বিশ্বের একমাত্র ক্লাব, যারা সব ম্যাচ খেলে ‘পরের দিন’, ফিরে আসে ‘আগের দিন
চারপাশে নীল জলরাশি আর পামগাছের সারি। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এক টুকরা দ্বীপ—তাহিতি। পর্যটকদের জন্য বলা যায় ‘ড্রিম ডেস্টিনেশন’।
কিন্তু এ তাহিতি দ্বীপের ফুটবলারদের জীবন মোটেই এত কাব্যিক নয়; বরং তাঁদের জন্য প্রতিটি ম্যাচ খেলতে নামা মানেই সময়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা। বিশ্ব ফুটবলে ‘তাহিতি ইউনাইটেড’ সম্ভবত একমাত্র দল, যারা অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে ‘ভবিষ্যতে’ চলে যায়, দেশে ফিরলে চলে আসে এক দিন ‘অতীতে’!
সায়েন্স ফিকশন সিনেমার গল্প মনে হচ্ছে? চলুন, ভেঙে বলা যাক। ওশেনিয়া মহাদেশের প্রথম পেশাদার ফুটবল লিগ ‘ওএফসি প্রো লিগ’-এ সুযোগ পেয়েছে ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার ক্লাব তাহিতি ইউনাইটেড। টুর্নামেন্টে তাদের লড়তে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, নিউজিল্যান্ড ও ভানুয়াতুর মতো দেশগুলোর সাতটি ক্লাবের বিপক্ষে। ২০২৭ সালের প্যাসিফিক গেমসের জন্য তাহিতির নিজস্ব স্টেডিয়ামে সংস্কারকাজ চলছে। ফলে আপাতত তাহিতি ঘরের মাঠে কোনো ম্যাচ আয়োজন করতে পারছে না।
ওএফসি প্রো লিগেও তাদের সব ম্যাচ খেলতে হবে প্রতিপক্ষের মাঠে। সমস্যাটা হলো, প্রতিপক্ষ দলগুলোর সবই তাহিতির পশ্চিমে থাকা কোনো না কোনো দেশের, অর্থাৎ ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট লাইন’ বা আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার ওপারে।
আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা হলো প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কাল্পনিক রেখা। এটি মূলত পৃথিবীকে সময় ও তারিখের হিসাবে দুই ভাগে ভাগ করে। আপনি যদি এই রেখা পশ্চিম দিকে (এশিয়ার দিকে) অতিক্রম করেন, তবে আপনার ক্যালেন্ডারে এক দিন যোগ করতে হবে। আর যদি পূর্ব দিকে (আমেরিকার দিকে) অতিক্রম করেন, তবে আপনাকে এক দিন পিছিয়ে দিতে হবে।
এবার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, তাহিতি থেকে ফিজির দূরত্ব মেরেকেটে দুই হাজার মাইল। কিন্তু সময়ের হিসাবে ফিজি এগিয়ে আছে পাক্কা ২২ ঘণ্টা। সহজ করে বললে, আপনি যদি তাহিতি থেকে ফিজি যান, তবে আপনি এক দিন ‘ভবিষ্যতে’ চলে যাবেন, আর ফিজি থেকে তাহিতি এলে আপনি এক দিন ‘অতীতে’ ফিরে গেছেন।
ফিজির মানুষ যখন রোববার সকালের নাশতা করছেন, তাহিতির মানুষ তখনো শনিবারের দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। ফলে তাহিতির সমর্থকেরা যখন নিজেদের ড্রয়িংরুমে বসে তাঁদের দলের খেলা দেখেন, ক্যালেন্ডারের হিসাবে সেই ম্যাচ আসলে হচ্ছে ‘আগামীকাল’! আর ওএফসি প্রো লিগে তাহিতি ইউনাইটেডের সব ম্যাচই তাদের দেশের পশ্চিমে থাকা দেশের ক্লাবগুলোর বিপক্ষে হওয়ায় প্রতিটি ম্যাচ খেলতে তাদের ‘ভবিষ্যতে’ যেতে হচ্ছে। এই পুরো লিগটাই যেন তাহিতি ইউনাইটেডের জন্য এক অন্তহীন অ্যাওয়ে সফর।
বিশ্ব ফুটবলে ‘তাহিতি ইউনাইটেড’ সম্ভবত একমাত্র দল, যারা অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে ‘ভবিষ্যতে’ চলে যায়, দেশে ফিরলে চলে আসে এক দিন ‘অতীতে’!
