওয়ের হাই প্রেসিং ঠেকাতে ব্রাজিলের পূর্বপ্রস্তুতির অভাব চোখে পড়েছে বেশি। নরওয়ে ম্যাচজুড়ে যে হাই প্রেসিং ফুটবল খেলবে, তা ব্রাজিলের ধারণার বাইরে ছিল বলেই আমার মনে হয়। ব্রাজিল সম্ভবত ভেবেছিল, নরওয়ে লো ব্লক করবে এবং প্রতি–আক্রমণে আসবে। কিন্তু মাঠে সেটা হয়নি; বরং নরওয়ে অনেক ওপরে উঠে খেলেছে।

সাধারণত ব্রাজিলিয়ানরা মাঝমাঠে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও সুসংগঠিত থাকেন, যেখানে অন্তত চারজন খেলোয়াড় সক্রিয় থাকেন। কিন্তু এই ম্যাচে ব্রাজিলের মাঝমাঠে প্রায়ই মাত্র দুজন খেলোয়াড়কে দেখা গেছে, যার সুযোগ নিয়ে নরওয়ে মাঝমাঠে ‘ফোর ভার্সেস টু’ পরিস্থিতি তৈরি করে মাঝমাঠের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।

দ্বিতীয়ত, আর্লিং হলান্ডভীতি ও ব্রাজিলের রক্ষণের ভঙ্গুরতা। নরওয়ের প্রধান অস্ত্র হলান্ডকে নিয়ে ব্রাজিলের কোনো ‘হোমওয়ার্ক’ ছিল না, যার ফল বিশ্বকাপ থেকে এমন বিদায়।

ব্রাজিলকে হারিয়ে সতীর্থদের নিয়ে ‘ভাইকিং রো’ উদ্‌যাপনে নেতৃত্ব দেন নরওয়ের অধিনায়ক আর্লিং হলান্ড
এএফপি

হলান্ড পুরো ম্যাচে মাত্র ১০-১২ বার বল ছুঁলেও তাঁর উপস্থিতি ছিল ব্রাজিলের জন্য আতঙ্কের। তাঁকে রুখতে গিয়ে ব্রাজিলের ডিফেন্ডাররা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে হলান্ড বল পাওয়ামাত্রই মার্কিনিওস-গ্যাব্রিয়েলরা খেই হারিয়ে ফেলছিলেন।

তৃতীয়ত, ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের মধ্যে মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাস, সাহস ও ধৈর্যের অভাব ছিল স্পষ্ট, যা ব্রাজিলের মতো দলের সঙ্গে বেমানান। বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বাড়তি চাপ খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। যার শুরুটা আমরা দেখেছিলাম গ্রুপ পর্বে মরক্কো ম্যাচ থেকেই। মরক্কো ম্যাচের ধাক্বার পর ব্রাজিলের পরের তিনটি ম্যাচ আশান্বিত করেছিল।

কিন্তু শেষ ষোলোর ম্যাচে প্রথম ১০ মিনিটেই নরওয়ের আধিপত্য দেখে সম্ভবত ব্রাজিল নার্ভাস হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে সেই চিরচেনা সাহস বা ধৈর্য দেখা যায়নি। এমনকি পেনাল্টি মিস করা এবং নরওয়ের গোলকিপারের সেই সেভ আত্মবিশ্বাস আরও কমিয়ে দেয়, অন্যদিকে নরওয়েকে দেয় নতুন অনুপ্রেরণা।

চতুর্থত, কার্যকর এবং প্রথাগত একজন নাম্বার নাইনের অভাবে ব্রাজিলের আক্রমণগুলো প্রায়ই খেই হারিয়েছে। অন্যদিকে নরওয়ে লম্বা বলগুলো হলান্ডকে দিয়েছে এবং হলান্ড তার কাজটা ঠিকঠাক করেছে।

অন্যদিকে নরওয়ের হাই প্রেসিং কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্রাজিল যখন লম্বা পাস খেলছিল, তখন বল রিসিভ করার মতো সঠিক জায়গায় কোনো ‘নাম্বার নাইন’ বা টার্গেট ম্যান ছিল না। এ ছাড়া সাধারণত ব্রাজিল প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পেছন দিয়ে বল নিয়ে যায় এবং গোলের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু এই ম্যাচে ব্রাজিলিয়ানদের পাসিং ও রানিংয়ের টাইমিং এতই খারাপ ছিল যে বেশ কয়েকবার তাঁরা অফসাইড পজিশনেও ধরা পড়েন।

আরও পড়ুন

পঞ্চমত, ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির কোচিং স্টাফের বড় ঘাটতি ছিল প্রতিপক্ষের কৌশলের বিকল্প কৌশল পূর্বানুমান করতে না পারা এবং সেই অনুযায়ী মাঠে তারা ব্যবস্থাও নিতে পারেনি।

নরওয়ে যখন ভিন্ন কিছু করে ব্রাজিলকে চমকে দিয়েছে, তখন ব্রাজিল তার জবাব দিতে পারেনি। এমনকি ম্যাচ চলাকালীন সময়ে নরওয়ে যখন দুজন সতেজ উইঙ্গার নামিয়ে চাপ বাড়াল, ব্রাজিল তখনো কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়।

আর্জেন্টিনা ফুটবল দল
রয়টার্স

ব্রাজিলের এই বিদায় আর্জেন্টিনার জন্য বড় সতর্কবার্তাও। তবে আর্জেন্টিনার ইতিবাচক দিক হলো, তারা প্রতিপক্ষের হাই প্রেসিং সামলে বল দখল রেখে আক্রমণে যেতে ব্রাজিলের চেয়ে বেশি দক্ষ। মিসরের বিপক্ষে সম্ভবত ‘লো ব্লক’ এবং প্রতি–আক্রমণের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা, যেখানে মেসিকে কড়া মার্কিংয়ে রাখা হবে।

তবে নরওয়ে, কেপ ভার্দের মতো মিসরও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হাই প্রেসিংয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বড় দলগুলোর জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, মাঠের মানসিক প্রস্তুতি এবং প্রতিপক্ষের চমকে দেওয়া ট্যাকটিকস সামাল দেওয়া।
পরিশেষে বলব, নরওয়েকে হারাতে যে প্রস্তুতিটা দরকার ব্রাজিলের, তাতে তাদের ঘাটতি ছিল।

লেখক: ফুটবল কোচ ও বিশ্লেষক