তিন লাল কার্ডে শুরু, বিশ্বকাপ কি হবে ‘লালে লাল’
কথায় আছে, ‘সকাল দেখেই বোঝা যায়, দিনটা কেমন যাবে।’ তো, এবার বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই দেখা গেল ৩ লাল কার্ড। টুর্নামেন্ট শেষে লাল কার্ডের ‘বোঝা’ কতটা ভারী হবে কে জানে!
উত্তর সময়ের হাতে। তবে আজতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ম্যাচ শেষেই এই প্রশ্ন উঠে গেছে। তার কারণ, চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে ৩২ দলের মোট ৬৪ ম্যাচে লাল কার্ড দেখা গিয়েছিল মাত্র ৪টি। তার চার বছর আগে একই সংস্করণের ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও লাল কার্ড ছিল ৪টি। এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ম্যাচসংখ্যা ১০৪টি। বিশ্বকাপে এক আসরে সর্বোচ্চ লাল কার্ডের রেকর্ডটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তাই উঁকি দিচ্ছে এখনই।
সেটা না হয় দিক, এরই মধ্যে কিন্তু ভেঙে গেছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে উদ্বোধনী ম্যাচে সর্বোচ্চ লাল কার্ডের রেকর্ড। ১৯৯০ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে চমকে দেওয়া ‘আফ্রিকার অদম্য সিংহ’ ক্যামেরুনের দখলে এত দিন ছিল রেকর্ডটি। সে ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন ক্যামেরুনের আন্দ্রে কানা-বিয়িক ও বেনজামিন ম্যাসিং।
আজতেকায় এবারের বিশ্বকাপে উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর ২-০ গোলে জয়ের ম্যাচে পেছনে পড়ল ৩৬ বছর আগের সেই রেকর্ড। মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকার ‘যৌথ প্রযোজনা’য় লাল কার্ড দেখা গেল ৩টি। দক্ষিণ আফ্রিকার দুই মিডফিল্ডার স্ফেফেলো সিথোলে ও থেম্বা জেওয়ানে লাল কার্ড দেখেন। মেক্সিকোর সেজার মন্তেস এরপর লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।
তবে জেওয়ানের লাল কার্ডটা মেনে নিতে পারেননি দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হুগো ব্রুস। মেক্সিকোর রক্ষণভাগে আক্রমণে উঠে স্বাগতিক ডিফেন্ডার রবার্তো আলভারাদোকে ছাড়াতে গিয়ে হাত ব্যবহার করেন জেওয়ানে। ভিএআর দেখে রেফারি উইলটন সাম্পাইও লাল কার্ড দেখান জেওয়ানকে। ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের ব্রুস বলেন, ‘দ্বিতীয়টি (লাল কার্ড) নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি। মেক্সিকান খেলোয়াড়ই আমার খেলোয়াড়কে বাধা দিয়েছিল। রেফারি তার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং আমাদের সেটা মেনে নিতে হবে। কিন্তু আমার মনে হয় না (লাল কার্ড ছিল)। ওটা লাল কার্ড নাও দেওয়া যেত।’
বিশ্বকাপে এক ম্যাচে ন্যূনতম তিন বার তার বেশি লাল কার্ড দেখা গেছে সাতবার। এর মধ্যে প্রথম দুটি ঘটনাই কোয়ার্টার ফাইনালে—১৯৩৮ বিশ্বকাপে ‘ব্যাটল অব বোর্দো’খ্যাত ব্রাজিল ও সাবেক চেকোশ্লোভাকিয়ার ম্যাচে ৩ লাল কার্ড দেখা যায়। ১৬ বছর পর ১৯৫৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিল-হাঙ্গেরি ‘ব্যাটল অব বার্ন’ ম্যাচেও দেখা যায় ৩টি লাল কার্ড। একই ঘটনা ফিরে আসে ৪২ বছর পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকা-ডেনমার্ক ম্যাচে।
আট বছর পর সবকিছু ছাপিয়ে যায় ২০০৬ বিশ্বকাপ। সেবার গ্রুপ পর্বে ইতালি-যুক্তরাষ্ট্র ও ক্রোয়েশিয়া-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ৩টি করে লাল কার্ড দেখা গেছে। এরপর শেষ ষোলোয় ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’খ্যাত নেদারল্যান্ডস-পর্তুগাল ম্যাচটি সব ছাপিয়ে যায়। ৪টি লাল কার্ড দেখান রেফারি—বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে এটাই সর্বোচ্চ লাল কার্ড। শুধু তাই নয়, ২০০৬ বিশ্বকাপ আসলে লাল কার্ডেরই বিশ্বকাপ। মোট ২৮টি লাল কার্ড দেখা গিয়েছিল—যেটা বিশ্বকাপে এক আসরে সর্বোচ্চ লাল কার্ডের রেকর্ড।
এই ম্যাচে লাল কার্ডের আলোচনায় ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’ ফিরে আসবেই। কারণ সেই ম্যাচের পর দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোর মধ্যকার ম্যাচে একাধিক লাল কার্ড দেখা গেল। সেই ম্যাচের পর দক্ষিণ আফ্রিকাই এবার প্রথম দল হিসেবে দুটি লাল কার্ড দেখল। ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গে’ পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের দুজন করে খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন।
লাল কার্ড প্রসঙ্গে এবারের বিশ্বকাপে উদ্বোধনী ম্যাচটি রেকর্ড বইয়ে আরও একটি পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। তিনটি লাল কার্ডই সরাসরি দেখান ব্রাজিলিয়ান রেফারি সাম্পাইও। কেউ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েননি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে এক ম্যাচে তিনটি সরাসরি লাল কার্ড দেখা গেছে ৭২ বছর আগের সেই ‘ব্যাটল অব বার্ন’ ম্যাচে।
তবে সেবারের সেই ১৯৫৪ বিশ্বকাপে কার্ডের প্রচলন ছিল না। লাল কার্ড ও হলুদ কার্ডের প্রচলন শুরু হয় ’৭০ বিশ্বকাপ থেকে। ‘ব্যাটল অব বার্ন’ ম্যাচে ব্রাজিলের নিল্টন সান্টোস, হাঙ্গেরির ইয়োসেফ বোজিক ও হামবার্তো তোজ্জিকে সরাসরি মাঠ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন রেফারি। সে হিসেবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম এক ম্যাচে তিনজন খেলোয়াড় সরাসরি লাল কার্ড দেখলেন, সেটাও উদ্বোধনী ম্যাচে!