তাহিতির ক্লাবগুলোর জন্য অবশ্য লম্বা সফর নতুন কিছু নয়। ফরাসি শাসিত অঞ্চল হওয়ায় প্রতিবছর তারা ফ্রেঞ্চ কাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। ২০২১ সালে যেমন দ্বীপটির এএস ভেনাস নামের এক ক্লাব প্রায় ২০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সের চতুর্থ স্তরের এক দলের বিপক্ষে খেলতে গিয়েছিল। ফল? ২-০ গোলে হার, অর্থাৎ অত পথ উড়ে গিয়ে শুধু একরাশ ক্লান্তি আর হার নিয়ে ফিরতে হয়েছিল তাদের।
তবে এবার চিত্রটা ভিন্ন। তাহিতি ইউনাইটেডের জেনারেল ম্যানেজার তেমায়ুই ক্রলাস ইএসপিএনকে বলেন, ‘লজিস্টিক সামলানোই এখানে আসল চ্যালেঞ্জ। আমাদের সব সময় ম্যাচের চেয়ে ভ্রমণ নিয়ে বেশি ভাবতে হয়। তবে এই ক্লাবটা তাহিতির খেলাধুলার জন্য এক বিরাট বিপ্লব। আমরাই দেশের প্রথম পেশাদার স্পোর্টস টিম।’
এমন পেশাদারত্বের জন্য ফুটবলারদের ত্যাগও কম নয়। কেউ কেউ নিশ্চিত ক্যারিয়ার বা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন স্রেফ ফুটবলের নেশায়। মাসের পর মাস কাটাতে হচ্ছে ঘরবাড়ি আর প্রিয়জন ছেড়ে ভিনদেশে, তবু স্বপ্নটা তো বড়! ২০১২ সালে ওশেনিয়া নেশনস কাপ জিতে তাহিতি চমকে দিয়েছিল ফুটবল–বিশ্বকে। খেলেছিল ২০১৩ কনফেডারেশনস কাপে স্পেন, নাইজেরিয়া আর উরুগুয়ের মতো বড় সব দলের বিপক্ষে। সেই গৌরবের মশালটাই এখন বইছে তাহিতি ইউনাইটেড।
ওএফসি প্রো লিগে ফিজির বুলা এফসিকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথম জয় পায় তাহিতি ইউনাইটেড। সেই জয়ের পর তাহিতির ক্যাফেগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। এরপর পাপুয়া নিউ গিনির ক্লাব হেকারিকে হারিয়ে তারা জানান দিয়েছে মহাদেশের ফুটবলে আগমনী বার্তাও। দলের কোচ স্যামুয়েল গার্সিয়া এর আগে ছয় বছর তাহিতি জাতীয় দলের দায়িত্বে ছিলেন। ইএসপিএনকে ই–মেইলে জানানো প্রতিক্রিয়ায় তাঁর কী যে উচ্ছ্বাস, ‘পেশাদার লিগে প্রথম জয় পাওয়াটা আমাদের জন্য এক মাইলফলক। এটা প্রমাণ করেছে, আমরা সঠিক পথেই আছি।’
এই টুর্নামেন্টে খেলতে পুরো মৌসুমে তাহিতি ইউনাইটেডের ফুটবলারদের প্রায় ৩০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে। অন্তত এক সপ্তাহ কাটবে শুধু মেঘের ওপর বিমানে। চার মাসের এই অভিযানে ১২ বার আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পার হয়ে সময়ের আগে-পিছে যাতায়াত করবেন তাঁরা। ক্লাবের অধিনায়ক ও তাহিতি ফুটবলের কিংবদন্তি তেওনুই তেহাউ মনে করেন, ভ্রমণক্লান্তিই তাঁদের দলগতভাবে আরও শক্তিশালী করছে।
তাহিতি ইউনাইটেডের স্বপ্ন এখন একটাই—ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে এ রকম বড় টুর্নামেন্টের ম্যাচ খেলা। তবে স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ চলায় ২০২৮ সালের আগে হয়তো সেই আশা পূরণ হবে না।
তত দিন পর্যন্ত তাহিতির সমর্থকদের দূর থেকেই দলের জন্য গলা ফাটাতে হবে। আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা হয়তো তাঁদের বারবার ‘অতীতে’ আটকে রাখছে, কিন্তু তাঁদের প্রিয় ফুটবলাররা ঠিকই ডানা মেলছেন ‘ভবিষ্যতের’ দিকে।